আগামী ৩১ জানুয়ারি শুরু হবে সংসদের বাজেট অধিবেশন। চলবে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ দশদিন। এটিই হবে সপ্তদশ লোকসভার শেষ অধিবেশন এবং নরেন্দ্র মোদী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট। যদিও আসন্ন নির্বাচনের ফলে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণকে পেশ করতে হবে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের অন্তর্বর্তী বাজেট বা ভোট অন অ্যাকাউন্ট। আর সেটা হবে ১ ফেব্রুয়ারি। আয়-ব্যয়ের সম্পূর্ণ হিসাব, বিস্তারিত তথ্য, নতুন পরিকল্পনা ইত্যাদি – অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ বাজেট – সংসদে পেশ করার দায়িত্ব পাবে নতুন সরকার। যদিও অন্তর্বর্তী বাজেটে কোনো বড়সড় ঘোষণা হয় না, মোদী সরকার কিন্তু ২০১৯ সালের ভোট অন অ্যাকাউন্টে কিন্তু কর ছাড়ের কথা ঘোষণা করে দিয়েছিল। তাই অনেকেরই ধারণা, এবারও অন্তর্বর্তী বাজেটেই নির্মলা কিছু বড়সড় ঘোষণা করতে পারেন। ওদিকে বিরোধীপক্ষ তৈরি হচ্ছে সরকারকে নানাভাবে জব্দ করতে, পারলে কাঠগড়ায় তুলতে। গত শীতকালীন অধিবেশনে সংসদের নিরাপত্তা নিয়ে হইহই রব ওঠে সংসদের দুই কক্ষে। সংসদের মর্যাদা লঙ্ঘনের কারণ দেখিয়ে উভয় কক্ষ থেকে বরখাস্ত করা হয় ১৪৬ জন সাংসদকে। তাঁদের বেশির ভাগই নতুন অধিবেশনে আপনা আপনি ফিরে আসতে পারবেন নিজ নিজ আসনে। কিন্তু সবাই নয়।
সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে রেকর্ড সংখ্যক সাংসদকে বরখাস্ত হতে দেখা গেছে। এর মধ্যে লোকসভার সদস্য ১০০ এবং রাজ্যসভার ৪৬। কারণ তাঁরা কক্ষে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি এবং ১৩ ডিসেম্বর লোকসভায় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিষয়ে আলোচনার দাবি জানিয়েছিলেন। সরকারপক্ষ রাজি না হওয়ায় তারা ওয়েলে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। শীতকালীন অধিবেশন থেকে লোকসভার অন্য সাংসদদের সাসপেন্ড করা হলেও কিছু সাংসদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রিভিলেজ কমিটিকে। বরখাস্ত হওয়া ১৪৬ জন সাংসদের মধ্যে ১৪ জনের বিষয় পাঠানো হয় প্রিভিলেজ কমিটিতে। তাঁদের ভাগ্য নির্ধারিত হওয়ার কথা এই কমিটির সিদ্ধান্তেই। মনে করা হচ্ছিল তাঁরা সকলেই স্বকক্ষে ফেরত আসবেন। যেমন লোকসভায় কংগ্রেস দলের নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরীর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই হয়েছে। বাদ সাধল রাজ্যসভার প্রিভিলেজ কমিটির কোরাম।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
লোকসভার প্রিভিলেজ কমিটির সদস্য ১৪। তার চেয়ারপার্সন ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ সুনীল কুমার সিং। এঁর সভাপতিত্বে গত ১২ জানুয়ারি দুপুর তিনটে নাগাদ কমিটির মিটিং বসে। সেখানে তলব করা হয় কংগ্রেসের তিন সাংসদ – কে জয়কুমার, আব্দুল খালেক এবং বিজয়কুমার ওরফে বিজয় বসন্তকে। জানতে চাওয়া হয় তাঁদের বক্তব্য। সূত্র বলছে, তাঁরা নাকি নিজেদের আচরণের জন্য নিঃশর্তভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এরপর লোকসভার প্রিভিলেজ কমিটি এই তিনজনের সাসপেনশন প্রত্যাহার করার প্রস্তাব স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠানো হয়।
ওদিকে রাজ্যসভার প্রিভিলেজ কমিটির সদস্য দশ। তার চেয়ারপার্সন বিহারের জনতা দল ইউনাইটেডের হরিবংশ নারায়ণ সিং। গত ৯ জানুয়ারি দুপুর বারোটায় সেই কমিটির বৈঠক হয়। দেখা যায় সভাপতিকে নিয়ে উপস্থিত মাত্র তিনজন সদস্য। সিপিএমের একজন এবং বিজেপির সব সদস্য অনুপস্থিত। এগুলো কোনো গোপন তথ্য নয়। নিয়মানুযায়ী এসব রাজ্যসভার ওয়েবসাইটেই রয়েছে। কোরাম না হওয়ায় রাজ্যসভার ১১ জন সাংসদের বাজেট অধিবেশনে কক্ষে পদার্পণ করা আটকে রইল। ধরা যায় তাঁদের সাসপেনশন এখনো চলছে। এই লেখা লিখবার সময় পর্যন্ত রাজ্যসভার ওয়েবসাইটে পরবর্তী মিটিংয়ের কোনো খবর কিন্তু আপডেট করা হয়নি।
এ তো গেলো নিয়মের কথা, সর্বশেষ পরিস্থিতির কথা। কিন্তু ভাবার কথা, যে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও কি সরকার বিরোধীপক্ষের মুষ্টিমেয় সাংসদকে সামলাতে পারছে না? অতীতেও অশান্তি দেখা গেছে সংসদের দুই কক্ষে, অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে সরকারপক্ষের নেতারা, বিশেষ করে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, বিরোধী পক্ষের নেতৃত্ব এবং সাংসদদের সঙ্গে কথা বলে সমঝোতা করেছেন। মনে পড়ে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, প্রমোদ মহাজন, অনন্ত কুমার, রাজীব শুক্লার মত নেতারা তৎকালীন সরকারপক্ষের তরফে বিরোধী সাংসদদের মাঝে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা করতেন। নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান। সংসদীয় গণতন্ত্রে কি বিরোধীশূন্য সংসদ কক্ষ বাঞ্ছনীয়? অবশ্য অন্যদিকে বিরোধী দলেরও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়। বিরোধের জন্য বিরোধ বা অশালীন বিরোধিতাও কাম্য নয়।
প্রশ্ন শুধু আগামী দশদিনের নয়। আগামী দিনে নতুন সরকার কি নতুন আশা, নতুন প্রত্যাশা আনতে পারবে? কী রূপ হবে সংসদের?
‘ওদের বলতে দাও’ শিরোনামে বর্তমান পরিস্তিতি নিয়ে ২০ ডিসেম্বর পিআরএস লেজিসলেটিভ রিসার্চে কর্মরত চক্ষু রায় তাঁর মতামত লিখেছেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রে। তাঁর কথায় “সংসদে অচলাবস্থা নতুন নয়। আমাদের জাতীয় আইনসভায় রাজনৈতিক দল/জোটের ভূমিকা যা-ই হোক না কেন, বছরের পর বছর ধরে একটি পরিচিত গল্প চলছে। বিরোধীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক দাবি করে এবং সরকার এড়িয়ে যায়। আজ আমরা যে বিঘ্ন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখছি তা আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থায় বছরের পর বছর ধরে পদ্ধতিগত স্থবিরতার ফল।”
আরো পড়ুন বাদল অধিবেশনে সংসদকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হল
তিনি আরও লিখছেন “১৯৬০-এর দশকে সংসদ সদস্যদের দ্বারা আমাদের সংসদীয় কার্যক্রমে নিয়মিত ব্যাঘাত শুরু হয়েছিল। এঁরা ছিলেন স্বতন্ত্র সাংসদ, যাঁরা ভাবতেন যে তাঁরা যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এমন বিষয়গুলি তুলে ধরার পর্যাপ্ত সুযোগ দিচ্ছেন না কক্ষের প্রিসাইডিং অফিসার। তৃতীয় লোকসভার (১৯৬২-৬৭) সদস্য রাম সেবক যাদব এবং মণি রাম বাগরির মত সাংসদদের সংসদীয় রীতিনীতি মেনে চলার জন্য স্পিকার নিয়মিত সতর্ক করেছিলেন।”
পরিশেষে তাঁর অভিমত, “সাম্প্রতিক বিঘ্ন এবং সাংসদদের গণহারে সাময়িক বরখাস্ত করা আমাদের আইনসভার ঘুম ভাঙানোর ডাক হওয়া উচিত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে আলোচনার সর্বোচ্চ ফোরাম হিসাবে জাতীয় আইনসভার পরিচিতি বিপদের মুখে পড়েছে। সংসদকে বিতর্ক উৎসাহিত করার জন্য আরও ভাল সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। অন্যথায় এর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষয়ে যাবে।”
আবার লোকসভার প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল পিডিটি আচারি ২১ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান টাইমস কাগজে লিখছেন যে “শূন্য হাউস (কক্ষ) একটা বিরক্তিকর দৃশ্য।” তাঁর কথায় “সাংসদদের ঘনঘন সাময়িক বরখাস্ত সংসদের মত একটি মহৎ প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মের পক্ষে সহায়ক হতে পারে না।” তাঁর বক্তব্যের শেষদিকে তিনি জানাচ্ছেন, “যা প্রায়শই উপেক্ষা করা হয় তা হল হাউসে বিদ্যমান ভারসাম্যের অভাব। প্রায়শই হাউসের একদিকে যেমন গুরুতর অভিযোগ থাকে, তেমন থাকে অন্যদিকের অবজ্ঞাপূর্ণ প্রত্যাখ্যান। সিস্টেম আশা করে যে প্রিসাইডিং অফিসার হাউসে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। ঘনঘন সাংসদদের সাসপেন্ড করা সংসদের মত একটি মহান প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের পক্ষে অনুকূল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।”
এনডিটিভিতে সি আর কেশবনের ২ আগস্টের এক নিবন্ধ অনুসারে, সংসদ অচল করে দেওয়া শেষ হাতিয়ার হওয়া উচিত। তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান, একসময় সংসদে প্রতি বছর ১২০-১৪০ দিনের অধিবেশন হত, কিন্তু এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬০-৭০ দিনে। আরও জানান, এখন সংসদ চালাতে প্রতি মিনিটে ২.৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়। অথচ দুই কক্ষের গত বাজেট অধিবেশনে উৎপাদনশীলতা ছিল ৩৪% (লোকসভা) এবং মাত্র ২৪.৪% (রাজ্যসভা)।
শাসক ও বিরোধী পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে অন্য পক্ষকে এই অচলাবস্থার জন্যে দায়ী করে ফেলে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগামী দিনের দিকে তাকিয়ে কি নিজেদের অবস্থান থেকে একটু সরে আসা যায় না? এখন তারই প্রতীক্ষা। অন্যথায় যেমনটা চক্ষু রায় লিখেছেন, জনগণের আস্থা হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







