অর্ক মুখার্জি
উনবিংশ শতকের বাংলার ইতিহাসে যে গুটিকয়েক মানুষ ধারাবাহিক প্রগতিশীলতার অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের জীবনচর্যাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে বাঙালির সমাজ চেতনা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের পথিকৃৎ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৩৯ সালে সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। কেবল সংস্কৃত নয়, বাংলা ও ইংরিজি ভাষায় তাঁর দক্ষতা ছিল অসামান্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকেই বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলে অভিহিত করেন। বিদ্যাসাগরের একাধিক শিশুপাঠ্য বই এবং বাংলা ব্যাকরণ রচনা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত হিসাবে তাঁর যুগান্তকারী কাজকর্ম সুবিদিত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষা ও চেতনা – এই দুইয়ের সম্মিলিত বিকাশে এবং প্রয়োগে মানুষের জীবনে আসল পরিবর্তন আসে। সেই লক্ষ্যে জীবনভর কাজ করেছেন।
১৮৪৭ সালে নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে স্থাপন করেন একটি বইয়ের দোকান। সেবছর এপ্রিল মাসে একটি হিন্দি বই অবলম্বনে লেখেন তাঁর প্রথম বই বেতাল পঞ্চবিংশতি। এই বইতে গদ্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান, যতিচিহ্নের ব্যবহারে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। এরপর তাঁর লেখালিখির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। সেবছরই কৃষ্ণনগরে যান অন্নদামঙ্গল কাব্যের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতে এবং পরে দুই খণ্ডে সম্পাদিত অন্নদামঙ্গল প্রকাশ করেন। এই বইটি তাঁর এবং বন্ধুবর মদনমোহন তর্কালঙ্কারের অংশীদারিত্বে স্থাপিত সংস্কৃত যন্ত্র প্রেসের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ। বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের প্রবেশের অনেক আগেই গদ্যরচনা চালু হয়েছিল। কিন্তু অনেকের মতে সেইসব গদ্য শিল্পগুণবর্জিত এবং অসংলগ্ন বাক্যসমষ্টির সমাহার। ১৮৫৪ সালে শকুন্তলা, ১৮৬০ সালে সীতার বনবাস এবং জীবনের শেষ পর্বে রচিত ব্রজবিলাস পড়লে বোঝা যায়, তিনি কখনো সাহিত্যের প্রয়োজনে চিত্ররূপময়, কাব্যিক ও অলঙ্কারবহুল গদ্যভাষা ব্যবহার করেছেন, আবার কখনো দ্রুতগামী ও শ্লেষাত্মক গদ্যভাষার ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন এবং সুসংহত করিয়া তাহাকে গতি ও কর্মকুশলতা দান করিয়াছিলেন।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বিদ্যাসাগরের অন্যতম অবদান হল সেকালের রক্ষণশীল সমাজের চোখরাঙানি অগ্রাহ্য করে নারীশিক্ষা প্রসারে ব্রতী হওয়া। ভারতে প্রথম মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব জন ড্রিংকওয়াটার বেথুন, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, মদনমোহন এবং বিদ্যাসাগরের। বর্তমানে যাকে আমরা বেথুন স্কুল নামে চিনি। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন কেবলমাত্র কলকাতায় স্কুল তৈরি করলে গ্রামবাংলার মেয়েদের অবস্থা বদলাবে না। তাই তিনি বাংলা জুড়ে মেয়েদের জন্য স্কুল খোলার উদ্যোগ নেন। ১৮৫৭ সালে বর্ধমানে মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠা শুরু করার পর ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে নদিয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদিনীপুর জেলায় ৩৫টা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৬৪ সালের মধ্যে তাঁর উদ্যোগে বাংলায় মেয়েদের স্কুলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮।
বিদ্যাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং মহৎ গুণ – তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং রক্ষণশীল চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকে যুক্তি দিয়ে বিচার করার সাহস দেখিয়েছিলেন। একথা সুবিদিত যে ১৮৫৬ সালে বিদ্যাসাগরের উদ্যোগেই তৎকালীন ভারত সরকার বিধবা বিবাহ আইন পাস করে। ১৮৫৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি গণশিক্ষার প্রসারে সরকারি অনুদানের জন্য বাংলার গভর্নরের কাছে আবেদন করেন। ১৮৬৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বহুবিবাহ রদ করার জন্য দ্বিতীয়বার ভারতীয় ব্যবস্থাপক সভার কাছে আবেদনপত্র পাঠান। মনে রাখা জরুরি যে এইসব উদ্যোগের জন্য সেইসময় বহু তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। ঈশ্বর গুপ্ত, সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বিদ্যাসাগর তাতে দমে যাননি। বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের মত বর্বর পিতৃতান্ত্রিক প্রথার বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছেন। সেই বিদ্যাসাগরের জন্মদিন আজ। শিক্ষার প্রসারে তাঁর যা ভূমিকা তাতে তাঁর জন্মদিনকে বাংলায় শিক্ষক দিবস হিসাবে পালন করার কথা ভাবা উচিত সরকারের।
আরো পড়ুন মাইকেল মধুসূদন: আগ্নেয় ইশতেহার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মানে প্রগতিশীল চিন্তার স্পর্ধা। একঘরে হওয়ার সম্ভাবনা, এমনকি নিজের প্রাণহানির সম্ভাবনাও অগ্রাহ্য করে তিনি যেসব ভাবনার রূপায়ণ করতে পেরেছিলেন শ দেড়েক বছর আগে, তা আজও সোজা কাজ নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








