খবরে প্রকাশ, আগামী মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা কর্মীরা কলকাতা সহ বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবেন। মহিলা তৃণমূলের রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আমলে মহিলারা সুরক্ষিত। তাছাড়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ইত্যাদি নানা প্রকল্পে তারা উপকৃত। এই ‘উপকার’-কে মনে রেখে এই কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগেও তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে আর জি কর কাণ্ডের পর যে অপরাজিতা বিল মমতা সরকার নিয়ে এসেছে তা সারা দেশে ইতিহাস তৈরি করেছে। সুতরাং মহিলারা সত্যিই এই অপরাজিতা বিল পেয়ে সুরক্ষিত বোধ করতে পারেন কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

প্রথমে জানা দরকার, এই অপরাজিতা বিলে এমন কী আছে, যা ঐতিহাসিক বলে দাবি করছেন তৃণমূল নেতারা? আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিল নিয়ে আসার প্রেক্ষিত এবং আর জি কর কাণ্ডের পরবর্তীকালে কলকাতা সমেত বিভিন্ন জায়গায় এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড়। লক্ষ করে দেখা গেছে, যখনই, ইংরিজিতে যাকে বলে ‘হাই-প্রোফাইল কেস’ বা বহুচর্চিত কোন যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটেছে, তখনই সরকারপক্ষ কঠোরতম শাস্তি চেয়ে নতুন করে আইন তৈরি করেছে। আমরা নির্ভয়া কাণ্ডের পরেও একই চিত্র দেখেছিলাম। অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং আরও অনেক রাজ্য এই পথে আগে হেঁটেছে। কাজেই মমতা দেশের প্রথম প্রশাসক, যিনি এরকম পদক্ষেপ নিলেন, তা একেবারেই বলা যায় না। এই ধরনের আইন প্রণয়নের একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে – প্রবল জনরোষ প্রশমিত করা। একথা ভুলে গেলে চলবে না, যে একেবারে শুরুতেই সংবাদমাধ্যম আমাদের জানিয়েছে, আর জি কর কাণ্ডে ধৃত সিভিক ভলান্টিয়ার প্রথম দিনই পুলিসকে বলেছিল, সে-ই দোষী এবং ফাঁসির শাস্তি মেনে নিতে তার আপত্তি নেই। যদিও কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে নাকি পলিগ্রাফ টেস্টে একেবারে অন্য কথা বলেছে। ধর্ষককে ফাঁসিতে চড়ানোর কথা মুখ্যমন্ত্রী নিজে বারবার বলেছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন ধর্ষকের যত শীঘ্র সম্ভব এনকাউন্টার করে দেওয়া উচিত। অপরাজিতা বিলের মূল সুর এই দুটোই – ১) তাড়াতাড়ি সমাধান, ২) মৃত্যুদণ্ড। সাধারণ মহিলাদের বক্তব্য এই বিল আনার আগে জানতে চাওয়া হয়নি, যদিও যে কোনো আইন তৈরি করার আগে সেই আইনে যাদের প্রাথমিকভাবে কিছু এসে যায় তাদের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি কাজ। কিন্তু একথা খুব পরিষ্কার, যে মুখ্যমন্ত্রীর নিজের ইচ্ছাই এই বিলের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

নারী আন্দোলনের কর্মীরা বারবার বলেছেন এবং বহু গবেষণায় প্রমাণিতও হয়েছে, যে কঠিন শাস্তি অথবা মৃত্যুদণ্ডই পরবর্তীকালে ধর্ষণ কমাতে পারবে – এই ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং শাস্তি কঠোরতম হলে দোষী সাব্যস্ত করার হার কমে যায়। তাছাড়া নারী এবং শিশুদের উপর ধর্ষণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিত মানুষ, এমনকি নিজের পরিবারের লোকেদের দ্বারা হয়ে থাকে। কাজেই মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র শাস্তি জানলে সেই ধরনের ঘটনায় মহিলারাই পুলিসে অভিযোগ দায়ের করতে রাজি হবেন না।

আরো পড়ুন কলকাতা সত্যিই নিরাপদ? ‘পরিচিতি’ রিপোর্টে উঠছে প্রশ্ন

অপরাজিতা বিলে অনেকগুলি উদ্বেগজনক বিধান রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল ধর্ষণের জন্য বাধ্যতামূলক ন্যূনতম শাস্তি হিসাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তাছাড়া কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ডের কথাও বলা হয়েছে। অথচ অনেক আগেই সুপ্রিম কোর্টে মিঠু বনাম পাঞ্জাব রাজ্য মামলায় বলা হয়ে গেছে, যে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড সংবিধানবিরোধী। ১৯৮৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট ওই রায় দিয়েছিল। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক স্তরে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে স্বর আরও জোরদার হয়েছে। আইনজ্ঞরা মনে করছেন, এমন বিলে প্রেসিডেন্ট সই করবেন না, ফলে এটি কোনোদিনই আইনে পরিণত হবে না। মমতা হয়ত এই বলে বাহাদুরি নিতে পারবেন, যে আমি নতুন আইন আনার চেষ্টা করেছিলাম। আমাকে বাধা দেওয়া হয়েছে।

অপরাজিতা বিলের আরেকটি বিধান হল, তদন্ত যত শীঘ্র সম্ভব শেষ করতে হবে। আইন-আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার ফলে সত্যিই আমাদের মনে ধর্ষণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব কিনা, এই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ফাস্ট ট্র্যাক আদালতই একমাত্র সমাধান কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার। বিশেষ আদালতে যাঁরা কাজ করবেন, তাঁদের সংবেদনশীল হওয়া জরুরি। তাঁদের যে ধরনের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, তার কথা এই বিলে উল্লিখিত নেই। যেসব কারণে ধর্ষণে অভিযোগ করে মহিলারা বিচার পান না, সেই কারণগুলির প্রতিকার কীভাবে হবে তা এই বিলে উল্লেখ করা নেই। সাক্ষীকে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এই ধরনের মামলায় সাক্ষী পাওয়াও মুশকিল হবে। নির্যাতিতা নারী কীভাবে মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠে আইনি লড়াই চালাবেন, তার উপায়ও এই বিলে বাতলানো হয়নি।

দেশে যেহেতু ট্রান্সজেন্ডার প্রোটেকশন অ্যাক্ট বলবৎ রয়েছে, সেহেতু নতুন আইন তৈরি করতে গেলে মাথায় রাখতে হবে, নারী বলতে আমরা এখন শুধু জন্মসূত্রে নারী নয়, রূপান্তরকামী নারীদের কথাও বলতে বাধ্য। অথচ অপরাজিতা বিলে তাদের কথা এক লাইনও বলা হয়নি। ভারত সরকারের ধর্ষণবিরোধী আইনে প্রতিবন্ধী নারীদের কথা আলাদা করে উল্লিখিত থাকলেও অপরাজিতা বিল এই প্রান্তিক গোষ্ঠী নারীদের সম্পর্কে একেবারে নীরব।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই আইন না তৈরি করে তৃণমূল সরকার কী কী পদক্ষেপ নিলে নারীর সুরক্ষার সত্যিকারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে বলে মনে করা যেত?

মনে রাখা দরকার, নারী সুরক্ষার জন্য যে আইনগুলি দেশে আগে থেকেই চালু আছে, সেগুলির রূপায়ণে মমতা সরকার একেবারেই সচেষ্ট নয়। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে যে কমিটি থাকার কথা, তা নিয়ে ২০১৩ সালে আইন প্রণীত হয়েছিল। অথচ এতবছর পরেও পশ্চিমবঙ্গের সব অফিসে সেই কমিটি তৈরি হয়নি। আর জি কর কাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর হাসপাতালের ওয়েবসাইট চেক করে দেখা যায়, সেখানকার যৌন হেনস্থা রোধ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ডাঃ সন্দীপ ঘোষ। অথচ এই আইনে পরিষ্কার বলা আছে, এই কমিটির প্রধান কোনো মহিলাকে হতে হবে, কোনো পুরুষ ওই পদে বসতে পারেন না। সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কমিটির খবর নিলে সেখানেও কি আমরা একই ধরনের গাফিলতি দেখব? নির্ভয়া কাণ্ডের পর হাসপাতালের ভিতর নির্যাতিতা মেয়েদের জন্য যে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ তৈরি করার জন্য যে ফান্ড দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে বেশিভাগ রাজ্যই এই ধরনের কেন্দ্র তৈরি করে কাজ শুরু করেছে বেশ কয়েকবছর হল। অথচ পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের কেন্দ্র তৈরি হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল কেন? দেশে যে আইনগুলি বা প্রকল্পগুলি নারী সুরক্ষার জন্য আগে থেকেই বলবৎ আছে, সেগুলি কেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঠিকমত রূপায়িত করছে না সে প্রশ্ন করা জরুরি।

একথা মনে রাখা দরকার, যে নারীদের উপর যৌন হিংসা যে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় দেয় তার বিরুদ্ধে লড়াই কেবল একটি-দুটি আইন বা প্রকল্প দিয়ে হবে না। সামাজিক পরিবর্তন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। তবে ছোট ছোট পদক্ষেপে কিছু পরিবর্তন আনা সম্ভব। ছোট বয়স থেকে স্কুল পাঠক্রমে লিঙ্গ সচেতনতার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষামূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণে লিঙ্গ সচেতনতাকে বাধ্যতামূলক বিষয় করার মত উদ্যোগ নিতে আমরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আজ পর্যন্ত দেখিনি। উলটে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের মুখে নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা বারবার শুনি।

নিজে নারী হয়েও মমতাকে এই মুখপাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে আমরা দেখি না। পাড়ায় পাড়ায় তৃণমূল নেতা হিসাবে পরিচিতদের মুখের ভাষাও ধর্ষণ সংস্কৃতিকেই স্বীকৃতি দেয়। পশ্চিমবঙ্গের এই মুহূর্তে যা রাজনৈতিক অবস্থা, তাতে নতুন কঠোর আইন না এনে রাজনৈতিক বাতাবরণকে লিঙ্গবৈষম্য সম্পর্কে সংবেদনশীল করা আশু প্রয়োজন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.