আজকের পরিস্থিতিতে কি ঋত্বিক ঘটকের মত বিন্দুমাত্র ঘাড় না বেঁকিয়ে নিজের মর্জি মত শিল্পসৃষ্টি সম্ভব? শেষমেশ সেই প্রশ্নে পৌঁছল নাগরিক ডট নেট আর সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ কথোপকথন।

আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিল্পীকেও তো ঘর সংসার চালাতে হয়। সকলে ঋত্বিকের মত সারাজীবন নিজের মত করে শিল্প করতে পারলে করব, নইলে করবই না – এই সঙ্কল্প নিয়ে চলতে পারেন না। ঋত্বিক বিমল রায়ের মধুমতী-র মত হিট ছবির চিত্রনাট্য লেখার মত দু-একটা কাজই করেছেন। সিনেমা শেখানোর সরকারি চাকরিও বেশিদিন করেননি। সলিল আবার প্রচুর সিনেমার কাজ করেছেন, বাংলা আধুনিক গান রচনা এবং সুর দেওয়ার কাজ করেছেন। তাতেও বহু উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই যে আমাদের একটা প্রবণতা আছে, আমরা কেউ বাণিজ্যিক পরিসরে করা কাজগুলোকে কম গুরুত্ব দিই, আবার কেউ ‘ঘুমভাঙার গান’ নামে পরিচিত সলিলের সরাসরি রাজনৈতিক কাজগুলোকে পাত্তা দিতে চাই না। এটা কি ঠিক? মানে গরিব শিল্পীর শিল্পই সৎ শিল্প, বাকি সব স্রেফ আপোস – এরকম ভাবে কি শিল্পকে দেখা যায়?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একদমই যায় না। ওভাবে দেখলে তো বলতে হবে যে শিল্পীর গান কেউ শোনে না সে-ই সবচেয়ে বড় শিল্পী। ওটা একেবারেই ভুল চিন্তা পদ্ধতি। আসলে ঋত্বিকও কিন্তু চাইতেন লোকে তাঁর ছবি দেখুক। দেখে না বলে যথেষ্ট কষ্টও পেতেন। আমি যদি এখন পিয়ানো বাজাই, একটা লোকও শুনবে না। তাতে কি প্রমাণ হয় আমি বেঠোফেন? ধরো, আমি যদি সাহিত্যের কথা বলি। সাহিত্য শব্দটাই তো ‘সহিত’ থেকে এসেছে। অর্থাৎ অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ, সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ – এটাই তো সাহিত্য এবং শিল্পের কাছে মানুষের চাহিদা। যেমন প্রাচীন কবিরা কিন্তু ছন্দের উত্তম ব্যবহার করেছেন বলে কবি নন। তাঁরা সমাজের কথা বলতেন, সেই জন্যে কবি। মহাকাব্যগুলো তো সেভাবেই তৈরি হয়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি – সবই তো কবিতা। কিন্তু সেগুলো একেকটা জাতির অলিখিত ইতিহাস। সেইখানেই মহাকাব্যের মহত্ত্ব। সুতরাং শিল্পের জনপ্রিয় হওয়া বা শিল্পীর লক্ষ্মীলাভ মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু আমাদের সময়ে আমরা ব্যাপারটাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছি কেন?

কারণ পুঁজিবাদ যে কোনো জিনিসকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসাবে দেখে। শার্ল বোদলেয়ার বা জীবনানন্দ দাশ তার কাছে স্রেফ বিক্রয়যোগ্য বস্তু। সেইজন্যেই পুঁজিবাদ মনে করে যে আরও বিক্রি করতে গেলে শুধু জীবনানন্দের কবিতা বিক্রি করলে চলবে না। তাঁকে star বানাতে হবে। যেমন পাবলো পিকাসো বলতেন যে লোকে আমার ছবি নিয়ে মাথা ঘামায় না, অথচ আমি যে চুল কাটতে ভয় পাই সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। উনি কিন্তু সত্যিই চুল কাটার ব্যাপারে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন। মনে করতেন চুলের মধ্যেই ওঁর প্রতিভা রয়েছে। ফলে ওই টাক মাথায় যে কটা চুল আছে সেগুলো কাটতেও খুব গাঁইগুঁই করতেন। এখন বুর্জোয়া প্রচারযন্ত্র ওই কুসংস্কারটারই বিপুল প্রচার করত। মানে ওটাকেও বিক্রি করা হত। জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও দেখবে একই ব্যাপার হয়। তিনি কোনো আত্মীয়ার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন কিনা আসলে তো তা দিয়ে কিছু এসে যায় না, তিনি তো মহান তাঁর কবিতার জন্য। বিশেষ করে সাতটি তারার তিমির থেকে তিনি যখন পাল্টে গেলেন, কলকাতার জরায়ু এবং দুর্গত মানুষের কথা লিখতে শুরু করলেন, সেগুলো নিয়ে লোকে তত কথা বলে না। বেশি কথা হয় বনলতা সেন আসলে কে – এই নিয়ে। শিল্পের বনলতা সেন যে আসলে কোনো বাস্তব রমণী নন, ওই কল্পনার পিছনে কোন মহিলা ছিলেন তা নিয়ে ভেবে যে লাভ নেই – একথা পুঁজিবাদ তোমাকে ভুলিয়ে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গানের মালবিকা, মালিনী বা নলিনীদের নিয়েও এমনই করা হয়। ওই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে বড়জোর কোনো নির্দিষ্ট মহিলাকে চিহ্নিত করা যেতে পারে। তাতে এটুকুই প্রমাণিত হবে যে রবীন্দ্রনাথ ভালবাসতে জানতেন। সে আর বেশি কথা কী? ভালবাসতে না জানলে ওরকম কবিতা লেখা যায়? কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্য নিয়ে না ভেবে তিনি কবে কোন বিদেশিনী সম্পর্কে কতটা আগ্রহী হয়েছিলেন এবং সেই আগ্রহে কতটা যৌন ইশারা ছিল তা নিয়ে আমরা যত গবেষণা করি, তাঁর লেখা নিয়ে তত মাথা ঘামানো হয় না। এইটাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্প, সাহিত্য জনপ্রিয় হওয়ার বিপদ।

কিন্তু উল্টোটাও তো করা হয়। যেমন বিশেষ করে বামপন্থীরা, শিল্পের রাজনৈতিক দিকটা পছন্দ না হলেই সেটাকে অবজ্ঞা করতে চান।

সেটাও নিঃসন্দেহে আরেক ধরনের ভ্রান্তি। ধরো, ফ্রান্সে রোম্যান্টিসিজমের জনক থিওফিল গোতিয়ে বলেছিলেন যে একজন নগ্ন রূপসী বা রাফায়েলের একটা আসল পেন্টিং দেখতে পাওয়া গেলে আমি আমার ফরাসি নাগরিক অধিকারও ছেড়ে দিতে রাজি আছি। এটাকেই কলাকৈবল্যবাদ বা art for art’s sake বলে। সাধারণ মার্কসবাদীরা এই মনোভাবকে কিন্তু প্রবল আক্রমণ করবেন। বলবেন, সে কী! ফরাসি নাগরিক আদর্শ – সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা – তার অধিকার তো আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অধিকার! যে শিল্পী একজন নগ্ন সুন্দরী বা রাফায়েলের আঁকা ছবি দেখার জন্যে এটাকে বর্জন করার কথা বলে, সে তো প্রতিক্রিয়াশীল! কিন্তু রুশ দেশে মার্কসবাদের যিনি বিরাট এক স্তম্ভ, যাঁর কথা আমরা ভুলে গেছি, এমনকি বিপ্লবের পর যিনি মেনশেভিক হওয়া সত্ত্বেও লেনিন বলেছিলেন যে ওঁর প্রতি যেন অন্যায় ব্যবহার না হয়, সেই জর্জি প্লেখানভ আর্ট অ্যান্ড সোশাল লাইফ (১৯১২) বইতে দেখিয়েছিলেন যে এটাই শিল্পীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যখন সর্বস্ব যায় বস্তুকামী ঘৃধ্নুতায় নানাবিধ কাজে, তখন এই সৌন্দর্য চর্চাই বিপ্লব। বঙ্কিমচন্দ্র যখন দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাসে আয়েষার মুখে বসালেন ‘বন্দী আমার প্রাণেশ্বর’, সেটা স্রেফ একটা রোম্যান্টিক উক্তি নয়। সেটা আমাদের দেশে নারী স্বাধীনতার প্রথম উচ্চারণ।

যে শিল্পীর গান কেউ শোনে না সে-ই কি সবচেয়ে বড় শিল্পী? ওটা একেবারেই ভুল চিন্তা পদ্ধতি। আসলে ঋত্বিকও কিন্তু চাইতেন লোকে তাঁর ছবি দেখুক। দেখে না বলে যথেষ্ট কষ্টও পেতেন।

আসলে আমার মনে হয় আমাদের মার্কসবাদী চিন্তানায়করা, বিশেষত বাঙালিরা, অকল্পনীয় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পের ব্যাখ্যায়। নিজেদের সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন এবং কেবল ঘটনার বিবরণ দিয়ে গেছেন। স্বয়ং কার্ল মার্কস লিখেছেন যে উইলিয়ম শেক্সপিয়র ষোড়শ শতকের অন্যান্য সমাজতাত্ত্বিকদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হ্যামলেট নাটকটা মার্কসের বিশেষ পছন্দ ছিল। গোটা দাস কাপিটাল জুড়ে শেক্সপিয়র ভজনা রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে মার্কসের দেখার মধ্যে বিশালতা রয়েছে। আর আমাদের এখানকার মার্কসবাদীদের দেখা অত্যন্ত সংকীর্ণ দেখা। এই মুহূর্তের কর্পোরেট পুঁজিবাদও এই দেখাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। তাই মধুসূদন দত্ত আর সুবল দত্তের মধ্যে তফাত করা হচ্ছে না।

এখান থেকে একটা অনিবার্য সমসাময়িক প্রশ্ন এসে পড়ে। আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বাধীনতার পর থেকে জওহরলাল নেহরুর মডেলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্প সৃষ্টির যে ধারা ভারতে ছিল সেটা দ্রুত তুলে দেওয়া হচ্ছে। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ তুলে দেওয়া হচ্ছে, ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের মত সংস্থাগুলোর প্রযোজনায় ছবি আর আমাদের চোখে পড়ে না। কিন্তু এর বিপরীতে অন্য এক ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেখছি। সেটা হল, তুমি সরকারি দলের হয়ে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানাও, খোদ প্রধানমন্ত্রী তোমার ফিল্মের প্রোমোশন করবেন। কাশ্মীর ফাইলস, কেরালা ফাইলস, সবরমতী এক্সপ্রেস – এরকম প্রচুর ছবি হচ্ছে। এর মধ্যেও যাঁরা কোনোভাবে সরকারের বা সংখ্যাগুরুর অপছন্দের ছবি করতে যাচ্ছেন তাঁদের হাতে এবং ভাতে মারা হচ্ছে। ধরুন, সঞ্জয় লীলা বনশালির সেট ভাংচুর করা হয়েছিল পদ্মাবত ছবির শুটিংয়ের সময়ে। আবার নেটফ্লিক্স দিবাকর ব্যানার্জির তীস ছবিটা করাল, কিন্তু ঝামেলা হতে পারে এই আশঙ্কায় মুক্তি পেতে দিল না। এরকম একটা পরিবেশে ঋত্বিকের মত করে ছবি করা কি সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়? মানে ছবিটা না হয় ঘটিবাটি বেচে বানালাম। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তাটুকু তো থাকতে হবে? আবার ধরুন, কলকাতার ইন্ডাস্ট্রিতে আমরা দেখছি যে নির্দেশকরা একজোট হয়ে বলছেন – শাসক দলের খবরদারি, তোলাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছবি করাই ঝকমারি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এইরকম পরিস্থিতিতে কি ঋত্বিকের পক্ষেও তখনকার মত ঋজু থেকে ছবি করা সম্ভব হত বলে আপনার মনে হয়?

খুবই কঠিন হত। কারণ একজন কবি বা ঔপন্যাসিক বা চিত্রশিল্পী এই যুগেও কাগজ, কলম, তুলি বা কম্পিউটার কিনে নিজের মর্জি মত শিল্প সৃষ্টি করে যেতে পারেন। কিন্তু সিনেমা তো ওভাবে করা যায় না, সিনেমা করতে আরও অনেককিছুর সঙ্গে কয়েক কোটি টাকাও লাগে। এই পরিস্থিতিতে সেই ক্ষতিস্বীকার করতে যাবে কে? ফলে ঋত্বিকের মত করে এই যুগে ছবি করা সত্যিই খুব শক্ত হত এবং সেই লড়াইটা শেষপর্যন্ত হয়ত রাজনৈতিক সংগ্রামে পর্যবসিত হত।

এই প্রশ্নটা শুনে আমার মনে পড়ে গেল ঋত্বিক শেষ যে ছবিটা করতে চেয়েছিলেন সেইটার কথা। সেটা আশ্চর্যভাবে আর জি করের ঘটনাটার সঙ্গে মিলে যায়। আর জি করের নৃশংস ঘটনার পরে যে জনরোষ আমরা দেখলাম তা নিয়ে কোনোদিন কোনো ছবি-টবি হবে কিনা আমার খুব সন্দেহ আছে, তার কারণ তুমি যা বললে। তো ঋত্বিকের শেষ কাজ ছিল সেই বিষ্ণুপ্রিয়া নামে একটা চিত্রনাট্য। সেটা কী ব্যাপার? না জরুরি অবস্থা চলাকালীন নবদ্বীপ শহরে একটি মেয়ের অগ্নিদগ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিস যথারীতি প্রথমে ওটাকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল, পরে দেখা যায়, একেবারে জ্যামিতির উপপাদ্যের মতই, আসলে নবদ্বীপের কিছু দুষ্কৃতী মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। এই খবর কানে যাওয়ার পরেই ঋত্বিক ওই চিত্রনাট্য লিখে ফেলেন। তাতে একটা গান ছিল, যার বক্তব্য হল – যিনি ত্রেতায় সীতা, দ্বাপরে দ্রৌপদী, তিনিই এখন বিষ্ণুপ্রিয়া। নবদ্বীপে একটি মেয়ের ধর্ষণ এবং হত্যার কথা শুনেই ওঁর চৈতন্যদেবের স্ত্রী বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা মাথায় আসে।

ঋত্বিক শেষ যে ছবিটা করতে চেয়েছিলেন তার অনুপ্রেরণা জরুরি অবস্থা চলাকালীন নবদ্বীপের যে ঘটনাটা, সেটা আশ্চর্যভাবে আর জি করের ঘটনাটার সঙ্গে মিলে যায়।

বুঝতেই পারছ ছবিটা কী দাঁড়াত। কিন্তু ও জিনিস কি আদৌ করতে দেওয়া হত? কে ফান্ডিং করত? রাষ্ট্র তো করত না, কারণ রাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়েই ছবিটা। আর আজ যা অবস্থা, তাতে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা করতে চাইলেও তাকে হাজারবার ভাবতে হবে যে অন্য কাজ কারবারের জন্যে তাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতেই হবে। রাষ্ট্র সরাসরি বারণ করে দিলে তো আর সম্ভবই নয়। যেমন নাজি জার্মানিতে ব্রেশটের পক্ষে নাটক করা সম্ভব ছিল না। একসময় পর্যন্ত পেরেছিলেন। তারপর আর করা যায়নি। করলেও এমনভাবে করতে হয় যে শাসক যেন ধরতেই না পারে কী করা হল। যেমন জঁ পল সার্ত্র লিখেছিলেন আই অ্যাম মাই ওন ফ্রিডম । ফ্যাসিবাদীরা বুঝতেই পারেনি যে ওতে গ্রীক পুরাণের আশ্রয়ে যা বলা আছে তা আসলে নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে একটা বয়ান। তারপর নাজিরা প্যারিস দখল করার ঠিক আগেই জঁ রেনোয়া ল্য রেগলে দ্য জু (১৯৩৯) বলে যে ছবিটা করেন, সেই ছবি দেখলে কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে বড়লোকরা এ ওর বউয়ের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, সে তার বউয়ের সঙ্গে পরকীয়া করছে – এইসব নিয়েই ছবি। অনেকটা আজকাল বড় কাগজের প্রকাশ করা শারদ পত্রিকায় যেসব গল্প, উপন্যাস ছাপা হয় সেগুলোর বাঁধা বিষয়বস্তুর মত। ওগুলো শুধু যে অরাজনৈতিক তা নয়, ওগুলো আসলে মানুষকে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখা। কিন্তু বড় শিল্পী ওর মধ্যেও অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিতে পারেন। রেনোয়াঁ তাই করেছিলেন।

রেনোয়া

ব্রেশটও করেছেন। তাঁর নাটকে অনেক রগরগে শব্দ আছে, অনেক জনপ্রিয় থিম আছে। কিন্তু তার মধ্যে দিয়েই তিনি অন্য বয়ান উপস্থাপন করেন। এমনকি শেক্সপিয়রও এটা করেছেন। প্রোটেস্ট্যান্ট রানি এলিজাবেথের আমলে রোমান ক্যাথলিক শেক্সপিয়র তাঁর নাটকে যা সব নাশকতামূলক কাণ্ড করেছেন তা দেখে আজও অবাক হতে হয়।

কিন্তু আজকের অবস্থা যে খুব জটিল তা মানতেই হবে। ইরানে আব্বাস কিয়ারোস্তামি বা মোহসেন মাখমলবফকে তো অনেকটাই প্রবাসে কাজ করতে হয়েছে, জাফর পানাহিকে বারবার কারাবাস করতে হয়েছে। ফলে এখানকার শিল্পীরা আজ কী করে কী করবেন তা তাঁদেরই ঠিক করতে হবে। এর কোনো বাঁধা ফর্মুলা নেই।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হল, আমাদের শিল্পীদের চিন্তা করার অভ্যাস চলে গেছে। তাঁরা শিল্পকে স্রেফ পেশা হিসাবে দেখছেন। যে কোনো পেশাতেই যেমন আয়কর দিতে হয়, এটা ওটা নিয়ম মানতে হয়, সেসব মেনেই তাঁরা চলছেন। ফলে ওইসব প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি হচ্ছে। সেগুলোতে চিত্রভাষা বা আঙ্গিকের দিক থেকেও কোনো বলার মত জিনিস নেই।

যদি বাংলা সিনেমার আলোচনা করি, তাহলে দেখব যে বাংলা ছবি দীর্ঘকাল ধরে দর্শককে কিছুই দিতে পারছে না। একেবারে সাধারণ দর্শক যা চায় সেটুকু দেওয়ার কথাই বলছি। কিন্তু লোকে তাই নিয়েই চলছে। পিটুলি গোলা খেয়ে ভাবছে পায়েস খাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে আমি জানি না। তবে ক্রমশই আমার মনে হচ্ছে যে এই সাংস্কৃতিক সমস্যা আসলে একটা রাজনৈতিক সমাধান দাবি করে। এখন সেটা দলীয় রাজনীতি দিতে পারবে কিনা তা আমি বলতে পারব না। আজকের বাংলায় তো এমন কোনো রাজনৈতিক দল দেখি না যারা এককভাবে অথবা একাধিক দল মিলে একটা সাংস্কৃতিক রূপান্তর ঘটাতে পারবে। ফলে এই নরকযাত্রা থামিয়ে আমরা কীভাবে আবার রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের উত্তরাধিকার ফের অর্জন করতে পারব তা আমি সত্যিই জানি না।

ঋত্বিক, সলিলের শতবর্ষে আপনি কি তাহলে বাঙালি সংস্কৃতির জন্যে কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না?

দেখো, ঋত্বিকের একটা অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লবের ধারণা ছিল। কোমল গান্ধার ছবিতে দেখবে অনসূয়া ভৃগুকে একটা ডায়রি দেয়। ওটা তো আসলে রূপক। তখন পি সি যোশীর আমল। ভাবা হয়েছিল যে অসমাপ্ত জাতীয় বিপ্লব সমাপ্ত করার দায়িত্ব ইতিহাস নিয়তির মত এসে কমিউনিস্ট পার্টিকে দেবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। সলিল ভেবেছিলেন তিনি প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মিলন ঘটিয়ে ভারতীয় সঙ্গীতের যে আধুনিকীকরণ করছিলেন তা ক্রমশ এগিয়ে যাবে। গানকে ক্রমশ সরল হতে হবে, গানকে মানুষের হাতে তুলে দিতে হবে। এই ধারণাটা গুপি গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯) ছবিতেও সেই রাজসভায় গানের দৃশ্যে পাওয়া যায়। কালোয়াতি গান শুনে রাজা ঘুমিয়ে পড়ছিল। তখন গুপি আর বাঘা, দুটো চাষাভুষো মার্কা লোক, এসে এমন গান গাইল যার ‘ভাষা এমন কথা বলে/বোঝে রে সকলে’। বিজন ভট্টাচার্য, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত অথবা মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় – এঁরা সেই উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণের দিকপালদের স্তরের ছিলেন কিনা সেই আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। কিন্তু এই দ্বিতীয় নবজাগরণের একেবারে হাসিম শেখ, রামা কৈবর্তের কাছে পৌঁছবার চেষ্টা ছিল। ইতিহাসকে তলা থেকে লেখার একটা প্রয়াস ছিল। সে প্রয়াস তো বিফল হয়েছে। এখন আর কীভাবে তা করা যাবে আমি জানি না। কিন্তু সলিল আর ঋত্বিকের শতবর্ষে তাঁদের কাজকে ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে বিচার করলে কিছু সুবিধা হতে পারে। এঁরা কত দক্ষ শিল্পী তা নিয়ে ভেবে খুব একটা উপকার হবে না বলেই আমার মনে হয়।

কথা বলেছেন: প্রতীক

প্রথম অংশ
দ্বিতীয় অংশ

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.