শ্রীমু

মধ্য শব্দটা বেশ গোলমেলে। এর নজর সতত ঊর্ধ্বমুখী কিন্তু পিছুটান থাকে। উদাহরণস্বরূপ মধ্যবিত্ত ও মধ্যমেধা শব্দ দুটো ভাবা যেতে পারে। সিনেমায় মধ্যপন্থার ব্যাপারটাও সেরকম। এই ধরনের ছবির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মহৎ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিধেয় শরীরটায় গতানুগতিকতার ছাপ স্পষ্ট, বাণিজ্যিক নির্মিতির প্রকরণে দুষ্ট। দেবাশিস মাখিজা তাঁর চার নম্বর পূর্ণ দৈর্ঘ্যের কাহিনিচিত্রের ক্ষেত্রে এই মধ্যপন্থাকেই বেছে নিয়েছেন। এ বিষয়ে অবশ্য কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন যে তিনি প্রথম থেকেই চেয়েছিলেন জোরাম প্রতিধ্বনি কক্ষ বা ইকো চেম্বার পেরিয়ে অনেক বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছক। তাঁর ছবির রাজনীতিকে এক্ষেত্রে তিনি নিজের রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে চান না। এ ছবির অভিপ্রায় সাধারণ দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের সেতুবন্ধন, কোনো নান্দনিকতার ঘেরাটোপে নিজেকে বেঁধে ফেলা নয়। তিনি আরও এক কদম এগিয়ে বলেছেন, জোরাম ছবিটা বানানোর মাধ্যমে নিজের আর্ট হাউস ছবি করিয়ের তকমা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। দেবাশিসের আগের ছবিগুলো যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন, তাঁর ছবিতে প্রান্তিক জনজীবনের মলিন প্রাত্যহিকতা, অভাব, বঞ্চনা, বৈষম্য, অধিকার – এই বিষয়গুলো ফিরে ফিরে আসে। তাঁর চরিত্ররা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হেরে যাওয়া, বিতাড়িত মানুষজন, যারা বেঁচে থেকে মরে যেতে যেতে অকস্মাৎ নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বা দাঁড়াতে বাধ্য হয়। ক্রোধ দেবাশিসের ছবির চালিকাশক্তি, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিহিংসামূলক থ্রিলারের অবয়ব ধারণ করে। জোরাম ছবিটার কাহিনি ঠিক এরকমই একটা সন্ধিক্ষণে অবস্থিত।

ঝাড়খণ্ডের কোনো এক তফসিলি উপজাতি গ্রামের যুগল দাসরু (মনোজ বাজপেয়ী) ও ভানোর (তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জি) জীবন ভালই কাটছিল শুরুতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আমরা দেখি পাঁচবছর পেরিয়ে তারা নতুন পরিচয়ে মুম্বাইয়ের এক বহুতল নির্মাণক্ষেত্রেশর জনমজুর। নিবাস এক ঘুপচি ঘরে, সঙ্গী মাস তিনেকের একরত্তি মেয়ে জোরাম। অকস্মাৎ তাদের দেখা হয় আদিবাসী নেত্রী ও বিধায়ক ফুলো কার্মার (স্মিতা তাম্বে) সঙ্গে। অনভিপ্রেত এই সাক্ষাৎ। এর জের আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাই, যখন দাসরু ঘরে ফিরে দেখে ভানোকে খুন করে উল্টে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতর্কিতে তার উপরেও নেমে আসে আততায়ীর থাবা। দাসরু বাধ্য হয় প্রত্যঘাত করতে, তারপর ভানোর শাড়ির সাহায্যে বুকে পেঁচিয়ে নেয় জোরামকে। পালাতে থাকে সে। তার পিছু নেয় পুলিশ অফিসার রত্নাকর (মহম্মদ জীশান আইয়ুব) ও তার মহিলা-পুরুষ সংবলিত পুলিসবাহিনী।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শুরু হয় পরিচিত ইঁদুর দৌড়ের আখ্যান যা আমাদের টেনে নিয়ে যায় ঝাড়খণ্ডের গ্রামে এক পরিচিত অমোঘ নাটকীয় পরিণতির দিকে। পলায়নপর দাসরু, বুকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখা জোরাম এবং তার পেছনে কর্মক্লান্ত রত্নাকর, যার কাছে ক্রমশ ঠিক-বেঠিক, আইন-বেআইনির সংজ্ঞাগুলো গুলিয়ে যেতে থাকে। এরই মধ্যে টুকরো টুকরো ফ্ল্যাশব্যাকে আমরা দেখতে ও জানতে পারি অতীতের ছবিকথা। দাসরু, ভানো আর ফুলো কার্মা একই গাঁয়ের মানুষ। গ্রামের সর্বপ্রথম আদিবাসী বিধায়ক বাবুলাল কার্মার ছেলে মাধভি পড়শিদের জমি কম দামে বেচে দেওয়ার তাল করছিল কোম্পানির প্রকল্পে। তা বন্ধ করতে মাওবাদীরা তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়। গ্রামের সবার সামনে মাধভিকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেরেক বের করা কাঠের তক্তা দিয়ে নৃশংসভাবে খুন করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয় বিশ্বাসঘাতকের শাস্তির স্বরূপ। এই পুরো ঘটনার নীরব সাক্ষী মাধভির মা ফুলো। তার নজর এড়ায় না মুখে গামছা বেঁধে কারা সেদিন তার সন্তানের নিধন সম্পন্ন করতে সাহায্য করেছিল।

এই ঘটনার পরেই দাসরু আর ভানো এক কাকভোরে গ্রাম ছেড়ে পালায়। কারণ দাসরু বুঝতে পারে, সম্মতি না থাকলেও, তাকে প্রাণের তাগিদে মাওবাদীদের সঙ্গ দিয়ে যেতে হবে। সে গ্রাম নয়, বন্দুক থেকে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা আর হয় না। পাঁচবছর পরে মুম্বাইতে এক ঝলক দেখে ফুলো ঠিক তাদের চিনে ফেলে। এখন আর তিনি বাবুলালের ঘরণী নন, অঞ্চলের ডাকসাইটে বিধায়ক, আদিবাসী প্রগতির স্বনামধন্যা নেত্রী, প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলতে থাকা এক অসুরানী। তিনি পুরো ছবি জুড়ে এক পরিশীলিত খলনায়িকার কঠোর নির্লিপ্তি ভরা মুখ নিয়ে তাঁর ছায়াসঙ্গিনী বিদেশির মাধ্যমে দাসরুকে খতম করার আঁক কষে যান। ‘ইয়ে মাওবাদী হামকো ডেড চাহিয়ে এলাইভ নহি।’ কিন্তু রাখে দেবাশিস মারে কে! দাসরু ছলে বলে কৌশলে পালাতে থাকে। অতএব ছবি রুদ্ধশ্বাসে এগিয়ে চলে।

আরো পড়ুন দহাড়: চিৎকার কর মেয়ে, দেখ কতদূর গলা যায়

দাসরু এখন লালমাটি এক্সপ্রেসে উঠে ঝাড়খণ্ডের দিকে ধাবমান। ওদিকে পুলিস প্রত্যেক কামরায় চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে। ছবির এই দৃশ্যের প্রয়োগশৈলী অনবদ্য। টুকরো টুকরো শট, অস্থির ক্লোজ আপ, অতি সীমিত পরিসরে ক্যামেরার অনায়াস চলন, দাসরুর নির্বাক ভয়ার্ত চাহনি, শারীরিক ক্ষিপ্রতা, শটের দৈর্ঘ্যকে বাড়িয়ে কমিয়ে দৃশ্যটাকে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যেভাবে এক রোমাঞ্চকর পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা এককথায় অনবদ্য। নির্দেশনা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, অভিনয়ের এক তুরীয় মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। বাংলার ‘আমাকে আমার মত থাকতে দাও’ পরিচালকদের জন্য শিক্ষণীয়, বিশেষত দেবাশিস ও সম্পাদক অভ্র – দুজনেই যখন অধুনা প্রবাসী হলেও আদতে কলকাতা নিবাসী।

ছবির এর পরের অঙ্ক পুরোটাই ঝাড়খণ্ডে দৃশ্যায়িত, যেখানে পুলিসের কর্মকাণ্ড নিতান্তই প্রহসনমূলক। থানার মহিলা কয়েদি গৃহে নাবালক আদিবাসীদের আটকে রাখা হয় আর পুরুষ কয়েদিদের থাকার জায়গা দারোগার দফতরে পর্যবসিত। এখানে শাসন আর শোষণ এ পিঠ আর ও পিঠ, যার জেরে প্রজার জীবন ওষ্ঠাগত। তাদের জলের দরে জমি বেচে, চাষাবাদ বন্ধ করে উন্নয়নের দক্ষযজ্ঞে আহুতি দিতে হয় অথবা সরকার ও মাওবাদী – এই দুয়ের সঙ্গে আপোস করে ছেঁড়া ঘুড়ির মত লটকে থাকা ছাড়া আর কিছুই করণীয় নেই। এখানে তাই দাসরুর পরিত্রাণ নেই। তাকে ক্ষুদে জোরামকে নিয়ে আরও দূরে কোথাও চলে যেতে হবে। কিন্তু সেই নিরুদ্দেশের ঠিকানা তার, দেবাশিস অথবা আমাদের জানা নেই। ফলে যবনিকা পতন। এর আগে অবশ্য একটা মারকাটারি ক্লাইম্যাক্স – খাদান বরাবর দাসরুর পালানো উপর্যুপরি গুলিবর্ষণের মধ্যে দিয়ে, নিয়তির হাতে ফুলো কার্মার সমর্পণ আর রত্নাকরের শেষ রাতে বাজিমাত করার বিফল চেষ্টা।

এত নাটকীয় ধাপ পেরিয়ে এসে একথা অনস্বীকার্য যে জোরাম ছবিটা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলার নেই। প্রত্যেক সমালোচককেই তাই বড় পরিসরে গল্প ফেঁদে জায়গা ভরাতে হয়েছে। বিদেশি সমালোচকরা নিজেদের নান্দনিকতা প্রকাশের তাগিদে মাঝেমধ্যে অমুক জায়গাটা ব্রেসোঁর মত, তমুক দৃশ্যটা কায়রো স্টেশন-এর কথা মনে পড়িয়ে দেয় অথবা দাসরু যেন ফ্রিৎজ ল্যাঙের এম থেকে উঠে আসা এক উদ্বাস্তু – এইসব বলে নিজেদের প্রবোধ দিয়েছেন।

জোরাম বিদেশে বেশকিছু প্রথম সারির চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত, এদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং সর্বত্র উচ্চপ্রশংসিত। সত্যি কথা বলতে কাহিনিবিন্যাস ও প্রকরণশৈলীতে এই ছবিটি ক+ পাবে, পরিচালকের মুনশিয়ানার ছাপ আজি ও ভোঁসলেকে ছাপিয়ে এই ছবিতে আরও সংহত ও সুস্পষ্ট। কিন্তু চলচ্চিত্রমোদীরা জানেন যে সিনেমা বস্তুত দুরকম। এক ধরনের ছবি আপনাকে তাৎক্ষণিক বিনোদন জোগাবে, থ্রিলারধর্মী হলে শিরায় শিরায় রক্ত চলাচলের মাত্রা বাড়াবে। তার ঢেউয়ের দোলায় আপনি এই হাসবেন তো ওই কাঁদবেন, কখনো বা রাগে ফেটে পড়বেন। কিন্তু ছবি শেষ হওয়ার দু ঘন্টা বা বড়জোর দুদিন পরে ছবির বেশিরভাগ মুহূর্তই ভুলে যাবেন। শুধু মনে থাকবে ছবিটা ভাল লেগেছিল। দ্বিতীয় রকমের ছবিগুলো দেখার সময়ে আপনি ধীরে ধীরে এমনভাবে তার পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাবেন যে ভাল কতটা লাগছে তা বুঝতে বুঝতে দেখবেন ছবিটা শেষ হয়ে গেছে। তারপর সারাজীবন টুকরো টুকরো কিছু দৃশ্য বা মুহূর্ত আপনি বয়ে বেড়াবেন স্মৃতিতে ও মননে।

জোরাম হল প্রথম গোত্রের ছবি। এতে এমন কিছু নেই যা আপনি গত কয়েকবছরে খবরের কাগজে পড়েননি অথবা সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে দেখেননি। প্রত্যেক মুহূর্তে আপনি আঁচ করতে পারবেন এরপরে কী হতে চলেছে। এমনকি শেষ দৃশ্যটাও। পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি এখানে এক শহুরে দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের। তাঁর ক্রোধ এবং বিষয়ের সঙ্গে একাত্মতা ঠিক আমাদের মতই প্রাত্যহিক অন্যায় ও বঞ্চনার খবর পড়ে স্ফুলিঙ্গের মত মাথাচাড়া দিয়ে আবার একরাশ নৈরাশ্যে মিলিয়ে যায়। জোরাম একটা অত্যন্ত জরুরি ছবি হয়েও শেষ পর্যন্ত একটা মনে রাখার মত ছবি হয়ে ওঠে না, তার কারণ দেবাশিস এই মধ্যপন্থার সিনেমার মাধ্যমে অনেক লোকের কাছে পৌঁছতে চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ছবিটা কীভাবে তাদের ভিতরে প্রবেশ করবে তা নিয়ে বোধহয় তেমন ভাবেননি। আসলে মধ্যপন্থার সিনেমা হলেও হতে পারে, কিন্তু সিনেমার কোনো মধ্যপন্থা নেই। তাকে সারাক্ষণই চরমপন্থার সন্ধান করে যেতে হয়। তবেই না এ ধরনের সিনেমা জনতার হাতে হাতে নিশানের মত ঘুরবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.