দেউচা পাঁচামির কয়লাখনি প্রকল্প নিয়ে বাহ্যত পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে। কার্যত বিরোধীশূন্য রাজ্যে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হবে বলে মনে করছে না রাজ্য সরকার। সপ্তাহ তিনেক আগে তপসিয়ার তৃণমূল ভবনে রাজ্য সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী এই প্রতিবেদককে বলেন, “হাওয়ায় আন্দোলন হয় না। দেউচায় আমাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যে ন্যূনতম সংগঠন প্রয়োজন, তা গড়ে তোলার অবস্থায় বিরোধীরা কেউ নেই। আদিবাসীদের একাংশও আমাদের সঙ্গে। এই অবস্থায় চিন্তার কোনো কারণ দেখছি না।”

দেউচা পাঁচামিতে সাম্প্রতিক অতীতে বেশ কয়েকবার যাওয়ার ফলে মনে হয়েছে, তৃণমূল সরকারের এই চরম আত্মবিশ্বাসের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিজেপির শক্ত সংগঠন থাকলেও আপাতত গেরুয়া শিবিরকে দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হচ্ছে। সিপিএমের সংগঠনও তথৈবচ, কংগ্রেস প্রায় নেই। এসইউসিআই এবং বিভিন্ন নকশালপন্থী সংগঠন আশপাশের এলাকা থেকে গিয়ে মূলত আদিবাসী এলাকায় কাজ করার চেষ্টা করছে, তবে ওঁদের কারোর কোনোরকম জনভিত্তি নেই। সিউড়ি বা কলকাতায় কনভেনশন গোছের কিছু কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী, থিয়েটারকর্মী, শিক্ষাবিদরা খনির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু ওই এলাকায় গণআন্দোলন গড়ে তুলতে যা কিছু প্রয়োজন, তার প্রায় কিছুই এখন পর্যন্ত নেই।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সরকারও কার্যত খোলা মাঠে গোল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এলাকার এক প্রভাবশালী আদিবাসী নেতা, যিনি বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিতে ছিলেন, তাঁকে জোড়াফুল শিবিরে নিয়ে এসেছেন অনুব্রত মণ্ডল। সেই নেতাই এখন খনির পক্ষে জনমত গড়ে তোলার অন্যতম বড় সৈনিক। আদিবাসীরা প্রতিবাদ করছেন, মুসলিম বাসিন্দাদের বড় অংশও প্রতিবাদ শুরু করেছেন। বেশ কিছু মিছিল, সমাবেশও হয়েছে, তাতে টাঙ্গি, কুঠার হাতে জমায়েতও মন্দ হয়নি, কিন্তু দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার মত নেতৃত্বের অভাব স্পষ্ট।

গত ২ ফেব্রুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূলের সাংগঠনিক নির্বাচন ছিল। সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃণমূলের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরদিনই নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে দেউচা নিয়ে ‘বেড়ে’ খেলার ইঙ্গিত দেন মমতা। তিনি জানান, ইতিমধ্যেই আদিবাসীদের ১৩৯ জন জমি দিয়ে দিয়েছেন। সরকারের হাতে বর্তমানে এক হাজার একর জমি রয়েছে, সেই জমিতেই শুরু হবে কাজ। মমতা আরও জানান, প্রকল্পে জমি দেওয়ার জন্য মোট ৫১০০ জনকে চাকরি দেওয়া হবে। জমিদাতাদের সেরা পুর্নবাসন প্যাকেজ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও একবার বলেন, “দেউচা কোনোভাবেই সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রাম হবে না।” প্রসঙ্গত, কতজন জমির মালিক সম্মতি দিয়েছেন,তা নিয়ে সরকারের বয়ান সব সময় এক থাকছে না৷ মমতা ১৩৯ জনের কথা বললেও আগে সরকার জানিয়েছিল মোট ১৩১৪ জন জমির মালিক সম্মতি দিয়েছেন এবং তাঁদের মোট জমির পরিমাণ ৬০০ একর।

বস্তুত, দেউচা পাঁচামিতে তৃণমূল সরকার নরমে গরমে এগোচ্ছে। ৯ নভেম্বর ২০২১ তারিখে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী এই কয়লাখনির কথা ঘোষণা করেন। প্রায় ১৪ বর্গকিলোমিটার বা ৩,৪০০ একর জমি জুড়ে এই প্রকল্প। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লাখনি প্রকল্প এটি। মোট সরকারি বিনিয়োগ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। পুর্নবাসন প্যাকেজ ১০ হাজার কোটি টাকার। এই প্রকল্পে মোট কত কর্মসংস্থান হতে পারে, তার খতিয়ান দিয়েছে রাজ্য সরকার। জানিয়েছে এক লাখ লোকের চাকরি হবে। ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০,০০০ কোটি টাকা উচ্ছেদ হতে যাওয়া প্রায় ২১০০০ মানুষ, বর্তমান পাথর খাদান ও ক্রাশারের মালিক ও কর্মচারীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, এই প্রকল্প হলে আগামী একশো বছর রাজ্যকে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কয়লা কিনতে হবে না। দৃশ্যতই রাজ্য সরকারের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ বেশ আকর্ষণীয়। অন্তত খাগড়া-জয়দেব প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান ডিভিসির ঘোষিত প্যাকেজের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।

কিন্তু বাসিন্দাদের বড় অংশই জমি ছাড়তে নারাজ। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় দেউচা পাঁচামি জমি রক্ষা কমিটি ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় দেউচা পাঁচামি আদিবাসী জনজাতি জমি রক্ষা কমিটি নামে দুটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব প্রায় নেই, কিন্তু সাধারণ মানুষ নিজেরাই পথে নামছেন। তাঁদের রীতিমত সরকারি সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাইক মিছিল করলে বিপর্যয় মোকাবিলা আইনে মামলা করা হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে পুলিশ প্রতিবাদী জমায়েতে লাঠিচার্জ করেছে। আদিবাসীদের দাবি, তাতে এক নারী তাঁর গর্ভস্থ সন্তানকে হারিয়েছেন। এছাড়াও গ্রামে ঢুকে হুমকি, মিথ্যে মামলা দেওয়ার মত চেনা রাস্তা তো আছেই।

দেউচা পাঁচামির কয়লা খনি যে পরিবেশগতভাবে কতখানি বিপজ্জনক, তা নিয়ে এর আগে বহু আলোচনা হয়েছে। এই নিবন্ধে নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই। সংক্ষেপে বলা যায়, নয়ের দশকের গোড়াতেই ভারত সরকার জানত যে দেউচায় মাটির নীচে কয়লা আছে। কিন্তু সেই কয়লার স্তর অতি পুরু ও কঠিন ব্যাসল্ট পাথরের আস্তরণে বন্দী। মোট চারটি সিম বা স্তরে কয়লা আছে, প্রতিটি স্তরের মাঝে আছে কঠিন ব্যাসল্টের স্তর। তাই কোল ইন্ডিয়া এই এলাকা নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। কারণ, এখান থেকে কয়লা উত্তোলনের প্রযুক্তি ভারতে আজও নেই। কোল ইন্ডিয়ার হাতে কয়লা তোলার প্রযুক্তি নেই, ন্যাশনাল মিনারেল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের হাতে অত পুরু ব্যাসল্টের স্তর ভেদ করার প্রযুক্তি নেই।

চলতি শতকের শুরুতে দেশে কয়লার চাহিদা বাড়তে থাকে। কয়লা মন্ত্রক তখন আবারও দেউচা নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। কেন্দ্রীয় সরকার ছটি রাজ্যকে মিলিতভাবে এই কয়লার ব্লক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৩ সালে। এই বিষয়ে রাজ্যগুলির একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি বানানো হয়। কিন্তু রাজ্যগুলি একে একে সরে আসতে চাওয়ায় সেই জয়েন্ট ভেঞ্চারও হয়নি। শেষে পশ্চিমবঙ্গ নিজেই গোটা ব্লকটা চায়। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকার তাতে রাজি হয়ে যায়।

দেউচা পাঁচামির জমি কোন আইনে অধিগ্রহণ করা হবে তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের মতে, দেউচায় জমি অধিগ্রহণ ২০১৩ সালের আইনে না-ও হতে পারে। এর জন্য ১৯৫৭ সালের একটি ও ২০১৫ সালের একটি বিশেষ আইন আছে। এই দুটি আইনে জনমত বা গণশুনানি অথবা পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্রের তেমন গুরুত্ব নেই৷ অন্তত ২০১৩ সালের আইনের তুলনায় তা বেশ কম। ফলে পরিবেশকর্মীদেরও উদ্বেগ বাড়ছে।

রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি এই প্রকল্পের বিরোধিতা করতে পারবে না। নাগরিকে এই বিষয়ে আগেই লেখা হয়েছে “দেউচা-পাঁচামি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প। এই প্রকল্পের বিরোধিতা করার প্রশ্নই বিজেপির নেই। সম্প্রতি বিজেপি নেতা মোহিত রায়ের একটি বৃহৎ সংবাদপত্রের পাতায় উত্তর সম্পাদকীয় প্রবন্ধ (আনন্দবাজার পত্রিকা/ ১০ ডিসেম্বর, ২০২১) নিশ্চয়ই অনেকেই খেয়াল করেছেন। সেখানে দেউচা প্রসঙ্গে তিনি পরিষ্কারই বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন রোখার উৎসাহ যেন জনগণের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদির পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়…।

প্রকৃতপক্ষে মোহিতবাবু কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের কথারই প্রতিধ্বনি নিজকণ্ঠে ধারণ করেছেন। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কয়লাখনিগুলোকে ব্যাপকভাবে বেসরকারি মালিকানার হাতে তুলে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। গত বছর জুন মাসে কোভিড পরিস্থিতির মাঝখানে কেন্দ্রীয় সরকার ৪১টি কয়লা ব্লক বেসরকারিকরণ করেছে। যুক্তি হল বিনিয়োগ আসবে, কর্মসংস্থান বাড়বে ইত্যাদি। যা যা বলে দেশ লুঠ চলে আর কি। সম্প্রতি গ্লাসগোর পরিবেশ সম্মেলনে অন্য সব রাষ্ট্রনেতার মত মোদীও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলেন, কিন্তু কাজে তাঁরা চলছেন একেবারেই উলটো পথে।”

অন্যদিকে সিপিএমও সরাসরি খনির বিরোধিতা করতে পারছে না৷ গণশক্তিতে সিপিএমের পশ্চিম বর্ধমান জেলা সম্পাদক গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি দুটি কিস্তিতে দেউচা-পাঁচামি প্রকল্পের মারাত্মক বিপদের দিকগুলো নিয়ে একটি তথ্যবহুল এবং সবিস্তার লেখা (‘খোলামুখ খনির নামে লুটেরা পুঁজির কারবার’/ গণশক্তি/ ৯ এবং ১০ ডিসেম্বর) লিখেছেন। সেখানে তাঁর বক্তব্য “দেউচা পাঁচামির খোলামুখ খনি প্রকল্পের সমস্যাগুলিকে তুলে ধরার অর্থ কিন্তু এই প্রকল্পের বিরোধিতা করা নয়। কোনও মুমূর্ষু রোগীর বড় অপারেশনের আগে সেই হাসপাতালের ডাক্তারবাবু সহ হাসপাতালের উপরিকাঠামো নিয়ে রোগীর সুহৃদবৃন্দ ভাবনা করেন। রোগীর বাঁচার স্বার্থেই তা করেন। এই চিন্তা কিন্তু রোগীকে মেরে ফেলা বা তার অপারেশনের বিরোধিতার জন্য নয়। এখানে তো প্রকৃতির উপর বড় অপারেশন হবে? ভাবব না! আমরা তো প্রকৃতির আত্মীয় — প্রকৃতির সন্তান!” বোঝাই যাচ্ছে, খনি করতে দেওয়া হবে কিনা তা নিয়ে ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থানে রয়েছে সিপিএম।

এত কিছুর পরেও দেউচা পাঁচামি বাংলার রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। যে এলাকায় খনি হবে, তার অধিকাংশ বাসিন্দা শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের জন্য তৈরি। এবং সেই লড়াইয়ের মডেল ঠিক সিঙ্গুরের মত নয়, বরং নন্দীগ্রামের মত। কেন বারবার তাঁদেরই উচ্ছেদ হতে হবে, সেই প্রশ্ন তুলছেন আদিবাসীরা। সভা, জমায়েতের ভিড়ের মেজাজ বলছে, লড়াইটা বহুদূর পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা রাজনৈতিক নেতৃত্বের।

২০০৬ সালের মাঝামাঝিও রাজ্যে কার্যত বিরোধীশূন্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বামফ্রন্ট ২৩৬ আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল। তৃণমূল মাত্র ৩১টি আসন পায়। কংগ্রেস ২৬টি, এসইউসিআই ২টি। কিন্তু ২৫ সেপ্টেম্বর এবং ২ ডিসেম্বর সিঙ্গুরের দুটি ঘটনার পর চিত্রটা বদলে যায়। জানুয়ারির শুরুতে নন্দীগ্রামে গুলি চলে। রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বিরোধী মুখ বলে বসেন, সিঙ্গুর থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই নন্দীগ্রামে অশান্তি চলছে। এ থেকে বোঝা যায়, নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদের সর্বোচ্চ মহলও সে সময়ে অবগত ছিল না। কিন্তু তার কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নেয়।

দেউচাতেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। ফারাক দুটি জায়গায় — ১) সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে বিরোধীদের খানিকটা অস্তিত্ব ছিল। দেউচায় প্রায় নেই। ২) তৃণমূল, এসইউসিআই, নকশালপন্থীসহ বিরোধীরা সোচ্চারে বলতে পেরেছিলেন, তাঁরা জমি অধিগ্রহণ চান না। ঠিক হোক বা ভুল, অবস্থানে স্পষ্টতার অভাব ছিল না।

দেউচা পাঁচামির লড়াই বিজেপি করতে পারবে না। মানুষ খনির বিরুদ্ধে লড়তে চান। তাঁরা নেতৃত্বের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই লড়ছেন।

বামপন্থীরা কি আরও একবার বাস মিস করবেন?

 

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক বিকল্প নেই বলেই দেউচা-পাঁচামি সিঙ্গুর হবে না

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.