লক্ষণীয় যে ২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ভয়ানক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এবং পার্ক স্ট্রিট থেকে হাঁসখালি – প্রায় কোথাও মুখ্যমন্ত্রী ধর্ষিতাকে নিয়ে কুমন্তব্য করে ব্যাপারটাকে লঘু করে দিতে ছাড়েননি। তবু বিরোধীরা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেনি। তুলনায় এবারে মুখ্যমন্ত্রী অনেক সংযত। প্রথমদিনই বলে দিয়েছিলেন যে মৃতার বাবা-মা চাইলে সিবিআই তদন্তে তাঁর আপত্তি নেই। তাহলে এবার বিরোধীরা পদত্যাগ চাইছেন কেন? কারণটা সহজবোধ্য। মুখ্যমন্ত্রীর কাজের চেয়ে তো আর কথার গুরুত্ব বেশি নয়। এবারের ঘটনায় যুক্ত দুটো দফতরই মুখ্যমন্ত্রীর নিজের হাতে এবং তারা নিজেদের কাজে বিস্তর গাফিলতি করেছে তা ঘটনার দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরাও সেই মতই ব্যক্ত করেছেন। এ রাজ্যে এমনিতে তৃণমূলের রাজনৈতিক বিরোধীরা ছাড়া প্রায় সকলেই যে কোনো দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতির ঘটনায় বলেন – দোষীরা তৃণমূলের লোক হলেও মুখ্যমন্ত্রীর দোষ নেই। সাধারণ ভোটাররাও সাধারণত তাই মনে করেন। হাজারো কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও একের পর এক নির্বাচনে তৃণমূলের জয়ের বড় কারণ মমতার এই ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। রাজ্যের সবচেয়ে গরিব মানুষ, যিনি হয়ত স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ, তাঁরও বিশ্বাস ‘দিদির পার্টির ছেলেগুলো বদমাইশ। দিদি কী করবে?’ কিন্তু আর জি করের ঘটনায় এরকম বলার কোনো উপায় নেই।

শিক্ষা দুর্নীতিতে সব দোষই শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি এবং আমলাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া গিয়েছিল। গরু পাচার, কয়লা পাচার ইত্যাদি মামলায় তো অভিযুক্ত বা গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোগ আবিষ্কার করার প্রশ্নই নেই। অনুব্রত মণ্ডল তৃণমূল নেতা বলেই যে মমতা তাঁর থেকে টাকা পান – এমন কথা ইডিও বলেনি। সারদা কেলেঙ্কারিতে দু-একবার মুখ্যমন্ত্রীর নাম এলেও তা গুজবের বেশি এগোয়নি। নারদ কেলেঙ্কারির অভিযুক্তদের সম্পর্কেও মমতা বলতে পেরেছিলেন ‘আগে জানলে ভোটে দাঁড় করাতাম না’। কিন্তু তাঁরই অধীন দুটো দফতর একযোগে খুনের ঘটনায় অবহেলা করল, তিনি কিছুই জানলেন না। উপরন্তু আর জি করের কুখ্যাত অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলেন সর্বসমক্ষে, তারপর পদত্যাগের কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে অন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ করে দিল তাঁরই দফতর। আদালতের ধমক খেয়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হল। এত কিছু মুখ্যমন্ত্রীর অগোচরে হয়েছে – একথা চরম মমতাভক্তও কি বিশ্বাস করবে? ২২ তারিখই সুপ্রিম কোর্টে আর জি কর মামলার দ্বিতীয় শুনানিতে সিবিআই অভিযোগ করেছে – অপরাধের অকুস্থলের অবস্থার পরিবর্তন করা হয়েছে মামলা তাদের হাতে যাওয়ার আগেই। প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় দেখিয়ে দিয়েছেন যে রাজ্য সরকারের জমা দেওয়া টাইমলাইনে অপরাধীকে শাস্তি দিতে তাদের একনিষ্ঠতা নয়, অনীহাই প্রমাণ হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। আইনজীবী কপিল সিব্বাল এহেন আচরণের ব্যাখ্যা দিতে খাবি খেয়েছেন। তাই বিচারপতি পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা পুলিসের একজন দায়িত্বশীল অফিসারকে উপস্থিত থাকতে বলেছেন, যাঁর কাছে এই অসঙ্গতির সন্তোষজনক উত্তর আছে।

এমতাবস্থায় বিরোধীরা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে কেন? যাঁরা বনলতা সেনগিরি অন্যায় মনে করেন না তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলা যাক, মমতা নিজে বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।

উপরের ছবির তারিখগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন জিতে আসার পরেও ওই দাবি করেছেন। অর্থাৎ তখন কিন্তু বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা নিয়ে অন্তত সংসদীয় পথে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। তবু। সত্যি কথা বলতে, অন্যায় কিছু করেননি। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজই হল সরকারের পান থেকে চুন খসলে ক্ষেপে ওঠা। কাজটা মমতা চমৎকার পারতেন। বাম দলগুলো আজ পারে না, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও এই সেদিন পর্যন্ত পারত না। মমতার অবশ্য একটা সুবিধা ছিল। ২০১১ সালের আগের সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ মমতাকে ‘আন্দোলনের সুবিধা তুলতে দেওয়া হবে না’ বলত না। সরকারের সমালোচনা করে মমতা রাজ্যের বদনাম করছেন – এই জাতীয় কথা সিপিএম নেতাদের মুখে শোনা গেলেও, নাগরিক সমাজের লোকেরা কখনো বলতেন না। ইতিহাস তো সকলেরই থাকে। মমতারও আছে। তিনি তৃণমূল দল খোলার আগে দীর্ঘকাল কংগ্রেসে ছিলেন। কংগ্রেস আমলে পশ্চিমবঙ্গে যেসব অত্যাচার, অনাচার হয়েছে সেগুলোর দায়ও তাঁর ঘাড়ে চাপা উচিত তাহলে। কারণ তিনি কোনোদিন বলেননি যে তিনি সেসবের জন্যে লজ্জিত। উপরন্তু তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের স্নেহভাজনও ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও মমতাকে কংগ্রেসের কুকীর্তি মনে করিয়ে দিয়ে চুপ থাকতে বলত না কেউ। কারণ সেটা অপ্রাসঙ্গিক। কে আগে ক্ষমতায় থাকার সময়ে কী করেছিল, তার জন্যে তার পরবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার নেই, আন্দোলন করার অধিকার নেই – একথা যারা বলে তারা আসলে স্থিতাবস্থার সমর্থক। কোনো দল বা জোট সরকারে থাকাকালীন কুকর্ম করলে তার শাস্তি হিসাবে ভোটাররা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে অন্য কাউকে ক্ষমতায় আনেন। তাদের শাসন অপছন্দ হলে আবার তাদেরও তাড়ান – এভাবেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে। ভোটারদের বিশ্বাস অর্জন করতে বিরোধী দলগুলোকে অনবরত লড়াই করে যেতে হয়, সরকার পক্ষের ভুলের ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই কাঠামোর বাইরেও একজন বা কয়েকজন নাগরিক অথবা কোনো সংগঠন নির্দিষ্ট দাবি বা দাবিসমূহ নিয়ে আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু কোনো আন্দোলনে অমুককে ঢুকতে দেব না, তমুককে থাকতে দেব না বলাও যে অগণতান্ত্রিক এবং এক ধরনের বামনাই – তা মনুবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিরাও উপলব্ধি করছেন না।

আন্দোলনে একমাত্র তাকেই ঢুকতে দেব না বলা সঙ্গত, যার বিরুদ্ধে আন্দোলন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ যে তথাকথিত অরাজনৈতিক আন্দোলনগুলো করছেন, সেগুলো যে কার বিরুদ্ধে তা প্রায়শই বোঝা যাচ্ছে না। অনেক সময় আন্দোলনকারীরা নিজেরাই জোরের সঙ্গে বলছেন – কারোর বিরুদ্ধে নয়। ২২ তারিখ রাত দখল আন্দোলনের আহ্বায়ক বলে পরিচিত রিমঝিম সিনহা ২৫ অগাস্ট (রবিবার) রাতে ফের টর্চ জ্বেলে, বেগুনি পতাকা নিয়ে এক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। সেই ডাক দেওয়ার ভিডিওতেও এই আন্দোলন কার বিরুদ্ধে তা বলা হয়নি, যদিও বলা হয়েছে ‘আজ ২২ অগাস্ট, প্রায় ১২ দিন কেটে গেল, সুবিচার আসেনি। আর জি করের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করাও হয়নি।’ আন্দোলনের এক বিখ্যাত মুখ, অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত ২৩ অগাস্ট (শুক্রবার) তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছেন ‘একজনকে থামালে হাজার হাজার গলা আরও জোরে চিৎকার করবে’। এই শিরোনাম দেখে ভাবলাম যে থামাচ্ছে তার বিরুদ্ধে শেষমেশ বোধহয় দুকথা লিখেছেন। কিন্তু পড়তে গিয়ে হতাশ হলাম। উনি বরং লিখেছেন ‘আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব রাজনৈতিক বোধ রয়েছে। সেটা দিয়ে, আর নিজেদের সুবুদ্ধি দিয়ে আমরা ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ শব্দটি ব্যবহার করছি। এটার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমাদের কোনও পক্ষ নিতে হবে। আমাদের কেন কোনও পক্ষ নিতে হবে? আমাদের নিজের কণ্ঠস্বরই আমাদের পক্ষ।’

ন্যায়বিচার চাই বলছি, কিন্তু কার কাছে চাই বলছি না – এর কারণ কী? দুটো কারণ সম্ভব। ১) কার কাছে ন্যায়বিচার চাইছি নিজেও জানি না, ২) জানি, কিন্তু বলতে চাইছি না। কারণ বললেই বোঝা যাবে যে সে ন্যায়বিচার দিচ্ছে না। এই সত্য তাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু আমি কোনো কারণে তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।

সমাজের উচ্চকোটির যথেষ্ট লেখাপড়া জানা নারী (এবং পুরুষরা) যেহেতু এই নাগরিক আন্দোলনের মুখ, সেহেতু প্রথম সম্ভাবনাটা বাতিল করে দেওয়াই শ্রেয়। সোহিনী তাঁর লেখার উপর্যুক্ত অংশের পরেই একটা বাচ্চা মেয়ের উল্লেখ করে লিখেছেন সে-ও হাতে মোমবাতি নিয়ে চিৎকার করতে করতে ন্যায়বিচার দাবি করেছে। তারপর মন্তব্য করেছেন ‘সে রাজনীতির কী বোঝে?’ প্রশ্ন হল, সে ন্যায়বিচারেরই বা কী বোঝে? তাকে বড়রা কিছু একটা বুঝিয়েই তো নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদে? তা আর জি কর কাণ্ড যেভাবে গড়িয়েছে গত কয়েক দিনে, তাতে ওই বাচ্চা মেয়ের বড়রা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে যথাসময়ে এফআইআর না করে, মৃতার বাবা-মাকে বিভ্রান্ত করে, এমনকি তড়িঘড়ি মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রাজ্যের সরকারই। কথাটা অনেকে বুঝে গেছেন বলেই শতাব্দী, রিমঝিম, সোহিনীরা ঢোঁক গিললেও ১৪ তারিখ রাতেই এবং তারপর থেকে কোনো কোনো নাগরিক মিছিলেও সরাসরি সরকারবিরোধী স্লোগান শোনা গেছে। তাহলে এবার দ্বিতীয় সম্ভাবনার আলোচনায় আসা যাক।

কী কারণে তৃণমূল সরকারকে বিপদে ফেলতে চাই না? এটাই বাংলার রাজনীতির সেই দ্বিধা, যার কথা এই লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম। এই রাজ্যে বহু মানুষ আছেন যাঁরা আন্তরিকভাবে বিজেপি-আরএসএসের বিরোধী, আবার এও বোঝেন যে তৃণমূল সরকার বিস্তর অন্যায় করে চলেছে। কিন্তু মনে করেন সিপিএম/বামফ্রন্টকে আর ভোট দেওয়া চলে না (এরকম মনে হওয়ার জন্যে বাম নেতৃত্বের দিশাহীনতা, সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং বিজেপিবিরোধিতায় সিদ্ধান্তহীনতা যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী)। অতএব বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে।

এই মনোভাবকে প্রশ্ন করার সময় এসে গেছে। নিঃসন্দেহে বিজেপি-আরএসএস যে কোনো রাজ্যের পক্ষেই ধ্বংসাত্মক শক্তি। কিন্তু তৃণমূল যে ধ্বংসাত্মক নয় – একথা কি আর বলা চলে? স্রেফ উল্টোদিকে আরও খারাপ একটা শক্তি আছে – এই যুক্তিতে পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার দলের দমনপীড়ন, এমনকি নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা মেনে নিয়েও তাঁকেই বহুকাল ধরে সমর্থন করছিলেন প্রগতিশীলরা। কিন্তু মানুষের সহ্যের সীমা থাকে। চৈনিক চক্রান্তই বলুন আর মার্কিন চক্রান্তই বলুন – একটা দল কোনো ভূখণ্ডে বারবার ভোটই হতে দেবে না, সেই ভূখণ্ডের মানুষ তা কতবার কোন কোন যুক্তিতে মেনে নেবেন? পুলিস, অন্যান্য সশস্ত্র বাহিনী এবং শাসক দলের গুন্ডাদের গুলিতে প্রাণ গেলেও মানুষ অন্যদিকে মৌলবাদীরা আছে বলে মুখ বুজে থাকবে – এ জিনিস তো চিরকাল চলে না। স্বীকার্য যে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা, লোকসভায় ভোটদানে যে হিংসা, কারচুপি হয় তা এ আমলে নতুন নয়। মমতা ভোটকে হাসিনার মত প্রহসনে পরিণত করেছেন বলা যাবে না। কিন্তু ক্রমশ সেদিকেই এগোচ্ছেন বললে নেহাত ভুল বলা হবে কি?

পরপর দুটো পঞ্চায়েত নির্বাচন কিন্তু প্রহসনেই পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন শাসক দলের প্রার্থীরা। ভোটের দিন রক্তারক্তি দেখতে অভ্যস্ত এই রাজ্যের মানুষও মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময়েই অত মারামারি, মহিলাদের শাড়ি খুলে নেওয়া ইত্যাদি দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন না। ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি এমন আসনের সংখ্যা নেমে আসে ৯.৫ শতাংশে। কিন্তু তা যত না শাসকের বদান্যতায়, তার চেয়ে বেশি বিরোধীদের লড়াকু মনোভাবের কারণে। মনোনয়ন জমা দেওয়ায় অত্যন্ত কম সময় দিয়ে, জমা দিতে আসা প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে না পেরে ভোটের আগেই শিরোনামে চলে আসেন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব সিনহা। তবে আসল খেলা হল ভোট গণনার সময়ে। হিংসা তো হলই, জয়ী প্রার্থীকে আমলারা সার্টিফিকেট দেননি এমন অভিযোগ উঠল। মাঠে ঘাটে ব্যালট ও ব্যালট বাক্স পড়ে থাকতে দেখা গেল, প্রচুর মামলা হল এবং আদালতের নির্দেশে বহু আমলার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ল।

সিবিআই আর ইডি যে অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা, মন্ত্রীকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেগুলো থমকে গেছে। ঠিক যেভাবে সারদা ও নারদ মামলার কোনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার মানে এই নয় যে তৃণমূল দুর্নীতিমুক্ত। একথা তৃণমূলকে ফ্যাসাদে ফেলতে না চাওয়া মানুষও জানেন। আজ এখানে বাড়ি ভেঙে পড়ছে, কাল ওখানে বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেখানে বোমা তৈরি হত, পরশু তৃণমূলের কাউন্সিলররাই প্রকাশ্যে মারামারি করছেন, তার পরদিন কোনো সমাজবিরোধী গ্রেফতার হওয়ায় প্রবীণ বিধায়ক আর সাংসদ (মদন মিত্র, সৌগত রায়) ফোনে খুনের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করছেন – এসব তো এ রাজ্যে চলছিলই। আর জি কর কাণ্ডে দেখা গেল সরকারি হেফাজতে সরকারি কর্মচারীর জান, মালের সুরক্ষাও নেই। সেটা শুধু ধর্ষণ, খুনে প্রমাণিত হয়নি; ১৪ অগাস্ট রাতে হাসপাতালে যে তাণ্ডব চলেছে তাতেও প্রমাণিত হয়েছে। সেদিন ডিউটিতে থাকা নার্সরা জানিয়েছেন, পুলিস তাঁদের নিরাপত্তা দিতে তো ব্যর্থ বটেই, নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও তাঁদের কাছেই হাত পেতেছিল। বিজেপি এসে যেতে পারে – স্রেফ এই যুক্তিতে এই চরম নৈরাজ্য দেখেও কি তৃণমূলকে যেনতেনপ্রকারেণ সুরক্ষা দেওয়া চলে? রাজ্যের সব মানুষেরই ভাবার সময় এসেছে।

ভোট তো এখনো অনেক দূরে। ইতিমধ্যে তৃণমূল শুধরেও তো যেতে পারে, যদি টের পায় মানুষ তাদের কর্মকাণ্ডে খুশি নন। কিন্তু প্রাণপণে তাদের অন্যায় ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে তো দমনপীড়ন বেড়েই চলবে। ঠিক যা এই মুহূর্তে ঘটছে। ফুটবল মাঠে সমর্থকরা কিছু টিফো দেখাবেন – এই আশঙ্কায় একটা নিরীহ ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে দিয়ে আরও বড় প্রতিবাদের রাস্তা খুলে দেওয়া হল। তারপর সেই প্রতিবাদও আটকাতে নিরস্ত্র ফুটবলপ্রেমীদের উপরে লাঠি চালানো হল। এখন স্কুলগুলোকে পর্যন্ত সরকার আদেশ দিচ্ছে – সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া কোনোকিছুতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া চলবে না।

গণতন্ত্রের চেয়ে একনায়কতন্ত্রের সঙ্গেই যে এই আচরণের মিল বেশি, তা নাগরিক সমাজ স্বীকার না করলে নিজেদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই বলে কোন মুখে?

শেষাংশ আগামীকাল

প্রথম পর্ব

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.