লতা মঙ্গেশকর চলে গেলেন। পরিণত বয়সেই। শেষ প্লে-ব্যাক করেছেন তা-ও বছর পনেরো পার হয়ে গেছে। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, তত তাঁর অমোঘতা ছেয়ে ফেলেছিল আমাদের। এই অপাপবিদ্ধ কণ্ঠ যেন কালে কালে হয়ে উঠেছে আসমুদ্রহিমাচলের পরম এক স্বর।

সংগীতের দুস্তর পথে তাঁর জীবনভর অভিযান। গানের যে নিজস্ব ভাষা, সেই ভাষা আহরণে, নব নব ভাষার উদ্ভাবন ও প্রয়োগেই যেন তাঁর পথ চলা। সেই কিশোরীবেলায় শুরু এই পথের সন্ধান। আজীবন তিনি ছিলেন এক অভিযাত্রী। যে আঙ্গিকেরই গান হোক না কেন, তাতেই যেন তাঁর সিদ্ধি। ভারতীয় লঘুসংগীতে মান্না দে ছাড়া অবিরাম এহেন সাধনায় তন্নিষ্ঠ নিরন্তর অভিযাত্রী আর কে ছিলেন? প্রকরণের অজস্র প্রহরণ মজুত ছিল তাঁদের তূণীরে। সেসবের উপযুক্ত প্রয়োগ আমাদের বিস্মিত, বিমুগ্ধ করেছে লাগাতার বেশ কয়েক দশক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সামগ্রিকতা ছেড়ে টুকরো টাকরায় দৃষ্টিপাত করা যাক। সেই কবে থেকে দিকপাল সব সংগীতকার তাঁদের পরম যত্নে বাঁধা সবচেয়ে দুরূহ গানটি লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গাইয়ে এসেছেন। লতাজির অধিকাংশ কালজয়ী গানই আদতে ছিল ‘এক্সপেরিমেন্টাল’, এবং সেখানে তাঁর গায়ন তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। সে সমস্ত গানকে মাইলফলক করে তুলেছেন লতাজি। তা সত্ত্বেও সবশেষে বলতে হয়, মদনমোহন ও লতা — হিন্দি চিত্রগীতিতে এক দিব্য জুটি; ঠিক যেমনটি এক পবিত্র দ্বৈতকণ্ঠ— মুকেশ ও লতা।

https://youtu.be/fJfosFvwA5U

আজ বিভিন্ন চ্যানেল খুললে যেসব রিয়েলিটি শো বা ট্যালেন্ট হান্টের সমারোহ, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রতিযোগীরা (বিশেষ করে মেয়েরা) নিজেদের দক্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে চাইছে লতা মঙ্গেশকরের গান গেয়ে। কারণটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। কারণ যে দক্ষতায়, যে প্রকরণে, যে সাংগীতিক ভাষায়, যে তাৎক্ষণিক প্রয়োগে লতাজি এক-একটা গানকে অবিনশ্বর করে তুলেছেন, তার সঠিক অনুকরণ করতে পারলেই বৈতরণী পার হওয়া যায়।

লতা মঙ্গেশকর কিন্তু ছিলেন বাঁধাধরা সড়কের যাত্রী। গান ও সুর নিখুঁত ফুটিয়ে তুলতে নিমগ্নতা ও অনুশীলনে কোনো ফাঁক রাখতেন না। পরিণত বয়সেও তরুণ সংগীতকারদের সুরের প্রতি তিনি ছিলেন একই ভাবে তন্নিষ্ঠ। ইদানীংকালের ফিল্মি গানে মেলডির অভাব তাঁকে পীড়িত করত, সেইসঙ্গে গানের কথার দৈন্যদশাও। গানের বাণীকে তিনি বিলক্ষণ গুরুত্ব দিতেন। শোনা যায়, কারবাঁ (Caravan) ছবির “পিয়া তু অব তো আ যা”, এই এক্সপেরিমেন্টাল গানটির জন্য রাহুল দেববর্মণ লতাজিকেই ভেবেছিলেন। কিন্তু গানের কথা এবং সেইসঙ্গে “মনিকা, ও মাই ডার্লিং” শুনেই লতাজি সটান ‘না’ বলে দেন। অথচ ওই সিনেমাতেই এক লাস্য-নৃত্যের সঙ্গে “দিলবর…”, লতাজির কণ্ঠে এক স্মরণীয় গান। এটিও এক্সপেরিমেন্টাল, মধ্যপ্রাচ্যের লোকসুরের আদলে। সাম্প্রতিককালে বারবার তিনি খেদ প্রকাশ করেছেন হিন্দি সিনেমায় নায়িকা, ভ্যাম্প সব একাকার হয়ে গিয়ে গানের মানের অবনতি নিয়ে। অনেক নায়িকাই তাঁর গানের জোরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। মনে রাখতে হবে, অভিনেত্রীর ভজন-পূজন-সাধন-আরাধন থেকে ভাষ্য-হাস্য-লাস্য-রহস্য সবই কিন্তু তিনি প্রকাশ করেছেন সুরের চলনে, গানের ভাষায়, সংগীতের নিজস্ব প্রকরণে — কোনও বাচিক শিল্পীরূপে নয়, নিখাদ সংগীতশিল্পী হিসেবে, যা বহুকাল মানুষ শুনে যাবে।

তাঁর গানের নমুনা পেশ করা বা বিশ্লেষণ করা আজ এই মুহূর্তে বাতুলতা। হিন্দি চিত্রগীতিতে তাঁর অবিসংবাদী প্রভাবে ঢাকা পড়ে গেছেন অনেক কুশলী শিল্পী, যাঁরা আরও বেশকিছুটা এগোতেই পারতেন। এ প্রসঙ্গে সুমন কল্যাণপুর, বাণী জয়রাম, আরতি মুখোপাধ্যায়, সুলক্ষণা পণ্ডিত, রুণা লায়লার নাম স্বতই এসে যায়। এ নিয়ে ওঁকে ঘিরে অন্য ধরনের কথা চাউর হয়েছে। তবে মহল ছবির সেই “আয়েগা, আয়েগা…” থেকে শুরু করে, মধুমতী ছবির “আ যা রে…” হয়ে ওয়হ্ কৌন থি ছবির “লাগ যা গলে…” ছুঁয়ে, কুহেলি ছবির “আসছে, সে আসছে…”-র যে টানটান কৌতূহল — রহস্য-রোমাঞ্চের — তেমন আকুলতাই বজায় থাকবে লতা মঙ্গেশকরকে ঘিরে। আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক, লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠস্বর — এসব নিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসা থেকেই যাবে।

পরিশেষে ক্ষুদ্র এক নিবেদন। গোটা মারাঠাভূমিতে লতা মঙ্গেশকর এক অহংকারের নাম। জাতিগত গর্ব বললে বোধহয় ভালো হয়, যেমন শিবাজি, বালগঙ্গাধর তিলক প্রমুখ। এবং তা দল-মত-ধর্ম-রাজনীতির বেড়া পেরিয়ে, এককাট্টা হয়ে। আমরা শুনে এসেছি ‘মারাঠি অস্মিতা’-র কথা, যে প্রবাহে লতাজি সচিন তেন্ডুলকরকে ‘ভারতরত্ন’ দেওয়ার প্রস্তাব আনেন। পাশাপাশি এক বরেণ্য শিল্পীকে নিয়ে এই বাংলায় সাম্প্রতিক কোলাহলে মনে হচ্ছে, আমরা সত্যিই ক্ষুদ্র।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.