দিন দুয়েক আগে আমার এক ভিনদেশি বন্ধু সোশাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন ‘ছিঃ!!! ঘৃণা করতেও ঘৃণা হচ্ছে। ছিঃ!!!’

ইনবক্সে জানতে চেয়েছিলাম – কেন এমন প্রতিক্রিয়া? আমার সেই বন্ধু সন্তানের পড়াশোনার সূত্রে মাঝে মাঝেই এদেশে আসেন। উত্তরে জানালেন ‘জুম্মার দিনে দিল্লি পুলিসের এমন ন্যক্কারজনক কাজ দেখে নিজেকে আর মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে পারিনি দাদা! এক যুগ হয়ে গেল এপারে আসছি। ভালমন্দ অনেক কিছুই মিলিয়ে পেয়েছি, কানেও শুনেছি। কিন্তু এমন একটা ঘটনার দৃশ্য কাল ওভাবে দেখে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে গিয়েছি। হয়ত এমন বহু ঘটনা আগেও ঘটেছে কোথাও না কোথাও, কিন্তু সেসব শুনেছি দূর হতে, দেখিনি তো এভাবে……’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কয়েকদিন আগে সোশাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। দিল্লির রাজপথে কিছু মানুষ নমাজ পড়ছিলেন, সেইসময় দিল্লি পুলিসের এক কর্মী তাঁদের পশ্চাদ্দেশে পদাঘাত করে জোর করে তুলে দিচ্ছিলেন। বিষয়টি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, অশ্লীল এবং অমানবিক। প্রকাশ্য রাস্তায় ধর্মাচরণ বৈধ না অবৈধ, সে এক অন্য বিতর্ক। কিন্তু তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে এ প্রশ্নও উঠা উচিত যে সংখ্যাগুরুরাও, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, রাস্তা আটকে দশদিন ধরে দুর্গোৎসব করে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা নেয় কি?

দিল্লিতে এর আগেও শাহীনবাগের সিএএবিরোধী ধর্না মঞ্চে এবং দিল্লি দাঙ্গার সময়ে পুলিসের একইরকম ভূমিকা দেখা গেছে। দিল্লি পুলিস কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন হলেও আম আদমি পার্টির সরকারকে এর বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক প্রতিরোধে সামিল হতে দেখা যায়নি। তাহলে কি ধরে নিতে হবে, দেশের বামপন্থী দলগুলি বাদে বাকিদের হিন্দুত্বায়ন সম্পন্ন হয়েছে? হনুমান চালিশা প্রিয় অরবিন্দ কেজরিওয়াল শুধু নয়, পশ্চিমবঙ্গে মমতা ও অভিষেক ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসও কি হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে?

একথা এখন বহুল প্রচলিত যে মমতা ভোটের স্বার্থে অন্ধের মত নরেন্দ্র মোদীকে অনুসরণ করেন। মোদীর অনুকরণেই মমতা কলকাতায় গঙ্গারতির আয়োজন করেছেন। মায়াপুর ও দীঘায় মন্দির নির্মাণ করছেন। বিজেপি খারাপ, আরএসএস ভাল বলা; আরএসএস প্রধানের রাজ্য সফরে মিষ্টান্ন সহযোগে আপ্যায়ন ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে মমতার শাসনকালে রাজ্যে আরএসএসের শাখা বৃদ্ধি, আরএসএস পরিচালিত বিদ্যালয়ের সংখ্যাবৃদ্ধি প্রভৃতি প্রসঙ্গ এতটাই আলোচিত, যে তা আর নতুন করে আলোড়ন তৈরি করে না।

মমতার রাজনীতির অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হল ভোট রাজনীতির স্বার্থে সংখ্যালঘু মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে সুচতুরভাবে ব্যবহার করা। রিজওয়ানুর রহমানের মামলা থেকে আরম্ভ করে ইমাম, মোয়াজ্জেমদের ভাতা দেওয়া, দশ হাজার খারেজি মাদ্রাসা স্থাপন করার মত একাধিক বিষয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি আলোচনায় তুলে আনে। কিন্তু মমতার শাসনকালে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ কতটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে সেদিকে আলোকপাত হয় না বললেই চলে। এই প্রসঙ্গে বলা যায় মমতা জমানায় রাজ্যে দুর্গাপুজোর ছুটি পাঁচদিন থেকে দশদিন হয়েছে। কারণ অকারণে হিন্দু পুজোপার্বণে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সরকারপোষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি বেড়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবে ছুটি মঞ্জুর হয়েছে, এমনকি জামাইষষ্ঠী পালনের জন্যও সরকারি ছুটির বন্দোবস্ত হয়েছে। অন্য দিকে ঈদ সহ মুসলমান সম্প্রদায়ের একাধিক ধর্মীয় উৎসবে ছুটি কমেছে। ঈদ-উল-ফিতর ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সবচেয়ে বড় উৎসব। অথচ আমাদের রাজ্যে সেই উৎসবে ছুটি মাত্র একদিন, খুব বেশি হলে দুদিন। আরও অবাক করার মত ব্যাপার, ঈদের পরের দিনই সরকারি চাকরি বা বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের, এমনকি বোর্ডের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমন বহু নজির রয়েছে।

সম্প্রতি রাজ্য সরকার ১৭ এপ্রিল রামনবমী উপলক্ষে ছুটি ঘোষণা করেছে। নবান্ন থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সেদিন জরুরি পরিষেবা বাদ দিয়ে সরকারি এবং সরকারপোষিত সব প্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকবে। পশ্চিমবঙ্গে রামনবমীতে ছুটি এই প্রথম। অতীতে আমাদের রাজ্যে রামনবমী পালন হয়নি এমন নয়, পরম্পরাগতভাবে বাঙালি নিজের মত করে রামনবমী পালন করেছে। সেই উদযাপনে আজকের মত সংখ্যাগুরুর শক্তি প্রদর্শন, সংখ্যালঘুকে সন্ত্রস্ত করার প্রয়াস ছিল না। সাম্প্রতিককালে রামনবমী দিনটা শান্তিকামী, দাঙ্গাবিরোধী এবং সংখ্যালঘু মানুষের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের রাজ্যে রামনবমী নিয়ে আসানসোল দাঙ্গা, এক ছাত্রের মৃত্যু, এমনকি গতবছর উত্তর ২৪ পরগণার ভাটপাড়া, হুগলী জেলার রিষড়া, উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলায় রামনবমীর শোভাযাত্রা নিয়ে অশান্তির জেরে এক নাগরিকের মৃত্যুও হয়েছে।

আরো পড়ুন বাধ্যতামূলক মহানতার একাকিত্বে ইমাম রশিদি

তারপর রাজ্যে রামনবমীতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হল। তৃণমূল দলের প্রাক্তন সাংসদ কবীর সুমন প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন ‘রামনবমী ‘জাতীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন দিবস’। হিন্দি-হিন্দুত্বওয়ালাদের তোয়াজ করতে রামনবমীর ছুটি? মানছি না আমি। বাধ্য হচ্ছি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতা করতে।’ কবীর সুমন প্রতিবাদ করেছেন বটে, কিন্তু তাঁর দল তৃণমূল রাজ্যে বিজেপি-আরএসএসের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে রামনবমীর শোভাযাত্রার আয়োজন করছে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, সমস্ত জেলায় তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব রামনবমীর শোভাযাত্রার শোভাবর্ধন করেন না শুধু, মূল সংগঠকও বটে।

এখন প্রশ্ন হল, কেন তৃণমূল সরকারকে রামনবমীতে ছুটি ঘোষণা করতে হল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তৃণমূলের লোকসভার প্রার্থী তালিকায়। যেমন ধরা যাক, রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের প্রার্থী মুকুটমণি অধিকারী। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক। চালচলন ও হাবভাবে মুকুটমণিবাবুকে যোগী আদিত্যনাথের ছোট সংস্করণ বলা যেতে পারে।

রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল এবার প্রার্থী করেছে রায়গঞ্জ বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণ কল্যাণীকে। তিনি অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিন এক হাতে তৃণমূলের পতাকা, অন্য হাতে গেরুয়া পতাকা নিয়ে রামচন্দ্রের ‘ঘর ওয়াপসি’-র খুশিতে রায়গঞ্জ শহরে মিছিল করেছিলেন। শুধুমাত্র এই দুটো নামের নিরিখেই বোঝা যায় তৃণমূলের বর্তমান অবস্থা। হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়েই যে তৃণমূল রামনবমীতে ছুটি ঘোষণা করেছে – এ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না।

আসলে ক্রমান্বয়ে তৃণমূলের হিন্দুত্বায়ন সম্পন্ন হচ্ছে। তৃণমূল সম্পূর্ণভাবে আরএসএস মতাদর্শচালিত একটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তাই রামনবমীতে ছুটি ঘোষণার মধ্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং মমতা সরকার হিন্দু ভোটের স্বার্থে কবে এই রাজ্যে যোগী মডেলের অন্যান্য দিকগুলো প্রয়োগ করতে আরম্ভ করে, এখন সেদিকে নজর রাখতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.