বিদ্যাভূষণ রাওয়াত
উত্তরপ্রদেশের সম্ভলে সম্প্রতি যে কাণ্ড ঘটেছে তা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার। গুজব ছড়ানো বন্ধ করা এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি রোধ করা উত্তরপ্রদেশ সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন আদালতে একের পর জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে, সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তৈরি করে পরিবেশ অশান্ত করার যে ধারা চালু হয়েছে – এ প্রসঙ্গে সেই প্রবণতা নিয়ে কথা বলাও জরুরি। কী করে কোনো স্থানীয় আদালত এককথায় একটা মসজিদ (এক্ষেত্রে জামা মসজিদ) বা মন্দিরে সার্ভে করার অনুমতি দিয়ে দেয়? এর মানে দাঁড়ায় – যে কেউ আদালতে গিয়ে যে কোনো মসজিদ বা অন্য ধর্মস্থান নিয়ে মামলা দায়ের করে দাবি করতে পারে যে ওর নিচে একটা মন্দির ছিল। স্থানীয় আদালতগুলো যেন বসেই আছে ওরকম আবেদনে সাড়া দেওয়ার জন্যে।
এ জিনিস আজ সম্ভব হচ্ছে অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে এক বিরাট ফাঁকের কারণে। পাঁচ বিচারপতি নিজেদের রায়েই স্বীকার করেছিলেন যে রায় দেওয়া হচ্ছে মোটের উপর শান্তিপূর্ণ সমাধান করে দিতে, কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা নির্ধারণ করতে নয়। ওটা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের আবেগের প্রশ্ন, যা বহুকাল ধরে ঝুলে আছে, তাই আদালত এমন একটা রায় দিয়েছিল যাতে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার নিন্দা করা হয়েছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ওই রায়ের সমস্যা হল, পাঁচজনের একজনও একথা লেখেননি যে তিনি ওই রায় লিখেছেন ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য গড়ে তোলার জন্যে। আমরা জানি যে আদালত কেবল আইনের কথা বলে না, দ্বন্দ্ব মেটাতে শান্তিস্থাপনকারীর কাজও করে থাকে। ওই রায় দেওয়ার সময়ে কিন্তু দেশের সংসদে পাস হওয়া প্লেসেজ অফ ওয়রশিপ অ্যাক্ট, ১৯৯১ (ধর্মস্থান সংক্রান্ত আইন) ছিল। সরকার সেই আইন বাতিল করতে চাইলে নতুন আইন আনতে পারে অথবা যে আইন রয়েছে সেই আইন মেনে চলতে পারে। কিন্তু যাকে তাকে আদালতে সার্ভে পিটিশন দাখিল করে গোটা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার বিপন্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে – এ কেমন কথা?
বস্তুত, সম্ভলের ঘটনাকে একটা সতর্কবাণী হিসাবে দেখা উচিত। এই ঘটনা মনে করিয়ে দিল যে আইনশৃঙ্খলার রক্ষা কেবল স্থানীয় পুলিসবাহিনীর দায়িত্ব নয়। তারা ক্রমাগত চাপে থাকে, কারণ তাদের উপরতলার আদেশ পালন করে চলতে হয়। সুতরাং এই ধরনের ঘটনা আবার ঘটা আটকাতে গেলে প্রশাসনের রাজনৈতিক অংশকেই সাবধান হতে হবে। আমরা অবশ্য জানি যে আজকাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এইরকম ঘটনা উপভোগ করে, কারণ এগুলো তাদের নিজেদের সংকট থেকে উদ্ধার পেতে সাহায্য করে। এগুলো আসলে সাধারণ মানুষকে সংকটে রাখার কায়দা। সুতরাং দেশের সুপ্রিম কোর্টকেই এক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে। সুয়ো মোতো ভিত্তিতে এই ঘটনার বিচার করা হোক এবং এই ধরনের অর্থহীন পিটিশনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্পর্কে নিম্ন আদালতগুলোর জন্যে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিয়মাবলী তৈরি করে দেওয়া হোক।
আমরা এমন এক ভয়ানক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যখন শাসক দল এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে এক চুল বিব্রত হয় না। কী করে নির্বাচন করাতে হয় সেই কৌশল তারা শিখে গেছে এবং সারাক্ষণ নির্বাচনী মেজাজেই থাকে। ফলে শাসনব্যবস্থার সংকট তৈরি হয়। সুতরাং আশা করি সুপ্রিম কোর্ট এমন ব্যবস্থা করবে যাতে নিম্ন আদালত এই ধরনের মামলাকে পাত্তা না দেয় এবং নিম্ন আদালতের বিচারপতিরা বুঝতে পারেন তাঁদের ক্ষমতার সীমা কতটুকু।
আরো পড়ুন যে সরকার সংবিধানের আত্মার বিরুদ্ধে যায়, তার বিরুদ্ধে বলবই: মল্লিকা
গতকাল ছিল সংবিধান দিবস। এই সময়ে স্মরণ করা প্রয়োজন যে সাংবিধানিক নীতিবোধ নিয়ে চলাই এক্ষেত্রে একমাত্র পথ। বাবাসাহেব আম্বেদকর সংবিধান সভায় যে সাবধানবাণী শুনিয়েছিলেন তা আজ আমাদের ফের গুরুত্ব দিয়ে শোনা প্রয়োজন। মনে রাখা ভাল, যে ভারত বিশ্বগুরু হয়ে উঠতে পারবে না, যদি রোজ এ দেশের যেখানে সেখানে রাস্তাঘাটে মারামারি হতে থাকে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে এসব বন্ধ করতেই হবে।
সম্ভল জামা মসজিদ সার্ভের আবেদন আমাদের মনে করিয়ে দিল যে রাজনৈতিক এবং বিচারবিভাগীয় অবহেলায় ধর্মীয় মেরুকরণ সম্পন্ন হয়। ১৯৯১ সালের ধর্মস্থান সংক্রান্ত আইন থাকা সত্ত্বেও নিম্ন আদালতগুলো এই ধরনের পিটিশনে সাড়া দিয়ে আসলে সাংবিধানিক নীতিগুলোরই অবমাননা করছে। সংবিধান নির্ধারিত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের পাশে দাঁড়ানোর এটাই উপযুক্ত সময়।
ইনিউজরুমে প্রকাশিত মূল প্রবন্ধ থেকে অনূদিত
নিবন্ধকার একজন সমাজকর্মী। এই মুহূর্তে হিমালয় ও ভারতের সমভূমির উপর গঙ্গা ও তার শাখানদীগুলোর প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







