লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার। খসড়া তালিকায় দেখা গেল, অর্ধেকের মত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। এরপর শুরু হল নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত নোংরা খেলা। যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি (logical discrepancy) নামক অযৌক্তিক প্রণালীতে গণহারে শুনানিতে তলব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত সফটওয়্যারে গোলমাল, ঘনঘন পদ্ধতি ও নির্দেশিকা বদল, আধিকারিকদের অপ্রয়োজনীয় তাগাদা দেওয়া— এসব করে গোটা পরিস্থিতি জটিল করে তুলল তারা। তবু ‘চূড়ান্ত’ তালিকায় নতুন করে সাড়ে পাঁচ লক্ষ নামও বাদ দেওয়া গেল না। কিন্তু ৬০ লক্ষের বেশি মানুষকে বিচারাধীন রেখে প্রকাশিত হল ‘চূড়ান্ত’ তালিকা। সাড়ে আট শতাংশের বেশি ভোটারকে বিচারাধীন রেখে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রকাশিত তালিকাকে কি আদৌ চূড়ান্ত বলা যুক্তিগ্রাহ্য? মোট ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হলেও, আর কোথাও যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নামে বিশালসংখ্যক মানুষকে শুনানিতে তলব করা হয়নি। কোথাও এত মানুষকে বিচারাধীন রেখে ‘চূড়ান্ত’ তালিকাও প্রকাশিত হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষভাবে নিশানা করার কারণ খুঁজতে হবে বিজেপির রাজনীতির মধ্যে। যাদের ঘৃণা, বিদ্বেষের রাজনীতির অন্যতম অঙ্গ হল অনুপ্রবেশের ভাষ্য নির্মাণ। সাম্প্রতিককালে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ভাষ্য। তাদের এই প্রচারে অন্য রাজ্যে বাংলাভাষী মাত্রেই সম্ভাব্য বিদেশি সন্দেহে আক্রান্ত হচ্ছেন। সেই ঘৃণার রাজনীতিকে মূলধন করে এই রাজ্যেও সামাজিক পরিবেশ ধ্বংসের চেষ্টা চলছে। এক কোটির বেশি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী আর বহুসংখ্যক হিন্দু শরণার্থীর ভাষ্য প্রমাণ করতে তারা এসআইআর-কে হাতিয়ার করেছিল। কিন্তু খসড়া তালিকায় বিজেপির সেই ভাষ্য ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছিল ৫৮,২০,৮৯৯ জন ভোটারের নাম। নাম বাদ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা যে শুধুমাত্র অর্ধেক পূরণ হল তা নয়; দেখা গেল, বাদ যাওয়া নামের বড় অংশ হিন্দু। কিন্তু মুসলমানদের আশানুরূপভাবে বাদ দেওয়া গেল না। আরও অস্বস্তিকর হল, খসড়া তালিকায় উত্তরপ্রদেশে নাম বাদ যায় দু কোটি ৮৯ লক্ষের, এমনকি গুজরাটেও ৬৮ লক্ষের বেশি। সুতরাং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে গোঁজামিলে অঙ্ক মেলানোর মত একের পর এক পদক্ষেপ নিল নির্বাচন কমিশন। তারা অযোগ্য বলে পশ্চিমবঙ্গে আজ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, তারা যোগ্যতার সঙ্গেই বিজেপির রাজনৈতিক মতলব সফল করেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অন্য রাজ্যগুলিতে যে এসআইআরের কাজ যথাযথভাবে হয়েছে তা নয়। প্রামাণ্য নথি থেকে শুরু করে গোটা পদ্ধতি নিয়েই বিস্তর অভিযোগ ছিল। এর মাধ্যমে মুসলমান, দলিত, মহিলা, হতদরিদ্র, ভূমিহীন মানুষের নাম বাদ দেওয়ার আশঙ্কা বিরোধী দল সহ নানা মহল থেকেই তোলা হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাটে নিশানা করে মুসলমানদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভোটমুখী রাজ্যগুলির মধ্যে একমাত্র আসামে এসআইআর হয়নি, হয়েছে বিশেষ সংশোধনী। সেখানকার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা খোলাখুলি মুসলমানদের বেনাগরিক করার হুমকি দিয়েছেন। বরাক উপত্যকায় বাঙালি মুসলমানদের নাম বাদ দিতে মৌখিক নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গেও পদ্ধতির কারণে বহু প্রকৃত ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকেই বাদ গেছে।
চূড়ান্ত তালিকায় দেখা গেল, রাজ্যে নতুন করে ৫,৪৬,০৫৩ জনের নাম বাদ গেছে। দুই দফা মিলিয়ে রাজ্যে মোট ৬৩,৬৬,৯৫২ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল। চূড়ান্ত তালিকায় নতুন করে ১,৮৮,৭০৭ জনের নাম যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৬০,০৬,৬৭৫ জনের নাম বিচারাধীন রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট সহ অধিকাংশ রাজ্যেই খসড়া তালিকার পর আবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকায় যতজনের নাম বাদ গেছে, তার থেকে বেশি ভোটারের নাম উঠেছে। ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। দ্বিতীয় দফাতেও বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ গেছে। মহিলাদের নাম বাদ গেছে বেশি। এবারেও বাদ যাওয়া ভোটারদের বড় অংশ হিন্দু, আর নিশানায় থাকা মুসলমানদের বড় অংশ বিচারাধীন রয়েছেন। বাদ যাওয়া এবং বিচারাধীন ভোটারদের সংখ্যা যোগ করলে মোট সংখ্যাটা ১ কোটি ২০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে থাকা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে, পক্ষান্তরে বাদ যাওয়া বা ঝুলে থাকা হিন্দুদের শরণার্থী বলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ২০১৯ অনুসারে আবেদন করতে বাধ্য করা যাবে। প্রথমেই তাঁদের নিজেদের অনাগরিক বলে ঘোষণা করতে হবে। তারপর নাগরিকত্ব পাবেন কি পাবেন না— সে প্রশ্ন ঝুলে থাকবে ভবিষ্যতের জন্য। এনআরসি-র প্রাথমিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করার পাশাপাশি সিএএ যাতে স্বীকৃতি পায়, সেজন্যই এমনভাবে এসআইআর করা হয়েছে বলে মনে হয়।
দেখা যাচ্ছে, সাধারণভাবে যেসব জেলায় বিচারাধীনের সংখ্যা বেশি, সেইসব জেলায় নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন রয়েছেন মুসলমানপ্রধান মুর্শিদাবাদ জেলায়— সংখ্যাটা ১১ লক্ষের বেশি। অথচ এই জেলায় ১৫,০০০-এর কম নাম বাদ গেছে। বিচারাধীনের সংখ্যায় দ্বিতীয় স্থানে মুসলমানপ্রধান মালদা জেলা। সেখানে আট লক্ষের বেশি মানুষ বিচারাধীন রয়েছেন। অথচ নাম বাদ গেছে মাত্র ১৮,০০০। সারারাজ্যে যতজন বিচারাধীন, তার অর্ধেকেরও বেশি রয়েছেন মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা ও উত্তর দিনাজপুর— এই পাঁচটি জেলা মিলিয়ে। উত্তর ২৪ পরগণা জেলায় অবশ্য রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষের নাম বাদ গেছে— সংখ্যাটা ১,৪২,০০০-এর বেশি। সেই জেলায় বিচারাধীন রয়েছেন প্রায় সাত লক্ষ মানুষ। বাদ যাওয়া ও বিচারাধীনদের মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকেও রয়েছেন। একই কারণে নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নদিয়া জেলা। সেখানে ৬২,০০০ নাম বাদ পড়েছে। ওই জেলায় বিচারাধীনের সংখ্যাও নেহাত কম নয়— ২,৬৭,০০০-এর বেশি।
মুর্শিদাবাদ জেলার ২২ বিধানসভা কেন্দ্রে মোট যতজন বিচারাধীন, তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি রয়েছেন মাত্র আটটি কেন্দ্রে। এগুলি হল সামসেরগঞ্জ, সুতি, রাণীনগর, রঘুনাথগঞ্জ, ফরাক্কা, জঙ্গিপুর, লালগোলা, ভগবানগোলা। সাবর ইন্সটিটিউটের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে— সামসেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলায় জনসংখ্যার ৮০%-৯০% শতাংশ মুসলমান এবং এই কেন্দ্রগুলিতে ৪০%-৪৫% মানুষ বিচারাধীন। অথচ ২০০২ সালের সঙ্গে যোগসূত্রহীন (আনম্যাপড) বলে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা মাত্র ১%-৩%। মুসলমান অধ্যুষিত মালদা জেলার সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ১,৩৩,০০০-এর বেশি (৫২%) নাম বিচারাধীন রয়েছে। অথচ নাম বাদ পড়েছে মাত্র ০.৫৮ শতাংশের। মালদা জেলার মোট বিচারাধীনদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রয়েছেন সুজাপুর, রতুয়া, মালতীপুর, হরিশ্চন্দ্রপুর— মাত্র এই চারটি কেন্দ্রে। উত্তর দিনাজপুর জেলার গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, চোপড়া, করণদিঘি— এই চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে জেলার মোট বিচারাধীনের অর্ধেকের বেশি রয়েছেন। গোয়ালপোখরে বিচারাধীনের সংখ্যা ৭৬,০০০। এইভাবে রাজ্যের কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রকে নিশানা করে জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। পক্ষান্তরে উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বাগদা, গাইঘাটা, বনগাঁ উত্তর; নদিয়া জেলার কল্যাণী, শান্তিপুরের মত মতুয়া অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলিতে বহুসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বাগদায় ১৫,০০০-এরও বেশি নাম বাদ গেছে।
বুথভিত্তিক চিত্র দেখলে মুসলমান, তফসিলি জাতি, উপজাতিদের কীভাবে নিশানা করে নাম বাদ দেওয়া বা বিচারাধীন রাখা হয়েছে সেই খেলা আরও স্পষ্ট হবে। যৌথ জীবনযাপন নামে একটি সামাজিক সংগঠনের তথ্যানুসন্ধান থেকে উদাহরণ হিসাবে কয়েকটি বুথের চিত্র দেখা যেতে পারে।
সাবর ইন্সটিটিউটের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে— সামসেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, ভগবানগোলায় জনসংখ্যার ৮০%-৯০% শতাংশ মুসলমান এবং এই কেন্দ্রগুলিতে ৪০%-৪৫% মানুষ বিচারাধীন। অথচ ২০০২ সালের সঙ্গে যোগসূত্রহীন (আনম্যাপড)
বলে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা মাত্র ১%-৩%। মুসলমান অধ্যুষিত মালদা
জেলার সুজাপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ১,৩৩,০০০-এর বেশি (৫২%) নামবিচারাধীন
রয়েছে। অথচ নাম বাদ পড়েছে মাত্র ০.৫৮ শতাংশের।
কোচবিহার জেলার শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে গুলিচালনায় রাজ্য রাজনীতি সরগরম হয়েছিল। সেই কেন্দ্রের ১০৪ নম্বর বুথে মোট ভোটার ১,৫১৭ জন। তার মধ্যে প্রায় ৫৭% মুসলমান। নাম বাদ গেছে তিনজনের, সকলেই হিন্দু। এই বুথে ৩৫২ জন (অর্থাৎ ২৩%) বিচারাধীন রয়েছেন, সকলেই মুসলমান। এই বুথেরই কাছে অবস্থিত মাথাভাঙা বিধানসভা কেন্দ্রের ২৪৬ নম্বর বুথ। ওই বুথে মোট ৯৪৯ জন ভোটারের মধ্যে মাত্র ২৫ জন মুসলমান, মোট ৪৭ জন বিচারাধীন। তার মধ্যে ৩৬ জন হিন্দু ও ১১ জন মুসলমান। অর্থাৎ মুসলমানদের প্রায় অর্ধেকই বিচারাধীন। এই বুথে বাদ যাওয়া পাঁচজনের সকলেই হিন্দু। দুটি বুথই রাজবংশী অধ্যুষিত। মালদা জেলার মানিকচক বিধানসভা কেন্দ্রের ১৩৮ নম্বর বুথে মোট ৮৯২ জন ভোটারের মধ্যে ৫০৭ জনই (অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি) বিচারাধীন আছেন। তার মধ্যে মুসলমান ৪৪৭ জন।
হুগলী জেলার চণ্ডীতলা বিধানসভা কেন্দ্রের ১১৩ নম্বর বুথে ভোটারের ৮৫ শতাংশের
বেশি মুসলমান। মোট ১,২৬০ জন ভোটারের মধ্যে বিচারাধীন রয়েছেন ১৫৬ জন। তারমধ্যে ১৫৫ জনই মুসলমান। তিনজনের নাম বাদ গেছে, সকলেই তফসিলি জাতির।
আবার নদিয়া জেলার কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের ২৭১ ও ২৭২ নম্বর বুথ মতুয়া অধ্যুষিত। ২৭১ নম্বর বুথে মোট ১,১৪৮ ভোটারের মধ্যে আটজনের নাম বাদ গেছে। বিচারাধীন রয়েছেন ২০০ জন। ২৭২ নম্বর বুথে ১,০৫০ ভোটারের মধ্যে ১৭৫ জন বিচারাধীন আছেন এবং আটজনের নাম বাদ গেছে। হুগলী জেলার চণ্ডীতলা বিধানসভা কেন্দ্রের ১১৩ নম্বর বুথে ভোটারের ৮৫ শতাংশের বেশি মুসলমান। মোট ১,২৬০ জন ভোটারের মধ্যে বিচারাধীন রয়েছেন ১৫৬ জন। তারমধ্যে ১৫৫ জনই মুসলমান। তিনজনের নাম বাদ গেছে, সকলেই তফসিলি জাতির। পাশের ১১২ নম্বর বুথের ধর্মীয় সম্প্রদায়গত জনবিন্যাস মিশ্র। এই বুথে মোট ১,০৬৫ জন ভোটারের মধ্যে পাঁচজনের নাম বাদ গেছে, সকলেই হিন্দু। বুথটির বিচারাধীন ৬৫ জনের মধ্যে মুসলমান ৬০ জন, হিন্দু পাঁচজন। হুগলী জেলারই খানাকুল বিধানসভা কেন্দ্রের ১২৮ নম্বর বুথে মোট ভোটার ৬৭২। বিচারাধীন রয়েছেন ১৪ জন, আপাতভাবে মনে হবে নগণ্য। কিন্তু বিচারাধীনের মধ্যে ১২ জনই মুসলমান। অথচ এই বুথে মোট মুসলমান ভোটারের সংখ্যা ৫০ জনেরও কম। অর্থাৎ মোট ভোটারের মাত্র ৬.৮৫% মুসলমান। অথচ বিচারাধীনদের মধ্যে ৮৬.৭১% মুসলমান।
উত্তর ২৪ পরগণা জেলার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে এসআইআরের ভয়ে দলে দলে অনুপ্রবেশকারী পালাচ্ছে বলে গোদি মিডিয়া জোর প্রচার চালিয়েছিল। সেই স্বরূপনগর বিধানসভা কেন্দ্রের পাশাপাশি ১৮৩ ও ১৮৪ নম্বর বুথের সম্প্রদায়গত জনবিন্যাস বিপরীতমুখী। ১৮৩ নম্বর বুথে ৬১২ জন ভোটারের সবাই মুসলমান, এখানে ৪৭ জন বিচারাধীন রয়েছেন। ১৮৪ নম্বর বুথে আবার ৭৭৭ জন ভোটারের মধ্যে কয়েকজন বাদে সকলেই তফসিলি জাতির। এই বুথে ২৪ জন বিচারাধীন, ২৩ জনের নাম বাদ গেছে।
রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ যাওয়া প্রকৃত ভোটার আবেদন করতে গিয়ে হয়রান হচ্ছেন। ষাট লক্ষের বেশি বিচারাধীন মানুষের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এত কম সময়ের মধ্যে যথাযথভাবে করা সম্ভবপর নয়। সেই কাজের দায়িত্ব পড়েছে বিচারপতিদের ঘাড়ে। এমনিতেই আদালতগুলিতে বিচারপতি কম। তাঁরা এই কাজে যুক্ত হয়ে পড়ায় বিচারব্যবস্থার উপরেও চাপ বেড়েছে। অথচ এত মানুষকে বিচারাধীন রেখে ভোট দিতে না দিলেও তা যথাযথ হবে না। যেসব বিধানসভা কেন্দ্রে ৩০% বা ৪০% নাম বিচারাধীন, সেসব কেন্দ্রে তো ভোটের ফলাফলই বদলে যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, একজন প্রকৃত ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখাও চূড়ান্ত অনৈতিক। অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, পক্ষপাতিত্বমূলক এই ‘চূড়ান্ত’ তালিকায় ভোট হলে তা একপ্রকার প্রহসনই হবে।
আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে গত ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশ। বিচারাধীনদের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কি লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার ঝুলিয়ে রেখেই ভোট হবে? আসামে এমনভাবেই বহু মানুষকে বছরের পর বছর সন্দেহজনক ভোটার (D-voter) দেগে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ভোটাধিকারসহ নানা নাগরিক অধিকার থেকে তাঁরা বঞ্চিত। সেই রাজ্যের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে রায় দানে দীর্ঘসূত্রিতা ও পক্ষপাতিত্বের ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে। আসামের এনআরসি-র ‘চূড়ান্ত’ তালিকা স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু সন্দেহজনকদের কলঙ্কমুক্তও করা হয়নি। অথচ সেভাবেই একের পর এক ভোটগ্রহণ পর্ব চলছে। আসামের এনআরসি-র ক্ষেত্রেও কিন্তু বিচারবিভাগের ভূমিকা ছিল। আশঙ্কা জাগছে, পশ্চিমবঙ্গে সেই আসাম মডেলই অনুসরণ করা হবে। যাতে জটিলতা আরও বাড়বে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
আরো পড়ুন সেনা জওয়ানকেও নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলছে এসআইআর
রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে এই জটিলতা থাকুক। তাহলে তারা কেন্দ্রবিরোধী ও বিজেপিবিরোধী ভূমিকা দেখিয়ে ভোটে বাজিমাত করবে। বাঙালি জাত্যভিমানের রাজনীতি তার বড় মূলধন। একসময় তারা এসআইআরের মাধ্যমে একজনও প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দিতে দেবে না বলে রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করেছিল। এখন বলছে নাম বাদ গেলেও, অল্প ব্যবধানে হলেও তারা জিতবে। বিজেপির মত তারাও নামের যোগ-বিয়োগে ভোটের অঙ্ক কষছে। শাসক দল হিসাবে রাজ্যবাসীর অধিকার রক্ষার কর্তব্য নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের থেকে সেটা আশা করাও ভুল।
বামেরা নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি নিলেও, মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মানসিকতায় ঘাটতি রয়েছে। রাজ্যের নাগরিকদের এই বিষয়ে বড় ভূমিকা রয়ে যায়। এবারের মত এসআইআরে যাঁদের নাম উঠে গেল, তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেলে কিন্তু আগামীদিনে চরম সর্বনাশ হবে। রাষ্ট্র যদি আমাদের নাগরিকত্ব নিয়েই এমন খেলায় মেতে ওঠে, নিশানা করে অধিকার কাড়তে সফল হয়, তাহলে আগামীদিনে ভয়ঙ্কর বিপদ।
আসামে বহুবছর ধরে এই অবিচার চলে আসলেও আমরা নির্লিপ্ত থেকেছি। দেশজুড়ে বিনা বিচারে রাজনৈতিক কর্মীরা বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকলে, মারা গেলেও আমাদের গায়ে আঁচটুকুও পড়েনি। আমরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেছি। এবার আক্রমণটা আমাদের রাজ্যে পৌঁছে গেছে। নিশানা সাতে পাঁচে না থাকা ছাপোষা নাগরিকরা। তাঁদের অধিকার দেওয়া তো দূরের কথা, রাষ্ট্র যে কোনো কায়দায় বেনাগরিক করে দেওয়ার তালে আছে।
রাষ্ট্রের এই সর্বগ্রাসী কর্মসূচিকে না আটকাতে পারলে আমরা কেউ নিরাপদ থাকব না। ফ্যাসিবাদ এভাবেই বিস্তার লাভ করে। কোনো প্রকৃত ভোটারকে বাদ দিয়ে বা বিচারাধীন রেখে আগামীদিনে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া আমাদের সকলের উপরেই আক্রমণ। আজ বা কাল আমরা সকলেই নিশানা হব। আসামে ডি-ভোটার বলে দাগিয়ে দেওয়া মানুষ, অন্য রাজ্যে বাদ যাওয়া প্রকৃত ভোটার, এই রাজ্যে বাদ যাওয়া ও বিচারাধীন থাকা এক কোটির বেশি মানুষের প্রতি অবিচার হল রাষ্ট্রের স্বৈরাচারের নমুনা। দেশজোড়া এনআরসি-সিএএবিরোধী আন্দোলন সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে সেই পথেই নামা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








