বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে মেয়েটা। বয়সের ঘড়িতে একটু একটু করে বালি জমতে জমতে সে জেনে গিয়েছিল, এই বাড়িতে কোনোদিন তার জন্য ঘোড়ায় চড়ে কোনো রাজপুত্তুর এসে দাঁড়াবে না। এ যুগে কেবল রাজপুত্তুর কেন, কোটালপুত্তুরদেরও টাকা লাগে, মোটরবাইক লাগে, সোনার চেন লাগে। আর যে রাজকন্যারা সেইসব দাবি মিটিয়ে উঠতে পারে না, তাদের সারাজীবন বন্ধ দুর্গেই পড়ে থাকতে হয়। কিংবা তাদের মধ্যে যারা কোনো না কোনোভাবে রাজবাড়িতে পা রাখতে পারে, তাদেরও মরে যেতে হয়। পণের দাবি মেটাতে না পেরে বধূমৃত্যু – একদিনের জন্য খবরের কাগজে ওই একটা জ্বলজ্বলে শিরোনাম বরাদ্দ হয় তাদের জন্য। তা এই মেয়েটা না, সেসব কিছু হতে চায়নি। শুধু যে ছেলেটা নিজেই বলেছিল তার সঙ্গে একলা ঘর বাঁধবে, সেই ঘরটা খুঁজতেই সে চলে গিয়েছিল। এদিকে তার দাদা আবার বোকার হদ্দ। মেয়েমানুষ তো একটা মস্ত বোঝা ছাড়া কিছু নয়। সে বোঝা যদি আপনা-আপনিই ঘাড় থেকে নামে, তাহলে খুশি হওয়াই তো উচিত। তার বদলে সে কিনা খালি বোনটাকে খুঁজে বেড়ায়। আহা, যে সুখের খোঁজে সে এমন একলা পাড়ি জমাল, সেই সুখটুকু ছোট্ট বোনটার কপালে জুটল কিনা, তা জানতে না পারলে সে তিষ্ঠোয় কেমন করে!
কিন্তু খবর মেলে না। একে মেয়ে, তায় আবার নিচু জাত। তার ফাইল ঘেঁটে হাতে ময়লা লাগাবে কে? ওদের ছায়া মাড়ালে পর্যন্ত স্নান করতে হয়। দিশেহারা দাদা ভুল করে থানার দাওয়ায় উঠে পড়লে ধূপ জ্বালিয়ে একবার ঘুরিয়ে নেয় পুলিস। সেখানে কে তাকে খবর দেবে? অসহায় দাদা থানার গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, সামনে ভিড় জমেছে। তার বোনের কথা নিয়ে পুলিশের মাথাব্যথা নেই বটে, কিন্তু ঠাকুরসাবের মেয়ে পালিয়ে গেলে পুলিশের মাথা হাতে কাটেন তিনি। উঁচু জাত, বড়লোক, তায় আবার রাজনীতির জোব্বাও গায়ে চাপিয়েছেন যে। ঠাকুরসাবের চ্যালাচামুন্ডারা থানা ঘেরাও করে স্লোগান তুলেছে, আমাদের মেয়ে ওদের নিয়ে যেতে দেব না। গরিব লোকটা বুঝতে পারে, উঁচু জাত আর নিচু জাতের আমরা-ওরার বাইরে আরও একটা আমরা-ওরা তৈরি হয়ে গিয়েছে। সেই নতুন সংজ্ঞায় আবার আমরার মধ্যে নিচু জাতকেও একটুখানি জায়গা দেওয়া যেতে পারে। সত্যি বলতে কী, লোকটা জানে না বটে, কিন্তু ভারতবর্ষ জানে, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে। সেই যে কোন তেরো শতাব্দীতে মুসলিমরা বাংলা জয় করেছিল, আর এতদিনকার মার খাওয়া, পিছিয়ে থাকা লোকগুলোর কেউ কেউ আস্তে আস্তে তাদের দিকেই ঢলে পড়ছিল, অমনি উঁচু জাতের মধ্যে তিষ্ঠ তিষ্ঠ রব পড়ে গিয়েছিল। এতদিন উঠতে বসতে যাদের জুতোপেটা করা হয়েছে, যাদের ছোঁয়া লাগলে গঙ্গাস্নান করতে হয়েছে, হঠাৎ জানা গেল সেই অন্ত্যজদের দেবদেবীরা সকলেই নাকি এই উচ্চবর্ণের দেবতাদের লতায় পাতায় আত্মীয়। বিপদে পড়লে অমন আত্তীকরণ করা এ দেশের উঁচু জাতদের বরাবরের ধর্ম। আর এখন তো গোটা দেশ জুড়েই রব উঠেছে, হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়। তাই লোকটা যখন এক পা দু পা করে এগিয়ে গিয়ে ওই ঘেরাওয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল, কেউ তাকে বাধা দিল না। আর লোকটাও বুঝে নিল, এই দেশে টিকে থাকতে গেলে তাকে ওই আমরাদের দলে ঢুকতেই হবে। তাই সে-ও বেমালুম বলে দিল, তার বোনকে নিয়ে ভেগেছে ওদেরই এক ছোঁড়া। আর এই একটা কথাতেই ‘আমরা’ পক্ষের দরজা খুলে গেল চিচিং ফাঁক হয়ে। একা পুলিশে রক্ষা নেই, তার বোনকে খুঁজতে শুরু করে দিল ঠাকুরসাবের বাহিনীও।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কী মনে হচ্ছে, পুরোটাই একটা ডিসটোপিয়া? আসলে গোটা দেশটাই একটা ডিসটোপিয়ার ভিতরে ঢুকে পড়েছে? নাকি, গোটা দেশটা ডিসটোপিয়ার ভিতরেই ছিল এতদিন? যে প্রিভিলেজড আমরা স্মার্টফোনে অ্যামাজন প্রাইম চালিয়ে দহাড় দেখতে বসে আচমকাই চমকে উঠছি, ভাবছি দেশটা এমন বদলে গেল কবে; সেই একই কথা ওই দলিত শ্রেণির দাদা কিংবা বোনকে জিজ্ঞাসা করা হোক, কিংবা জিজ্ঞাসা করা হোক জাতে মেঘওয়াল আর পদে সাব-ইনস্পেক্টর অঞ্জলি ভাটিকে। দেখা যাবে, তাদের কাছে দেশটা আদৌ বদলায়নি। তাদের কাছে এমনটাই সত্যি ছিল বরাবর। যে সত্যিকে কখনও ‘কোটা সিস্টেম’-এর সুবিধা ছুড়ে দিয়ে আর কখনও ‘কোটা সিস্টেম’ নিয়ে কটাক্ষ করে এতদিন এড়িয়ে চলেছি আমরা। দেশ আর দলিত – এই দুই শব্দ পাশাপাশি বসলে আমাদের সেই অবস্থানগত আয়রনিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজ যেসব খবরে আমরা ছটফট করে উঠছি, তা তো নতুন কিছু নয়। খবরই তো জানিয়েছে, দলিতের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে উঁচু জাতের ঠাকুরসাবরা। জানিয়েছে, দলিত যুবককে নিচে বসিয়ে তার মুখে প্রস্রাব করেছে বর্ণগর্বী নেতা। জানিয়েছে, শুধু মুসলমান বলে একজন মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে দিয়েছে আরেকজন মানুষ। স্মৃতির সামান্য ধুলো উড়িয়ে দেখলে দেখা যাবে, এই খবরগুলো আসলে স্বাধীনতার ৭৫ বছর ধরেই বদলায়নি। একই শিরোনাম, একই ঘটনা। শুধু স্থান, কাল, পাত্র বদলে গিয়েছে। সে পাত্রের নাম কখনও চেতন সিং, কখনও শম্ভুলাল রেগর। এদের শিকার যারা তাদের নামগুলো পর্যন্ত আমরা মনে রাখিনি। বেঁচে থাকতেই হোক কি মরে গিয়ে, ওরা একইরকম অচ্ছুত। একইরকম তাৎপর্যহীন একঘেয়ে।
তাৎপর্যহীন বলেই ওদের খোঁজ পড়ে না কখনো। একজন হারালেও নয়, ২৯ জন হারালেও নয়। অবশ্য এখানে আরও একখানা মোচড় আছে। এ গল্পে যারা হারিয়ে যায়, তারা একে তো নিচু জাত কি ভিনজাত, তার উপরে আবার মেয়ে। সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এই মেয়েদের একঘেয়ে জীবনে নতুন রং লাগানোর স্বপ্ন দেখানো খুব সহজ ছিল। আর নিচু জাতের পুলিস অফিসার অঞ্জলির মতই, উঁচু জাতের সিরিয়াল কিলারও জানত এ দেশে নিচু জাতের মেয়েদের দাম ঠিক কতখানি। আসলে ভারতবর্ষ নামের দেশটায় যেমন ধর্মের প্রসঙ্গ এলে উঁচুনিচুর ভাগ গুলিয়ে যায়, তেমনই এই বিভাজন ঘেঁটে যায় লিঙ্গের প্রশ্নেও। সেখানে উঁচু জাতের ঠাকুরসাবেরাও মেয়েদের মাথায় ঘুংঘট আর মুখে কুলুপ এঁটে কয়েদ রাখতে চায়, আবার নিচু জাতের মেঘওয়ালরাও উচ্চশিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে যে কোনো ছেলের সম্বন্ধ করতে দুবার ভাবে না। কারণ দাপুটে সাব-ইনস্পেক্টর হোক কি ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে, মেয়েদের আসল জায়গা তো পুরুষের নিচেই। তাই ফ্যাসিবাদ যখন তার ক্ষমতা কায়েম করতে বসে, তখন বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটাও তার একটা হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। আরও সুবিধা হল, সেই প্রসঙ্গে ফ্যাসিবাদ যে যুক্তিগুলো সাজায়, এ দেশে বহু আগে থেকেই তার জন্য সুগম পরিসর তৈরি হয়ে আছে। দহাড় নিয়েই কথা হচ্ছে যখন, এ গল্পের পুলিস আধিকারিক অঞ্জলি ভাটিকেই ধরুন। যে কার্যত এ গল্পের নায়ক। নিচু জাতের মেয়েকে তার বাবা শিখিয়েছিলেন, কারোর উপর নির্ভর না করে নিজের রুটি জোগাড় করে নিতে। আসলে এইখানেই সূত্র লুকিয়ে আছে যে, একটি মেয়ের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থানটুকু পাওয়া যে বিয়ের গোড়ার কথা, আর্থিক স্বাবলম্বন দিয়েই বিয়ের সেই প্রয়োজনীয়তাকে নাকচ করা সম্ভব। কিন্তু কথা হচ্ছে, অঞ্জলি তো তা পেরেছিল। তারপরেও নিজের ঘরেই তার অবস্থান একরকম নড়বড়ে হয়ে থাকে। পেশাগত দক্ষতাকে ছাপিয়ে ওঠে তার পুজো-আচ্চা না করা, বাধ্য বিনীত না হওয়ার মত ‘মেয়েলি’ পটুত্বের অভাব। ভালো স্কুল-কলেজে পড়া শিক্ষিতা মেয়েটির মোটরবাইক চড়ে দাপিয়ে বেড়ানো আর দিনরাত কাজে ডুবে থাকার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে তার মায়ের পুরোহিতকে বাড়তি দক্ষিণা দিয়ে পাত্র জোগাড় করার তাগিদ। আবার ইনস্পেক্টর দেবীলালের পরিবার উচ্চবর্ণ, উচ্চবিত্তও বটে, কিন্তু তারপরেও স্কুলপড়ুয়া কিশোরীর বিয়ে নিয়েই মায়ের চিন্তার অন্ত থাকে না। মেয়ের কৃতিত্বকে খাটো করে দেয় কলঙ্কের ভয়, তাই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বড় মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ পেলেও মা তাকে ছাড়তে নারাজ। আবার উঁচু জাতের ঘর থেকেই রজনী ঠাকুর প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলেও পরিবারের ‘ভাবাবেগে’ আঘাত লাগে। মনে করে নেওয়া যাক, প্রেমের বিয়েতেও মা-বাবার স্বাক্ষরসহ সম্মতি লাগবে, কদিন আগেই এমন আইন প্রণয়নের ভাবনা জানিয়েছেন বিজেপিশাসিত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। বিরোধী কংগ্রেস দলের বিধায়করাও এই ভাবনাকে সমর্থন করেছেন।
এখানেই দহাড় দেশের সামগ্রিক মানসিকতার সূত্র ধরিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয়, ঠাকুরসাব থেকে স্বর্ণকার পরিবারের বড়কর্তা – সকলেরই শিরায় শিরায় বইছে একই আধিপত্যকামিতা। যে আধিপত্যের কাছে মেয়েরাও দলিত ছাড়া আর কিচ্ছুটি নয়। সব মিলিয়ে মেয়েদের লড়াইটা এ দেশে তাই পুরুষবাদ আর মনুবাদের ডবল ইঞ্জিনের বিরুদ্ধে। সংবিধানের সমতার নীতি অঞ্জলিকে সাব-ইনস্পেক্টর বানাতে পারে, কিন্তু তাতে অঞ্জলি হেঁটে গেলে কনস্টেবলকে ধূপ জ্বালানো থেকে নিবৃত্ত করা যায় না।
অবাক হচ্ছেন বুঝি? কিন্তু একটু মনে করে দেখুন না, এই তো কদিন আগেই এক আরপিএফ কর্মী এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে ঊর্ধ্বতন অফিসারসহ চারজনকে মেরে ফেললেন অনায়াসেই। নিহত আর ঘাতক – দুজনের পরনে একই উর্দি ছিল। সরকারের দেওয়া। দুজনের হাতে একই রাইফেল ছিল। সরকারের দেওয়া। সংবিধান আদতে দুজনকেই একই আসনে বসার অধিকার দেয়। কিন্তু আরপিএফ কর্মীর নাম চেতন সিং আর নিহত অফিসারের নাম টিকারাম মিনা। উর্দিতে একটা তারা বেশি, কিন্তু জাতে নিচু। এবার চেতনের মুখে বসিয়ে নিন মান্ডোয়া থানার সেই কনস্টেবলের মুখ, যে হারিয়ে যাওয়া বোনের জন্য মিসিং ডায়েরি লেখাতে আসা দলিত যুবকটি দাওয়ায় উঠে পড়লে তেড়ে যায়, আর অফিসার অঞ্জলির দাওয়ায় ওঠা আটকাতে না পারলেও প্রত্যেকবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার বাইরে ছড়িয়ে দেয় পবিত্র ধূপের ধোঁয়া। কিংবা মাড়োয়ারি ঠাকুরসাবের মুখও বসাতে পারেন, যে অফিসারদের মুখের উপরে প্রশ্ন করে, নিচু জাতের মেয়েটাকে কোন সাহসে তার বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে? কিংবা স্বর্ণকার বাড়ির বড়কর্তা, বাড়ির মেয়েদের সবক শিখিয়ে চলার স্বভাবটা যিনি অঞ্জলির উপরেও ঝালিয়ে নিতে চান? তাও স্বর্ণকারদের পৈতৃক হাভেলিতে না হয় সংবিধানের দোহাই দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে অঞ্জলি, হয়ত ধ্বংসস্তূপের মতো একা পড়ে থাকা বুড়ো কর্তার হাঁকডাকের চেয়ে বেশি সাধ্য ছিল না বলেই। কিন্তু সংবিধানের রক্ষক যে দল, সেই দলেরই প্রতিনিধি ঠাকুরসাবের প্রাসাদে দোরগোড়াতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অঞ্জলি আর সংবিধান – দুপক্ষকেই। আসলে সংবিধানের জুজু দেখিয়ে পেশাগত সুবিধা মিলতে পারে, কিন্তু সমাজের মন বদলানো যায় না। সেখানে অঞ্জলি উর্দিতে দুই তারা লাগানো কোনো পুলিস অফিসার নয়, একজন নারী এবং দলিত। এইটুকুই সেখানে তার পরিচয়। তাই রাস্তায় বাইক হাঁকিয়ে যাওয়া ফালতু ছেলেরাও যেমন তাকে আওয়াজ দিতে ছাড়ে না, তেমনই জেলার এসপি সাহেবের চোখও তাকে চেটে নেয় প্রতি মুহূর্তে। আর এই দেশটায় থাকতে থাকতে অঞ্জলিরা ক্রমশ বুঝে নেয়, সংবিধান নয়, সরকার নয়, সঙ্গীও নয়। তাদের নিজেদেরই নিজেদের হাত ধরতে হবে। তাই অঞ্জলি কোনও সুপার-কপ হয়ে ওঠে না, সুপারউওম্যানও নয়। কেবল হারিয়ে যাওয়া মেয়েদের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে নিজের বাঁচার শর্তগুলো নিজেই লিখতে থাকে।
আর এইখানেই দহাড় একটা অন্যরকমের গল্প তৈরি করে ফেলে। এই কাহিনির শুরুতে দলিত যুবকটি টিকে থাকার স্বার্থেই ‘আমরা’-র শরিক হয়ে উঠতে চেয়েছিল। কাহিনির শেষে টিকে থাকার যাবতীয় শর্তকে প্রত্যাখ্যান করে অঞ্জলি ‘ওরা’-র অংশ হয়ে উঠতে চায়। মেয়েকে উঁচু জাতের অবদমনের হাত থেকে বাঁচাতে তার বাবা যে ‘ভাটি’ পদবি তার নামের সঙ্গে জুড়েছিলেন, সেই ধার করা পরিচয়কে অস্বীকার করে এবার নিজের ‘মেঘওয়াল’ পরিচয়েই ফিরতে চায় অঞ্জলি। এই দেশটায় থাকতে থাকতে অঞ্জলিরা বুঝে নেয়, আসলে কোনো উঁচু জাতের পদবিও তাকে নিরাপত্তা জোগাতে পারবে না। কারণ, জাত, বর্ণ, শ্রেণি সবকিছুর বাইরে গিয়ে আসলে এ দেশে একটাই বর্গ আছে মেয়েদের। আর সেটা সমাজের চোখে একরকমের পিছড়ে বর্গই। যে বর্গ আদতে প্রান্তিক, আদতে অপর। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র – সব জায়গাতেই তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, যারা নেহাতই একঘেয়ে আর গুরুত্বহীন। যাদের কথা শোনার দায় আছে, কিন্তু কথা বলার অধিকার নেই। রেললাইনের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া মুসলমান যুবকের মুখে যেমন কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়, তেমনই পালিয়ে যাওয়া রজনীরও জবানবন্দি দেওয়া অধিকার থাকে না।
যে পিছড়ে বর্গের প্রতিনিধি হয়ে উঠে এসেছে এ গল্পের সেই মেয়েরা, যারা সিরিয়াল কিলারটির শিকার, সেই পিছড়ে বর্গেরই একজন ছিল শ্রদ্ধা, যে কিছুদিন আগেই প্রেমিকের হাতে টুকরো টুকরো হয়ে ফ্রিজে ঢুকে গিয়েছিল, শিক্ষিতা রোজগেরে মেয়ে হয়েও সে নিজেকে এই সংকট থেকে বাঁচাতে পারেনি। পিছড়ে বর্গের মতো গুরুত্বহীন বলেই বাড়ি ছাড়ার পর দীর্ঘদিন কেউ তার খোঁজ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না, ঠিক যেমন আলোচ্য ওয়েব সিরিজেও পালিয়ে যাওয়া মেয়েদের অনেককেই মৃত বলে দেগে দেয় তাদের পরিবার। শ্রদ্ধার মতই গোটা সিরিজের পালিয়ে যাওয়া মেয়েদের বিশ্লেষণ করলে একটা প্যাটার্ন পাওয়া যায়। আসলে তারা কেউ ‘অপর’ হওয়ার একাকিত্বকে বয়ে চলতে চায়নি। বদলে তারা একরকম আত্মীয়তার ওম খুঁজতে চেয়েছিল। সেই অসহায় চাওয়াকেই ব্যবহার করে থাকে ঘাতকেরা। আর্থিক নিরাপত্তা, জাতিগত নিরাপত্তা, এমনকি স্বাবলম্বনের নিরাপত্তা যাদের আছে আর যাদের নেই, সেই সমস্ত শ্রেণিতেই যে ঘাতক প্রেমিকদের শিকারেরা রয়ে যায়, তা থেকে বোঝা যায় আদতে এই মেয়েরা একটাই সূত্রে গাঁথা। অপরত্বের সূত্রে। যে অপরত্বের প্রেক্ষিতে জাতের খোঁটা শোনা দলিত মেয়েটিও একা হয়ে থাকে, পণের টাকা জোগাতে না পারা গরিব ঘরের মেয়েটিও একা হয়ে যায়, আবার ধনীর দুলালি রজনী ঠাকুর কিংবা চাকরি করা মিরিয়মও একা হয়ে থাকে।
আরো পড়ুন শ্রদ্ধার হত্যায় প্রকাশ হয়ে পড়ল সমাজের ব্যাধিসমূহ
অপেক্ষাকৃত দুর্বলকে যেভাবে আত্তীকরণের লোভ দেখিয়ে গ্রাস করে ক্ষমতাবান, সেই মাৎস্যন্যায়ের নিয়মেই এই অসহায়তাকে ব্যবহার করে নিচু জাতের দিকে উঁচু জাতের, কিংবা ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর দিকে পুরুষসিংহদের থাবা এগিয়ে আসে। আর সেই আত্তীকরণের যাবতীয় প্রলোভনকেই ভেঙে তছনছ করে দেয় অঞ্জলি। দহাড় শব্দের মানে গর্জন। পিছড়ে বর্গের কাছ থেকে যে কথা বলার অধিকার উচ্চবর্গ কেড়ে নেয়, উচ্চবর্গের দাক্ষিণ্যকে অস্বীকার করার মাধ্যমে সেই গিলে নেওয়া শব্দেরাই গর্জন হয়ে ফেটে পড়ে। গোটা সিরিজ জুড়ে জাতি আর লিঙ্গের পটভূমিতে মেয়েদের অবস্থানগত সংকটের যে চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল, গন্তব্যে পৌঁছে সেই সংকটের একটা পালটা জবাবও তৈরি হয় মেয়েদের হাতেই।
শিরোনামের জন্য নিবন্ধকার আকাশ চক্রবর্তী রচিত একটি গানের কাছে ঋণী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








