প্রিয়া সামন্ত

“এই আমার জীবন, সঁপে দিই অকবিতাকে, কবিতাকে।”

“কিছু বোঝবার আগে শুরু করে দাও” – তরুণ বন্ধুকে লেখা এই ছিল তাঁর উপদেশ, বন্ধুর অশেষ নিরাময় চেয়ে। আর “একটা কিছু ধরে নিয়ে তবে শুরু করতে হয়,/তা না হলে কোথাও পৌঁছোনো যায় না।” এমনটাও তাঁর মনে হত। তিনি দেবারতি মিত্র, বাংলা কবিতার ‘ছায়ামানবী’। কিন্তু ছায়াকে নিজের উৎস হিসাবে চিনে নেবার বহু আগে তাঁর জীবনে এক ‘আলোলীন নিবিড় উচ্ছল দিন’ ছিল, ‘বকুল ছড়ানো যত ঋণ’ তাঁর প্রসন্ন হৃদয়মূলে জ্বেলে রেখেছিল মায়ালীন তীব্র আলোর স্নান। আর সেই আলোর স্নান কীভাবে প্রথমবার শব্দের বাঁধনে ধরা দিল, সে এক গল্পকথা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেবার কমাস আগে হাজারীবাগ রোড স্টেশনে বেড়াতে যাওয়া, বর্ষার ছায়ায় পরেশনাথ পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট শালগাছের জঙ্গল ঘন নীলে রাঙানো। আপনভোলা কিশোরী দেবারতি সেখানে ঘুরে বেড়ান, খয়েরি সবুজাভ ও পাথর ফাটা লাল রঙের স্রোত মিলেমিশে তাঁর চোখে হয়ে ওঠে ‘তিন বিনুনি’। একদিন হাজারিবাগ থেকে তিলাইয়া বাঁধ দেখে ফেরার সময়ে চোখের সামনে সব ওলটপালট, “তামাটে পাহাড়ের চোখের কোলে অবসাদের গাঢ় কালো ছায়া, পলাশ শাল সেগুন গাছের বেগুনি ঝলক, কষা মাদক বনজ গন্ধ। হু হু করে বয়ে চলেছে সারা পৃথিবী।” বাড়ি ফিরে এসে সেই নিয়ে লেখা একটি চিঠি, তাঁর কাছে হয়ে ওঠে প্রথম কবিতা।

সেই শুরু। এদিকে বোধের আয়ুষ্মানকাল থেকে কবিতার অবিরল এক ধারা তাঁর জীবনে মায়ের দুধের মতই অলক্ষ্যে প্রবহমান ছিল। শৈশবে বাবার মুখ থেকে শুনে চলা রবীন্দ্রনাথের একের পর এক দীর্ঘ কবিতার স্মৃতি হোক কিংবা মামাবাড়িতে ধ্রুপদী গানের চর্চার পাশাপাশি শ্যামাসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদী, নজরুলগীতি শোনবার অভ্যেস; সুর ও কবিতার চলন যেন তাঁর অনাগত জীবনের পথের ধারাটিকে, কাব্যময়তার সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিল। মামার বন্ধুদের কবিতার আসর থেকে বাংলা কবিতার তৎকালীন ধারাটিকে চিনে নেওয়াই হোক অথবা মায়ের দাদামশাইয়ের শখের জ্যোতিষচর্চার সুবাদে নক্ষত্রমণ্ডলের আঁতের কথাটিকে বুঝে নেওয়া, দেবারতির কিশোরীবেলা ছিল তাঁর চেতন-ঐশ্বর্যের সলতে পাকানোর কাল। তাঁর কবিতায় অবলীলায় ‘এজরা পাউন্ড’ থেকে ‘ব্ল্যাকহোল’ পর্যন্ত গতায়াত সে কারণেই এমন সহজ মনে হয়।

কলেজে ভর্তির তিন বছরের মধ্যেই শতরূপা থেকে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে (১৯৭১) ধারণ করে আছে দেহের বন্দর থেকে সহসা নোঙর ছিঁড়ে তাঁর আত্মার ছুটে চলাটিকে। তাঁর জীবনের সেই সময়ের অকৃতার্থতা, বিষাদ, প্রেম, বিকর্ষণ, নিঃসঙ্গতা এবং মৃত্যুচিন্তার মত বিষয় কবিতাগুলিতে ঘুরে ঘুরে কথা বলে। শরীরী উন্মাদনা ও তুমুল আদরের ভাষা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে কবিতাগুলিতে।

সারা দুপুর আমি তোমায় স্নান করিয়ে দিই
ডিমের মতন গড়ানো মসৃণ
                          ঢেউ তুলেছে ঠাণ্ডা স্নানের ঘর

বিশাল নীল হ্রদ থেকে আকাশে …
                          চন্দন কস্তুরী চাঁপা জোয়ার এলে ভাসাই,
জলে নামো, মুখ নামিয়ে আমি পাশে দাঁড়াই।”

স্নানের এই ঘোর লাগা জ্বর কবির প্রিয় দৃশ্যকল্প। কবির কাছে বকুল গাছের নীচে নদী হয়ে ওঠে আরেক অবগাহন;

আমার চোখের লোর দেখতে দেয়নি আর কিছু,
আমি শুধু রক্তমাখা বেণি খুলে মাথা করে নিচু
               গাঢ় কল্লোলে ডুবেছিলাম।”

নিজস্ব স্বভাবে ডুব দিয়ে জলপাত্রের মত লজ্জাহীন হতে তাঁর দ্বিধা নেই, সোচ্চারে ঘোষণা করেন “আমারও পিপাসা ছিল, আমি শুধু সান্ত্বনা চাইনি।” যদি প্রশ্ন আসে কে তাঁকে এমন করেছে? উত্তরও তাঁর ক্ষুরধার, সপাট “হৃৎপিণ্ডে বিঁধে আছে জীবনের আমৃত্যু প্রত্যয়।” সেই বিশ্বাসেই শরীরের প্রতিটি কোষভাঙা রক্তিম উদ্দাম বৃষ্টিকে নিয়ে তিনি পাহাড়ি ঝিঁঝিঁর ম্লান ছায়াঘন গান শোনেন। কিন্তু সেই গান ক্রমশ তাঁকে বাস্তব জীবন থেকে দূরতর এক দ্বীপের একক বাসিন্দা করে তোলে। “‘অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে’র কবিতাগুলি লেখা হয়ে যাবার পর প্রায় সরীসৃপের মত বুকে হেঁটে কর্কশ পাথর আঁকড়ে অনেক কষ্টে স্যাঁতসেঁতে” সেই গর্তের মত চেতনের জগৎ থেকে তিনি বেরিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা চালান। আর ভোরবেলাকার শুকতারার মত আলোয় ছলছল এক মায়াজগতের মধুর বিভ্রম ঘিরে নেয় তাঁর কাব্যসৃষ্টির প্রণোদনাকে। আমার পুতুল (১৯৭৪) কাব্যগ্রন্থে এসে তাঁর “রক্ত শিরশির করে –/আবছা ফিরোজানীল ছায়া ফেলে আত্মার গম্বুজ”।

যে ঈশ্বর তাঁর কবিতায় এতদিন ‘ঘুমন্ত নির্বিকল্প জলের আকর’-এর মত মূর্তিময় শীতলতার আধার ছিলেন, তিনিই এখন ‘পুতুল-ঈশ্বর’। শরীরী দ্রোহের কাল পেরিয়ে “উপচোনো শরীর ও শরীরাতীতের কাছে” আজ তাঁর “জন্মজন্ম ঋণ”; মাতৃত্বের স্নেহ সমুজ্জ্বল প্রিয়ময়তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আমার পুতুল ঈশ্বর বলে এত প্রিয়’-

‘আমার সর্বস্ব নিংড়ে খা তুই রাক্ষস’
মা যেমন অহরহ তর্জন করতে করতে
সন্তানের মুখে তুলে দেয় দুধে ভরা স্তন
সে রকম আমি তোকে দেব পুতুল-ঈশ্বর।

তাঁর নিজের ভাষায় “‘আমার পুতুল’-এ গাছপালা, চাঁদ, আলো হাওয়া, এমনকী মানুষ পর্যন্ত সবই মায়াজগতের। সেই দুর্লভ সময়টাতে আমার মধ্যে এক স্বতন্ত্র পৃথিবী স্পন্দিত হচ্ছিল”। ততদিনে কবি মণীন্দ্র গুপ্তকে তিনি স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেছেন। বিবাহ পরবর্তী স্পর্শপ্রিয় সেই সময়ের ফাগ তাঁর এই দ্বিতীয় বইয়ের সুতোর ভাঁজে ভাঁজে ছড়িয়ে আছে। অন্ধ স্কুলে যে শব্দময় ঘন্টা বেজেছিল, তা এখন ‘বিচ্ছিন্ন শব্দের এষা’ হয়ে সময়ের মুখ চেপে ধরে। জগৎসংসারের স্বপ্নময় এক আলোজগতের বাসিন্দা হতে চেয়ে দেবারতি লেখেন

দ্যাখো, আমি থরে থরে সাজাব প্রদীপ,
কপালে উপচে ওঠো টিপ।
তারায় তারায় চাঁদে বীজ নিয়ে যাব,
                            আলোলতা তুমি মূল কুঁড়ি,
গতির লাটাই ভেঙে সুতো কেটে ঘুড়ি উড়ে যাবে।

সন্তান কামনায় তাঁর স্বপ্নময় আকুতি, স্পষ্টত প্রথম ভাষা পায় এই কাব্যের শরীরে। ‘সে, আমি আর আমাদের মেয়ে’ কবিতায় কবি লেখেন “শেষরাতে নিথর বালির হা হা সাদা বিছানায়/ খসে পড়লি এ কে তুই?/রূপের ভ্রমর ছোট্ট ভাঁজ আঁকা দুটি ঠোঁট/কচি আধবোজা চোখে পদ্মগন্ধ, নিখুঁত পদ্মিনী/ … সে ও আমি, আর তুই/এক জন্মে এত কেউ পায়!” প্রার্থনা, স্তব, আদর ,পাগলামি কিংবা যা হোক কিছুর এই মায়াজগৎ পেরিয়ে তাঁর তৃতীয় কবিতার বই যুবকের স্নান-এ (১৯৭৮) এসে কবি এই প্রথম নিজের হাত থেকে নিজে নিস্তার পেয়ে বাঁচলেন। দুর্দিন, সংঘাত, নৈরাশ্য সত্ত্বেও বর্ণময় পৃথিবীকে নবীন চোখে যেন প্রকৃত প্রস্তাবে কবি এই প্রথমবার দেখলেন “গোল ফোয়ারার মতো আকাশের নীচে/ সে যেন আরম্ভ হল এইমাত্র”। মহাকাশের ব্যাপ্তিময় অন্ধকার বিস্তারের পাশাপাশি তারাদলের সৌন্দর্যময় অবস্থানের সুষমা কবির চোখে “গাঢ় হয়ে বসে গেছে চামড়ার নীচে”। প্রথম বইয়ের স্নানধর্ম ‘যুবকের স্নান’ কবিতায় এসে কবির মর্মমূলে স্থিতধী হয়েছে, পাহাড়ি সুড়ঙ্গে বেজে ওঠা বাজনার বোলে, গাছের জরায়ুকোণ থেকে অগ্নির রঙিন বিন্দু ঝরনায় ছিটকে পড়েছে

আবিষ্ট যৌবনা জল উড়ে এসে
ভেঙে দেয় তাকে
ভেঙে ভেঙে নিয়ে যায়
সাদা পাথরের প্রাকৃতিক কারুকাজ
ঘুমন্ত উরুর একখানি
স্তব্ধ গর্ভে
টেনে নিল দূর পাহাড়ের জন্মদেশ
মিশে আছে সে সূর্যের স্মৃতি অলসতা
পাতায় পাতায় ঢাকা ঘন বনজঙ্গলের মেঘ।

কলকাতার কোনো এক তিনকোণা পার্কে রঙবেরঙের ঘুড়ির মতো নানা গাছের পাতা উড়ে উড়ে টাল খেতে খেতে হারিয়ে যায় অস্তমান ছায়ায়। দোকানে দোকানে আলো জ্বলে ওঠা সন্ধ্যায় তন্বী নিরাভরণা মেয়ের মুখের কারুকার্যে ফুটে ওঠা ধার ও রক্তিমতা থেকে হাজারিবাগ শহরের ফুলে ওঠা বিরাট ছাতার মত জাজ্বল্যমান কাঁচপোকা রঙের জুলজুল পাহাড়কে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া শীতকালের দমকা ঝড় কিংবা কামারপুকুরের ভাই-বোন পুকুরের স্নান থেকে হলদিয়ার নতুন কোয়াটার্স থেকে দেখা রিনিরিনে সাদা মৌরির ফুল আর ক্লিওপেট্রার ভেসে যাওয়া জাহাজ – এইসবই ছিল তাঁর যুবকের স্নান-এ। পৃথিবীর অপার রহস্যের দিকে এক সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে মায়া লাগে, জল আসে বারবার। ব্রহ্মাণ্ডের সারাৎসারের মূলে কণারূপে তিনিও আত্মগত নাড়ির টানে এই যে লেগে আছেন, তাঁর অস্তিত্বের মূলসুর যেন এইটাই। শব্দের শূন্যতার গায়ে পাকে পাকে বেড়ে ওঠে এক আস্তিক্যের বোধ। কোথাও না থেকেও এক লগ্ন হয়ে থাকা, তাঁর ভেতর এক অন্যতর আমি-র জন্ম দেয় “আমার সারা দেহে/লুব্ধক তারার কেমন সুন্দর ঠাণ্ডা/নীলচে আভা/ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসছে/জল, শ্যাওলার রেশ, পানার সুতোর মতো/অবিকল নেই আমি আর,/তোমার বদলে দেখ রং পালটে নিয়েছি।” আয়নার উলটোভাবে দেখার দেশ এখন তাঁর প্রিয়তর বাসভূমি হয়।

পরবর্তী ভূতেরা ও খুকি (১৯৮৮) কাব্যগ্রন্থটি প্রধানত ধারণ করে আছে তাঁর সন্তান কামনার নিগূঢ় আকাঙ্ক্ষাটিকে। এখন তাঁর “ধমনিতে স্ফুটতর নক্ষত্রের ইঞ্জেকশন/ হাসিসের মতো কালো, মিথেন গ্যাসের মতো নীল”। অন্য গোলার্ধের “দুধে-মদে তৈরি মেয়ে”-কেও দু বিনুনি পিঠে পরীর মতো লাগে। আলুকঝালুক পাতা ঘাসকুটো শার্টে লাগা একটি ছেলে এসে তাঁর কাছে “অন্তত একটি তারা” চায়। উত্তর আসে “আমি তো ভিতরশূন্য ব্ল্যাক হোল –/বিকিরণ, অন্ধ তাপ, রশ্মির আওতা থেকে চিরদূরে”। হৃদয়রেখারও যাকে ভয় এমন এক সন্তানের চাওয়া, যে তাঁর এক ভূতে গতি পায়নি, সে যেন আয়ুর ঝোলানো লতা বেয়ে রোজ রাত্রে ওঠে, আর ভোরে রোজ ডগা ছিঁড়ে দেয়। মা হতে চাওয়ার আর্তি কেঁপে ওঠে মা হারানোর যন্ত্রণায়। “মা-গান শুনতে শুনতে তারাদের মধ্যিখানে তারা হয়ে কাঁপি।/মা থাকো মা থাকো মা থাকো/পরলোক কোনদিকে – সে জগতে/হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে একা অন্ধকারে হেঁটে/তোমাকে যদি না খুঁজে পাই!” মনে পড়ে মণীন্দ্র গুপ্তের বাচনে, তাঁর ‘হারামণি’ কবিতার কথা। শিরোনামের “দেশজ শব্দটি যেন অপরাধী মায়ের নাড়িছেঁড়া আদর হয়ে মেয়ের গায়ে হাত বুলোচ্ছে।” “ আমি কেন রয়ে গেছি একা,/মিথ্যে দিয়ে অঙ্ক কষে শূন্যের বদলে শূন্য লিখে/কী লাভ আমার হল/ ছায়ার নামতা শিখে…।” মণীন্দ্র গুপ্তের কথায় “ কবিতায়, নিজের মা, ছোট বোন এবং নিজেকে জড়িয়ে, ত্রয়ীর একটি ইউনিট তৈরি করে, এই মা-মেয়ে সম্পর্ক খুব গভীরভাবে খেলেছে দেবারতি।”

আরো পড়ুন কবি ও কাঙাল শক্তি: উত্তরাধিকার ইন্দ্রনাথে

১৯৯৬ সালে সেই মেজো বোন দেবাঞ্জলির মৃত্যু দেবারতিকে মানুষ হিসাবে আমূল বদলে দিয়েছিল। পর্বান্তরের তুন্নুর কম্পিউটার (২০০০) বইতে “তারার অন্তঃকরণের মতো একান্ত নীল” সেই বোনকে হারানোর যন্ত্রণা গভীরভাবে বহমান। ‘বোনের স্বপ্ন’ থেকে ‘বোনের কথা’, তাঁর এই সময়ের লেখাগুলি অসহ ব্যথার ভারে অবনত, অথচ স্মৃতিদীর্ণ বোনের লাল জামা নিয়ে গিন্নিশকুনেরা খেলতে এলে দেবারতি রাবণের চিতার মত চিৎকার করে ওঠেন “’আমার বোনের জামা – আমার বোনের লাল জামা/কাউকে দেব না আমি কিছুতে দেব না –”

আবার এই কাব্যগ্রন্থেই কম্পিউটার ব্যবহার করে তাঁর বোনঝি তুন্নু, যে কম্পিউটার দেবারতির কবিতার জগতের মতই স্বগত মেজাজে, নিজস্ব নিয়মে চলে। ‘বাধ্যবাধকতা’ শব্দটা লিখতে বললেই সেই কম্পিউটার ছবি দেখায় ‘সীমানাহীন প্রান্তর, বসন্তকালের আকাশ, কোনও-দিন-না-শেষ পরিযায়ী হাঁসের মালা, বিশ্বের বাইরে ছুটন্ত আলো আর অকল্পনীয় স্বাধীনতা’-র। এই কাব্য জুড়ে একদিকে মৃত্যুকেই একমাত্র গন্তব্য বলে বিশ্বাস করতে না পেরে অন্ধের মত পথ খুঁজে চলার তাড়না আর অন্যদিকে শূন্য থেকে ঝলক ঝলক হাওয়ার সুরে তাঁর মেয়েদের বলে যাওয়া “ভেবো না, অত ভেবো না মা/ আমি, আমরা, তোমার মেয়েরা/দেশে দেশে বয়ে যাব-/গাছ শব্দ আর প্রাণ/আমাদের ছাড়া জন্মাতেই পারবে না।” মৃত্যুকে হারিয়ে ওঠা এই স্থিতপ্রজ্ঞ বিশ্বাস এবার দেবারতির আধার হয়ে ওঠে, অন্ধত্বের সমস্ত অন্ধকার ছাপিয়ে একপিঠে নিকষা ও রাবণ ‘সমবয়সী, প্রায় একাঙ্গী’ হয় আর অন্য পিঠে বালিহাঁসের সন্তানজন্মে ফিরে আসে এক ডানাবিহীন মানবপুত্র। অনাগত সন্তানের মুখের ডৌল মিলেমিশে যায় ‘মর্মকুমার’-এ।

নাম জিজ্ঞেস করলে বলো মর্মকুমার
আমার শরীরে তুমি প্রাণ …
এক-একদিন শেষ রাত্তিরে চুল আঁচড়ে আঁচড়ে
শুকতারা ছুঁড়ে দাও আমার বিছানায়
তোমার বুকের দুধে আমার চোখমুখ ভিজে যায় –
তখন না কুমার না কুমারী
তুই শুধুই মর্ম।

এইখানে এসে দেবারতির কবিতার স্থিতি, আর কোনো শোক নেই, নেই কোনো সুতীব্র দাহন, সমস্ত বিষাদ এসে এখন এক সমতট কান্নার পাশে বসেছে। একহাতে তার স্বয়ম্বরমালা, অন্যহাতে ব্রহ্মাণ্ডের চেতন। পুরাণকথার মত তাঁর কণ্ঠে ভর করেন ‘শেষ দময়ন্তী’- “আমার অনন্ত স্বয়ম্বর, অনন্ত বিবাহ/সে শুধু তোমার সঙ্গেই।/ চন্দ্রসূর্যবায়ু চিরকাল সাক্ষী।/আমি ছেলেবেলা থেকে একটি একটি করে নক্ষত্র গাঁথছি –/ব্রহ্মাণ্ড আমার বরণমালা।/স্বামী, আমি দময়ন্তী, তোমাকে আলিঙ্গন করে/জীবনের যত কান্না আজ কেঁদে নিতে চাই।” একদিন যে পুতুল-ঈশ্বরের বুকে স্তন গুঁজে ত্রাণ দিতে চেয়েছিলেন, আজ সেই কামেশ্বর, মায়ার লীলা শেষ করে এই আলিঙ্গনের কান্নায় নেমে বাঁচেন। এও যেন এক অন্যতর স্নান। শরীর বিদীর্ণ করে ঘোর রক্তবর্ণ এক তারার জন্মলগ্ন তৈরি হয়। ক্রমে তাঁর খোঁপা ভরে ওঠে তারার ধুলোয়। কষ্ট কমে যাবার পর বুঝতে পারেন বড় কষ্ট হয়েছিল। সেলিম চিস্তির কবরে আলো নিয়ে আসা লোকটির মত, তাঁর মন “দেখতে পায় না, শুনতে পায় না এমন নক্ষত্র” হয়ে ওঠে; আমাদের অন্তরদীপ কিংবা “বাদুড়টাদুড়ের মুখ থেকে খসা পাকা ফল”-এর মধ্যে তফাত থাকে না আর। উলটে দেখার সেই আয়নার পথ এখন শূন্যপথে বিলীন। তারাদের মায়ের নাম জানতে জানতে, প্রশ্ন করেন “শূন্যতাকে তুমি কখনো মা বলোনি?” উত্তরে আবারও প্রশ্ন “পাতা ব্রহ্ম, লতা ব্রহ্ম, হাওয়া ব্রহ্মময়,/অদূরে তাকায় ব্রহ্ম, ব্রহ্ম কীসে হয়?… খুঁজে দেখব জড় প্রাণ কাকে,/নারী ও পুরুষ বিনা জন্ম-কর্ম এ জগৎ?/পুজো দেব কিচ্ছু-নার মাকে।” কে তবে এই কিচ্ছু-নার মা? যে নিজে শিশুজন্মের আগেই নিজেকে মায়ায় ঢেকে ফেলেছে আর বিনি সুতোর মালার মত প্রায় শূন্যে গাঁথছে তার সন্তানকে! নাকি অপেক্ষায় আছে সেই কল্পনার সন্তানের কথা বলতে শেখার – “তবু তোর জন্ম তো না হয়ে ওঠার গল্প না,/তুই কি জানিস আমবউলের চেয়ে মিষ্টি/ক্ষীরনদীর স্বপ্নের চেয়েও ইষ্টি তোর মায়ের দুধ/তোর মায়ের ভাষা, তোর জেগে ওঠার কল্পনা।” খোঁপা ভরে আছে তারার ধুলোয় (২০০৩) কাব্যগ্রন্থে এসে এই তো সেই মুহূর্ত, যেখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে একদিকে সৃষ্টি আর অন্যদিকে লয়, এক পাল্লায় শিল্প আর অন্যপাল্লায় ব্রহ্মাণ্ডের সার। মনে পড়ে দেবারতিরই স্বীকারোক্তির মত কবিতা সমগ্রের ভূমিকা অংশ “কবিতা নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, করতে চাই না, শুধু পৌঁছতে চাই সেই সমুদ্রের কিনারায় যার একদিকে জীবন ও শিল্প অন্য দিকে শূন্যতা যেখানে কল্পনা মুহুর্মুহু অবিরাম নিজেকে সৃষ্টি করে চলে। ঘটনাচক্রে আমার জীবনে কবিতার বিকল্প আর কিছু নেই, ওই একটিমাত্রই আমার পথ ও পাথেয়।” আর আমরা তো এও ভালো করে জানি, তাঁরই কথায়, “শব্দের খাতিরে আমি ‘একমাত্র’ লিখি নি, লিখি না।”

দেবারতির কবিতায় তাই ঋতু হয়ে যায় এক পৌনে এগারো বছরের মেয়ে। স্টেজের মায়াবিনীর অন্ধ হলে আর দোষ সাজে না। জীবনের পথে এগোতে এগোতে, চার দশক আগেকার প্রজাপতির মত এক বালক আর মৌমাছির মত এক বালিকা, স্নিগ্ধ বিকেলে, ভোরবেলায় হাত ধরাধরি করে বাগানে বেড়াবার মত করে শিউলি ফুল কুড়োয়। তারায় তারায় রুদ্রাক্ষের মালা ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়ে আকাশময়। “একটা সূর্যাস্ত থেকে আরেকটা সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেতে/অনেকক্ষণ সময় লাগে।” আকাশ তারায় তারায় টইটম্বুর হয়ে সমুদ্রে উপচে পড়ে। তখন জানি মুজবৎ পাহাড়ে হাওয়া দিয়েছে (২০১৩)। “দুঃখনদী, মৃত্যুনদী, হাসিনদী, স্বপ্ননদী/ শেষ হয়েও শেষ হয় না।” আর তাই পিঁপড়ের কষ্টের মত, কেঁচোর স্বপ্নের মত, সূর্য আর ঘড়ির সঙ্গমের মত, পুরুষ মৌমাছির মৃত্যুর মত কিংবা কান্নার জন্মস্থানের মত দেবারতির অনন্ত সেই জীবন, তিনি অনন্তর সঁপে দিয়ে যান অকবিতাকে এবং কবিতাকেও।

নিবন্ধকার পেশায় বাংলার শিক্ষক। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখার সূত্রে কবিতা জগতের কাছাকাছি থাকা প্রিয়তর কাজ। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.