সম্প্রতি ভারতবর্ষের সব থেকে বড় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। বিগত ৩রা অক্টোবর গ্রেপ্তার হওয়া জনৈক আরিয়ান খানের বেলের মামলার শুনানি সম্পন্ন হওয়ার পর, মহামান্য মুম্বাই হাইকোর্ট তার জামিন মঞ্জুর করল গত ২৮শে অক্টোবর। পরের দিন, অর্থাৎ ২৯শে অক্টোবর, ভারতের প্রায় সমস্ত ভাষার সমস্ত খবরের কাগজের হেডলাইন ছিল এই খবরটিই। গোটা ভারত তখন প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ বলছিল, একজন মাদকাসক্ত জেলে থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। আরেক পক্ষ বলছিল, আরিয়ান খান যেহেতু শাহরুখ খানের ছেলে, তাই বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়ো কেসে ওকে ফাঁসিয়েছে। মিডিয়া, টুইটার, ইউটিউব যেমন উত্তাল, তেমনই আমার আপনার পাড়ার চায়ের ঠেকেও কিন্তু চর্চা হয়েছিল এই বিষয়টি নিয়ে। যদিও ড্রাগের থেকেও বেশি করে আলোচনা হওয়া উচিত রিহ্যাবিলিটেশন নিয়ে, সার্ভাইভারদের নিয়ে, কিন্তু, তা হল না। টিভি চ্যানেলে আইনজীবীরা অব্দি এসে অপরাধের বিবরণ দিলেন। কিন্তু একবারও বললেন না, যে যিনি ড্রাগ নিচ্ছেন, তাঁকে অপরাধী নয়, সর্বাগ্রে একজন শিকার হিসাবে চিহ্নিত করা উচিত। মুক্ত এবং সুস্থ্ সমাজে সেটাই কাম্য।

এবার, এসবের ঊর্ধ্বে উঠে, তথ্যের ভিত্তিতে যদি কী পেলাম কী হারালাম তার হিসেব করতে বসেন, তাহলে বুঝবেন এই কেসটি, কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া নারদা কাণ্ডের গ্রেপ্তার এবং জামিনের কেসটির থেকেও বেশি মজার। বলিউড, বা হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত কিং শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ান খানের এই কয়েক দিনের জেলযাপন, শুধু মজাদার নয়, হাস্যকরও বটে। তিন তারিখ রাতে, মুম্বাইয়ের কোনো এক প্রমোদতরীর একটি অনুষ্ঠান থেকে গ্রেপ্তার হয় আরিয়ান খান, এবং আরো সাত-আট জন, নার্কোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর হাতে। এনসিবির সেই টিমের নেতৃত্বে ছিল সমীর ওয়াংখেড়ে নামের এক অফিসার, যার এই ধরণের কেসে আগে আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করার অভিজ্ঞতা আছে। মূল অভিযোগ, ওই প্রমোদতরী থেকে তখন উদ্ধার হয়েছিল কয়েক গ্রাম চরস, কোকেন জাতীয় আরো কিছু বেআইনি মাদক দ্রব্য, এবং আরিয়ান খান সেই সমস্ত মাদক দ্রব্য কেনাবেচা এবং সেবনে যুক্ত ছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয় মামলা, আরিয়ান খান এবং আরো সাতজনের বিরুদ্ধে। এরপর আরিয়ানের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করার পর জানা যায়, যে আরিয়ানের কাছ থেকে কোনোরকম মাদকদ্রব্য উদ্ধারই হয়নি। উল্টোদিকে, এনসিবির তরফে কোর্টে জানানো হয়, মাদক হাতে নাতে না পাওয়া যাক, আরিয়ান যে মাদকের ব্যাপারে জানতেন তা তাঁর হোয়াটস্যাপ চ্যাটের থেকেই প্রমাণ হওয়া সম্ভব, এবং সেই প্রমাণ আরো সহজে হতে পারে, যদি তাকে আরো কিছুদিন জেলে রেখে, বাকি তদন্ত শেষ করে, অন্যান্য সাক্ষীদের বয়ান নিয়ে নেওয়া যায়। দুই পক্ষের সওয়াল জবাব শেষ হলে, মুম্বাইয়ের এনডিপিএস কোর্ট সপ্তাহান্তের বিরতির পর, জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়। এনডিপিএস কোর্টে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হওয়ার কারণে, আরিয়ানের আইনজীবীরা মুম্বাই হাইকোর্টে আবেদন করেন, এবং, শেষ অব্দি ২৮ তারিখ, মহামান্য মুম্বাই হাইকোর্ট থেকে ওই একই যুক্তিতে জামিন মঞ্জুর হয়। এরপর একের পর এক সকল অভিযুক্তই জামিন পেয়ে যায় এই কেসে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মজার কথা হল, ফৌজদারি মামলা প্র্যাকটিসরত আইনজীবী মাত্রেই জানে যে, প্রায় সমস্ত ভুয়ো কেসে, সরকারপক্ষ, অর্থাৎ পুলিশ, সিবিআই, এনসিবি, এনআইএ ইত্যাদি তদন্তকারী সংস্থা, এই একই ধরনের যুক্তিতে, অভিযুক্তদের জেলের মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করে। ধরুন, সেই ভীমা কোরেগাঁও মামলা, বা এলগার পরিষদ মামলায় অভিযুক্ত সকলের ক্ষেত্রেই সরকারপক্ষের বক্তব্য হল, এখন তাদের কারোর বিরুদ্ধেই বিশেষ কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও তারা প্রত্যেকেই কোনো এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। সেইজন্যই, যদি তাদের আরো কিছুদিন জেলে রেখে, বাকি তদন্ত শেষ করে, অন্যান্য সাক্ষীদের বয়ান নিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে তাদের সবার বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে সহজেই। এই যুক্তিতেই এরা সবাই এখনো জেলে, বিচার কবে শুরু হবে কেউ জানে না, তদন্ত কবে শেষ হবে তাও কারোর জানা নেই। তারপর ট্রায়াল বা বিচার আরম্ভ হলে শুরু হবে তারিখ পে তারিখের খেলা। এগুলো খুবই পরিচিত চিত্রনাট্য। আরিয়ান খানের বাবা শাহরুখ খান। তাঁর পক্ষে, টাকার তোয়াক্কা না করে, মুকুল রোহতগির মত আইনজীবীকে নিযুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু অন্যান্য প্রায় সমস্ত কেসেই অভিযুক্তের পক্ষে আইনজীবী নিযুক্ত করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে টাকার অভাবে। আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভুয়ো কিনা, সেসব তো এখনই বলা সম্ভব নয়। বিচার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণই বাকি। আরিয়ানের এই পেটি ড্রাগের কেসের সাথে, উপরোক্ত এলগার পরিষদ বা ভীমা কোরেগাঁও কেসের তুলনাও সম্ভব নয়। অভিযোগ হিসাবে সেসব অনেক গুরুতর, এবং তাতে বিচারাধীন কারোর সাথেই আরিয়ানের সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে কোনো তুলনাই হয় না। এসব কেবলই উদাহরণ মাত্র।

কিন্তু এই প্রশ্ন থেকেই যায়, যে শাহরুখ খানের ক্ষমতার আন্দাজ তো সকলেরই ছিল। তারপরেও কেন এই চেষ্টা? ইন্সপেক্টর সমীর ওয়াংখেড়ের বিরুদ্ধে অবশ্য এখনই উঠে এসেছে এক্সটরশন, হুমকি, ব্ল্যাকমেলসহ আরো বহু অভিযোগ। কিন্তু সেসব আলোচনার জায়গা এই লেখা নয়। সেই ২০১৫ সালে আমির খানের “ইনটলারেন্স” নিয়ে মন্তব্যের পর থেকেই, বারবার দেখা যাচ্ছে, একের পর এক ফিল্ম, কলাকুশলী, পরিচালক, ইত্যাদির প্রতি ছোট-বড় নানা ইস্যুতে চটে যাচ্ছে আমাদের দেশের সরকার। বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করতে হচ্ছে কোম্পানিগুলোকে, পাল্টাতে হচ্ছে ছবির নাম, বদলে ফেলতে হচ্ছে চিত্রনাট্য। অনুষ্কা শর্মার প্রযোজনায় তৈরি হওয়া পাতাললোক-এর বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা হওয়া বা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার দরুন দীপিকা পাড়ুকোনকে হঠাৎ এনসিবির তলব। বলিউডের উপর যেন একটু রেগেই আছেন সরকার বাহাদুর। কিন্তু চেষ্টার তো কোনো অভাব রাখেনি বলিউড। মাঝেমাঝেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে সেলফি তোলা, বা মিটিং করে ফেলা, দেশের কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো প্রথম সারির সিনেমা ব্যক্তিত্বের মুখ না খোলা (অবশ্যই ব্যতিক্রমী কয়েকজন বাদে), কেন্দ্রের শাসক দলের হয়ে ভোটের প্রচার, সরকারি বিজ্ঞাপনে বিনা পারিশ্রমিকে যোগদান, প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেওয়া, করোনা ভাইরাসকে আটকানোর জন্য থালা বাজানো — এসব তো বলিউডই আমাদের দেখিয়েছে। তবে এতকিছুর পরেও প্রাপ্তির ভাঁড়ার বোধহয় শূন্য। অর্থাৎ এতকিছুর পরেও, মনের মত ছবি বানানোর ছাড়পত্র বোধহয় জোটেনি। কথায় কথায় লেগেই আছে হুমকি আর হয়রানি। দেশাত্মবোধক সিনেমা ছাড়া, আর সমস্ত বিষয়কে বাদ দেওয়ার অলিখিত নিয়ম জারি করার চেষ্টাও হয়ে থাকতে পারে, বলা যায় না। অথবা হয়ত, উপরোক্ত ওই ব্যতিক্রমী মানুষগুলো, নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে, কিছু বিরুদ্ধ মতামত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই হয়ত এই আকালেও নিউটনথপ্পড়সর্দার উধম-এর মত ফিল্ম বা লায়লাসেক্রেড গেমস জাতীয় ওয়েব সিরিজ তৈরি হচ্ছে ওই বলিউডেই। ভুলে গেলে চলবে না, অতিমারির আগে ২০১৯ সাল ছিল আর্থিকভাবে বলিউডের সফলতম বছর। আসল কারণ অনুধাবন করা অসম্ভব। সিনেমার মত জনপ্রিয় মাধ্যম, এবং হিন্দি ভাষার বহুল ব্যবহার, এই দুটিকে একসাথে ব্যবহারের চেষ্টা সরকারের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি সিনেমা যেহেতু আদতে শিল্পকলা এবং শিল্পী মাত্রেই যেহেতু সাধারণ ভাবে উদারমনা এবং মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী হয়, তাই এত সহজে বোধ হয় সরকারি জাঁতাকলে ধরা পড়ছে না বলিউড, আর বারবার হয়ে চলেছে পর্বতের মূষিক প্রসব।

জার্মানির অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালক ফ্রিৎজ ল্যাংয়ের সেই গল্পটা তো সবারই জানা। তাঁর মেট্রোপলিস ছবিটির মজা ছিল, জার্মানির বাম আর দক্ষিণ — দুই পক্ষই ছবিটিকে আপন করে নিতে পেরেছিল! পত্রপাঠ তাঁর ডাক পড়েছিল গোয়েবেলসের অফিসে, এবং ‘অনুরোধ’ করা হয়েছিল একটি ‘দেশাত্মবোধক সমাজতান্ত্রিক সিনেমা’ বানানোর জন্য। তার বদলে তাঁকে সরকারি চলচ্চিত্র বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বলা বাহুল্য, ল্যাং একটুও দেরি না করে, পত্রপাঠ বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে আর জার্মানিতে পা রাখেননি। তা না করলে সম্ভবত, মেট্রোপলিসই তাঁর শেষ ছবি হত।

আমি জানি না আমাদের দেশ সেদিকেই যাচ্ছে কিনা, কিন্তু তাহলেও তো অবাক হওয়ার কিছু নেই। সরকারের পছন্দের লোকেদের ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা সেন্সর বোর্ডের মাথায় বসানোর একের পর এক নিদর্শন তো আমরা দেখেই চলেছি। সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের অপছন্দের ছবির, বা ছবির পরিচালকের, বা অভিনেতা অভিনেত্রীদের বিরুদ্ধে, ‘ফ্রিঞ্জ’ বা প্রান্তিক সংগঠনের মাধ্যমে হুমকি, মারধর ইত্যাদি তো লেগেই আছে। তারপর আছে উটকো মামলার ঝামেলা, পুলিশের উৎপাত, শুটিংয়ে হুজ্জতি। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীরা খোলাখুলিই বলতে শুরু করে দিয়েছেন, যে এখন থেকে হিন্দি সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ বানানোর আগে, তার চিত্রনাট্য অনুমোদন করাতে হবে সরকারের কাছ থেকে। মজার বা দুঃখের কথা হল, এই রাজনীতিতে আজ যারা প্রান্তিক, কালই গলায় মালা-টালা পরে তারাই হয়ে উঠবে মহীরুহ। নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক বা সাংসদ। আমাদের দেশের ইতিহাসে এ-ও নতুন কিছু নয়। অতএব, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.