সুদীপ্ত রায়

‘মৃত্যুর আরেক নাম ডোমকাক,
বহ্নিশিখা, তুমি তাকে ভালবাসো জানি’

তুষার চৌধুরী তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থের প্রবেশক হিসাবে ব্যবহার করেছেন উপর্যুক্ত পঙক্তিটি। প্রমা থেকে প্রকাশ পায় তাঁর ডোমকাক ও বহ্নিশিখা কাব্যগ্রন্থটি। প্রমার প্রকাশক সুরজিৎ ঘোষ এই গ্রন্থটি নির্মাণ করেছেন চমৎকারভাবে। শ্রী ঘোষ এই প্রবেশক কবিতাটির পর ছেড়ে রাখেন আস্ত পৃষ্ঠাখানি। শুধু দুটি স্তবকে কবিতাটি, তারপর অনন্ত মৃত্যুর মত সাদা পাতা। যেমন মানিকের পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় মাণিক ইঙ্গিত দেন মৃত্যুর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

‘… মরা শালিকের বাচ্চাটিকে মুখে করিয়া সামনের মাঠ দিয়া ছপছপ করিয়া পার হইয়া যাওয়ার সময় একটা শিয়াল বারবার মুখ ফিরাইয়া হারুকে দেখিয়া গেল। ওরা টের পায়। কেমন করিয়া টের পায় কে জানে!’

জীবনানন্দ যাকে বলছেন মৃত্যুর নীলাভ ঘ্রাণ। আসলে শশী যখন আবিষ্কার করে হারু ঘোষের মৃতদেহ, শশীও কিন্তু টের পায় মৃত্যু! এক মৃত্যুপুরীতে সে প্রবেশ করতে চলেছে – এ ইঙ্গিত এড়িয়ে যাওয়ার নয়।

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি লেখায় বলেছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর শবদেহে গীতার পরিবর্তে যেন পুতুলনাচের ইতিকথা রাখা হয়। সন্দীপনও কি প্রকৃত প্রস্তাবে মৃত্যুর কথা টের পাচ্ছিলেন? আমরা পুতুলনাচের ইতিকথা থেকে চোখ ফেরাই সন্দীপনের ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ নামক এক ক্ষীণকায় গ্রন্থের দিকে। মাণিক ও জীবনানন্দ-তাড়িত এবং রিপু-তাড়িত সন্দীপন তাঁর ওই গ্রন্থে একটি গল্পের নামকরণ করেন ‘আট বছর পরে একদিন’। তার মুখ্য চরিত্র এক বাঙালী যুবা, নাম বিজন। বিজন বিবাহযোগ্য এক পুরুষ। তার উপযুক্ত কনেসন্ধানে রত তার পরিবার। এই অশ্লীল প্রক্রিয়াকে বিজন এড়িয়ে যেতেই পারত। যেহেতু ন্যাকামো তার ধাতে সয় না, তাই তাকেও অনেকের মধ্যে থেকে বেছে নিতে হবে শ্রেষ্ঠা কোনো একজনকে। বিজন বোঝে তা অশ্লীল।

এই গল্পের একটি বিশেষ অংশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করি চলুন

বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এসে সে দাড়ি কামাতে বসল। বৌদি এসে একবার তাড়া দিয়ে গেল,’কীগো যাবে কখন, তাড়াতাড়ি করো?’ বিজন বলল,’আচ্ছা বৌদি, চিঠির একটা উত্তর না পেয়ে, এরকম হুট করে চলে যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?’

বৌদি বলল, ‘ওমা, উত্তর আবার দেবে কি?’

তা সত্যি মেজদা চিঠি দিয়েছে বেস্পতিবার। সময় কই উত্তর দেবার?

ইশ! ঠোঁটের নিচে একটু কেটে গিয়েছিল…”

সন্দীপন যে আসলে গদ্যে মাণিক-তাড়িত তা বোঝা যায় পুতুলনাচের ইতিকথায় পাঁচ নম্বর অধ্যায়ে এসে

কুসুম ক্ষমা চাহিতে আসিল দিন চারেক পরে। দুপুরবেলা চুপিচুপি, চোরের মতো! শশীর ঘরের পিছনে বাগানে। বাগানে লিচু হয়, কাঁঠাল হয়, কপি হয়, নটেশাক হয়,তীব্রগন্ধী কাঁঠালি চাঁপা, লাল বোঁটা শিউলিফুল ফোটে। বাগান দিয়া আসিয়া ঘরের জানালার ফাঁকে ফিসফিস করিয়া কুসুম ডাকিল, ছোটোবাবু, শুনুন।

শশী ঘুরিয়া বাগানে গিয়া দ্যাখে জানালার নীচে তাহার অত সাধের গোলাপ-চারাটি কুসুম দুই পায়ে মাড়াইয়া মাটিতে পুঁতিয়া দিয়াছে…

বাগানে আরও গাছ ছিল, সেই ইঙ্গিত মাণিক দিয়ে রাখছেন বাগানের বিস্তারিত বর্ণনার মাধ্যমে। কুসুম কেন গোলাপ চারাটিকেই বেছে নিল পদদলিত করবার জন্য? এ প্রশ্ন আমাদের মনে আসা স্বাভাবিক এবং বিজনের ক্ষৌরকর্মের সময়ে ঠোঁট কেটে রক্ত গড়ানো। এ এক তীব্র মেটাফর।

সম্পর্কে শূন্যতা আছে
এই সত্য ক্রমে আরো উদ্ভাসিত হোক

‘হৃদয় আমিষদষ্ট’
সত্য শুধু জানে পরলোক

পরলোক দৈব পাখি
চক্ষু ভরা ক্রীড়া

কুয়োতলে স্নানরতা
মৃত রমণীরা

এইমতো যোগাযোগ
কেশ-রূপ সাঁকো

শহর যেখানে শেষ
সেইখানে থাকো

(গোরস্থান রোড, নয়/ রাহুল পুরকায়স্থ)

আসলে সম্পর্কে শুধু শূন্যতা নয়, সম্পর্কে হত্যার দিকেই অবচেতনে কুসুম এবং সচেতনে বিজন, যথাক্রমে মাণিক এবং সন্দীপন দ্বারা ইঙ্গিত করছেন। এ-ও এক মৃত্যু; ‘সম্পর্ক’, ‘হত্যা’ যার প্রতিশব্দ মাত্র। মৃত্যুর নীলাভ ঘ্রাণ টের পাচ্ছেন বিজন, কুসুম ও শশী পরস্পর।

আট বছর পরে একদিন গল্পে বিজনের ঠোঁট কেটে যাওয়ার ঠিক পরেই এক জায়গায় সন্দীপন লিখছেন ‘…বিজন পেরেকে টাঙানো আয়নাটির দিকে তাকিয়ে ছিল…’। আসলে পেরেকে টাঙানো আয়না এবং যার মধ্যে দিয়ে বিজন দেখতে পায় নিজেকে, নিজের প্রতিচ্ছবিকে। পুতুলনাচের ইতিকথায় এ জাতীয় কোনো উপমা না থাকলেও সন্দীপন আসলে মাণিককে অতিক্রম করতে চেয়েছেন তাঁর লেখায়। পেরেকে টাঙানো আয়না; আমাদের মনে আসা স্বাভাবিক ক্রুসিফিক্সনের কথা। সম্পর্কের, জীবনের এক আদ্যন্ত ক্রুসিফিক্সন ঘটিয়ে ফেলছেন সন্দীপন, মাণিককেও অতিক্রম করে।

পুতুলনাচের ইতিকথায় কুমুদ ও মতি কলকাতায় যাদের বাড়িতে ভাড়া থাকে, তাঁরা হলেন জয়া ও বনবিহারী। এই দুই চরিত্র অদ্ভুত। বনবিহারী আঁকিয়ে, জয়া তাঁর স্ত্রী। পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাসের এগারো নম্বর অধ্যায়ের এক জায়গায় আমরা দেখি, যে চিত্র বনবিহারীর এবং জয়ারও যুগপৎ স্বপ্ন, যা কিনা কোনো মূল্যেই কারোর কাছে বিক্রীত হবে না, সেই ছবি জয়া ছিঁড়ে ফেলছেন উদগ্রভাবে। এর সঙ্গেই তুলনীয় আট বছর পরে একদিন গল্পে শেষ দিকে পিঁপড়ের পা ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্যটি। আসলে জয়া স্বীকার করেন তিনি বনবিহারীকে ভালবাসেননি, ভালবেসেছেন তাঁর প্রতিভাকে, এবং যখন তিনি এটি অনুধাবন করেন, তখন বোঝেন বনবিহারীর প্রতিভাও আসলে ঝুটো। পাঠক সম্পর্কের মৃত্যুর আরেক নীলাভ ঘ্রাণ টের পাচ্ছেন?

আরো পড়ুন রমাপদ চৌধুরী: উদাসীন অশ্রুবিন্দুর নিভৃত কথক

মণিমালা তার বিবাহ প্রস্তাবে সম্মত নয়। তার বলতে বিজনের। মণিমালা গান জানে, জানে নাচ আর সেতার বাজাতে জানে। অথচ বিজনের দিদি জিজ্ঞাসা করলে সে বলে সে জানে না, তার বোন জানে। বিজন বোঝে কী ক্ষমাহীন প্রত্যাখ্যান তাকে করে মণিমালা, এবং এই প্রত্যাখ্যানেরই কি অভিশাপ লাগে মণিমালার আঙুলে আঙুলে?

স্টপে দাঁড়িয়ে সেই দিকে চেয়ে বেচুর মত অবিকল বিষাদময় গলায় বিজন জিজ্ঞেস করল, ‘তোর ঘরে একটা সেতার দেখলাম, কে বাজায় রে?’

বাজায় আর কে। বল বাজাত। বৌ-ই বাজাত। সেই ছেলেবেলা থেকে চর্চা, শুনেছি ভাল নাচতেও পারত, দেখ না, একদিন ছেড়ে দিল হুট করে। এখন আর ছোঁয় না। ছোঁবে কী করে,’ দুলাল বলল, ‘যা ধুলো।

হয়ত ভুলেই গেছে।একটু থেমে দুলাল আবার বলল, ‘তুই রবিশঙ্করের সেতার ভালবাসতিস খুব। এখনো শুনিস রাত জেগে?’

মণিমালা এখন বিজনের বন্ধুর স্ত্রী। সেই বন্ধুর অনুরোধে সে যখন দুলালের (বিজনের বন্ধু) বাড়ি যায় এবং মণিমালাকে দেখে, একটি কথাই উচ্চারিত হয় পৃষ্ঠার সাদা অংশ জুড়ে – ‘…স্মৃতি বড় কম নয়, স্মৃতির চেয়ে বড় এক আকাশ…’

মনে পড়ে আমাদের কুসুমের প্রত্যখ্যানের কথা – শশীকে।

আসলে হত্যাই কিছু কিছু সম্পর্কের নিয়তি। কিছু রূপকথা কখনো সত্যি হয় না।

মানুষ আহত হলেই হাঁটা শুরু করে। যেমন বিজন আহত হয়ে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল দুলালের সঙ্গে, আর তার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছিল স্মৃতি। পুতুলনাচের শেষ দৃশ্যে শশীও আসলে হেঁটে বেড়াচ্ছিল তার গাওদিয়া গ্রামের পথে পথে। এত যে মৃত্যু, এত যে সম্পর্কের হত্যার কথা লিখলেন মাণিক, সন্দীপন – আসলে তাও কি মৃত্যুকে স্বীকার করেও অস্বীকার করা নয়?

দেখুন নাগরিক ডট নেটের পডকাস্ট সব প্রশ্ন চলবে: ব্যাপারটা কী হচ্ছে SIR?

প্রশ্ন তোলা থাক, বিজন, মণিমালা, দুলাল, শশী, কুসুম, মতি, কুমুদ, জয়া, বনবিহারীরা এখন কেমন আছেন? কেমন থাকতে পারেন ওঁরা? মাণিক ও সন্দীপনের গদ্যময় দিগন্ত ছেড়ে পাঠক আসুন এই প্রশ্ন খুঁজি কাব্যে, কাব্যের দিগন্তে

যদি নাই লিখিতাম কবিতাখানি! যদি নাই বলিতাম, মরা… মরা…!
নিজের খুলিকে মসিপাত্র না ভাবিয়া যদি শিরে শিরে
বজ্র খেলিতাম! অপার মায়ার ভ্রমে যদি নিজেকে না আঁকিতাম
গৃহের দেয়ালে! যদি না জড়াইতাম প্রেমে ও বৈরাগ্যে! যদি
নেশাপক্ষী না উড়াইতাম জ্যোৎস্নায় ! যদি হিংস্র চঞ্চু না-ই
ঘষিতাম দাঁড়ে!

তা হলে, তা হলে সাঁই, ও গোঁসাই, কেমনে ভুলিব আমি তারে!

(যদি নাই লিখিতাম / রাহুল পুরকায়স্থ)

ঋণ: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্ত সম্পর্কের জন্ম এবং মৃত্যুকে

নিবন্ধকার বাংলা সাহিত্যের অকিঞ্চিৎকর পাঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.