কার্ল মার্কস মনে করতেন ইংল্যান্ড হল ভারতের ভবিষ্যতের আয়না। ইংল্যান্ডের বদলে আমরা ফ্রান্স, জার্মানি বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বসিয়ে দিলেও অর্থ একই থাকে। পোশাক বা চুলের ফ্যাশনের মত পুঁজিবাদের নিরিখে এগিয়ে থাকা দেশগুলোয় যা হয় পরে সেটা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে হয় একটু দেরিতে। অনেকটা গ্রামের তরুণ প্রজন্মের গ্রাম্য দোষ ঝেড়ে ফেলে শহুরে দোষ আপন করে নেওয়ার মত। সেই হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের সমাজে ঘটে চলা ব্যাপারগুলোকে আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের সমস্যা বুঝতে সাহায্য করতে পারে। এই মুহূর্তে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোয় সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান। যারা বিশ্বায়নের নামে গোটা দুনিয়াকে দরজা হাট করে খুলে দিতে বলেছিল, তারাই এখন সীমানায় পাঁচিল তুলবে বলছে। যারা ব্যক্তিস্বাধীনতার ঢাক পেটাত, তারাই বলছে অত স্বাধীনতা চাই না। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর পুঁজিবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আদর্শ উদাহরণ হতে পারে।
আগামী ২০ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখনো মাসদুয়েক বাকি। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই একের পর এক ভাষণে তিনি সমর্থক, বিরোধী – সকলের জন্য একের পর এক পিলে চমকানো ঘোষণা করে চলেছেন। যেমন সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা করে দিয়েছেন যে ক্ষমতায় এসেই তিনি জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করবেন এবং সেনা নামিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের দেশছাড়া করবেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এটা প্রথমবার নয়। নির্বাচনী প্রচারেও ট্রাম্প এলিয়েন এনিমিজ অ্যাক্ট, ১৭৯৮ লাগু করে এই কর্মসূচি পালন করার কথা বলেছিলেন। এই আইন শেষবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানি, জাপানি, ইতালিয় অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
ট্রাম্প সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অপরাধে অভিযুক্ত রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন। তাঁকে একজন পর্ন তারকার মুখ বন্ধ করতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে আদালত ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত করেছে। এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল উল্টে দিতে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টার অভিযোগ আছে। এছাড়াও তিনি একজন বুক বাজানো অভিবাসীবিরোধী, সামাজিকভাবে রক্ষণশীল, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী লোক। নির্বাচনের আগে একটি রক্ষণশীল থিংকট্যাংক প্রকাশিত প্রোজেক্ট ২০২৫ নিয়েও ব্যাপক হইচই হয়েছিল। সেখানে ট্রাম্পের শাসনকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনকাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন এনে একটা ফ্যাসিবাদী ধরনের কাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। শুধু তাই নয়, অভিবাসীদের গণবিতাড়ন কর্মসূচির কথা বলা হয়। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের ভয় দেখাতে ডেমোক্র্যাটরা এই প্রোজেক্টকে ব্যবহার করেছিল। তবুও দেখা গেল যে ভারতীয়, লাতিন, আরব বংশোদ্ভূত সংখ্যালঘু ভোট, যাদের কট্টর ডেমোক্র্যাট ভোটার হিসাবেই এতদিন বিবেচনা করা হত, তাদের ভাঙিয়ে ট্রাম্প বাজিমাত করলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিসকে হারিয়ে।
২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প মাত্র ১২% এবং বাইডেন ৮৭% আরব ভোট পেয়েছিলেন। কমলার জন্যে এবারে সেই ভোট ৫১% কমেছে। অন্যদিকে ৪৩% ভোটবৃদ্ধির ফলে ট্রাম্প পেয়েছেন আরব ভোটের ৫৫%। ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের মধ্যে ট্রাম্পের ভোট বৃদ্ধি হয়েছে ৯%, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ভোট কমেছে ১০%। লাতিন মূলের মানুষের মধ্যে আগেরবারের তুলনায় ১৩% ভোট বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে আগেরবারের মতই ট্রাম্প মাত্র ১২% ভোটে আটকে থাকলেও, ডেমোক্র্যাটদের ভোট কমেছে প্রায় ১%।
মোট ভোট পড়েছে ৬৪.৫%, যা গত নির্বাচনের থেকে ২.৫% কম। তথ্য বলছে, জাতিগত এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ব্যাপক ভোট দ্বিদলীয় নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের থেকে রিপাবলিকানদের দিকে যেমন ঘুরেছে, তেমনি একটা ছোট অংশ ডেমোক্র্যাটদের বর্জন করলেও ট্রাম্পকে ভোট দেননি। ফেডেরাল ইলেকশন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে সমস্ত প্রার্থী মিলিয়ে মোট ১,৬৩১.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছিল। এর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা তুলেছে ১০০০.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে কমলা একাই তুলেছেন ৯৮৭.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জুটেছিল ৫৬৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ট্রাম্প তুলেছিলেন ৩৮১.৫ মাত্র মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু ওই হিসাবের সঙ্গে ভোটারদের চাওয়া পাওয়ার কোনো সঙ্গতি যে ছিল না তা পরিষ্কার।
২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর উগ্র শ্বেতাঙ্গদের উৎপাত ব্যাপক বেড়ে যায়। বহু অভিবাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাকরি ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে যান। মার্কিন নাগরিক আরব, ভারতীয়, লাতিন বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক অপরাধ বৃদ্ধি পায়। তাহলে কেন তাঁরা এবারে ট্রাম্পকে ভোট দিলেন? দোষটা সংখ্যালঘুদের, নাকি মার্কিন সংবাদমাধ্যমে এবং রক্ষণশীলদের কাছে ‘বাম’ বা ‘মার্কসবাদী’ তকমা পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই গণ্ডগোল আছে? বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী, বুর্জোয়া, লিবারাল ওই পার্টির সঙ্গে কিন্তু মার্কসবাদের আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই।
যা-ই হোক, কী এমন ঘটল যা অশ্বেতাঙ্গ আমেরিকান ভোটারদেরও ট্রাম্পের দিকে নিয়ে এল? ফল প্রকাশের পর মিশিগানে এক জনসভায় ট্রাম্প নিজেই এই ম্যাজিকের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, মিশিগানসহ গোটা দেশের মুসলমানরা অন্তহীন যুদ্ধ বন্ধ করতে চেয়েছে। তারা শক্তিশালী সরকার চায়, শৃঙ্খলা চায়, সাধারণ বুদ্ধি (common sense) চায়। তারা রূপান্তরকামী অপারেশনের পক্ষে নয়, তারা নারীদের খেলায় পুরুষদের খেলতে দিতে চায় না। তারা বিকশিত অর্থনীতি চায়। তারা অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়াই গোপনে স্কুলে শিশুদের লিঙ্গ পরিবর্তন করে দেওয়ার পরিকল্পনা (যা কমলার ছিল বলে ট্রাম্পের বক্তব্য। যদিও এটা একেবারেই ভুয়ো খবর, যা একাধিকবার মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে) পছন্দ করে না।
একই জনসভায় আরব-মার্কিন সম্প্রদায়ের এক নেতা ব্যাখ্যা করেন যে কেন তাঁরা ট্রাম্পকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছি কারণ ট্রাম্প ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছি পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কারণে। কারণ সেটা আমাদের সন্তানদের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত, বিশেষত স্কুলের পড়াশোনার ক্ষেত্রে। আমরা রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকে চেয়েছি কারণ আমরা কঠোর সীমান্ত চাই। আমরা চাই কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসতে হলে আইন মেনে আসুক।
লাতিন ভোটারদের ট্রাম্পের দিকে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিফেক্টর বইয়ের লেখিকা পাওলো রামোস এমএসএনবিসি চ্যানেলে এক আলোচনায় বলেন, গত চারবছর ধরে যা দেখছি, একজন ডেমোক্র্যাট ল্যাটিনো বা সাধারণ (দলহীন) ল্যাটিনোর ট্রাম্পবাদের দিকে ঝোঁকা জটিল কোনো ব্যাপার নয়। আমি রাস্তায় কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, বারবার অভিবাসীবিরোধিতা এবং রূপান্তরকামীদের প্রতি বিদ্বেষ বেরিয়ে এসেছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্প নিজে, ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া সংখ্যালঘু এবং ট্রাম্পবিরোধীরা মূলত তিনটে কারণের কথা উল্লেখ করছেন – যুদ্ধ, রূপান্তরকামী মানুষের প্রতি বিদ্বেষ এবং অভিবাসীবিরোধীতা।
ট্রাম্প বা রিপাবলিকানদের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ট্রাম্প যখন তখন পরমাণু বোমা ব্যবহার করার হুমকি দেন। যদিও ট্রাম্পের গত শাসনকালে দেখা গেছিল, তিনি যত গর্জান, তত বর্ষান না। সেইসময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি। বরং ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ইজরায়েলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর আব্রাহাম চুক্তি হয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ট্রাম্প আলোচনায় বসেছিলেন। যুদ্ধের বদলে কূটনীতির মাধ্যমে মার্কিন সাম্রাজ্যের স্বার্থ চরিতার্থ করাই ট্রাম্পের কৌশল বলে দেখা গিয়েছিল। বাইডেনের আমলে কিন্তু ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য সমেত পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঝামেলা পাকানোর তহবিল যোগাতে গিয়ে মার্কিন অর্থনীতি আরও গভীর সঙ্কটে পড়েছে। গাজায় মার্কিন মদতে ইজরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের তার শাস্তিও দিতে চেয়েছেন। যদিও ট্রাম্প ইজরায়েলকে লাগামছাড়া সন্ত্রাস, গণহত্যা চালানোর ছাড় দেওয়ার পক্ষে প্রকাশ্যেই কথা বলেন, তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখাটাই ডেমোক্র্যাটদের শাস্তি দেওয়ার প্রধান উপায় বলে মনে করেছেন ভোটাররা।
ঐতিহাসিকভাবে ধর্মপ্রাণ মানুষ নারী আন্দোলন বা বিকল্প লিঙ্গ ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কখনোই লিঙ্গ রাজনীতি এবারের নির্বাচনের মত জীবনমরণ সমস্যা হিসাবে হাজির হয়নি। কারণ সম্ভবত এর আগে নারী বা সমকামীদের আন্দোলনগুলো ছিলো আত্মরক্ষামূলক, নিজেদের মানবাধিকারের জন্য। এতে ধর্মপ্রাণ লোকেরা বিরক্ত বোধ করলেও, কখনোই তাদের মনে এখনকার মত প্রভাব ফেলেনি। বিরক্ত হলেও তাঁরা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু লক্ষণীয়, গত ১৪ মার্চ ইউএসএ টুডে লিখেছে যে গত ১২ বছরে নিজেকে এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের অংশ মনে করা মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অন্যদিকে ২৩ অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে যে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার ভয়ে ‘পিউবার্টি ব্লকার’ বা বয়ঃসন্ধি ঠেকানোর ওষুধ নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন না গবেষকরা।
অন্যদিকে তথ্য বলছে, সাতের দশক থেকে নয়া উদারবাদের আমলে মার্কিন শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত মজুরি বাড়েনি বললেই চলে। অন্যদিকে মার্কিন কারখানাগুলো আরও শস্তা শ্রমিকের খোঁজে পাড়ি দিয়েছে গরিব দেশগুলোতে। ফলে আমেরিকায় কারখানা উঠে গেছে, শ্রমিকরা বেকার হয়েছেন, ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। এর মধ্যে একদিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্মহার হ্রাস, অন্যদিকে বাইরে থেকে অভিবাসীদের আগমন মার্কিন শ্রমিকদের ব্যাপক নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। একসময় যারা অভিবাসী ছিল কিন্তু বর্তমানে মার্কিন নাগরিক, তারা নিজেদের অভিবাসী বলে আর ভাবে না। বরং সাদা মার্কিনিদের বহিরাগত নিয়ে ভয়ের সঙ্গেই একাত্মবোধ করে। অনেকটা পশ্চিমবঙ্গে আগে আসা বাঙালরা যেমন পরে আসা বাঙালদের উৎপাত মনে করে। আবার এটাও খেয়াল করার মত যে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে মহারাষ্ট্রে অভিবাসীবিরোধিতাকেই সম্বল করে সিপিআইয়ের শ্রমিক ভিত্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে কারখানা থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছিল শিবসেনা।
এরই মাঝখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক নতুন তত্ত্বের আমদানি হয়েছে – মাগা (Make America Great Again) কমিউনিজম। হজ আলদিন (২৭) এবং জ্যাকসেন হিঙ্কেল (২৪) নামে দুই মার্কিন তরুণ ট্রাম্পের ওই স্লোগানের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন কমিউনিজমকে। শুনতে অনেকটা কাঁঠালের আমসত্ত্ব মনে হলেও, ওই যুবকদের দাবি – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ট্রাম্প সবচেয়ে বড় শ্রমিক সমাবেশ ঘটিয়ে ফেলেছেন আমেরিকাকে আবার মহান বানানো বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত কারখানা ফিরিয়ে আনার কথা বলে। হিঙ্কেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্পের সভায় যাঁরা ভিড় জমাচ্ছেন, তাঁরা ঋণে জর্জরিত বা বেকার শ্রমিক। তাঁরা চান কারখানা খুলুক। শিক্ষা চাই, স্বাস্থ্য চাই। তাঁরা চান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশে যুদ্ধ না করে নিজের দেশের মানুষের উন্নতি করুক। এইভাবে ট্রাম্পের মাগা স্লোগানের মাধ্যমে যেসব মানুষ একজোট হচ্ছেন, তাঁদের সমস্যার সমাধান নাকি কমিউনিজমের মাধ্যমেই হতে পারে।
অন্যদিক দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেবানিয় মূলের হজ আল দীন ট্রাম্পকে তাঁর সমর্থন প্রসঙ্গে বলেন, ট্রাম্পের প্রতি কোনো ভক্তি নেই, আগ্রহ শ্রমিক সমাবেশের দিকে। তাঁর ব্যাখ্যা – ম্যাকডোনাল্ড’স-এ আমরা বার্গারের জন্য যাই, জোকারটার জন্য নয়।
অন্যদিকে আল দিন জানিয়েছেন, তিনি প্রথমে বার্নি স্যান্ডার্সের সমর্থক ছিলেন। পরে তাঁর মনে হয় যে মার্কিন শ্রমিকদের সঙ্গে বামেদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর কথায়, আমরা এই নাকের মাঝে দুল পরা, বেগুনি চুলের কিম্ভূতদর্শন বামপন্থীদের বলতে চাই, যখন তোমরা শ্রমিকশ্রেণিকে গিয়ে বলো তোমাদের আমেরিকাকে ঘৃণা করতে হবে এবং আমেরিকান হওয়াকে ঘৃণা করতে হবে, তখন তোমরা শত্রুকেই সাহায্য করো। তোমরা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের কোনো উপকার করো না।
আরো পড়ুন সেলিব্রিটি কাল্ট দরদি সিপিএমকে খোলা চিঠি
এই নভেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পাশাপাশিই ভেরমন্টে হাইবেলিফ নামে এক স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ক্রিস্টোফার হালেলি (৩৩) নামে এক যুবক। হালালির পার্টির নাম আমেরিকান কমিউনিস্ট পার্টি। এই পার্টি তৈরি হয়েছে এবছর জুলাই মাসে। মূলত ঐতিহ্যবাহী পুরনো কমিউনিস্ট পার্টি ইউএসএ ভেঙে তরুণ সদস্যরা এই দল গঠন করেছেন। ওই দলের প্লেনারি কমিটিতে হালালির সঙ্গে হ্যাঙ্কেল এবং আল দীনও আছেন।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, মুমূর্ষু পুঁজিবাদের যুগে তথাকথিত উদার বুর্জোয়াদের সাংস্কৃতিকভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, আত্মহারা এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে মানুষমারা শাসনকে (দার্শনিকভাবে উত্তর-আধুনিকতা উত্তর-কাঠামোবাদের প্রচারক) অনেকসময় বাম বা মার্কসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে। এই শাসন খেটে খাওয়া মানুষকে ইউরোপ জুড়েই উগ্র দক্ষিণপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে বামেরা বহু ক্ষেত্রেই উদ্ভট বুর্জোয়া দর্শনের কাছে আত্মসমর্পণ করে ক্রমশ শ্রমজীবী মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ লড়াইয়ে ফলে অর্জিত অধিকারগুলোও হারিয়ে যেতে বসেছে।
যদিও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অ্যাসেট ম্যানেজার কর্পোরেশন ব্ল্যাক রকের সিইও ল্যারি ফিংক গতমাসে এক সম্মেলনে বলেছিলেন ‘এটা জীবনের সবচেয়ে বড় নির্বাচন, একথা শুনে শুনে আমি ক্লান্ত। সময়ের এতে আসলে কিছুই যায় আসে না।’
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








