মার্চের ৩০ তারিখের সকাল। হঠাৎ করে শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২১১তম জন্মদিবস উপলক্ষে একটা ছুটি পাওয়া গেছে। সকালের ফুরফুরে হাওয়া গায়ে মেখে এগিয়ে চলেছি মেটিয়াবুরুজের পথে। মেটিয়াবুরুজ যেন কলকাতার মধ্যেই এক অন্য কলকাতা, যার অনেকটাই অজানা, অচেনাও।

মেটিয়াবুরুজের ইতিহাস কলকাতার থেকেও পুরনো। কোম্পানির শাসন শুরু হওয়ার আগে, ভাগীরথী নদীর দুই তীরে দুটো মাটির কেল্লা ছিল। একটা তৈরি করেছিলেন মহারাজা প্রতাপাদিত্য, আরেকটি ডাচ বণিকরা। রবার্ট ক্লাইভ যখন কলকাতা দখল করেন, কেল্লা দুটো গুঁড়িয়ে মাটির ঢিবিতে পরিণত করেন। সেখান থেকেই মেটিয়াবুরুজের গোড়াপত্তন। তারপর হুগলি নদীতে বয়ে গেছে অনেক জল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মেটিয়াবুরুজের দ্বিতীয় লখনৌ হয়ে ওঠার কাহিনি তো আরও খানিক পরের। সে তো ইংরেজদের লখনৌ গিলে নেওয়ার কাহিনি। নবাব ওয়াজেদ আলি শাহকে পদচ্যুত, প্রতারিত করার কাহিনি। অযোধ্যা থেকে নির্বাসিত, ভাগ্যহত নবাব বারাণসী হয়ে বজরায় ভেসে এসে নোঙর ফেললেন এই মেটিয়াবুরুজের বিচালিঘাটে। নবাব তখন ইংরেজ কোম্পানির পেনশনভোগী। তবুও তিনি স্বপ্ন দেখেন, একের পরে এক মহল তৈরি করেন এই শহরের বুকে। তিল তিল করে তিরিশ বছর ধরে ছোটা লখনৌতে এক ছায়া রাজত্ব তৈরী করেন তিনি। ইংরেজরা অযোধ্যা কেড়ে নেওয়ার পর আর তাঁর ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না। কিন্তু হিন্দুস্থানী সঙ্গীত, শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসাবে মেটিয়াবুরুজকে গড়ে তোলার অবিসংবাদিত নায়ক, ভাগ্যবিড়ম্বিত সংস্কৃতিবান নবাবের কথা আজ নয়। লখনৌয়ের নবাব কীভাবে মেটিয়াবুরুজের নবাবে পরিণত হলেন সে কাহিনিও নতুন নয়।

আজ আমরা মেটিয়াবুরুজের এক আপাত অনালোচিত, অনুল্লিখিত ইতিহাস ফিরে দেখব, যা অনেকদিন পরে স্মৃতির আড়াল থেকে জনসমক্ষে এল ২০১৫ সালের ৭ অক্টোবর, যখন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এলেন মেটিয়াবুরুজের সুরিনাম ঘাটে। সুরিনাম ও ভারতের স্মৃতি বিজড়িত অ্যালুমিনিয়ামের মাই বাপ মূর্তির আবরণ উন্মোচন করলেন।

মেটিয়াবুরুজ আর দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামের এই যোগাযোগ এ অঞ্চলের মানুষজনের কাছে তত সহজবোধ্য নয়। সুরিনাম ঘাট নামটা তাদের কাছে পরিচিত নয়,এই ঘাট তাদের কাছে বালুঘাট নামেই পরিচিত। যদিও সুরিনামের সাথে ভারতের সম্পর্ক ১৫০ বছরের পুরনো। সেই সম্পর্কের ইতিহাস বড়ই করুণ, আত্মগ্লানির, পরাজয়ের এবং তাই বোধহয় লোকচক্ষুর অন্তরালেই তার অবস্থান।

দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পূর্ব আটলান্টিক উপকূলে সুরিনাম। সেখানকার ডাচ ঔপনিবেশিকরা প্ল্যান্টেশন পদ্ধতিতে আখ, কফি, কোকো ও আরও কিছু শস্য ফলাত। এই অঞ্চলে বিশেষত আখ চাষ খুবই লাভজনক ছিল। প্ল্যান্টেশন পদ্ধতিতে অনেক বড়ো জমিতে চাষ হত বলে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হত। প্রধানত আফ্রিকা থেকে আসা ক্রীতদাসদের দিয়ে এখানে শ্রমিকের চাহিদা পূরণ করা হত। কিন্তু ১৮৬৩ সালের ১ জুলাই ডাচ মুলুকের রাজা তৃতীয় উইলেমের ঘোষণা অনুসারে উপনিবেশগুলোতে দাসপ্রথার অবসান হলে সুরিনামে কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিকের অভাব দেখা দিল। ১৮৭০ সালে এক চুক্তি অনুসারে ডাচ গায়ানা ব্রিটিশদের হতে ছেড়ে দিল ওলন্দাজরা, পরিবর্তে ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষ থেকে শ্রমিক নিয়োগের অধিকার পেল। এ দেশ তখন নামমাত্র মজুরিতে সুলভ শ্রমিক জোগাড় করার স্বর্গরাজ্য। নিয়োগ করা হল এজেন্ট, কলকাতায় তৈরি হল মরিশাস, দক্ষিণ গায়ানা বা সুরিনামের অফিস। এজেন্টরা ভারতবর্ষের উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, বাংলা ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়োগ করা শুরু করল।

সুরিনামের উদ্দেশে প্রথম জাহাজ আল্লারুখ কলকাতা বন্দর থেকে গাদাগাদি করে ৩৯৯ জন চুক্তিবদ্ধ শ্রমিককে নিয়ে যাত্রা শুরু করে ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩। ৫ জুন জাহাজটি সুরিনামে পৌঁছায় এবং ১৮৭৩ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে ৬৪টি জাহাজ ৩৪,০০০-এর বেশি শ্রমিক নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল সুরিনামের উদ্দেশে। প্রথম জাহাজ আল্লারুখ যখন সুরিনামের রাজধানী পারামারিবোতে পদার্পণ করে, তখন আগত শ্রমিকদের ১১ জন যাত্রার ক্লান্তি এবং ভিড়ের চাপে মারা যান। ভারত থেকে রওনা দেওয়া যে জাহাজ শেষ দ্বীপপুঞ্জ সুরিনামে পৌঁছেছিল তার নাম দেয়া। তখন ১৯১৪ সাল।

এই সময়ের মধ্যে প্রায় এক লাখ চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক অজানার উদ্দেশে ফিজি, দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি দেন। শুধুমাত্র পেটের টানে বলা ভুল হবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জোর জবরদস্তি করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সে সময়ে কর আদায়ের কড়াকড়ি, অত্যাচার ভারতীয় কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিয়েছিল। বছরের যে সময়ে চাষবাস হত না, সেইসময় বিকল্প জীবিকা না থাকায় তাদের অর্ধাহারে, অনাহারে জীবন কাটাতে হত। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে তাদের অনেকেই সরল মনে পাঁচ বছরের জন্য সুরিনাম যাওয়ার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে। এর পরিণাম তাদের জানা ছিল না।

উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে মুজফফরপুর, বেনারস, এলাহাবাদ, পাটনা,ভাগলপুর অঞ্চলে নিয়ে আসা হত, সেখান থেকে রেলে কলকাতায়। পুরুষ শ্রমিকের জোগান দিয়ে এজেন্ট পেতেন ২৫ টাকা আর মহিলা শ্রমিকের জোগানে ধার্য ছিল ৩৫ টাকা। কাকুতি মিনতি, লোভ, ভয় দেখিয়ে দৈহিক নির্যাতন করা, জোর খাটানো – সবরকম উপায়েই তাঁরা শ্রমিক সংগ্রহ করতেন।

কলকাতায় আসার পর শ্রমিকদের বরাদ্দ ছিল থালা, বাটি আর কয়েকখানা পোশাক। এই নিয়ে পুঁটুলি বেঁধে তাদের যাত্রা শুরু হত। যদিও ব্রিটিশ সরকার তাদের বোঝাত পাঁচ বছর পরে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। সেই আশাতেই তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে যাত্রা করত, কিন্তু আসলে ওলন্দাজদের কাছে হস্তান্তরিত হত। দাস শ্রমিকের পরিচয় বদলে যেত চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকে।

কলকাতা বন্দর থেকে বিভিন্ন দেশের উদ্দেশে নির্দিষ্ট জেটি থেকে জাহাজ যাত্রা করত, গন্তব্য দেশটার নামেই জেটির নামকরণ হত। এইভাবেই সুরিনাম ঘাট নাম হয়। যদিও আজ আর মেটিয়াবুরুজের মানুষ ওই নামে কোনো ঘাটকে চেনে না। তাঁরা সিইএসসির সাদার্ন জেনারেটিং স্টেশনের মধ্যে দিয়ে বালুঘাট যাওয়া যায়, এইটুকুই জানেন। সেই বালুঘাট ই যে সুরিনাম ঘাট, সেই ইতিহাস বিস্মৃতপ্রায়।

মাই বাপ স্মৃতিফলকটির আবরণ উন্মোচনে সুরিনাম ঘাটে এসেছিলেন ভারতে সুরিনামের রাষ্ট্রদূত আসনা কানহাই, যিনি নিজেও ভারতীয় বংশোদ্ভুত। তিনি আবেগবিহ্বল হয়ে স্মৃতিচারণ করেন কীভাবে তাঁর পূর্বপুরুষ ভবানীপুর ডিপো থেকে সুরিনাম যাত্রা করেছিলেন। ছোটবেলায় সুরিনামে শোনা ভোজপুরী গান, রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী, কোরান পাঠ আর কিছু রবীন্দ্রসংগীতের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

ভিটেমাটি ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলোর অক্লান্ত পরিশ্রমের জীবনে আনন্দ বলতে ছিল দিনান্তের পরিশ্রম শেষে সন্ধেবেলা পরিবার পরিজনদের সাথে তুলসীদাসী রামায়ণ অথবা কাশীরাম দাসের মহাভারত পাঠ এবং সময়ে অসময়ে ভোজপুরী গানের কলি গুনগুনিয়ে ওঠা। কহোলি, ঈদ উল ফিতর প্রভৃতি দেশীয় উৎসব, অনুষ্ঠান দেশজ সংস্কৃতির সাথে যোগ স্মরণ করাত। অবর্ণনীয় কঠোর দাসত্বের জীবনে হঠাৎ করে সবকিছু নেই হয়ে যাওয়া জীবনে ওইটুকুই ছিল তাদের সম্বল। কথা ছিল পাঁচ বছর পরে কাজ শেষে ঘরে ফিরে আসবেন তাঁরা, কিন্তু তা হয়নি। ক্রমশ ব্যাপারটা নির্বাসন হয়ে দাঁড়াল। ব্রিটিশ সরকার তাঁদের আর ফিরিয়ে আনেনি। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল মানুষগুলোকে।

শেষপর্যন্ত ও দেশেরই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন সেই শ্রমিকরা। একবার সুরিনাম ছেড়ে নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন কেউ কেউ চলে গিয়েছিলেন, অনেকে যাননি। দেশ, আত্মীয় পরিজন শুধু স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল। সুরিনাম ঘাটের এই মাই বাপ ফলকটি সুরিনামের পারামারিবোয় স্থাপিত মূর্তির রেপ্লিকা — মা, বাবা, সন্তানের হাত ধরে, পুঁটলি নিয়ে মানুষ চলেছে অজানিতের পথে। সেই সুরিনাম যাত্রার স্মৃতি এখন বেঁচে আছে উত্তরসূরিদের মধ্যে।

সুরিনাম ঘাট আজ পরিত্যক্ত। কোনো জাহাজ আনাগোনা করে না। ঘাটের অদূরে ওয়াজেদ আলী শাহের প্রাসাদ, ইমামবড়া ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর অব্যক্ত যন্ত্রণার, বিশ্বাসঘাতকতার, প্রতারণার স্মৃতিভার বুকে নিয়ে রয়ে গেছে কিছু মাস্তুল।

তথ্যঋণ: দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

আরও পড়ুন

পড়শি রাজ্যে এক টুকরো বাংলার সন্ধানে

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.