ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের একদা প্রধান ব্রিজভূষণ শরণ সিং তাঁর বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগে হওয়া মামলা থেকে রেহাই পেলেন। যৌন নির্যাতনের অন্য যে অভিযোগগুলো বিভিন্ন মহিলা কুস্তিগীররা করেছিলেন সেগুলো অবশ্য এখনো বিচারাধীন। তা সত্ত্বেও, খবরে প্রকাশ, উত্তরপ্রদেশে এক বিজেপি অফিসে আতশবাজি সহকারে বিজয় উৎসব পালন করা হয়েছে। অযোধ্যা বিমানবন্দরে ব্রিজভূষণকে স্বাগত জানাতে আড়ম্বরপূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে যৌন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা আইন, ২০১২ (পকসো)-তে অভিযুক্ত হওয়ার পর ব্রিজভূষণ বলেছিলেন, তিনি সরকারকে এই আইন বদলাতে বাধ্য করবেন।
মনে রাখা দরকার, এই আইন শিশুদের সুরক্ষার জন্য প্রণীত একটি বিশেষ আইন। পকসো আইন লিঙ্গ নিরপেক্ষ, অর্থাৎ এই আইনে ছেলেরাও যে যৌন হিংসার শিকার হতে পারে তার স্বীকৃতি রয়েছে। এটা ১৮ বছরের কম বয়সের সকলকে শিশু হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এমন আইনে যার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, তিনিই যখন বদলে দেবেন বলে হুংকার দেন, তখন বোঝা যায় তিনি কতটা শক্তিধর। এই আইন অত্যন্ত কঠোর। যেমন শুধু নির্যাতনকারী নয়, কোনো শিশুর উপর যৌন নির্যাতন হচ্ছে জেনেও তা রিপোর্ট না করে, তারও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা আছে। বলাই বাহুল্য ব্রিজভূষণকে একদিনের জন্যেও গরাদের পিছনে পাঠানো সম্ভব হয়নি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে যে নাবালিকা অভিযোগ করেছিল, তার বাবা অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন। কোনো ভয়ে বা প্রলোভনে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তবে ভারতের আইন আদালত যে শক্তিশালী এবং অর্থবান মানুষদের জন্যেই, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই মামলা।
বিজেপিশাসিত ভারতবর্ষে ধর্ষকদের মালা পরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া কোভিডোত্তর যুগের ভাষায় ‘নিউ নর্মাল’। খুব অশ্লীল লাগে যখন বিভিন্ন সোশাল মিডিয়ায় অভিযোগকারী নারীদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গবিদ্রুপের বন্যা বয়ে যায়। ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধ পকসো মামলা বন্ধ করে দেওয়ার দিল্লি পুলিসের আবেদন আদালত অনুমোদন করার পরেও এই ধরনের বহু পোস্ট দেখলাম। বিজেপির সদস্য সমর্থকরা লিখছেন – ন্যায়ের জয় হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ করছেন – তাঁদের নেতাকে কিছুতেই দমানো যাবে না।। তবে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর লাগে, যখন দেখি কিছু মানুষ এই সুযোগে বলতে শুরু করেন – ধর্ষণ এবং শিশুদের যৌন হেনস্থা সংক্রান্ত আইনগুলো ক্ষতিকর। নারী সুরক্ষার জন্যে যেসব আইন আছে, সবগুলোই যে মেয়েরা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে – এই কথা এমনিতেই প্রচুর বলাবলি হয়। ফলে নারী নির্যাতন সামাজিক স্বীকৃতি পায়। অথচ সত্যিটা হল, উচ্চবিত্ত পরিবারের অতি অল্পসংখ্যক মহিলা আইনের অপব্যবহার করলেও, দেশের সিংহভাগ নারী পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে যুঝতেই পারে না। থানা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারে না, আদালতে পৌঁছনো তো দূরের কথা। অথচ আজকাল সংবাদমাধ্যমে পুরুষ অধিকার নিয়ে কাজকর্মকে যথেষ্ট জায়গা দেওয়া হচ্ছে। কাজেই নারীবিদ্বেষ ভদ্র বেশ ধরে হারানো জায়গা পুনরুদ্ধার করার সুযোগ পাচ্ছে।
আরো পড়ুন নাসার আর ব্রিজভূষণ: যৌন নির্যাতনের আমরা ওরা
আমাদের দেশে পকসো মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে শাস্তির হার এমনিতেই কম। কিন্তু প্রমাণিত হয় না বলেই অভিযোগগুলো অসত্য – তা বলা যায় না। আইন পাশ হয়েছিল ২০১২ সালে, ১৩ বছর কেটে গেল, আজও শিশুবান্ধব আদালত তৈরি করা হয়নি। ওই আইন অনুযায়ী নির্যাতিত শিশুদের যে ‘সাপোর্ট পার্সন’ দেওয়ার কথা তা এখনো অনেক ক্ষেত্রে হয় না। দেশের সব জেলায় পৃথক ফাস্ট ট্র্যাক পকসো আদালতও এখন পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এই প্রেক্ষাপট ভুলে গিয়ে ব্রিজভূষণের মামলা সামনে রেখে যখন আইন পরিবর্তনের দাবি দেখি সোশাল মিডিয়ায়, খুবই ভয় করে।
ওই লোকটার বিরুদ্ধে আনা অন্য অভিযোগগুলোও খারিজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু তার ভিত্তিতে যদি যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত আইনগুলো পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়, তা সত্যিই আশঙ্কার কারণ। ব্রিজভূষণ গোড়াতেই বলেছিলেন যে সরকারকে আইন পরিবর্তনে বাধ্য করবেন। তাই এখন বিজেপি সমর্থকদের সোশাল মিডিয়া পোস্টগুলো অশনি সংকেত বলে মনে হচ্ছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








