সম্প্রতি ভারতের সরকারি তথ্য এবং তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সংবাদসংস্থার বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে যে অতিমারীর সময়ে বহু মৃত্যু সঠিকভাবে কোভিডজনিত মৃত্যু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলত ভারতবর্ষে কোভিডজনিত মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর এবং অনেকটাই কম। প্রকৃত মৃত্যু অনেক ক্ষেত্রেই কয়েকগুণ বেশি ছিল। তবে সেই প্রসঙ্গে আসার আগে কিছু কথা স্মরণ করে নেব।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, নাকি সুনামি?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০২১ সালের ২১ এপ্রিল বিবিসির একটি রিপোর্টে পরিস্থিতির ভয়াবহতার চিত্র ছিল এরকম।

২০২০ সালের ১৮ জুন ভারতে সর্বসাকুল্যে ১১,০০০ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হন এবং পরের ৬০ দিনে গড়ে দৈনিক ৩৫,০০০ মানুষ আক্রান্ত হতে থাকেন। সেই তুলনায় ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় ঢেউয়ের সূচনায়, ভারতে ১১,০০০ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হন এবং তার পরবর্তী ৫০ দিন দৈনিক গড় ছিল ২২,০০০। এই অবধি তেমন কিছু মনে না হলেও, পরিস্থিতি ঘোরালো হতে শুরু করে এরপর থেকেই। বিবিসির ওই প্রতিবেদন তারপর জানাচ্ছে – ওই ৫০ দিনের পরের যে দশদিন, তাতে দৈনিক কোভিডে আক্রান্ত হন গড়ে ৮৯,৮০০ জন। অন্য এক রিপোর্ট অনুযায়ী, উপর্যুক্ত তারিখের অনতিবিলম্বে দৈনিক ১,৫০,০০০ কেস ধরা পড়তে শুরু করে এবং তার কিছুদিন পরে দৈনিক সংখ্যাটা হয়ে দাঁড়ায় ৩,৮৬,৪০০। কোভিড ভাইরাসের ডেল্টা স্ট্রেনের বিধ্বংসী ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সরকার ও জনগণের গাছাড়া ভাবও হয়ত এর জন্য অনেকটাই দায়ী ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম ঢেউয়ের কোভিডজনিত মৃত্যু বা রোগের প্রকোপ তেমনভাবে ব্যতিব্যস্ত করেনি কেন্দ্র বা রাজ্যের সরকারগুলোকে। লকডাউন ঘোষণার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বা ভাইরাসের তুলনামূলকভাবে কমজোরি থাকাই এর জন্যে দায়ী কিনা, নাকি রাজ্যগুলোর তৎপরতায় এমনটা ঘটেছিল, নাকি সব মিলিয়েই ওই ফলাফল – সে অন্য আলোচনা। তবে একথা অনস্বীকার্য যে ২০২১ সালের শুরুর দিকে ডেল্টার অতর্কিত আক্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের সতর্কবাণী সত্ত্বেও সরকারগুলো কুছ পরোয়া নেই অবস্থানে ছিল।

তার পিছনে হয়ত কিছু রাজ্যের নির্বাচন একটা কারণ। জনগণ ফুর্তিতে থাকলে ভোট দেবেন – হয়ত এমন ভাবা হয়েছিল। যতদিনে বোধগম্য হল যে এবারের ভাইরাস অন্য ধাতুতে গড়া, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ২০২০ সালেই নানা দেশ, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃতদেহ রাখার জায়গা বা কবরস্থানের অভাবে তৈরি ভয়াবহ পরিস্থিতির ছবি সারা পৃথিবী দেখেছে। সেই দুঃস্বপ্ন এবার শুরু হল ভারতে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হাসপাতাল ও নার্সিং হোমে শয্যা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটগুলোর উপর চাপ পড়ল। বহু দেশে দেখা দৃশ্যাবলীর পুনরাবৃত্তি হল ভারতে। যে কারণগুলো দ্বিতীয় ঢেউকে মারাত্মক করে তুলেছিল বলে মনে করা হয় তার মধ্যে বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ, জনসমাগমের উপর ২০২০ সালে আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং রাজনৈতিক মিটিং, মিছিলের রমরমা পড়ে।

মহামারী, অতিমারীর কথা ছেড়েই দিলাম। যে সমস্ত সংক্রমণ নিয়মিত বছরে কয়েক মাসের জন্য মাথাচাড়া দেয়, যেমন ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া – সেসবের মোকাবিলা করতেও প্রয়োজন পূর্ব পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্যের শক্তপোক্ত ভীত, স্বচ্ছভাবে আসল পরিস্থিতি জনগণের কাছে তুলে ধরা, মানুষের ভাল করার সদিচ্ছা এবং বিবেকবান নেতৃত্ব। রোগের মূলে যেখানে এমন একটি ভাইরাস যার সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদেরও অনেক কিছু অজানা, তখন এমনকি সদুদ্দেশ্য থাকলেও ভুলভ্রান্তি অবশ্যম্ভাবী। একথা সত্যি যে ভারতের নানা রাজ্যের সরকার নিজেদের মত করে এই অতিমারীর ঝড় সামলানোর কাজে সচেষ্ট ছিল। কিন্তু সমস্ত রাজ্যের নেতৃত্ব অতিমারীর আবহে স্বচ্ছতা ও সততার প্রতীক হয়ে উঠবেন – এ নিতান্ত দুরাশা। তদুপরি এরকম জাতীয় বিপদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় স্তরে নেতৃত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে তেমন নেতৃত্বের অভাব ছিল|

নানা রাজ্যে এবং জাতীয় স্তরে কী হয়েছিল না হয়ে ছিল তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এই নিবন্ধকারের সাধ্যের বাইরে। আমি বরং তুলে ধরার চেষ্টা করব একটি বিচিত্র প্রবণতার কথা। এই প্রবণতা দেশে দেশে (কোনো দেশে বেশি, কোথাও বড্ড বেশি, অন্যান্য দেশে হয়ত তত নয়), রাজ্য রাজ্যে, শহরে, গ্রামে – সর্বত্র কমবেশি দেখা যায়। এই ধরুন ডেঙ্গুর মরশুম এলেই যে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা সরকারি প্রতিষ্ঠানে আছেন, তাঁরা একটা অলিখিত চাপ অনুভব করেন। চাপটা হল – ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেন কম থাকে সে বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। অনেক সময় তো এই আদেশ খোলাখুলি দেওয়া হয়। আপনি ভাবতেই পারেন – এতে অসুবিধা কোথায়? রোগভোগ কম রাখাই তো লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। কথাটা ভুল নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ডাক্তারদের উপরমহল ঠিক সেই উদ্দেশ্যে ওই নির্দেশ দেয় না। ‘মৃত্যু যেন কম হয়’ বলা মানে আসলে অমুক কারণে মৃত্যু বা অমুক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা যেন কম করে দেখানো হয়। বলা বাহুল্য, কোভিডকালে এই নির্দেশ ছিল কোভিডে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা সম্পর্কে। অর্থাৎ আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা আসলে যা, তাই দেখালে ‘লোকে কী ভাববে’? সংখ্যা কম না দেখালে দেশ হিসাবে, রাজ্যে হিসাবে মুখরক্ষা হবে কী করে? এই ছিল উপরমহলের চিন্তা। মুশকিল হল, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ধামাচাপা দিয়ে জোর করে কোনো একটা অসুখে মৃতের সংখ্যা কম দেখালে, সেই উদ্বৃত্ত মৃত্যু অন্য কোন কারণে হয়েছে তার কাহিনি তৈরি রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে আবার অন্যভাবে মুখ পুড়তে পারে। মানে মাসে হাজারখানেক বাড়তি মৃত্যুর কারণ কোভিড নয় বলে হার্টের অসুখ, স্ট্রোক ইত্যাদি থেকে হয়েছে বলা যেতেই পারে। কিন্তু রাতারাতি ওই অসুখে একগাদা লোক আক্রান্ত হতে এবং মরতে শুরু করল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। মৃত্যুগুলো সম্পূর্ণ চেপে গেলে প্রশ্ন উঠতে পারে – এতগুলো মানুষ গেল কোথায়? সেই যে ছোটবেলায় আমরা উপদেশ শুনতাম ‘একটা মিথ্যা বললে সেটাকে চাপা দিতে আরও অনেক মিথ্যে বলতে হবে’, সেইরকম আর কি। যা-ই হোক, এই জোর করে সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা কোভিডকালে তুঙ্গে উঠেছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট কোভিডজনিত মৃত্যু চেপে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখে। সেখানে জটিল সব পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখানো হয় যে গোটা বিশ্বই কমবেশি মৃত্যু চেপে যাওয়ার দোষে দুষ্ট। সারা বিশ্বে প্রকৃত কোভিডজনিত মৃত্যু প্রকাশিত মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় প্রায় তিন গুণ। এই অসঙ্গতি নির্ণয় করতে গবেষকরা ব্যবহার করেন বাড়তি মৃত্যুর (excess deaths) হিসাবকে, যা সাধারণ অবস্থায় মৃত্যুর সংখ্যা এবং অতিমারীর সময়ে মৃত্যুর সংখ্যার ব্যবধানের ভিত্তিতে বোঝার চেষ্টা করে যে সরকারিভাবে প্রকাশিত তথ্য মোটের উপর নির্ভরযোগ্য কিনা। ওই সমীক্ষায় দেখা যায় যে ভারত বাড়তি মৃত্যুর খতিয়ানে অন্য সব দেশের চাইতে এগিয়ে। তার থেকেও বড় কথা হল, সরকারিভাবে প্রকাশিত কোভিডজনিত মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে এই বাড়তি মৃত্যুর ফারাক বিশাল, যা এই চিত্র দেখলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রিপোর্ট প্রকাশ করেন ২০২২ সালের মে মাসে। তার মাসখানেক আগে, ১৬ এপ্রিল, নিউইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্টে বলা হয় যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই সমীক্ষার ফলাফল ধামাচাপা দেওয়ার নানা প্রচেষ্টা ভারতের সরকার বাহাদুর চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কারণ ভারতের বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষা করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিকাল অ্যাডভাইসরি গ্রুপের এক নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সদস্য তো দাবি করেন, ভারতের প্রয়াস ছিল এই রিপোর্টের প্রকাশ দশ বছর পিছিয়ে দেওয়া। বলা বাহুল্য, ভারত সরকারের তথাকথিত ওসব ছিদ্রান্বেষণ অন্যেরা খতিয়ে দেখেছেন এবং মনে করেছেন – ওসব আপত্তি ধোপে টেকে না।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, মৃত্যুর সংখ্যা কমসম করে দেখানো যদি বিশ্বব্যাপী প্রবণতা হয়, তাহলে ভারত ওই রিপোর্ট নিয়ে আলাদা করে উতলা হতে যাবে কেন? উত্তরের একটা দিক বা সরকারের এই প্রবণতার একটা কারণ আন্দাজ করা যেতে পারে নীচের সারণিতে চোখ বোলালে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, কোভিডজনিত সারা পৃথিবীর মৃত্যুর ৯% হয়েছে ভারতে। জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের প্রতি ছজনের একজন ভারতীয়। অন্যদিকে অতিমারীজনিত সারা পৃথিবীর মৃত্যুর ৯% ভারতে হওয়ার মানে হল, প্রতি ১১টি মৃত্যুর একটি ভারতে। সরকারি হিসাবে পাওয়া এই শতাংশ সত্যি হলে মোটেই খুব খারাপ হত না, বরং অনেকেই বাহবা দিতেন। সারা বিশ্বের তুলনায় ভারতের সর্বজ্ঞ সরকার বেশি বিচক্ষণ হয়ে বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করেছেন, তাই তুলনামূলকভাবে অতিমারীজনিত মৃত্যু এদেশে কম – এরকম বলাই যেত। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই রিপোর্ট। সেখানে দেখা যাচ্ছে, মোট মৃত্যুর মোটামুটি ৩২%। অর্থাৎ গড়ে তিনটি কোভিড মৃত্যুর একটি ভারতে। এই নিবন্ধকারের ধারণা – এইটিই জাতীয় নেতৃত্বের আপত্তির কারণ।

ভারত সরকার যথারীতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টকে তুলোধোনা করে। কোভিডে সরকারি সংখ্যার অন্তত দশগুণ মৃত্যু হয়েছে ভারতে – বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছোট মুখে এসব বড় কথা শুনে ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রক তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। মূল কথা সেই পদ্ধতিগত ত্রুটি। অথচ মন্ত্রক কোনো বিকল্প পদ্ধতি বলতে পারেনি। কেবল জোর দিয়ে বলে যায়, ভারত সরকারের বলা সংখ্যা নির্ভুল। অর্থাৎ অল্পবিস্তর ভুলচুকও ছিল না ভারতের গণনায়। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকাল সাইন্সেজ, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকাল রিসার্চ, নীতি আয়োগ ইত্যাদি সংস্থার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট নিয়ে নিজেদের আপত্তি সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেন। এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য তো স্পষ্ট জানান, ওই রিপোর্টকে তাঁরা ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেন না। কারণ ওসব ভারতের ভাবমূর্তি কলুষিত করার চক্রান্ত। মাণ্ডব্যের পোর্টফোলিও দেখে বিস্ময়ে হতবাক না হয়ে পারা যায় না। ওঁর সম্পর্কে তার আগে কিছুই জানতাম না। কিন্তু উনি যতরকম মন্ত্রক সামলেছেন এবং এখনো সামলাচ্ছেন (অনেকসময় একাধিক নানারকমের মন্ত্রক) তাতে অনুভব করলাম যে দেশসেবার আগুন বুকের ভিতর যদি জ্বলে, তাহলে মন্ত্রক নিয়ে বাছবিচার করা তখন চলে না। যা-ই হোক, ওঁর মূল্যায়ন এই নিবন্ধে করার অবকাশ নেই। বরং বলে নেওয়া ভাল যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই রিপোর্ট বেরোবার আগেও ভারতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে বলা হয়েছে বলে অন্য গবেষকরা সতর্ক করেছিলেন। ডঃ প্রভাত ঝা ও তাঁর সতীর্থদের রিপোর্ট বা ইন্ডিয়াস্পেন্ডের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই লেখা একই কথা বলেছিল।

ভারতে সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য ও রিপোর্ট

এবার আসা যাক সেই প্রসঙ্গে, যা কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের চার বছর পরে এই লেখা লিখতে উস্কে দিল। জাতীয় সিভিল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের তথ্যাবলী দ্য হিন্দু এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যম জোগাড় করেছে তথ্য জানার অধিকার আইন কাজে লাগিয়ে। তাতে দেখা গেছে, ২০২১ সালে সর্বসাকুল্যে ১ কোটির বেশি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়, যা তার আগের বছরের চেয়ে ২১ লক্ষ বেশি। এই ২৬% বৃদ্ধি কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। এই তথ্যের সূত্র জন্মমৃত্যুর রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম। পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ বিষয়ক এক রিপোর্ট (Medical Certification of the Cause of Death) অনুযায়ী, কোভিডের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল ১,৬০,৬১৮। তা এক লাফে ৪,১৩,৫৮০ হয় ২০২১ সালে। সমস্ত নথিভুক্ত মৃত্যু যে ডাক্তার দ্বারা প্রত্যয়িত তাও নয়। হলে তবেই মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা যায় বা জানা যায়। যেমন সমস্ত কারণ মিলিয়ে এক কোটির উপর মৃত্যুর মধ্যে ২০২১ সালে মাত্র ২৪ লক্ষের কিছু কম মৃত্যু ছিল প্রত্যয়িত, যা তার আগের বছরের থেকে প্রায় ছয় লক্ষ বেশি। এই সদ্যপ্রকাশিত তথ্যাবলী থেকে আরও জানতে পারছি, ৫,৭৪,০০০ কোভিডজনিত মৃত্যু হয়েছিল ২০২০ এবং ২০২১ মিলিয়ে। সরকারি বয়ান অনুযায়ী, অতিমারীর শুরু থেকে ২০২৫ সালের ১২ মে অবধি কোভিডজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৫,৩৩,০০০। আর সব বাদ দিলেও, এই দুই সরকারি সংখ্যার মধ্যেই দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। তার ওপর অপ্রত্যয়িত মৃত্যুর মধ্যে বেশকিছুও নিশ্চয়ই অতিমারীর ফল। এসব ধরলে ফারাক বাড়তেই থাকবে।

সঙ্গত কারণেই সংবাদ সংস্থাগুলো একমত যে কোভিডজনিত মৃত্যুর আসল সংখ্যা সরকারি সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। দ্য হিন্দু বলছে বাড়তি মৃত্যু (excess deaths) ৬.৫ গুণ। শুধু তাই নয়, রাজ্য বিশেষে এই তফাত আরও প্রকট। যেমন গুজরাটে ৪৪ গুণ, মধ্যপ্রদেশে এবং উত্তরপ্রদেশে প্রায় ২০ গুণ, তেলেঙ্গানায় ১৮ গুণ। এর কারণ কী? মনে করা হচ্ছে, মৃতের আনুষঙ্গিক শারীরিক সমস্যা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে হয়ত সেগুলোকেই মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ বলে ধরা হয়েছে। অবশ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই জল্পনা আরও দানা বাঁধছে, কারণ এই রিপোর্টের পাশাপাশি, এমনকি ২০২১ সালের স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম রিপোর্ট বেরোতেও প্রায় চার বছর দেরি হল। এগুলোকে আসল তথ্য জনসমক্ষে আনতে রাষ্ট্রের অনীহা বলেই ধরা যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও বা এনপিআর, যা ইদানীং রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের চক্ষুশূল, ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে আভাস দিয়েছিল যে ভারতে রাজ্যে রাজ্যে কোভিডের পরিসংখ্যানে বাস্তবের সঙ্গে ফারাক রয়ে যাচ্ছে। ৩০ এপ্রিলের সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি একদিন গুজরাটে সেখানকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, ৬৮৯টি মৃতদেহের সৎকার করা হয় কোভিড প্রোটোকল মেনে। অথচ সেই দিনের সরকারি হিসাব বলছিল সংখ্যাটা ৭৮। এইরকম তারতম্য অন্য রাজ্যেও দেখা যাচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। এমনও বলা হয়েছিল যে, ২০২১ মার্চে ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছিলেন, দেশে করোনা অতিমারী শেষের দিকে (‘end game’)। সত্যিই ওই সময়ে দৈনিক ৮,০০০ মত কেস শনাক্ত হচ্ছিল। যেখানে তার আগের সেপ্টেম্বরে দৈনিক শনাক্ত কেসের সংখ্যা ছিল ১০,০০০। এরপর আবার রোগনির্ণয় দৈনিক ঊর্দ্ধগামী হতে শুরু করলেও রাজনৈতিক কারণে ফের লকডাউনের প্রশ্নকে পাত্তা দেওয়া হয়নি। উল্টে অস্বীকার করাই একটি কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। বহু ল্যাবরেটরির উপরেও সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর চাপ আসতে থাকে।

আরো পড়ুন রাজ্যের করোনা সামলানো দেখে হাসছে পাশবালিশ

তবে বর্তমান ভারত সরকারের এই অপছন্দের তথ্য অস্বীকার করা, এমনকি তাকে বদলে দেওয়ার প্রবণতা কিন্তু করোনায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের যে কোন সূচক (ranking) অপছন্দ হলেই, অর্থাৎ তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে মনে হলেই, সেই সূচককে নস্যাৎ করার কাজটি সরকারপক্ষের আই টি সেল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করে আসছে। পরবর্তী ধাপ হল নিজেদের মনগড়া কিছু সূচক উদ্ভাবন করা। যদিও এই আলোচনার বিষয় কোভিড সংক্রান্ত পরিসংখ্যান, এই বৃহত্তর প্রবণতা মাথায় রাখলে সরকার বাহাদুরের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সুবিধা হবে। এরকম বেশ কিছু উদাহরণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যাবে।

তা সরকারি হিসাবে গরমিলের এই যে প্রমাণাদি এখন সামনে এনেছে দেশিয় সংবাদমাধ্যমই, এ প্রসঙ্গে কী বলবেন আমাদের নেতা, নেত্রীরা? অবশ্য আদৌ কিছু বলবেন না হয়ত, কারণ চার বছর আগের অতিমারী নিয়ে জনগণ আজ আর ভাবিত নয় – এমনটাই হয়ত ওঁদের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস যুক্তিসঙ্গতও বটে। এই যে ঘন্টার পর ঘন্টা নষ্ট করে এইসব লেখালিখি করছি চ্যানেলে চ্যানেলে যুদ্ধবাজি না দেখে, এ এক ধরনের দেশদ্রোহিতার লক্ষণ বলে কেউ দেগে দিলেই তো অনেকের কাছে এই লেখার একটা শব্দেরও কোনো দাম থাকবে না।

২০২১ সালের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে পর্যবেক্ষকরা কেউ কেউ বলেছিলেন, যতই অস্বীকার করুন, হিন্দুগরিষ্ঠ দেশ ভারতে একসঙ্গে বহু মানুষের সৎকার যখন করতে হয়, তা লুকিয়ে ফেলা ভীষণ কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল চিতাকাঠের অভাবে। এমনকি একাধিক মৃতদেহ একই চিতায় দাহ করার পরেও অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল অন্ত্যেষ্টির ব্যবস্থা। এই ধোঁয়া, এই হাহাকার কি চাইলেই ধামাচাপা দেওয়া যায়? আর ধোঁয়া আছে মানেই তো আগুন লেগেছে কোথাও।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.