মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্তত ২০০ বছর পরে নামের জন্যই একটি রাজনৈতিক বিবৃতি। রামায়ণের যে প্রতিপ্রস্তাব তিনি লিখেছিলেন মেঘনাদবধ কাব্যে, তা যদি আজকে লেখা হত তাহলে আমি নিশ্চিত যে তাঁর কাব্যগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হত এবং তাঁকে কোনো কারাগারে ধূলিশয্যায় শয়ান দেখতাম। সুখের কথা, বাঙালি পুতুপুতু কবিরা অত সাহসী নন। তাঁরা মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর ও আরও নানাবিধ কৃতিত্বকে সম্মুখবর্তী করেন অথবা সেমিনারপত্র লেখেন। কীভাবে আমরা মধুসূদনের আলোচনা করতে পারি? এই যে সম্পূর্ণ আর্যাবর্তের বিরুদ্ধে দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহ, এই যে বহু সংস্কৃতিবাদ যা তিনি তামিলনাড়ু ভ্রমণের ফলে আবিষ্কার করেন, তাকে কি আমি মেঘনাদবধ কাব্যে ছত্রে ছত্রে প্রকীর্ণ দেখব? নাকি আমরা দেখব তিনি কীভাবে ভাষার মধ্যে এক ক্লাসিকাল দার্ঢ্য সঞ্চার করলেন? আমরা অনেককিছুই দেখতে পারি। কিন্তু আপাতত আমরা যা দেখছি, তা হল নারীকে দেখার ক্ষেত্রে মধুসূদন এক অন্য চোখ আমদানি করেছিলেন এবং তা আমরা খেয়ালই করিনি। বাস্তবিক মেঘনাদবধ কাব্যের চতুর্থ সর্গে সীতা ও সরমার যে সংলাপ তা আমাদের পুরুষতান্ত্রিক চেতনারেখার প্রতিপ্রস্তাব। মেঘনাদবধ কাব্যের মধুসূদনকে নানাভাবে গ্রহণ করা যায়। অলীক কুকাব্যরঙ্গে আলুলায়িতা পয়ারকে আবার স্বর্গে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে অমিত্রাক্ষর অনিবার্য ছিল, মাইকেল অনার্য ইতিহাসকে সংযুক্তির তত্ত্ব হিসাবে দেখবেন, আমার মুগ্ধতা সে পর্যন্ত ছিলই। কিন্তু হঠাৎ দেখি কুয়াশা ও কুহক – পরাশর ও সত্যবতীর প্রণয় যেমন – চতুর্থ সর্গের মাইকেলও সামন্ত সভ্যতার আড়ালে অশোকবনে কিছু নাশকতার বীজ ছড়িয়ে রেখেছেন। সীতা, আজ মনে হয়, একটি কুসুমমাত্র অরণ্যে যেমতি, ‘এপিফ্যানি’ বা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। এমন অন্তঃসলিলা সংলাপ স্বয়ম্ভর সে নিজেই আবিষ্কার করে, যেমন ‘আয়নার সামনে নারী’: দ্রষ্টব্য নয়, সে নিজেই দ্রষ্টা। বীরাঙ্গনা কাব্য শুধু সম্প্রসারিত অশোকবন নয়। আমাদের আধুনিকতায় নারীত্বের প্রথম ইশতেহার। উনিশ শতকের উওম্যানিফেস্টো। প্রথম ও অদ্বিতীয়। বীরাঙ্গনা কাব্য, ভারতীয় সাহিত্যে প্রথম নারীকে মাংসের কারাগার থেকে মুক্ত করে ধারণার প্রতিমায় প্রতিষ্ঠা করে।

তুমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদ নও; নিবিড় যামিনী নও; নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, সুন্দরী রূপসী: অয়ি পদ্মপলাশলোচনে তুমি তবে কে? আমাদের হাবিজাবি নারীবাদ পাণ্ডুলিপি, টীকা, কালি কলমের পর থতমত খায়। গত ২০০ বছর ধরেই বাঙালি সমালোচক কবি শ্রীমধূসূদনের জন্য অন্য কোনো আসন সাজাতে পারেননি আর বীরাঙ্গনা কাব্য সেই সমালোচনা প্রবণতার শীর্ষবিন্দু। ১৮৬২ সালে প্রকাশের পর থেকে আমরা খেয়ালই করলাম না মধুসূদন কেন এই নারীদের – সংখ্যায় ১১ জন – বীরাঙ্গনা বলেছেন! অন্তিমের পত্রলেখিকা ছাড়া আর কেউ প্রকাশ্যে রণরঙ্গিনী হওয়ার বাসনাও প্রকাশ করেননি, এই পত্রসমূহ আধুনিক কোনো সম্পাদকের সৌজন্যে হয়ত ‘প্রিয়তমেষু’ নামে পুনঃপ্রকাশিত হবে লিটারারি ফেস্টে! তবে এরা বীরাঙ্গনা কেন?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেইসব বীর রমণীরা মধুসূদনকে প্ররোচিত করলেন না, যাঁরা টড সাহেবের রাজপুতানায় ছিলেন। অথবা সেই দীপ্তিময়ী সম্রাজ্ঞীকে তিনি ধর্তব্যের মধ্যেও আনলেন না, যাঁকে নিয়ে তিনি সুনিশ্চিতভাবে ভেবেছিলেন ইংরেজিতে আর বাংলায় সামান্য কিছু দৃশ্যাংশও পাঠিয়েছিলেন মহারাজ যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরকে। আমি সুলতানা রিজিয়ার কথা বলছি। আশ্চর্য যে মাইকেল বাস্তব থেকে, এমনকি কল্পিত ইতিহাস থেকেও, নায়িকা খুঁজে পেতে চাননি। তাঁর অভিযান পুরাণকথায় যেখানে ইতিহাস নিজেই অসংবৃত, আমাদের চোখ সহসা গোপনীয়তার সেই প্রদেশ খুঁজে পায় না।

অর্থাৎ মধুসূদনের নারীরা প্রথম সেক্সুয়াল আইডেন্টিটির প্রাকৃতিকতা থেকে জেন্ডার্ড আইডেন্টিটির নির্মাণ ঘোষণা করেন। যৌনতার প্রাণগত অস্তিত্ব থেকে লিঙ্গের দার্শনিক পরিসরে উত্তরণ – সে কী অবিশ্বাস্য স্বর্গারোহণ পর্ব! আমার করুণা হয় সেইসব অজর অক্ষর অধ্যাপকদের প্রতি আর অনাবাসী বাঙালি নারীবাদীদের প্রতি এবং সম্পাদক সমীপে স্তনযুগভারে ঈষৎ নতা তরুণী কবির প্রতি, যাঁরা এই পত্রাবলীতে আগুনের ডালপালা খুঁজে পাননি।

আরো পড়ুন মহাশ্বেতা ও ইলিয়াস: প্রমিত সাহিত্যের প্রতিস্পর্ধী স্বর

আপাতভাবে সত্য যে ইতালিয় ভাষায় গভীর অনুরাগ মধুসূদনকে রোমের ধ্রুপদী কবি ওভিডের ‘হিরোইক এপিসলস’-এর সান্নিধ্যে গমনের পরামর্শ দেয়। কিন্তু স্বাধিকারপ্রমত্তা এই নায়িকারা, আমি আবারও বলি, সমরাঙ্গনবিহারিণী রানি দুর্গাবতী অথবা ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ নন। এঁরা অন্তঃপুরবাসিনী। কিন্তু সেই অন্তঃপুর, ভাগ্যক্রমে, ইতিহাসের। অনেক পরে জীবনানন্দ যে ‘অপর আলো’-র কথা বলেন সেই আলো এঁদের চোখেমুখে। অর্থাৎ আমাদের পুরস্ত্রীদের আলোচনায় নারীত্বের ‘অপর’ কী গৌরব! কী গৌরব! তিনি রামমোহন বা বিদ্যাসাগর নন, কোনো সমাজকর্মী ও সংস্কারক নন। অন্দরমহলের আত্মকথার নিয়তিনির্দিষ্ট এই লিপিকার ছিলেন ভাষার যথার্থ তত্ত্বাবধায়ক একজন কবি! যাঁর সম্বল দরবারের আমিষগন্ধ নয়, অলজ্জ লিখনশৈলী। একেই তো পরবর্তীকালে কোনো জাঁ পল সার্ত্র বাংলায় থাকলে ‘এনগেজড আর্ট’-এর সূচনা ভাবতে পারতেন।

রবীন্দ্রনাথের চারুলতা লিখেছিল। ‘চরণতলাশ্রয় ছিন্ন’ মৃণাল তো লিখেছিলই। অথচ আমরা খেয়াল করিনি অযথা রাজ-অবরোধ থেকে রঘুকুলপতি দশরথকে চিঠি লেখার সময়ে অবসিত যৌবনা কৈকেয়ী আত্মাকে বিবসনা করার ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিলেন। আর্যাবর্তে রাবণকে প্রণাম জানিয়ে যে ভ্রষ্টাচার, যে ব্লাসফেমি, যে নাস্তিক্য মধুসূদন দেখিয়েছিলেন, সে সাহসের তবু প্রতিতুলনা দাক্ষিণাত্যে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কী অপরিসীম ঔদ্ধত্যে তিনি আসমুদ্রহিমাচলে নিন্দিতা এই মন্দ মেয়ের কথা শোনালেন তাঁরই জবানিতে – ভেবে কূলকিনারা পাই না! অর্থাৎ পিনারাই বিজয়নের সাহায্যে মধুসূদনকে পুনর্পাঠ করা যায়। কিন্তু বীরাঙ্গনা কাব্য পাঠ করার জন্য আত্মাকে আবার জরায়ুতে ফিরে যেতে হবেই। প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ায় রাজাকে কৈকেয়ী সরাসরি অভিযুক্ত করছেন। মধুসূদন নির্ভয়ে তাঁর জবানিতে নেড়ে দেখছেন সত্যের নুড়িপাথর। সিগমুন্ড ফ্রয়েড তখনো বলেননি যে শরীরই নিয়তি। কিন্তু দশরথের সত্য বিকৃতিতে কৈকেয়ী স্পষ্ট দেখতে পান নিজের শরীরের লাবণ্যহানি: ‘হা ধিক্! কি কবে দাসী – গুরুজন তুমি!/নতুবা কেকয়ী, দেব, মুক্তকণ্ঠে আজি কহিত, – ‘অসত্য-বাদী রঘু-কুল-পতি!/নির্লজ্জ! প্রতিজ্ঞা তিনি ভাঙ্গেন সহজে!/ধৰ্ম্ম-শব্দ মুখে, – গতি অধর্ম্মের পথে!” এরপরই কৈকেয়ী প্রথম বাংলা সাহিত্যে পুরুষের অভিনয় ব্যর্থ করে দিলেন: ‘না পড়ি ঢলিয়া আর নিতম্বের ভরে!/নহে গুরু উরু-দ্বয়, বর্ত্তুল-কদলী সদৃশ! সে কটি, হায়, কর-পদ্মে ধরি/যাহায়, নিন্দিতে তুমি সিংহের প্ৰেমাদরে,/আর নহে সরু, দেব! নম্র-শির: এবে উচ্চ কুচ! সুধাহীন অধর! লইল লুটিয়া কুটিল কাল, যৌবনভাণ্ডারে/আছিল রতন যত;’ অর্থাৎ দেহপট সনে শুধু নট নয় নারীও সর্বস্ব হারায়। এই মনস্বী অগ্রজকে আমি প্রণাম জানাই যে তিনিই নারীকে, যে আমাদের ‘নবজাগরণে’ উপেক্ষিতা, তাকে মনের সাক্ষরতা দিয়েছেন। নারীত্বের এই প্রকাশ শুধু পুরুষের ধারণা নয়, শুধু ক্ষমতার বয়নে রাজতন্ত্রে একটি অবস্থান নয়, মধুসূদন যে উনিশ শতকের মাঝামাঝি আমাদের সর্বাধিক পাপিষ্ঠা নারীকে অন্য পরিসর থেকে, নারীর অন্দরমহল থেকে দেখেছিলেন – আমাদের স্বঘোষিত নারীবাদীরা তা উল্লেখই করেন না। ‘এ কি কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে’ – বাঙালির বাকবিধির মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে, যা উপেক্ষিত থেকে গেছে তা দণ্ডিতা রাজবধূর সক্রোধ বিলাপ। বিরতিহীন তুমুল ধিক্কারের মধ্যেও ইতিহাসের এজলাসে মধুসূদন যে কৈকেয়ীর ওকালতনামা পেশ করেন সে বীরত্ব একক। ইতিহাস যদি সত্যভাষী হয় তবে নারীর উন্নীত চেতনার মলাটে মধুসূদনের নাম ছাপা হবেই। হ্যাঁ, বিদ্যাসাগরের পাশাপাশি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.