২২ জানুয়ারি আমার ফেসবুক বন্ধু তালিকার অনেকেই দেখলাম লিখেছেন “আজ ফ্রেন্ড লিস্ট সাফ করার দিন”, “এই ঘটনাকে যাঁরা সমর্থন করেন, তাঁরা বেরিয়ে যান” ইত্যাদি। কেউ কেউ আবার “সমস্ত রামমন্দির সমর্থনকারী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সমর্থক” – এই মর্মে জনগণকে অপরাধবোধে ভোগানোর চেষ্টায় মগ্ন। আমার রাজনৈতিক মতামতের কারণে আমি এ ধরনের পোস্টই যে বেশি দেখতে পাব, তার ব্যবস্থা আমায় জুকু সাহেব করে রেখেছেন।
লক্ষ করলাম, এসব পোস্ট যাঁরা করেছেন তাঁরা বেশিরভাগই রাজনৈতিক কর্মী নন, হলেও তাঁদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। দেশে যা ঘটছে তাতে তাঁদের যে প্রত্যক্ষভাবে কিছু আসে যায় তাও নয়। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় বাম, অতিবাম বা উদারপন্থী মনোভাব প্রকাশ করতে মাঝে মাঝে তাঁরা সরকারবিরোধী কিছু পোস্ট করেন বা শেয়ার করেন। এতে আপত্তির কিছু নেই। এঁরা অধিকাংশই উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত। তাঁদের শ্রেণি ধর্ম তাঁরা ঠিকই পালন করছেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কিন্তু যাঁরা বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী বা কর্মী হওয়ার প্রচেষ্টায় রয়েছেন, তাঁদের জন্য এই প্রবণতা ভয়ানক। নিজেকে স্তুতির বলয়ে আবদ্ধ রাখতে চায় দুরকম মানুষ। এক, গণ্ডমূর্খ কূপমণ্ডুক। দুই, সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রগতিশীল রাজনীতি যাঁরা করেন বা করেন বলে মানেন, তাঁদের মধ্যে এই দুরকম মানুষ ভরে গেছে বলেই আজ এই লেখা লিখতে হচ্ছে।
ভারতবর্ষের এক বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে ২২শে জানুয়ারি সত্যিই এক খুশির দিন, উৎসবের দিন। রামলালা নিজের বাড়িতে ফিরেছেন, না হোটেলে থাকছেন – এই আলোচনা বৃথা। আসল কথা, প্রচুর মানুষ ওইদিন বাড়িতে পুজো করেছেন, ভালমন্দ রান্না করেছেন, প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দপ্রকাশ করেছেন। কারণ তাঁদের আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রাম ও তাঁর মন্দির অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এঁদের অনেকেই নিম্নবর্গীয়।
এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। কয়েকদিন আগে একজন অটো চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। অত্যন্ত মিষ্টভাষী ভদ্রলোক। দিল্লিতে কেমন থাকেন, কোথায় থাকেন – এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল। রাস্তায় একটা মন্দির দেখতে পেয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা সম্পর্কে। উনি যে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের একনিষ্ঠ কর্মী, তা পরের কয়েকটা কথা শুনেই বোঝা গেল। ভদ্রলোকের বাড়ি অযোধ্যায়। ২২ তারিখ নিয়ে তাঁর মধ্যে বিপুল উদ্দীপনা। তাঁর জীবদ্দশায় বহু প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে, এতে তাঁর জীবন ধন্য হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। কথায় কথায় উনি আবার রাজীব গান্ধীর ভূয়সী প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের কথা, তাঁদের গ্রামে হিন্দু-মুসলমানের সুসম্পর্কের কথা। বিজেপি এবং আসাদুদ্দিন ওয়াইসির দল অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন দলের প্রতি তিনি যথেষ্ট রুষ্ট, কারণ দুপক্ষই নাকি ধর্মের নামে বিষ ছড়ায়। প্রসঙ্গত, ইনি ব্রাহ্মণ।
এঁকে কেউ হয়ত বলবেন ‘ব্রেনওয়াশড’। সাবেকি মার্কসবাদীরা বলবেন এঁর ‘ফলস কনসাশনেস’ (যদিও এই শব্দবন্ধে ফলস কথাটার অর্থ মিথ্যা বা ভুল নয়। বরং তা এমন কিছু ভাবনাকে বোঝায়, যা মানুষকে তার মৌলিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করতে দেয় না)। এসব বলে অযোধ্যাবাসী এই শ্রমজীবী মানুষটার ভাবনাচিন্তাকে কোনোরকম বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ছাড়াই বাতিল করে দেওয়া রাজনৈতিক শ্লথতার পরিচয় নয় কি? এত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগকে স্রেফ হিস্টিরিয়া বলে তাচ্ছিল্য করা কি আরও জনবিচ্ছিন্নতার দিকে চলে যাওয়া নয়? ফেসবুক বিপ্লবীরা আমাদের সেই অন্ধকূপের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন।
কোনো কোনো মার্কসবাদী হয়ত আর্থসামাজিক শোষণের সঙ্গে ধর্মবিশ্বাসের যোগাযোগ স্থাপন করবেন। তাঁদের মতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা যত বাড়ে, ততই তাঁরা ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু দারিদ্র্য, ক্ষুধা, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া এই সময়ে আমরা বামপন্থীরাও তো মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করতে পারতাম। গড়ে তুলতে পারতাম বৃহত্তর সামাজিক ঐক্য, গণআন্দোলন। গত শতাব্দীর শুরু থেকে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ দেশে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল তো এরকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই। আমাদের অটো চালক বন্ধুর তো আমাদেরই লোক হওয়ার কথা। হলেন না কেন?
উত্তর খুব সহজ। হিন্দুত্ববাদীরা পেরেছে, আমরা পারিনি। ওরা সাম্প্রদায়িক, ওরা মানুষে মানুষে বিভেদের চাষ করে – সবই ঠিক। কিন্তু ওদের আরও ভাল করে চেনা দরকার, এ দেশের সমাজকে আরও ভাল করে চেনা দরকার। ওরা প্রান্তিক মানুষকে কাছে টানতে পেরেছে। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে মানুষের মন জয় করা যায় সংগঠন ও অনুশাসন দিয়ে। নিজেদের আরএসএস-বিজেপি যে উৎসাহ ও নিষ্ঠার সঙ্গে সাংগঠনিক কাজ করে গেছে, সুদিনেও তার অন্যথা হয়নি। দেশের দুর্গমতম জায়গাতেও মাটি কামড়ে পড়ে থেকে জয়ের ভিত তৈরি করেছে। তাই আজ তারা সফল। হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের দিকে রোজ লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। আগামীদিনের নকশাও তৈরি। আমাদের কী অবস্থা?
আরো পড়ুন আদানির বন্দর নির্মাণ: কমিউনিস্ট উন্নয়ন-ভাবনার সংকট
ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন আর আরএসএসের বয়স এক। আগামী বছর ১০০ বছর পূর্ণ হবে দুপক্ষেরই। আরএসএস দেশের নাম পাল্টে দিতে, সংবিধানকে ধূলিসাৎ করতে সক্ষম হচ্ছে। আমরা কী করছি? কোন জোটে কার সঙ্গে কোন চেয়ারে বসলে কটা ভোট বাঁচানো যাবে – সেই হিসাব কষা ছাড়া? দেশের বৈপ্লবিক পরিবর্তন কীভাবে আনা সম্ভব, সমস্ত গরিব মানুষকে নিজের ছাতার তলায় পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কীভাবে সংগঠিত করতে হবে – তা নিয়ে কোনো সম্যক ভাবনা আমাদের আছে কি? ধর্মীয় উন্মাদনার বিরুদ্ধে সফল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্ত্র কী হতে পারে – তা কি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করছি? ব্যক্তিগত স্তরে রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে আমরা কতটুকু কর্মনিষ্ঠ হতে পেরেছি? প্রশ্নগুলো যেমন আমার নিজের জন্য, তেমনই সমস্ত প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের জন্যও। উত্তর অন্তত আমার কাছে নঞর্থক, অন্যদের কথা জানি না।
‘কী করিতে হইবে?’ আমার মতে আমাদের এখন একটাই কাজ। এ যে আমাদের পরাজয়ের মুহূর্ত তা স্বীকার করা। পরাজয় স্বীকার না করলে কোনোদিনই শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সংগঠিত করা সম্ভব নয়। নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু হার স্বীকার করে নিয়েও মনকে ইতিহাসের দিকে চালিত করতে হবে। ইতিহাস বলে, আপাতদৃষ্টিতে দুর্দম অপরাজেয় অ্যাডলফ হিটলার আর বেনিতো মুসোলিনিরও পতন ঘটেছিল। যে জনতা তাদের একদিন দুহাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল, সেই জনতাই মুসোলিনির মৃতদেহের উপর থুতু ফেলেছে। ইতিহাস বলে, ১৯২৭ সালে কুওমিনটাংয়ের বিশ্বাসঘাতকতার পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু সেই পার্টিই দুই দশক পরে তৃতীয় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করে।
সব জয়ই যেমন সাময়িক, সব পরাজয়ও তাই। সতত পরিবর্তনশীল এই পৃথিবীতে খেটে খাওয়া মানুষই শেষ কথা বলবেন। তাই আজকের পরাজয় যেন আমাদের নৈরাশ্যবাদী করে ফেলতে না পারে। মানুষের অদম্য সৃষ্টিশীলতার প্রতি বিশ্বাস আমরা যেন হারিয়ে না ফেলি। এই পরাজয়ের মুহূর্ত আমাদের ঘর আর ফেসবুক ছেড়ে বাইরে বেরোতে, নতুন করে সমাজকে চিনতে, নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে সংগঠন গড়ে তুলতে, নতুন করে ভাবতে, শিখতে, জানতে উদ্বুদ্ধ করুক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









আপনি খাটি কথা বলেছেন, এইটাই আমি আমার ” facebook communists” দের বোঝাতে পারি না, যে তারা ভারতবর্ষকে বুঝতেই চাই নি, তারা marxist theory কে a priori চাপিয়ে দিয়েছে… যদিও academically or intellectually base-superstructure model very persuasive, but ওগুলো parliamentary democratic pragmatism র মধ্যে পড়ে না।
For years Communists are in perpetual search for some equivalent of proletariat in India, sometimes it is farmers, then labours in general, now minorities ….this is social determinism compounded by Marxist fallacy of economic determinism…
যেমন এই কৃষক, শ্রমিক , শিক্ষক কে organise করে ঘোড়ার ডিম হবে, সে তারা বুঝবেও না always search of imminent revolution…. daft..
It is more advisable that Indian communists should stop finding ” working class” in dia which is not at all industrialised country… Rather they should make “Household” as locus of mobilisation…
একেবারে ঠিকঠাক বলেছেন । এই নিয়ে ফেসবুকে বেশ কিছু পোস্ট করেছি ।