বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) কলকাতা পার্ক প্যালেসে নারীবাদী সংগঠন পরিচিতি ‘নিরাপদ চলাফেরা ও হিংসামুক্ত জীবন’ শীর্ষক এক জেলাস্তরের আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। পরিচিতি ২০০০ সাল থেকে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছে। দক্ষিণ কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় এই সংগঠন কাজ করে। সেন্টার ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিসের সঙ্গেও এই সংস্থা যুক্ত হয়েছে এবং কলকাতায় কাজ করছে পরিচারিকা, প্রান্তিক মানুষ এবং শ্রমজীবী পুরুষ ও মহিলাদের নিয়ে।

সম্প্রতি কলকাতার পাঁচটি শহুরে সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিচিতির পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বিষয়ক অডিট করা হয়। অডিটের উদ্দেশ্য ছিল মহিলারা নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে এবং নিজেদের এলাকায় চলাফেরার স্বাধীনতা সম্পর্কে কী ভাবছেন তা জানা। এছাড়া ১৭টি শহুরে সম্প্রদায়ের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক শহুরে মূল্যায়নের বাড়ির ভিতরে ও বাইরে মহিলারা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন তার খবরও নেওয়া হয়েছে। এই অডিট ও মূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে আলোচনা সভায় তা নিয়ে কথা হয়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কলকাতার মহাবীরতলা, বালিগঞ্জের মত কিছু এলাকার মূলত মহিলাদের পক্ষে সুবিধাজনক পরিকাঠামোর অডিট করে দেখা গেছে, দু-একটি এলাকা ছাড়া পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং সুরক্ষা নেই। ফলে মহিলারা নিজের অঞ্চলে স্বচ্ছন্দে ঘোরাফেরা করতে পারেন না, এমনকি প্রশাসনের সহযোগিতাও সময় মত পাওয়া যায় না বলে তাঁরা দাবি করছেন।

মহিলাদের উপর ঠিক কী ধরনের নির্যাতন চলে তা নিয়ে কলকাতার ১৭টি এলাকায় যে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মহিলাদের উপর শারীরিক নির্যাতনের হার ৩৫.২৯%, মহিলাদের প্রতি অপশব্দ ব্যাবহারের হার ৩৩.৩৩%। মহিলাদের উপর মানসিক অত্যাচার, আর্থিকভাবে অত্যাচার, যৌন অত্যাচারের ঘটনাও উঠে এসেছে। এই অত্যাচারের নেপথ্যে মদ্যপান অন্যতম বড় কারণ, যদিও মদ্যপান না করেও এই ধরনের নির্যাতন করার ঘটনা নেহাত কম নয়। নির্যাতিতারা জানিয়েছেন সাধারণ দিনের তুলনায় যে কোনো উৎসবের সময় নির্যাতন বেড়ে যায়।

আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন পরিচিতির সাথে যুক্ত মহিলা ও পুরুষরা। এছাড়াও ছিল ইনস্টিটিউট অফ সোশাল ওয়ার্ক (ISW), প্রচেষ্টা, স্বয়মের মত বেশ কয়েকটি এনজিও। বক্তা ছিলেন কলকাতার প্রোটেকশন অফিসার জয়িতা অধিকারী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বয়মের সোমদত্তা নিয়োগী, ISW থেকে দেবকল্পা বাসুদাস এবং পরিচিতির ছেলেদের দলের অসীম বিশ্বাস।

আলোচনা সভা থেকে মদ বিক্রি বন্ধ করার দাবি উঠেছে। কিন্তু সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, পানশালা তো আগেও ছিল। তাহলে এখন মদ্যপানের প্রবণতা বাড়ল কেন? কোভিডের পর তো আরও বেশি। সামাজিক, মানসিক নানা কারণ থাকলেও মূল কারণ হিসাবে রুটিরুজির অনিশ্চয়তাকে বক্তারা চিহ্নিত করেন।

তাঁদের অভিমত, মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নির্যাতনের পিছনেও একই কারণ রয়েছে। যে বাচ্চা তার বাবাকে মদ খেয়ে মাকে মারধর করতে বা উচ্চস্বরে গালাগাল দিতে দেখছে, সে নিজেও তাই শিখছে। মহিলাদের তুচ্ছ করে দেখার যে প্রবণতা, তার প্রভাব শিশুদের মননে এবং আচরণে অনায়াসে লক্ষ্য করা যায়।

বক্তাদের একজন এ সম্বন্ধে বলেন, “এতক্ষণ পরিচিতির করা রিপোর্ট দেখে একটাই কথা মাথায় এল, সম্প্রতি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্টে কীভাবে কলকাতাকে সবচেয়ে নিরাপদ শহর বলে উল্লেখ করা হল?” তিনি বলেন, কলকাতায় কোনো ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার করা যায় না, বলা হয় এখানে দরকার নেই। অথচ পরিচিতির অডিট যে পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের। এই নির্যাতনের প্রতিকারে আইনকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়েও তিনি বলেন। দেশে উপযুক্ত আইন থাকলেও তার অনুশীলন এবং বিচারব্যবস্থা দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

গার্হস্থ্য হিংসা নিয়েও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।

পরিচিতি জানে এই ধরনের ঘটনা রুখতে এবং সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে শুধু মহিলা নয়, পুরুষদেরও সচেতন করতে হবে এবং তাদেরও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অসীম তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, মহিলাদের সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন এবং ব্যবস্থা আছে, যদিও তার সদ্ব্যবহার কতটা হয় তা নিয়ে সংশয় আছে। কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে সে সুযোগও কম।

এহেন পরিস্থিতির পরিবর্তনে শিক্ষা ও সচেতনতার বিশেষ প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রশাসন-আইন-বিচার ব্যাবস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। অবশ্যই এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের বড়সড় দায়িত্ব রয়েছে।

অডিট ও মূল্যায়নের পাশাপাশি গ্রহণীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে সুপারিশও পরিচিতি রিপোর্টে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন পরিকাঠামোগতভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। নিয়মিত পুলিশি টহলদারি প্রয়োজন। মহিলাদের চলাচলের রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো এবং পৃথক ও স্বাস্থ্যকর কমিউনিটি টয়লেটের প্রয়োজনীয়তা, সেগুলোর উপর বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন আছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মহিলাদের প্রতি থানা এবং পুলিসকর্মীদের আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। তাই কর্মীদের জন্য লিঙ্গ সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা বিশেষভাবে দরকার।

আরো পড়ুন যে সমাজে না বলা বারণ, সেখানে বহরমপুর অনিবার্য

মোটের উপর সমাজকেই মহিলাদের চলাফেরার স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। প্রশাসনকে বেআইনি মদের কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে।

মহিলাদের উপর হওয়া ক্রমবর্ধমান গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে পুরুষদেরও দলবদ্ধভাবে প্রচার করতে হবে। গার্হস্থ্য হিংসা এবং শিশুদের মারধরের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের দেশে নারী, পুরুষ উভয়েই শোষণের শিকার হলেও সামাজিক শোষণ আর নির্যাতনের মাত্রা নিশ্চিতভাবে নারীর উপরে বহুগুণ বেশি। পরিবারের ভিতরে এবং বাইরে তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। এমনকি অর্থনৈতিক শোষণেরও শিকার মহিলারা। একই কাজে একজন পুরুষের বেতন ও নারীর বেতনের তারতম্য এর অন্যতম উদাহরণ। নারীমুক্তির জন্য অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে পরিচিতি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.