শতবর্ষে পা দেওয়া ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরীকে নিয়ে নাগরিক ডট নেট আর সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের কথোপকথন এসে পৌঁছল আজকের রাজনীতি এবং তার সঙ্গে শিল্পীদের সম্পর্কের প্রসঙ্গে।
অনেকদিন আগে আপনার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা কথোপকথন শুনেছিলাম। সেখানে আপনি বলেছিলেন যে ঋত্বিক আদ্যন্ত বামপন্থী হলেও মনে করতেন তিনি মূলত একজন শিল্পী। তাঁকে রাজনীতিটাও শিল্পের মধ্যে দিয়েই করতে হবে। সলিলও তো আজীবন তাঁর সঙ্গীতের মধ্যে রাজনীতি বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেক্ষেত্রে ইদানীং পশ্চিমবঙ্গে শিল্পীদের দলীয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া, ভোটে দাঁড়ানো, কিছুদিন পরে বেরিয়ে যাওয়া বা আর জি করের ঘটনার মত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কারো কারো পথে নামা – এগুলোকে আপনি কী চোখে দেখেন? এই শিল্পীদের কাজে তো আমরা ডান, বাম, মধ্য – কোনো রাজনীতিরই ছাপ দেখি না। মানে অধিকাংশ বাংলা সিনেমায় বা গানে বা নাটকে তো আটপৌরে জীবনটাই দেখতে পাই না। তার রাজনীতি দূরের কথা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
দেখো আজকাল বেশিরভাগ সময়েই আমি হয়ত খুব তেতোভাবে কথা বলি। কিন্তু জানি না আজকের শিল্পীরা যে রাজনীতিটা করছেন সেটার সম্পর্কে কী করে এর চেয়ে নরম করে বলা সম্ভব। আমার মনে হয়, আগে কলকাতা ফুটবলে যেমন দলবদল হত বা এখন যেমন আইপিএলের নিলাম হয়, নীতা আম্বানির মত ধনকুবেররা ক্রিকেটার কেনাবেচা করেন, আজকাল রাজনীতি তেমনই হয়ে গেছে। যদি আরেকটু সিরিয়াস ভাষায় বলি, তাহলে যা চলছে সেটাকে সোজাসুজি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষায় বলা উচিত aestheticization of politics – একেবারে আদর্শ ফ্যাসিবাদী শাসনে যা হয়ে থাকে। রাজনীতিকে এক ধরনের শিল্প, মানে spectacle, বানিয়ে দাও। আজ যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাও, তাহলে দেখবে সমস্ত রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েই কবিতা লেখা হচ্ছে। সেসব খুব ভাববিহ্বল কবিতা। তাতে কুঠারকে কুঠার বলার চেষ্টা খুব কম। ফলে সাহিত্যে, শিল্পে ওই প্রতিবাদে শাসকের কিছু এসে যাবে না।
এবার ঋত্বিক আর সলিলের শিল্পকর্মের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব যে তাঁরা ফর্ম আর বিষয়, দুটোরই এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেছিলেন যে তাকে বলা যায় এক ধরনের দার্শনিক হস্তক্ষেপ। সেই কারণেই এঁরা নিজের সময়ের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন। ঋত্বিক আসলে কী করেছিলেন? দেশভাগ একটা উপলক্ষ মাত্র। আসলে মানুষের ছিন্নমূল হওয়া তার একটা অন্তর্গত সমস্যা। এই সমস্যাকে তিনি কোথায় রাখবেন – প্রকৃতপক্ষে এই নিয়েই ঋত্বিকের কাজ। অনেকেরই ধারণা মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) আর সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)- ই তাঁর উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে ছবি। কিন্তু ঋত্বিকের প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭) দেখলেও একটা ছোট্ট দৃশ্য দেখা যাবে। কলকাতায় দুর্গা প্রতিমা প্রবেশ করছে এবং এক ভাড়াটে পরিবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে। বাড়ি থেকে পালিয়ে ছবিতেও এই জিনিস দেখতে পাব। আমার তো তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ওটা আসলে বাচ্চাদের ছবিই নয়। ওই ছবির কাঞ্চন যে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা শহরে আসে এবং ওয়াইড অ্যাঙ্গলের প্রভু ঋত্বিক এক্সট্রিম ওয়াইড অ্যাঙ্গলে যেভাবে কলকাতা শহরকে দেখেন, সে এক বিশেষ দেখা। ওখানে বাড়িছাড়া হওয়ার আরেকটা স্তর দেখা যায়, তা হল পথেঘাটে থাকতে হওয়া। যেসব মানুষকে কাঞ্চন দেখে তারা কেবল উদ্বাস্তু নয়, তারা হল যাকে বলে underclass। এমনকি তিতাস একটি নদীর নাম ছবিতেও কিন্তু এই ব্যাপারটা ফিরে আসে, কারণ ভারতে প্রথমবার সভ্যতার স্থানচ্যুতি হয়েছিল সিন্ধু নদ গতিপথ পরিবর্তন করায়। সুতরাং তিতাসের শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এখানে ঋত্বিক সিন্ধুনদের ইতিহাসকে যুক্ত করছেন। যুক্তি তক্কো আর গপ্পো তো বলাই বাহুল্য, এক উন্মাদের বুড়ো আংলা হওয়ার প্রয়াস। নীলকণ্ঠের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া, ছৌ নাচ, লোকাচার, মানে একেবারে people’s art বলতে যা বোঝায় – এসবের সঙ্গে আমাদের মধ্যবিত্ত শিল্পের সম্পর্ককেই ঋত্বিক প্রশ্ন করেন।
ঋত্বিক আর সলিলের শিল্পকর্মের কথা যদি ভাবি, তাহলে দেখব যে তাঁরা ফর্ম
আর বিষয়, দুটোরই এমনভাবে রাজনীতিকরণ করেছিলেন যে তাকে
বলা যায় এক ধরনের দার্শনিক হস্তক্ষেপ। সেই কারণেই এঁরা নিজের
সময়ের মুখপাত্র হয়ে উঠেছেন।
আমরা জানি যে গণসঙ্গীতে সলিল যখন পাশ্চাত্য সুরের প্রয়োগ শুরু করেন, তা নিয়ে গণনাট্য সঙ্ঘের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মত মানুষ মনে করতেন যে বিদেশি সুর এদেশের একেবারে নিচের তলার মানুষ, যাঁরা গণসঙ্গীতের মূল লক্ষ্য, তাঁদের ছুঁতে পারবে না। কিন্তু সলিল এই যুক্তি মানতে চাননি। অন্যদিকে আমরা ঋত্বিকের ছবিতে দেখেছি দেশজ সংস্কৃতি একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তিনি অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবিতে ওরাওঁদের নাচ দেখান। বিশেষত ‘পার্টিশন ট্রিলজি’-তে পুরাণ বা এদেশের প্রাচীন কিংবদন্তিগুলোকে ব্যবহার করেন। সত্যজিৎ রায়ও একবার বলেছিলেন যে ঋত্বিকের মত একেবারে পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বিরল। আবার জীবনের শেষ ছবি যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো, যে ছবি প্রায় আত্মজীবনী এবং যখন তিনি আর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও নন, সেখানে ছৌ নাচ আসে। চরিত্রগুলোর নামও দুর্গা, নচিকেতা – এইরকম। তাই জানতে ইচ্ছা করছে যে সলিল আর ঋত্বিক কি ওই বিতর্কে দুটো আলাদা মতের লোক? নাকি এগুলোকে সেই সময়কার কমিউনিস্টরা অতিসরলীকৃত বাইনারিতে দেখতেন বলে ওই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল?
আমি সম্প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান বা পি সি যোশীর সাংস্কৃতিক নীতি সম্বন্ধে বলতে বলতে এই ব্যাপারটাই ভাবছিলাম। লোকসংস্কৃতি আর আমাদের উচ্চবর্গীয় আধুনিকতা কীভাবে মিলতে পারে – এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বস্তুত সলিল আর ঋত্বিক শুধু যে সমবয়স্ক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন তা নয়, দুজনেই এই দুটো ধারাকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে ভাবছিলেন। আসলে একটা স্বরের বদলে বহু স্বরে কথা বলা, দৈনন্দিনতাকে মহাকাব্যের স্তরে পৌঁছে দেওয়া দুজনেরই লক্ষ্য ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির ওই বিতর্কের মূল্যায়ন করতে গেলে আমি মনে করিয়ে দেব, সলিল ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে যে গানগুলো রচনা করেছেন…জনপ্রিয় গান, আজও প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বাজে… সেগুলো এখন শুনলে এক অন্যরকম চিন্তা মাথায় আসে। কী গান? যেমন ধরো ‘পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/সোজা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি’ বা ‘নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে/সে কখন গেছে ফিরে আমায় ডেকে ডেকে’। এগুলো কি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর সংলাপ নয়? যে সরলরৈখিক আখ্যান পার্টির মত একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, সেটা ঠিক না-ও হতে পারে। ফলে পথ হারাব বলে পথে নামা সলিলের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, ঋত্বিকের ক্ষেত্রেও তেমন সত্যি।
এটা কেন বলছেন?
ধরো, সলিলদা একটা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে আমাকে বলেছিলেন, যে কোমল গান্ধারে ব্যবহার করার জন্যে ঋত্বিকের অনুরোধে উনি একটা প্রেমের গান লিখেছিলেন। সেটা শেষপর্যন্ত ছবিতে রাখা হয়নি। কোন গান? ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। এটা আলাদা করে আধুনিক গান হিসাবে প্রকাশ পেয়ে প্রবল জনপ্রিয় হয়। তা গানটাকে তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে এটা এক ধরনের আত্মবিবরণী। ‘ওগো ঝরাপাতা, যদি আবার কখনো ডাকো’। এই লাইনটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যে ঋত্বিক সুরমা ঘটককে একটা চিঠিতে লিখেছেন, পি সি যোশী গতকাল আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ঋত্বিক, ইউ আর দি ওনলি পিপলস আর্টিস্ট ইন ইন্ডিয়া।’ এর থেকে বেশি কিছু চাই না। তাহলে কমিউনিস্ট পার্টি আবার কখনো ফিরে ডাকবে, এই ভাবনাই কি কাজ করছিল মনের মধ্যে? দুজনেরই? আমার তো এই কথাগুলোকে খেয়াল করলে সেরকমই মনে হয়। সে ডাক যে কখনো আসবে না তা হয়ত দুজনেই বুঝতেন। তবু…এ যেন এক রাজনৈতিক সংলাপ।
আর সলিল যা করছিলেন, সেটা তো আসলে ভারতীয় সঙ্গীতের এক বিরাট আধুনিকীকরণের চেষ্টা। কীরকম? এই যে আমি একটু আগে রামপ্রসাদ, রবীন্দ্রনাথ আর সলিলকে বাংলা আধুনিক গানের তিনটে মাইলস্টোন বলে চিহ্নিত করলাম। সেটা কেন? কারণ রামপ্রসাদের গানের যে আধ্যাত্মিক দিক সেটা বাদ দিয়েও যদি শুধু ভাষার দিকে নজর দিই, তাহলে দেখব যে উনি বাংলা গানের ভাষার ঝুঁটি ধরে দিক বদলে দিচ্ছেন। খাজাঞ্চিখানায় কাজ করতেন। ফলে তাঁর গানে অজস্র ফারসি শব্দ চলে আসছে, যেমন ‘দে মা আমায় তবিলদারী/আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী’। রূপক আনছেন কৃষিকার্য থেকে, যেমন ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা’। এ তো বৈপ্লবিক। রামপ্রসাদ গানকে একেবারে সাধারণ মানুষের জিনিস করে তুলছেন। এমনিতে তো ভারতীয় মার্গসঙ্গীত সাধারণ মানুষের সমতলে নামতে পারে না। পণ্ডিত ভীমসেন যোশী বা ওস্তাদ আমির খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁদের সঙ্গীত উচ্চতায় মহাকাশে পৌঁছে যায়, কিন্তু তা দিয়ে তো বাজারের পোকাকাটা জিনিসের কেনাকাটা করা মানুষের মনের খিদে মেটে না সাধারণত। ভারতের লোকসঙ্গীত, যা হাবিব তনবীর বা ঋত্বিকের কাজে এসে পড়েছে, তার সঙ্গে উচ্চবর্গীয়দের সঙ্গীতের একটা বিরোধ থেকে গেছে। অথচ রাগ হংসধ্বনির সঙ্গে ‘কান্দিয়া আকুল হইলাম ভবনদীর পাড়ে’-তে তেমন বিরোধ নেই।
কমিউনিস্ট পার্টি আবার কখনো ফিরে ডাকবে, এই ভাবনাই কি কাজ করছিল মনের মধ্যে? দুজনেরই? আমার তো এই কথাগুলোকে খেয়াল করলে সেরকমই মনে হয়। সে ডাক যে কখনো আসবে না তা হয়ত দুজনেই বুঝতেন।তবু…
রবীন্দ্রনাথও ১৮৮১ সালে একটা প্রবন্ধে লিখেছেন যে ওস্তাদরা ‘গানের কথার উপরে সুরকে দাঁড় করাইতে চান, আমি গানের কথাগুলিকে সুরের উপরে দাঁড় করাইতে চাই। তাঁহারা কথা বসাইয়া যান সুর বাহির করিবার জন্য, আমি সুর বসাইয়া যাই কথা বাহির করিবার জন্য।’ এইজন্যেই আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সঙ্গীতের সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। আর সলিল কী করলেন? তিনি প্রাচ্য সঙ্গীত আর পাশ্চাত্য সঙ্গীতের মূল ভেদটা বুঝতেন। বুঝে কী করলেন? আপাতভাবে খাপ খায় না, যা contrapuntal, এমন জিনিসকে সফলভাবে মিলিয়ে দিলেন। গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তো বটেই। আমি তোমাকে একেবারে সিনেমার গান থেকে উদাহরণ দিচ্ছি। হিন্দি ছবিতে সলিলের সুরারোপিত প্রথম জনপ্রিয় গান হল ‘আ যা রে পরদেশী…ম্যায় তো কব সে খড়ি ইস পার’।
বিমল রায়ের মধুমতী (১৯৫৮) ছবির গান, যে ছবির আবার চিত্রনাট্যকারদের একজন ঋত্বিক। সলিলদা নিজেই বলেছিলেন যে ওই গানে আসামের বিহু, পাঞ্জাবের ভাংড়া মেশানো হয়েছে। আবার ইন্টারল্যুডে মোজার্ট ঢোকানো হয়েছে। অথচ গানটা শুনলে কিন্তু সম্পূর্ণ দেশি গান বলেই মনে হয়। আর সারা দেশেই লতা মঙ্গেশকরের গলায় এটা আজও জনপ্রিয়।
সুতরাং ভারতীয় সংস্কৃতির আধুনিকীকরণের প্রয়োজন যে ছিল তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। নাটকে এই কাজটা সেইসময় হাবিব তনবীর করছিলেন, সিনেমায় ঋত্বিক, সঙ্গীতে সলিল – এরকম আরও অনেকে। বস্তুত ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ সংগঠন হিসাবেই সচেতনভাবে এই কাজটা করছিল। ওই প্রয়াস সম্পর্কেই অশোক মিত্র একটু আলগা সুরে বলেছিলেন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ ১৯৪০-এর দশকে আমাদের দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ ঘটাচ্ছিল।
মানে আপনি বলছেন ঋত্বিক, সলিল দুজনেই শিল্পী হিসাবে একই লক্ষ্যে এগোচ্ছিলেন, কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে চলে যাওয়ার পরেও?
আমার মনে হয় পি সি যোশীর নেতৃত্বে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ যেটা করতে চেয়েছিল – নাটকে নবান্ন (১৯৪৪) দিয়ে, সাহিত্যে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় যা করছিলেন ‘দুঃশাসনীয়’ বা ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’-র মত গল্পের মধ্যে দিয়ে, কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা সুকান্ত ভট্টাচার্য – সেটা হল উনবিংশ শতকের তথাকথিত রেনেসাঁয় যা হয়নি, সেই কাজটা করা। অর্থাৎ সংস্কৃতিকে একেবারে নিম্নবর্গীয় মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। সলিল আর ঋত্বিক সঙ্গীতে এবং সিনেমায় সেটাই চেষ্টা করছিলেন। সিনেমার মত একটা যন্ত্রভিত্তিক মাধ্যমে এটা কিন্তু দুঃসাহসিক কাজ। কারণ আমরা সাধারণভাবে যন্ত্রকে সন্দেহই করি। আজও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা আর রক্তকরবী এত জনপ্রিয় কেন? বা মহাত্মা গান্ধীর আমেদাবাদ টেক্সটাইল সম্পর্কে বক্তৃতাগুলোর আজও আবেদন রয়েছে কেন? কারণ গান্ধী আর রবীন্দ্রনাথ – দুজনেই খেয়াল করেছেন যে যন্ত্রের দাঁতে অনেক রক্ত লেগে আছে। যন্ত্রের আগমন তো স্রেফ শিল্পবিপ্লবের ফলাফল নয়। যন্ত্রকে এদেশে এনেছে ঔপনিবেশিক শক্তি। এর সঙ্গে পুঁজি আর মুনাফার সরাসরি যোগ রয়েছে। তার ফলে ঢাকার মসলিন নষ্ট হয়েছে, বহু কুটির শিল্প উঠে গেছে, জমি জায়গার ব্যাপক দখলদারি করে রেললাইন পাতা হয়েছে। এসবে হয়ত জাতিরাষ্ট্র গঠনে সুবিধা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজের তন্তুজাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
সলিলদা একটা একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে আমাকে বলেছিলেন, যে কোমল গান্ধারে ব্যবহার করার জন্যে ঋত্বিকের অনুরোধে উনি একটা প্রেমের গান
লিখেছিলেন। সেটা শেষপর্যন্ত ছবিতে রাখা হয়নি। কোন গান?
‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’।
তা ঋত্বিক দেখলেন যে এটা খুব জটিল একটা বিষয়। কারণ এই যুগে তো আর যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই বাঁচব – একথা বলা যায় না। ওরাওঁদের কারোর যদি হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে তাদেরও তো ইসিজি, বাইপাস সার্জারি ইত্যাদি করতেই হবে। তন্ত্র মন্ত্র, তুকতাকে তো আমরা থেমে থাকব না। কারণ মানুষের উপকারে যন্ত্রের ব্যবহার এখন সম্ভব হয়েছে আর আমরা তো চাইও এমন একটা সমাজ যেখানে ওরাওঁদের কাউকে এই সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হবে না। কিন্তু এই দুয়ের সমন্বয় হবে কী করে? সেটা ঘটাতে গেলে অযান্ত্রিক করতে হবে। সুবোধ ঘোষের মূল গল্পে কিন্তু ওরাওঁদের নামগন্ধ ছিল না। তাহলে ঋত্বিক তাদের আনলেন কেন? আসলে এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে যে আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা কখনো অনাদৃত থাকেনি। মহেঞ্জাদারো বা পাটলিপুত্রেও তার চিহ্ন আছে। সুতরাং যন্ত্র জিনিসটাকেই ভারতীয় হলে প্রত্যাখ্যান করতে হবে তা নয়। কিন্তু সেই যন্ত্র কাদের হাতে, কারা তাকে কীভাবে ব্যবহার করছে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সলিলের কাজে এই জিনিসটা কীভাবে হয়েছে যদি একটু উদাহরণ দিয়ে বলেন…
একসময় ফ্র্যাঙ্কফুর্ট স্কুলের অ্যাডর্নো, ওয়াল্টার বেঞ্জামিনকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে দৃশ্যকলা যেমন বস্তুকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে, তেমনি এমন গানও আছে যা পাখিদের গানকে নশ্বরতা থেকে উদ্ধার করে। এটা কী করে করা যায় সে প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় যে লোকসঙ্গীতকে অনুসরণ করলেই তা করা যাবে এমন নয়। বরং ১৯৫৯ সালে লতার গাওয়া ‘যা রে উড়ে যা রে পাখি’ গানটায় দেখো, কীভাবে শব্দকে নশ্বরতার হাত থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ‘যা ফিরে আপন নীড়ে’ বলা হচ্ছে, অথচ সুরটা কিন্তু রুট কর্ডে ফিরছে না। আবার ‘রানার’ গানটার কথা যদি ভাবি। রানার ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে যাচ্ছে, সলিল সুরটাকে ছবার রুট কর্ডে ফিরিয়েছেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত শিল্পীও বলে ফেলেছিলেন, সলিল, এ গান গাওয়া খুব মুশকিল। কিন্তু গানটাতে শুধু শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম তুলে ধরার জন্যে সলিল কী অসাধ্য স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন! তার জন্যে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাহায্য নিয়েছেন। তাতে তো দোষের কিছু নেই। পল রবসন ১৯৩৪ সালে বলেছিলেন যে যিশুখ্রিস্ট সাদা চামড়ার মানুষের কাছে এক ধরনের বিমূর্ত অনুভূতি। তারা তাঁকে চার্চে খুঁজে পায়। কিন্তু কালো মানুষদের কাছে যিশু স্পর্শযোগ্য বিষয়। সেই অনুভূতি থেকে কালো মানুষদের কথ্য ভাষায় যেসব গান রচিত হয়েছিল সেগুলোকে রবসন মার্কিন মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
শেষাংশ আগামীকাল
কথা বলেছেন: প্রতীক
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








