অর্ক মুখার্জি

এক অদ্ভুত সময়ের মধ্যে আমরা চলেছি। ২০২৪ লোকসভা ভোটে দেশজুড়ে রামকে কেন্দ্র করে আবেগের সুনামি তৈরি করে তার রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে ঝাঁপাচ্ছে বিজেপি। ঝকঝকে মন্দিরের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়। আরএসএস নিজেদের প্রোপাগান্ডাকে মানুষের ইচ্ছা বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য একবারে তৃণমূল স্তর থেকে নিবিড় প্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের যুবসমাজের কর্মসংস্থানের যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে তা খুবই উদ্বেগজনক। নরেন্দ্র মোদী যখন প্রথমবারের জন্য ক্ষমতায় আসেন ২০১৪ সালে, তিনি কিন্তু বিকাশের স্লোগান দিয়েছিলেন। সেই বিকাশ ছিল দেশের যুব সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ইঙ্গিত। দশ-দশটা বছর কেটে গেল। ভোটের আগে রামমন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মাণ করতে হচ্ছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বছরে দু কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিল্লির মসনদে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সম্প্রতি কেন্দ্রেরই ‘পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ (পিএলএফএস)-তে প্রকাশ, গত বছরের জুলাই থেকে এ বছর জুন পর্যন্ত স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩.৪%। আরও ভয়াবহ ছবি ধরা পড়েছে সাম্প্রতিকতম সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই) রিপোর্টে। তাদের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪৪.৪৯ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। তার আগের ত্রৈমাসিকে বেকারত্বের হার ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ছিল ১৪.৩৩ %। আগের ত্রৈমাসিক থেকে প্রায় ১% বৃদ্ধি। এই বয়সের মানুষের মধ্যে বেকারত্বের এই হার শেষ চোদ্দটা ত্রৈমাসিকের মধ্যে সর্বাধিক।

কিন্তু কেন এই বেহাল দশা? মোদী ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন গ্রামোন্নয়নের কথা। তিনি সাংসদদের গ্রাম দত্তক নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বেকারত্বের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি গ্রামাঞ্চলেই। সেখানে ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪৩.৭৯%, ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩.০৬% আর ৩০-৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২.২৪%। শহরাঞ্চলে ২০-২৪ বছর এবং ৩০-৩৪ বছর বয়সী মধ্যে বেকারত্বের হার আগের ত্রৈমাসিক থেকে এই ত্রৈমাসিকে সামান্য হলেও কমেছে – যথাক্রমে ৪৭.৬১% থেকে ৪৫.৯৮% এবং ৩.২৯% থেকে৩.০৪%। তবে ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ১৫.৬১% থেকে বেড়ে ১৬.৫৪% হয়েছে। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারের বছরে দু কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি তো বটেই, উলটে দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছরে কর্মসংস্থানের হার গড়ে প্রতিবছর ০.২% থেকে ০.৯% কমেছে। এদিকে কর্মসংস্থানের যোগ্য এবং কাজের খোঁজে থাকা মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সংগঠিত ক্ষেত্রে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ষোলো থেকে ৬৪ বছর পর্যন্ত বয়সের কাজে যুক্ত বা কাজের খোঁজে থাকা মানুষের হার (এলএফপিআর) ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা উদ্বেগজনক। গ্রেট ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্সে এই হার ৭০ শতাংশের বেশি। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান বা রাশিয়ার মত দেশে এই হার ৬০ শতাংশের বেশি। ওই দেশগুলো পারলে আমরা পারছি না কেন?

নভেম্বরে প্রকাশিত সর্বশেষ সিএমআইই রিপোর্ট বলছে ভারতের বেকারত্বের হার গত নভেম্বর মাসে আট শতাংশে পৌঁছেছে যা অক্টোবরে ছিল ৭.৮%। গত এক বছরে বেকারত্বের গড় হার ছিল ৭.৪%, যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। কোভিড অতিমারীর সময় এই হার ছিল প্রায় ২২%। স্বাধীন ভারতে এ এক রেকর্ড বলা যেতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির ঠেলায় উৎপাদন ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে না। ফলে নিয়োগের ক্ষেত্র ক্রমে সংকুচিত হয়েছে, হবেও আগামীদিনে। সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে স্থায়ী নিযুক্তি বন্ধ থাকায় শূন্য পদের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে আর্থিক মন্দার জেরে যাঁদের কাজ ছিল তাঁরাও কাজ হারাচ্ছেন, বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। স্বল্প মজুরির অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। কোভিড সংকট মিটে গেলেও বেকার এবং কাজ হারানো মানুষের সংকট মিটছে না, বরং বাড়ছে।

আরো পড়ুন টুইটার, বাইজু’স আঁধারে ছাঁটাই সম্পর্কে কয়েকটি কথা

শুধু ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই চলছে। ভারতীয় রেল তার কর্মীসংখ্যা এখনকার অর্ধেক করে ফেলতে চলেছে। ভারতের ৫২টি স্টার্টআপে সাম্প্রতিককালে প্রায় ১৮,০০০ কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। এই স্টার্টআপগুলোর মধ্যে আছে বাইজু’স, চার্জবি, কারস২৪, লিড, মিশো, ওলা, এমপিএল, ইনোভেসার, উড়ান, আনঅ্যাকাডেমি, ভেদান্তু ইত্যাদি সংস্থা। এর মধ্যে ১৫ ই-লার্নিং কোম্পানিতে ৭,৮৬৮ জন কর্মীকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবছর পাঁচটা ই-লার্নিং কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে, কাজ হারিয়েছেন প্রায় ৩,০০০ কর্মী। সুইগি, জোমাটোর মতো খাবার সরবরাহকারী সংস্থাও কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে। শুধু এদেশে নয়, দুনিয়াজুড়ে কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মাইক্রোসফট, ফেসবুক, অ্যামাজন প্রভৃতি যেসব সংস্থায় কাজ করার স্বপ্ন দেখত লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা, সেই কোম্পানিগুলো থেকেও অতি সম্প্রতি বিরাট সংখ্যক কর্মীকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস্যাপ ইত্যাদির মালিক মার্ক জুকেরবার্গের পরিচালনাধীন মেটা কোম্পানি ১১,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে, যা মোট কর্মীবাহিনীর ১৩%। দুনিয়ার চতুর্থ ধনীতম ব্যক্তি জেফ বেজোসের মালিকানাধীন অ্যামাজন ১০,০০০ কর্মীকে ছাঁটাই করেছে, যা মোট কর্মীবাহিনীর ৩%। দুনিয়ার পয়লা নম্বর ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক টুইটারের (অধুনা এক্স) মালিক হওয়ার পরেই ৩,৭০০ কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়। শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় ২০ জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককেও ছাঁটাই করা হয়েছে। ভারতে ও ভারতের বাইরে এই সংস্থাগুলোতে কর্মরত বেশ কিছু ভারতীয়ও এই ছাঁটাইয়ের শিকার। জিম ফারলের পরিচালনাধীন ফোর্ড কোম্পানি ৩,৫৮০ জনকে ছাঁটাই করেছে। বিল গেটসের মাইক্রোসফট থেকে কাজ হারানো ৩,০০০ কর্মীর মধ্যেও বেশকিছু ভারতীয় আছেন। বাইজু রবীন্দ্রনের বাইজু’স ২,৫০০ কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছে। বিনকিট কোম্পানি ১,৬০০ এবং ইউনিলিভার ১,৫০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে।

অর্থাৎ ভালভাবেই বোঝা যাচ্ছে, ‘আচ্ছে দিন’ বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের কাছে এক রাজনৈতিক কল্পকাহিনি। সামনের লোকসভা নির্বাচনে কর্মসংস্থানকে হাতিয়ার করতে হলে কেবলমাত্র আনুমানিক হিসাবে ভরসা রাখতে হবে। কারণ তথ্য বলছে কর্মসংস্থানের অবস্থা শোচনীয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ, কর্মক্ষেত্রে কর্মচারীদের আর্থিক সুরক্ষা ও নিশ্চয়তা এবং কর্মীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতা ঢাকতে ধর্মের মত ব্যক্তিগত বিষয়কে গণপরিসরে টেনে এনে নির্বাচনী ইস্যু করে তোলার দরকার হয়। ভারতবর্ষের মত দেশে অধিকাংশ মানুষ ভাববাদী সংস্কৃতির সঙ্গে যেভাবে সম্পৃক্ত, তার সুযোগ নিয়ে ধর্মকে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলো ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ যুবসমাজ বেকারত্বের জ্বালায় ভুগবে, বছরের পর বছর চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেবে, কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পাবে না। অস্থায়ী নিয়োগ বাড়বে এবং সেই নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে না, দুর্নীতি হবে নানাবিধ। সেই সংকট মুহূর্তে মানুষ স্বাভাবিক নিয়মেই আশ্রয় খোঁজে, ধর্ম সেই আশ্রয় জোগাবে। সঙ্গে থাকবে মিডিয়ার যোগ্য সঙ্গত। এমনভাবে সবকিছু উপস্থিত হবে যেন বেকারত্ব তেমন সমস্যা নয় বা চাকরির প্রত্যাশা অন্যায়। যুবক-যুবতীরা স্টার্টআপ করলেই পারে।

অথচ সেটা করতেও পরিবেশ লাগে, সুযোগ লাগে, সর্বোপরি পুঁজি লাগে। সেসব আড়াল করে বেকারত্বের দোষ যুবসমাজের উপরেই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। টুয়েলফথ ফেল ছবিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে মনোজ স্রেফ জেদ, অধ্যবসায় আর মেধা দিয়ে আইপিএস হয়েছিল। কিন্তু সিনেমার মত রূপকথার উপসংহার সবার হয় না। বেশিরভাগেরই হ্য় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা একটা চাকরি খোঁজে একটু নিরাপত্তায় আশায়। রামমন্দির তাদের অনেকের কাছে প্রার্থনার জায়গা হতে পারে, ধর্ম পালনের কেন্দ্র হতে পারে। কিন্তু কোনো মন্দির আর্থসামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারে না। তাই এই অস্থির সময়ে যেখানে চাকুরিস্থলে শোষণ, কম মাইনেতে চাকরি করতে বাধ্য হওয়া, ছাঁটাই হয়ে যাওয়ার ভয়, নিরাপত্তা না থাকা – এসবের সমাধান না করে কেবল ধর্মীয় আবেগ উস্কে দিয়ে কতখানি শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী যুবসমাজের মন পাওয়া যাবে সে বিষয়ে কিন্তু সন্দেহ আছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.