চলেছি বোলপুর হয়ে দুমকার পথে। লীলা মজুমদারের হলদে পাখির পালক যখন হাতে এসেছিল, তখন আমার তৃতীয় শ্রেণী। সেই তো দুমকার সাথে পরিচয়। ঝগড়ু চিনিয়েছিল দুমকাকে। জেনেছিলাম, “দুমকায় ওদের গাঁয়ে হয় না, এমন আশ্চর্য জিনিস নাকি নেই।”

তারও অনেক পরে, কালকূটের কোথায় পাবো তারে উপন্যাসে দুমকার মলুটিতে সেই আশ্চর্য, অজানা ভুবনের আবিষ্কার। “সত্যি যে কোথায় শেষ হয়, স্বপ্ন যে কোথায় শুরু হয়” ঝগড়ুর এই বিশ্বাস আমার হৃদয়ে নোঙর করে নিল। শুরু হল, মলুটির সাথে আমার ঘর বসত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অনেকদিনের চেষ্টা সফল হল, সেই কোন ভোরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে highway mirchi-তে তড়িঘড়ি কিছু খেয়ে চলেছি মলুটির পথে। বোলপুর হয়ে সাঁইথিয়ার রাস্তায়। বোলপুর বাজার, সাঁইথিয়া বাজারে কালীপুজোর বিকিকিনি চলছে। ঘনবসতিপূর্ণ, গঞ্জের বড় বাজার অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চলেছে। ময়ূরাক্ষীর উপরে পুরনো ব্রিজের মেরামতি চলছে, তাই নতুন ব্রিজের উপর দিয়ে চলেছি। পথে শনিবারের বিরাট গরুর হাট, ট্রাকের ভিড়, বেচাকেনা চলছে। যানজট পেরিয়ে আমেদপুরের রাস্তায়, সড়কের পাশে পাশে চলেছে রেললাইন। সবুজে, সবুজে মেশা নীল নীলিমায় হারাতে হারাতে বাতাসপুর, গদাধরপুর, পুরন্দরপুর, মল্লারপুর, হস্তীকাদা হয়ে চলেছি মলুটির পথে।

সাঁওতাল পরগণার শিকারিপাড়া থানার অন্তর্গত মলুটি বাঙালি অধ্যুষিত হলেও, কয়েক ঘর ওঁরাও আছেন। তাঁদের ঘরদোর নানা ছাঁদের, নানা আকারের। একচালা, দোচালা, খড়ে ছাওয়া মাটির দোতলা। চুমড়ে আর চন্দননালা নদী চলেছে গ্রামের দুপাশে। লাল, রুক্ষমাটির দেশ, দূরে টিলা। মন্দিরের গ্রাম মলুটিতে বর্তমানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ৭২টি মন্দির, ১০৮টি মন্দিরের মধ্যে। যদিও হয়ত আবহবিকার, বায়ুক্ষয়ের কারণে মন্দিরের গায়ের টেরাকোটার কাজ অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে পুরাতত্ত্ব বিভাগ মন্দির সংরক্ষণের কাজে হাত দিয়েছেন।

মলুটিকে ঘিরে অনেক উপকথা, রূপকথাও। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের এই ভূমের নাম ছিল মল্লহাটি। সেখান থেকেই মলুটি নামের উৎপত্তি। অনেকে মনে করেন, এই মল্লভূম ছোটোনাগপুরের মালভূমি অঞ্চল, বাঁকুড়া, বীরভূম, মেদিনীপুর নিয়েই গঠিত ছিল। কারও বিশ্বাস, মহুল বন থেকেই মহুলটি এবং তারপরে লোকমুখে মলুটি।

শক্তি সাধনার তীর্থভূমি মলুটি। কালী এখানে বিভিন্ন রূপে পূজিত হন। মন্দিরের দেশ মলুটির আরেক নাম গুপ্তকাশী। তন্ত্রসাধনক্ষেত্র মলুটিতে বজ্রযান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তন্ত্রসাধনা করতেন।

এ কথাও শোনা যায়, আদি শঙ্করাচার্য কাশী যাওয়ার পথে কিছুদিন এখানে অবস্থান করেন এবং বৌদ্ধধর্মের সর্বজনীন, ক্রমবর্ধমান আবেদন কমানোর জন্য এখান থেকেই হিন্দু পুনরুজ্জীবন আন্দোলন শুরু করেন।

সরকারী খাতায় মলুটি ছিল ১৫ শতকের নানকর রাজ্য। গরীব ব্রাহ্মণ বসন্ত রায় গৌড়ের সুলতানের বেগমের হারিয়ে যাওয়া পোষা বাজপাখি খুঁজে দিয়ে এই গ্রাম উপহার পান। বসন্ত রায়ের নতুন নাম হয়, বাজ বসন্ত। কাশীর সুমেরু মঠের দন্ডি সন্ন্যাসী তাঁকে রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন। এই বংশের রাজারা প্রাসাদ প্রতিষ্ঠায় তত আগ্রহী ছিলেন না, যতটা ছিলেন মন্দির নির্মাণ করতে। তাই ক্রমেই মলুটি হয়ে উঠল মন্দিরের দেশ। প্রতিটি মন্দিরের গায়ে, প্রাকারে টেরাকোটার অসাধারণ চিত্রশৈলী, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের গল্পগাথার অনবদ্য খোদাইকার্য।

মলুটির আকাশে বাতাসে রামপ্রসাদী সুর, ওই যেন বেজে ওঠে খ্যাপা গোবিনের গলায়, ‘অই হে, আমি এই ভয়ে মুদি না আঁখি/নয়ন মুদিলে পাছে, তারা হারা হয়ে থাকি।’

নাচ, গান, সাপ খেলানো, কালীর জয়ধ্বনি আর দেবী মৌলীক্ষা — এই নিয়েই মলুটি। কার্তিক মাসের চতুর্দশী অমাবস্যায়, আর শীতে মৌলীক্ষা মন্দির প্রাঙ্গণে হয় দেবীপূজার আয়োজন, বসে মেলা। দুই রাজ্যের মানুষ এক হয়ে যান। কর্মসূত্রে ভিনদেশে থাকা মানুষ ফিরে আসেন নিজভূমে, দূর দূরান্তের সাঁওতাল পল্লীর মানুষ চলে আসেন দেবীর থানে ও টানে।

কী এক রহস্যময়তা মৌলীক্ষার প্রান্তরে! চলে অরূপের খেলা। কার্তিকের চতুর্দশী অমাবস্যায়, রায়বাড়ির অতিথি হয়ে কালকূট পেয়েছিলেন সেই অরূপরতনের সন্ধান। জীবনসন্ধানী লেখক দেখেছিলেন, মন্দিরের গাত্রের নরনারীর মত, সাঁওতাল নরনারী,কালীপুজোর রাতে মৌলীক্ষা প্রান্তরে গহীন আঁধারে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মেতে ওঠে। সে এক পরম বিস্ময় ছিল লেখকের কাছে। তিনি দেখেছিলেন, এ যেন সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর জন্য পুজো। সেই পুজোয় মন্দিরের গায়ে পুরাণের নরনারী, এবং সাধারণ রক্তমাংসের নরনারীর প্রার্থনায় কোনো ভেদ নেই। আজ কালের নিয়মে সব ইতিহাস।

মলুটি আজ হেরিটেজ ভিলেজ। ডেভিড ম্যাককাচিয়ান বীরভূমের মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। কিন্তু এই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, পরে শিক্ষক গোপালদাস মুখোপাধ্যায় মলুটির ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। চন্দননালার ধারে প্যালিওলিথিক যুগের অস্ত্র ও পাথর পাওয়া গিয়েছে, পাওয়া গিয়েছে অনেক পুরনো পুঁথি। একার চেষ্টায় সেগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করেছেন গোপালদাস।

গ্রামে মন্দিরের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েছি বামদেবের মন্দিরের সামনে। সূর্য তখন পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে, শুনশান গ্রাম, প্রতিটি মন্দিরে শ্যামাপূজার প্রস্তুতি চলছে, পাড়ায় ম্যারাপ বাঁধা হচ্ছে, মেলা বসবে। বামদেবের মন্দিরের প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয়েছে, মাটি লেপা হয়নি। চারিদিকে মন্দির, মন্দিরই বাড়ি। সবাই কালীর সেবক, মূর্তির কারিগরও। মন্দিরগুলো একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। মন্দির, মসজিদ, গির্জার গঠনশৈলী থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ নতুন অসাম্প্রদায়িক ভাবনার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। সব মন্দিরে শ্যামা মায়ের আরাধনা হয়, মহাদেবও আরাধ্য দেবতা।

চায়ের দোকানে ছোট জটলা। এগিয়ে যাই গলা ভেজানোর জন্য। দোকানদারের সাথে সাথে খুশি স্থানীয় মানুষজনও। এগিয়ে আসেন, সাহায্য করেন মন্দিরের পথনির্দেশ দিয়ে। রাজার কথা বলতে পারেন না। তবে বলেন, রাজ্যপাট তো আছে, রাজা এখন সরকার। অনুযোগ করেন, কালীপুজোর দিন এলেন না কেন? উৎসব তো এখনও শুরু হয়নি, মূর্তি গড়া চলছে, চক্ষুদান না হলে বুঝবেন কী করে মায়ের মহিমা?

আবার কোথায় পাবো তারে উপন্যাসের ক্ষ্যাপা গোবিনের কথা মনে আসে। গুনগুনিয়ে ওঠে মন, “ওহে কালী কুণ্ডলিনী, শম্ভূভাবিনী/ জাগ মা অন্তরে শ্যামা, জাগ হে অন্তরে।”

সবাই প্রহর গুণছে, মায়ের আগমনের। “নেচে, নেচে আয় মা শ্যামা”। সারাবছরের প্রতীক্ষা, গরীব, নিম্নমধ্যবিত্ত গ্রামবাসীর আটপৌরে জীবনে এই সময়টুকুই শুধু আঁধারে আলোর ক্ষণ। পূজোর পরে আবার নেমে আসবে আঁধার, মলুটিও হয়ত চলে যাবে বিস্মৃতির অন্তরালে। কিন্তু ইতিহাস থেকে যাবে, মলুটি কথা বলবে, কৌতূহল জাগাবে ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু ভ্রামণিকদের কাছে।

তথ্যঋণ:

১। কোথায় পাবো তারে – কালকূট
২। মলুটি ওয়েবসাইট
৩। ইন্টারনেট
৪। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মলুটি সংক্রান্ত লেখা
৫। গোপাল দাস মুখোপাধ্যায়ের মলুটির ইতিহাস।

ছবি: নিবন্ধকার

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.