প্রবুদ্ধ ঘোষ

জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আমাদের ছেলে বা মেয়ে হলে ও কি কাস্ট সার্টিফিকেট পাবে?’

-মানে? ভাত আর ডিমের কুসুম মাখা গরাসটা মুখে তুলতে দু সেকেন্ড বেশি সময় লাগল আনন্দর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

-আমিও বুঝিনি। গোরা বলল, ‘না, মানে, শুনেছি যে বাবা বা মার মধ্যে একজন এসসি হলে তাদের বাচ্চা কাস্ট সার্টিফিকেট পায়, মানে রিজার্ভেশন’

-হুম। এবারে গরাস মুখে তুলতে আর অতিরিক্ত সেকেন্ড খরচ করল না আনন্দ। ডিমের সাদাটা দাঁতে কামড়ে বলল, তুই কি এইজন্যেই?

-শরীরটা কেমন করে উঠল। এতদিন পরে হঠাৎ এর’ম

-তুই কী যেন শিখবি বললি? কীসের ট্রেনিং। আমি টাকাটা রেখেছি আলাদা করে। বলিস আমায়। থমথমে অবস্থাটা কাটানোর চেষ্টা করল আনন্দ।

-হ্যাঁ, বলব। চিনির চোখ লাল, হালকা ফোলা।

আনন্দ এরপরে আঁচিয়ে, গামছায় হাত মুছে জেঠুর ঘরে গেল। ওষুধ দিতে হবে। আজ নিশ্চয়ই আটটায় প্রেসারের ওষুধ খায়নি। উফফ্‌। স্টেমেটিল-এমডি না খেলে মাথা ঘোরা বাড়বে আবার। বেরোতে হবে তারপর। টাইলসের কারখানায় পিওনের কাজ করে আনন্দ। ভিআইপি বাজার। বাইপাস। ফিরতে ফিরতে রাত। মা-বাবার ছবিতে হালকা ধুলো। রোজ মোছা হয় না। হাত দিয়ে একবার পুঁছে দিল। চিনির খাওয়া হয়ে গেছে। বাসন তুলে কলতলায় নামিয়ে রাখছে। রাতে ফিরে চিনি বা ও মেজে নেবে বাসন। এঁটো পেড়ে ঘরে যাবে চিনি। রেডি হয়ে বেরোবে। বারুইপুরে একটা গয়নার শোরুমে চাকরি করে। আনন্দ কিটোটা পায়ে গলিয়ে বেরোল ঘর থেকে। লাল্টির বাচ্চা হবে। ওকে আদর করে দিল গলায় হাত বুলিয়ে। গোঁফগুলো কী লম্বা। চোখ বুজে আদর খাচ্ছে। চিনি ওর জন্যে খাবার দেয় রান্নাঘরের কোণে। কিন্তু আজ তো ডিম হয়েছিল, ইশ, লাল্টি খেতে পাবে না। নাঃ, দেরি হচ্ছে। তখনই চিনির কথাগুলো মনে পড়ে খচখচ করল। এই অপমান ওকেও এতবার সইতে হয়েছে, এখন গায়ে লেগে পিছলে যায়। কিছু অবশ্য থেকে যায়। এসব ক্ষতের উপশম একদিন হবেই, আনন্দ জানে।

আনন্দর ফিরতে অনেক দেরি হবে আজ। পণ্ডিতজি ডেকেছে। জাগরণ মঞ্চের অফিসে। এই নিয়ে তৃতীয়বার পণ্ডিতজির সঙ্গে দেখা হবে। কম ভাগ্যের কথা! দেসাই স্যারকে বলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে। পণ্ডিতজি স্পেশাল প্ল্যান বলবেন। আনন্দকে হরিশদা কিছুটা বলেছে আগে। ক্রমশ সকালের কথাগুলো মাথায় চড়ছে আনন্দর। গোরাকে ও চেনে। ভদ্রঘরের। চিনির একটা হিল্লে হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত হত আনন্দ। ওর সব প্ল্যান এর’ম নষ্ট হয়ে যায় কেন? চিনি তো গেল শ্রাবণেই উপোস করল। ব্রত করে। শনিবার শনিবার ফেরার সময় কলোনির ওই জাগ্রত মন্দির থেকে সিন্নি নিয়ে ফেরে। আনন্দ এই যে পণ্ডিতজির মত মানুষের আশ্রয় পেয়েছে, তাতে কি কিচ্ছু বদলাবে না? চিনির মনখারাপ কমবে না? কবে একটু সুখের মুখ দেখবে? যতদিন না পুরোপুরি নিজেদের দেশ হবে, ততদিন এর’মই… আঃ। মাথাটা দপদপ করছে। আবার সেই শীত-শীত অস্বস্তি ফিরে এল?

#

জাগৃতি মুখোপাধ্যায়ের গল্প পড়েছে আনন্দ। এতদিন আসল ইতিহাস জানতেই দেয়নি কেউ? কীভাবে জবরদস্তি ধর্ম মেরেছে, মন্দির-মঠ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওদের জন্যই দেশভাগ আর খুন। রামনাথ স্বামীর বইতে লেখা আছে তুর্কিরা বাংলা দখল করতে আসার অনেক আগে থেকে সুফি-টুফিরা বাংলায় এক-ধারসে ধর্ম পাল্টে দিচ্ছিল। গান গেয়ে সম্মোহন করত। তারপর গরু খাইয়ে দিত, সুন্নত করিয়ে দিত বাচ্চাদের তুলে এনে। আনন্দর কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে রাগে। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রজাদের বাঁচাতে কিছু বর্ণের ভাগ তৈরি করে দিয়েছিল। সে তো নিজেদের ধর্ম বাঁচাতেই “ওরা কিন্তু ধরম কে নাম পে সব এক হ্যায়। আর আমাদের দেখ বেটা, বাস ভেদভাব।” পণ্ডিতজির কথায় ঘাড় নাড়ে আনন্দ। তরুণদা জাগরণ মঞ্চের লাইব্রেরি থেকে আনন্দকে বই পড়তে দেয়। আনন্দ কোনোদিনই বই-টই পড়ে না। ইস্কুলে পড়তেও বই পড়তে ভাল্লাগত না। আর, এখন এত বড় হয়ে, দোকানের কাজ আর মঞ্চের কাজ সামলে পড়া তো আরও বিরক্তির। তবু বাছা বাছা দু-একটা পড়ে। পণ্ডিতজি পড়তে বলে, তরুণদা পড়তে বলে। রাতে বাড়ি ফিরে নিভু নিভু আলোর ঘরে আসল ইতিহাস আর ওই বদমাশদের আসল রূপ পড়তে পড়তে শরীর গরম হয়। রক্ত টগবগ করে। সুমন সরকারের লেখায় পড়েছে ওরা কীভাবে জোর করে গরুর মাংস খাইয়ে ধর্মনাশ করত। দাঙ্গা লাগিয়ে বেছে বেছে মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে… জেঠু নিজে বলেছে – জেঠুর পড়শি দশরথ পালের বোন আর মেয়েকে ওরকম করেই। বিজয় স্যার রামভক্ত স্বামীর বইটা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “এসব ভুয়ো গল্পে বিশ্বাস করিস না আনন্দ। জাতপাতের বদমাইশি জানলে ধর্ম পুজোআচ্চাকে ঘেণ্ণা করবি”। আনন্দ তখন ক্লাস টেন। জেঠু পায়ের ব্যথায় তিনদিন কাজে যেতে পারেনি। চিনি মুখ ভার করে বসেছিল। পড়া পারেনি বলে দিদিমণি ওকে, “ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার, এরাও এখন দিগগজ পণ্ডিত হবে। লটারি হয়ে কত ক্ষতিই যে হল সরকারি স্কুলগুলোর” বলেছে ক্লাসে। প্রত্যেকটা শব্দ মনে করে করে বলেছিল চিনি। “জেনারেশন কী? ফার্স্ট মানে জানি। অনুশ্রী ফার্স্ট হয়।” আনন্দ জানত। বলেনি। আনন্দ বাবা-মার জন্য কাঁদত, ওই ছেঁদো দু কামরায় ভেপসে ওঠা টানাটানিতে কাঁদত। আনন্দ ইস্কুলের পরে ফুটবল খেলছিল। শুকনো ডাবের খোলা দিয়ে ফুটবল খেলত ওরা। মান্তু, আনন্দ, প্রতিম, কাকা, কবীর। ওদের দেরি হয়ে যাচ্ছিল কোচিংয়ে যেতে। পিনাক স্যারের কোচিংয়ে সায়েন্স গ্রুপ পড়ত প্রতিম, কাকা, কবীর। ওখানে নাকি জয়েন্টের অঙ্ক করায়, খুব দামি কোচিং। আনন্দ ওসব লোভ ছেড়ে দিয়েছিল কবেই। জেঠু কাজে যেতে না পারলে… সামনে মাধ্যমিক… পাস করে একটা চাকরি… ওদের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। কানে এসেছিল কবীরের মা আর প্রতিমের মায়ের কথা

-ওর আর চিন্তা কী? কোটা আছে। জয়েন্ট, চাকরি সব বাঁধা

-হ্যাঁ রে শম্পা, যা বলেছিস। সোনার চাঁদ সোনার টুকরোদের চিন্তা কিসের? আমাদের ভাগ্যটাই খারাপ।

-কী যে দরকার বাপু রিজার্ভেশনের, বুঝি না। আরে, আমাদের পাড়ার ঝর্ণা টুডু সরকারি চাকরি করে। ওর বরও কোটা। বড় অফিসার। তার মেয়েও কোটায় চান্স নেবে। যত্তসব

-সেই যে মণ্ডল-ফণ্ডল কী একটা কমিশন হল। ব্বাবাঃ, ঢং দেখে বাঁচি না। তেলা মাথায় তেল দেওয়া। আর, আমাদের ছেলেরা জেনারেল বলে না খেতে পেয়ে মরবে।

-এই মান্তুর মা, তুমি সেদিন বলছিলে না যে, ওই কোটার ডাক্তারটা কেমন ভুল ডায়াগনসিস করেছিল! বলো বলো সুচন্দ্রাকে বলো

সন্ধে হয়ে আসছিল। শীতের বিকেল পাঁচটা দশেই সন্ধে নামিয়ে দেয়। শীত বাড়ছিল আনন্দর। আত্মবিশ্বাস ক্ষইয়ে দেওয়া শীত। মন ক্ষইয়ে দেওয়া শিরশিরে চোরা হাওয়া। শীত পেরিয়ে বসন্ত আসার আলো কোত্থাও দেখতে পাচ্ছিল না। মুখভার ধূ ধূ চোখের আনন্দকে একটা হলদে মলাটের বই থেকে পড়ে শুনিয়েছিলেন বিজয় স্যার। লোকটা যে সংবিধানের বাইরেও বই লিখেছে, তখনই তো জানল। ভাল লেগেছিল শুনে। কিন্তু ওই জ্বরো শীত প্রায়ই আসত। আনন্দ বুঝেছে ওসব বই-ফই শীত কাটাতে পারে না। ফিরে ফিরে আসে। স্যারের বলা ইতিহাস মনে পড়লে আনন্দর এখন হাসি পায়। ওই আম্বেদকরই তো বৌদ্ধ হয়ে নিজের ধর্মের পিঠে ছুরি মারল। হরিশদা সব বলেছে। বিজয় স্যারের কথাগুলো তখন খুব ভরসা জোগাত। কিন্তু ভাগ্যিস আনন্দ নাস্তিক হয়নি। স্যার নাস্তিক ছিল বলেই ওসব বলত। আশিস ওকে ভিডিও পাঠিয়েছে মোবাইলে – কমুনিস্টরা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মাথা বিষিয়ে দিয়ে দেশদ্রোহী করে দিচ্ছে। আচ্ছা, স্যারও কি সের’মই চাইত? পণ্ডিতজির কথা শুনে তো সের’মই মনে হয়েছে। কিন্তু, মন খচখচ করে। না, না, বিজয় স্যার ওর’ম না। ইশ, স্যারকে যদি ওই ভুয়ো দুনিয়া থেকে টেনে বার করা যেত। একবার অন্তত

#

লাল্লা আরওয়ালের। দু দশক হয়ে গেল হাজিপুরের কাঠের কারখানায়। লক্ষ্ণণপুরে ভূমিহারের মার খেয়ে রাজু সিং আর ভগবতিয়া পালিয়েছিল। নইলে কবুতরি, চুন্নি, বিজেন্দর, মনমতিদের মত লাশ হয়ে যেত। হাজিপুরে একটা যেমন তেমন ঘরে মাথা গুঁজে দিন গুজরান। লাল্লাকে বাল সঙ্ঘ স্কুলে দাখিল করে দিয়েছিল মিশ্রাজি স্বয়ং। পড়েছিল কয়েক বছর। তারপর কাঠের কাজ। লাল্লা ভাল মিস্ত্রি। কিন্তু, দু-তিন গ্রামের কাঠের কাজ করে কীই বা হয় আর? ক্ষেতিবাড়ি তো চুকে গেছে কবেই। ওই মজদুরিই ভরসা। তবে, বাল সঙ্ঘ স্কুলে অনেক কিছু শিখেছিল লাল্লা। পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও সেগুলো ভোলেনি। মিশ্রজির কাছে লাল্লার এত কৃতজ্ঞতা! আর, পণ্ডিতজির সঙ্গে দেখা হওয়ার নসিব কজনের হয়? লাল্লার দেখা হয়েছে তিনবার। পণ্ডিতজি বসে ছিলেন বেদিতে। আহা, দেওতা। লাল্লা পণ্ডিতজির পায়ের একটু দূরে মাটিতে মাথা ছুঁয়েছিল। হাতে কী সুন্দর একটা ফুল আঁকা কাপে সুগন্ধি চা। পণ্ডিতজির হাসির জন্যেই কি অমন সুন্দর লাগছিল পরিবেশ, নাকি চায়ের গন্ধে? মিশ্রাজিও ওর’ম একটা কাপে চুমুক দিতে দিতে হেসে হেসে মাথা নাড়ছিলেন। লাল্লা আগে কখনো এমন ইজ্জত পায়নি। এত সাজানো ঘর, দেওতার মত পণ্ডিতজি। মাটির ভাঁড়ে চায়ে চুমুক দিতে দিতে অবাক হয়ে পণ্ডিতজির কথা শুনছিল লাল্লা। লাল্লা যে চিকেন দো-পেঁয়াজা খেতে এত ভালবাসে, সেটা জেনে পণ্ডিতজি রাগ করলেন না। মিশ্রাজি ভয় দেখিয়েছিল, এসব বললে নাকি পণ্ডিতজি রাগ করবেন। “পহলে অ্যায়সে কিঁউ নহি সোচা?” এত ভাল কাজ শিখেও পসার জমাতে পারে না কেন? হাজিপুরের সবচে বড় কাঠের দোকান শওকত আলির। লাল্লা একদিন লছমিকে নিয়ে বড় কাপড়ের দোকান থেকে শাড়ি কিনে দিতে গেছিল। আতিফ চৌধুরীর দোকান। ধারে দিল না কিছুতেই। ভাগিয়ে দিল। লছমির সামনে ইজ্জতের একশো আট। পণ্ডিতজির এত খোয়াব লাল্লাকে নিয়ে? হাত কচলে সামনে ঝুঁকে দাঁড়ায় লাল্লা। আকর্ণ হাসে। আর নিচু লাগছে না নিজেকে।

ইস্কুলের বন্ধুদের একটা গ্রুপ আছে হোয়াটস্যাপে। সেখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে তন্ময়। আনন্দর কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। আনন্দর স্মার্টফোনই ছিল না। সেই একটা চাইনিজ ফোন নিয়েছিল বনির দোকান থেকে, তাও সেকেন্ড হ্যান্ড। ধ্যাদ্ধেড়িয়ে চলত। পরেরটা নতুন তবে সস্তার। হরিশদা এই ফোনটা দিয়েছে ওকে। দামি ফোন। ন-দশ হাজার তো হবেই। সেই প্রথম হোয়াটস্যাপ ব্যবহার আনন্দর; হরিশদাই দেখিয়ে দিয়েছিল। বাইপাসে হঠাৎই দেখা, তন্ময় বার থেকে বেরিয়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে। অত বছর পরেও চিনতে পেরেছে। এক বেঞ্চে বসেছে ফাইভ থেকে সেভেন। তবে, তন্ময় গ্রুপে ঢুকিয়ে দিলেও আনন্দ সাড়াশব্দ কম করে। মাঝে মাঝে ‘এই মেসেজটা শেয়ার করলে দু’দিনের মধ্যে ভাল খবর আসবেই’ ছবি ফরোয়ার্ড করে। একবার প্রতিম হ্যাটা করে রিপ্লাই দিয়েছিল। প্রতিম এখন সিঙ্গাপুরে চাকরি করে। ওর আর কিসের অভাব? ও কী করে বুঝবে এই মেসেজগুলো শেয়ার করে আনন্দ কতটা উতল হয়ে অপেক্ষা করে একটা ভাল খবরের। ওঃ, পণ্ডিতজির সঙ্গে প্রথমবার দেখা হওয়ার আগের রাতে গণেশের লাড্ডু খাওয়ার ছবিটা শেয়ার করেছিল! অনুর মায়ের কাছে শুনেছিল বুধবার নিরামিষ খেয়ে পাঁচমাথা গণেশের মূর্তি ঠাকুরের আসনে রাখলে রেজাল্ট ভাল হবেই – চিনি মাধ্যমিকটা উতরোতে স্বস্তি পেয়েছিল আনন্দ। আরেকবার গ্রুপে ওর পাঠানো একটা ভিডিও, যেখানে পাথর ছুঁড়ে গাড়ি জ্বালিয়ে পথ অবরোধ করছে মুসলিমরা, সেটা নাদিম ডিলিট করে দিয়েছিল, বলেছিল ফেক। পিরীত তো উথলে উঠবেই, আনন্দর গা কষকষ করছিল। খারাপ লেগেছিল দীপ ছাড়া বাকিরা কেউ কিছু বলল না দেখে। দীপ লিখেছিল বহরমপুরে ওর অফিসের পাশেই থানা। বেফালতু কারণে কী হুজ্জুতি করেছে ওরা। আনন্দ অন্য গ্রুপে ছবি, ভিডিও পাঠায়। সেদিন তথাগত একটা ছবি শেয়ার করেছিল। একটা পেটমোটা লোক, গায়ে এসসি/এসটি লেখা, সে নিজের গ্লাসের জলও খাচ্ছে আবার পাশের রোগাভোগা লোকেদের গ্লাসের জলও খাচ্ছে। রোগাভোগা লোকগুলোর গায়ে জেনারেল লেখা। আনন্দ টাইপ করেছিল, “ভেদভাব তৈরি করে আমাদের তাকত আলগা করতে এগুলো”… পাঁচ মিনিট পরে মান্তু লিখেছিল, “কী রে, আনন্দ কখন থেকে টাইপ করছিস। কী বলবি বলে ফ্যাল।” আনন্দ ব্যাকস্পেস মেরে মুছে দিয়েছিল অক্ষরগুলো। পাঠায়নি। কী হত পাঠিয়ে? কেউই বুঝত না। বাওয়াল হত। তথাগত আর মান্তু কিছুক্ষণ কথা চালাচালি করল। অনিরুদ্ধ, ফার্স্ট বয় ছিল, লিখল মেরিট না থাকলে কোটাই ভরসা। আগের সপ্তাহে দেসাই স্যার নারকেলডাঙ্গায় একটা বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন। ওর’ম একটা শান্তভদ্র হিন্দু পাড়ায় ধড়াক করে ফ্ল্যাট উঠে গেল – প্রোমোটার ওই জঙ্গি গুষ্টির। পাশেই রাজাবাজার। একটু একটু করে এলাকা বাড়াচ্ছে ওরা। জমি-চাকরি সব হাতাচ্ছে। আনন্দ গরিব হয়ে যাচ্ছে। তবে আনন্দ প্রতিবাদ করেছে। কলোনির ক্লাবের পাশে যে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠছে, তার একটা ফ্ল্যাট মুসলিম ফ্যামিলি কিনছিল। আনন্দ আর সুজন প্রোমোটারকে ধমকে ঝামেলা করে আটকেছে। প্রথমে একটা তারপর দলে দলে ঢুকবে – ওসব হতে দেবে না আনন্দ। কাউন্সিলরটা ঘুষখোর, কিন্তু এলাকার অনেককে পাশে পেয়েছে। পণ্ডিতজি শাবাশি দিয়েছে। নাঃ, আনন্দ কিচ্ছু বলবে না এখন। আনন্দর মেরিট নেই? পারবে তো আনন্দ পণ্ডিতজি, হরিশদার ইজ্জত রাখতে?

“কুছ তো কাম কর, সালা কামচোর। যা নিচে সে হরে রঙ্গ কা ফাইল লেকে আ”। বিজয়েন্দ্র দেসাইয়ের ধাতানিতে আনন্দর প্ল্যান ধাক্কা খেল। শুকনো ঠোঁট দুবার চাটল। মুখটা মুছে ফাইল আনতে নামল। দেসাই স্যার ওকে কেন পছন্দ করে না কে জানে। কেমন দুচ্ছাই করে সুযোগ পেলেই। ইদানীং ঝুটঝামেলা কি বাড়ল? পাঁচলায় আজাদ আলির ঘরে ঢুকে দু-একটা বাসন আর টিভি ভাঙা, ওকে আর ওর বাবা-মাকে নাকে খত দিয়ে ভিডিও করানোর পর থেকেই কি সময়টা টাল্লি খাচ্ছে? দেসাই স্যার মুখ করল। চিনির দোকানের মালিক দোকান সরিয়ে নেবে অন্য জায়গায়; চিনিকে আর রাখবে কিনা ঠিক করে বলেনি এখনো। আজাদ নাকি ম্যাচের দিন ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কমেন্ট লিখেছিল। ঠাকুরদেবতা নিয়ে আলবাল কীসব লিখেছিল ফেসবুকে। তোতোন, কেশব, তরুণদা সের’মই বলল তো। আজাদের মা খুব হাতে পায়ে ধরে কাঁদছিল সেদিন। শাপমন্যি করল নাকি? জেঠু তার পাঁচদিন পরে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে কাঁধে আর কোমরে খুব চোট পেয়েছে। ঠাকুর, একটু দেখো। আমি তো কোনো পাপ করিনি। দেসাই স্যার কেমন কুত্তা-বিল্লির মতো করে। সব ঠিক করে দাও ঠাকুর।

#

শিঞ্জিনীর সঙ্গে আনন্দর আলাপ ক্লাস নাইনে। অঙ্ক কোচিং। ওই একটাই কোচিংয়ে যেত আনন্দ। তাও বিজয় স্যার আনন্দর থেকে টাকা নিতেন না বলেই। আনন্দ বুঝত ওকে স্নেহ করেন। ভৌতবিজ্ঞান আর জীবনবিজ্ঞান দেখিয়ে দিতেন সময় পেলে। ভাল নম্বর ওঠেনি মাধ্যমিকে। ইলেভেনের পরে আনন্দ আর পড়ল কই? জেঠু আর পারছিল না টানতে। সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করত প্রাইভেটে। পায়ের হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার রোগ হল। দশ ঘন্টা করে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পায়ের হাড়ের ফাঁকে রস কমে যাচ্ছিল। ডাক্তারের বারণকে পাত্তা না দিয়ে তাও দুবছর কাজটা করেছে জেঠু। তারপর এক রাত্তিরে অসহ্য পা ব্যথা নিয়ে ফিরল। “শোনো, এরপর আর একদিনও ওই পাহারাদারের কাজ করলে পায়ে অপারেশন করতে হবে। লাখ দুয়েকের ধাক্কা। পারবে তো সামলাতে?” ডাক্তারের কথাগুলো বিঁধে যাওয়ার পরে আনন্দ এক সপ্তাহ সময় নিয়েছিল। তারপর ঢুকে পড়েছিল একটা কাপড়ের দোকানে। সামান্য টাকায়।

অদ্ভুত এই যে শিঞ্জিনী ওর সঙ্গ ছাড়েনি। হীরালাল কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ইংরেজি অনার্স। আনন্দর সঙ্গে দেখা হত সপ্তাহে তিনদিন। শিঞ্জিনী আনন্দকে বলত নাইট কলেজে ভর্তি হতে। গ্র্যাজুয়েট হয়ে গেলে ভাল চাকরি হবে আরও, তারপর শিঞ্জিনী চাকরি পেয়ে গেলেই বিয়ে। শিঞ্জিনী যে কেন অত ভালবাসল আনন্দকে। আনন্দ জানে মেয়েরা কেমন, কিন্তু শিঞ্জিনী অন্যদের মত ছিল না। নাঃ, নাইট কলেজ-ফলেজ সম্ভব হয়নি। সেলসম্যানের চাকরি, দশ-এগারো ঘন্টা পার হয়ে যেত। তারপর ঠিক চেনা বাসস্ট্যান্ডে দেখা হত। শিঞ্জিনী দাঁড়িয়ে থাকত ওর জন্য। আনন্দর সব ক্লান্তি ধুয়ে যেত তখন। খারাপও লাগত। সামান্য সেলসম্যান। হাঁ-মুখ সংসার। বোন ইস্কুলে পড়ে। জেঠু আধা-পঙ্গু। শিঞ্জিনী বড়লোক না, তবে স্বাচ্ছন্দ্য স্বচ্ছলতা এসব আছে। শিঞ্জিনী কেন যে… “অমন ব্যাজার মুখ করার কী আছে? সব ঠিক হয়ে যাবে।” শিঞ্জিনীকে বলেছিল বস্তিজীবন। টালির ঘর দু কামরা। বাবা-মার ফটোয় ধুলো জমছে। জেঠুর ঝাপসা দৃষ্টিতে খেদ, খেদ আর খেদ। বোনের মাধ্যমিক পাশ হলেই একটা ব্যবস্থা যদি। শিঞ্জিনী সামান্য কফিগুঁড়ো উপরে ছড়ানো দশ টাকার চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলত, “আরে, অত চিন্তার কিছু নেই। আমি গ্র্যাজুয়েশন আর মাস্টার্স করে নেব। ততদিনে তোর প্রমোশন… সব ঠিক হয়ে যাবে”। ওর পরিবারের কী এক কেলোর কীর্তি বলার সময়ে আনন্দ হঠাৎ আবিষ্কার করেছিল শিঞ্জিনী ওর মাসির ননদের ভাইঝি। তারপর সন্ধে পেরিয়ে দু কামরায় ফিরতে ফিরতে গলিটাকে এঁদো লাগত। স্ট্রিটলাইট ঝুলকানা মনে হত। নিজের কামরাকে মনে হত রণক্লান্ত সেনার অস্থায়ী বাঙ্কার। শিঞ্জিনীর সঙ্গে কাটানো ওই ঘন্টা দুয়েক সময় অনেক অনেক বছরের অক্সিজেন ভরে দিত ফুসফুসে।

-সে তো আমরাও বাঙাল। ভাগ-ফাগের অনেক আগে থেকেই কলকাতায়। বুবলির বাবারা ঘটি। তা তোমার ঠাকুর্দা নিশ্চয় জমিজমা ছেড়ে এসেছিল? ইশ, আমাদের জানো ফরিদপুরে কতবড় বাড়ি, পুকুর, বাগান ছিল…

আনন্দ শিঞ্জিনীদের বাড়ি দেখে আশ্বস্ত হয়েছিল। অত বড় না তা’লে। একতলা। তিনটে ঘর। ছাদ আছে। গোছানো বেশ বাড়ির ভেতরটা। তবে, ঝাঁ চকচকে ফার্নিচার অত নেই। ওদের সঙ্গে যতটা পার্থক্য ভেবেছিল, অতটা না। যাক

-না, আমাদের ওসব ছিল না। আমি জানি না। জেঠুর মুখে শুনেছি। নাঃ ওসব কিছুই না। ঠাকুর্দা চাষ করত।

-অঃ। ব্বাবাঃ, বুবলি এসব বলেনি তো। আমি ভাবলাম… তোমাদের টাইটেল কী?

-আপনারা বুলিমাসির আত্মীয় তো, না? মানে, বুলিমাসির ননদ শিঞ্জিনীর পিসি…

-ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই। কোন অজাত কুজাতে বিয়ে করবে, তারপর টাকা চাইবে বিপদে পড়ে। ওসব অনেক কেচ্ছা। তুমি বুঝবে না। তোমরা কী যেন?

-রায়

-আরে, রায় সব জাতের হয়। বামুন হয়। কায়স্থ হয়। আবার সিড্যুল কাস্টেরও হয়। মণ্ডলও কিন্তু তাই। সব মণ্ডল কিন্তু এসসি না, জানো তো?

মেঘ জমছে টের পেয়েছিল আনন্দ। এসব বুঝতে সময় লাগে না ওর। ছোট থেকে কম শোনেনি। কম দেখেনি। ডিমভাজা আর ঘুগনিটা খেয়েছিল। আঃ চমৎকার রান্না, টাগরায় স্বাদ নিল। আনন্দ মায়ের হাতের রান্না খায়নি। মানে খেয়েছে, কিন্তু মনে নেই। অত ছোট বয়েস, তখনও ভূতের ভয়, তখনও নিজে খেতে পারত না, মা চলে গেছিল। বোন অবশ্য খুব ভাল রাঁধে। কিন্তু মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ কীর’ম হয়, শিঞ্জিনীর মায়ের হাতের ঘুগনি খেয়ে বুঝেছিল।

-এই তুইও ওর’ম দুর্দান্ত রাঁধিস তো? নইলে কিন্তু ব্রেকাপ

ব্রেকাপ বানানটা হাতড়াচ্ছিল আনন্দ। তখন ১১ টাকায় একশোটা এসএমএস দিত। ওই লঝ্‌ঝড়ে ফোনটা ছিল। মন্টুর দোকান থেকে এসএমএস প্যাক ভরিয়ে নিয়েছিল আনন্দ।

-শোন না, আগামীকাল একবার দেখা করবি?

-কাকিমা কী ভাল! কত স্নেহ করলেন আমায়। মাকে তো অত মনে নেই। কিন্তু আজ বুঝলাম। আসব কাল।

পরেরদিন একটু আগেই কাজ গুটিয়ে, মানে এক কাস্টমারের বাড়ি যাওয়া কাটিয়ে শিঞ্জিনীর সঙ্গে দেখা করেছিল। স্বাভাবিক কফি-মেশানো-চা। একটা চিকেন কাটলেট দুজন ভাগাভাগি করে খাওয়া। ওর ইংরেজি অনার্সের ক্লাসে নতুন কোন জুনিয়র প্রফেসরকে দেখে হ্যাল খেয়েছে, তাই নিয়ে হাসিঠাট্টা। সাতটা বাজতে দশে, উল্টোদিকের বাসে ওঠার আগে শিঞ্জিনী বলেছিল, “শোন না, আর দেখা করা হবে না, বুঝলি? মানে, দেখা না করাই ভাল। মা-বাবা কিছুতেই… ভাল থাকিস”

আনন্দ সেদিন একটা বাসের সামনে পড়তে পড়তে, দুটো চারচাকার ড্রাইভারের কাছে খিস্তি খেয়ে জ্বরো রুগির মত বাসায় ফিরেছিল। যে বাসার একটা কামরার বাল্ব কাটা, আরেকটা কামরায় দপদপে টিউবের আলো জ্বলে। দুদিন পরে গাব্বু ঠেকে নিয়ে গেছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে জগৎ সিনেমার সামনে একটা দামড়া রাঁড় তুলেছিল। বয়েস চল্লিশ পার। ওদের সব চেনাজানা হোটেল থাকে। সস্তার। ওর ডানদিকের পানের ছোপঅলা ভাঙা দাঁত আর থুতনির নিচের জরুল চোখে পড়তেই হঠাৎ মনে পড়েছিল শিঞ্জিনীর মায়ের দাঁতে চাপা শব্দগুলো। “বুবলির ঠাকুর্দা হুগলির। তিনঘরের কায়েত। আমাদের পরিবারে কেউ…”। টাকাটা গচ্চা গেছিল। প্রথমে উক্কি উঠছিল। তারপর আলগা কিছু কসরৎ। কয়েক মিনিটে হড়াৎ করে বেরিয়ে নেতিয়ে গেছিল। আরও অন্ধকার, আরও বিষণ্ণতা। তিনদিন দোকান কামাই করে গুপ্তাজির খিস্তি খেয়েছিল আনন্দ। এরপর থেকে সন্ধেয় অনেকটা সময় বেঁচে যেত ওর। গাব্বুর সঙ্গে, টুকাইয়ের সঙ্গে কয়েকদিন এর’ম ঘুরতে ঘুরতে আনন্দ সামলে উঠেছিল। তখন কীর’ম একটা লক্ষ্যহীন ষাঁড়ের মত ঘুরে বেড়াচ্ছিল আনন্দ। চিনি খাবার সাজিয়ে বসে থাকত, জেঠু ঘষা চোখ নিয়ে ভাগ্যকে দুষতে দুষতে কাশত। এখন লক্ষ্য পেয়েছে আনন্দ, স্থির লক্ষ্য। গাব্বু কাউন্সিলরের পা চেটে ভালই বাগিয়েছে আর টুকাই সেলসম্যান। কালেভদ্রে চোখাচোখি, আলগা কথা হয়। চিনি ওই প্রসঙ্গ তোলায় তেতো হয়ে গেল জিভ। শিঞ্জিনী সবই জানত। আনন্দর দুঃখ, আনন্দর ডুম-জ্বলা দু কামরা। তবু এমন হঠাৎ ছেড়ে গেল? সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। ওতে জীবন পানসে হয়ে যায়। কে যেন বলেছিল?

এসব বিকেলে বড্ড হাওয়া দেয়। দিন বাড়ছে। গরমের দুপুর পেরিয়ে কালবৈশাখীর মেঘ মাঝে মাঝে। সব মেঘে বৃষ্টি হয় না। তেমনই এক দ্বিধাগ্রস্ত মেঘ উড়িয়ে দেওয়া হাওয়ায় ঘুম পাচ্ছে আনন্দর। সেই বাইপাস থেকে রুবি রাসবিহারী ধর্মতলা হয়ে হাওড়া। ছোট ব্যাগটা আঁকড়ে হাই তুলল আনন্দ। এত ঘুম এল কোত্থেকে? মনে পড়ল, আরেঃ! গোরারা দত্ত। তাই অমন প্রশ্ন করেছে চিনিকে। দুঃখ পেয়েছে। ধুস। এদের নিয়ে এই মুশকিল, এরা কেউ অন্য ধর্মের পরানো পট্টি খুলতে জানে না। কে বোঝাবে যে, আমাদের ধর্মে এসব ভেদভাব ছিল না। যে ভাল কাজ তো ভাল প্রতিষ্ঠা। আনন্দও নিশ্চয় অনেক উঁচুতে জায়গা করে নেবে একদিন, খুব হাওয়া দিচ্ছে। হাওয়ায় পতাকা উড়ছে। আনন্দ পতাকার দড়ি ধরে উঠতে যাচ্ছে, প্রতিমের মা বলছে “কোটায় চান্স পেয়ে উঠছে, দ্যাখ দ্যাখ”। বিজয় স্যার পতাকাটা ছিঁড়ে দিতে হাত বাড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, “এগুলো ফালতু। লাথি মেরে হাটা”। আনন্দ পিছলে যাচ্ছে পতাকা থেকে।

#

বিজয় স্যার মুড থাকলে অনেককিছু বলতেন। স্যারদেরও চলে আসতে হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তখন অবশ্য দেশভাগ হয়ে গেছে। বিজয় স্যারের বাবা অবশ্য ওখানেই পড়াশোনা করেছেন। ম্যাট্রিক দেওয়ার পরে কলকাতায় এসেছিলেন। আটান্ন-ঊনষাটে। বিজয় স্যারের জন্মকর্ম এখানেই। “সে ছিল বিষয় আশয়। ধুস, ওসব মনে রেখে কী হবে?” স্যার উড়িয়ে দিতেন আনন্দর প্রশ্ন। জেঠুর চোখ জ্বলে উঠত। তারপর নিভে আসত। রোদ্দুর পড়ে আসা অঘ্রাণের বেলা যেমন অক্ষম তেজে জ্বলে উঠেও আস্তে আস্তে শিশিরের গন্ধের দিকে যায়। ঝরাপাতার গান শুনতে পায়। “কাশেম আছিল সারওয়ারের চ্যালা। সারওয়ার কি কইত জানস সভায়? ‘ইন্দুদের শরীল তেলতেইল্যা মোডা-সোডা কিয়ার লাই? ভাইছাব, আম্মেরা যে চিয়ন চিয়ন চাইল হদাস করেন, হেইগুন অরা খায়’ কাশেম বারাইয়া পড়ত লাশ ফালাইতে”। ’৪৬ সাল। খিলপাড়া গ্রামের ভাগচাষী হরেন রায় পালাচ্ছিল তখন। নারাণপুর গ্রামের সুরেন বসু খুন হয়ে গেছে। পাঁচগাওয়ের জমিদার ধর্ম পাল্টে ফেলেছে। ভাগচাষী হরেন রায়কে বাঁচাতে আর কে আসবে? আনন্দর চোখের সামনে ওই দৌড়, রক্ত, মুখ থুবড়ে পড়া, পালানোর ছবি। “আঁইটতে আঁইটতে ঠ্যাং বিষ অই গেছে। তবু হগগলে আঁইটছি।” পালাতে পালাতে কানাইনগর। “তওনো দ্যাশ আছিল, জানস?” দ্যাশ ক্ষইছিল। ভিটে গেছিল এক দাঙ্গায়। আবার নতুন জমিতে ক্ষেতমজুরি। পেট-কাপড়ের টান বাড়ে। ’৬৪-তে আবার দাঙ্গা। আবার পালানো। এবার শুদ্দুরপাড়ায় আগুন দিল ওরা, দখল। জেঠু বলে। আগুনের তাত গায়ে লাগে আনন্দর। পোড়াতে পোড়াতে ধুবুলিয়া ক্যাম্প। সেখানে কয়েকমাস ধুঁকে ঠাকুমা মারা গেল। তারপর দক্ষিণ শহরতলির কলোনি। ননীদাদু কমুনিস্ট করত, কলোনির একটা পরিবার বিষ খাওয়ার পরে হরেন রায়কে ওই দরমা-টিনের দু কামরায় বসিয়েছিল। ভাগচাষী থেকে কাঠবেকার। কলোনিতে এসে ঝিমিয়েই থাকত। তবে, রিজেন্ট কলোনির জমিতে জুম্মন আলির বাড়ি দখল করতে যাওয়ার সময়ে কী জোশ! জেঠু হাসত। তারপরেই বিড়বিড় করে বলত ঠাকুর্দা কেমন ধুঁকতে ধুঁকতে দুবছরের মধ্যেই… স্মল টুলস কারখানায় ছোট কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল। ‘হক্কলডি কাইড়্যা নিছিল অরা’ – জেঠুর ছানি চোখ আরও ছানি-পড়া অতীতের বুক খুঁড়ে বেদনা বের করে আনন্দর সামনে রাখত। ছানি-চোখ আর ঠিক হবে না। ডান চোখেও ছানি আসছে। এটা অপারেশন না করতে পারলে অন্ধ। আনন্দ বাঙাল লব্জে কথা বলে না। ছোটবেলায় বলত। বাসায় সবার বলা শুনে শিখে গেছিল। মিষ্টুর জন্মদিনে আনন্দকে গোল করে ঘিরে মিষ্টু, পান্তু, বুবাই, বাপ্পারা হাসছিল, “বাঙ্গালো, কেক খাইলো, মিষ্টি খাইলো, রস খাইলো, ভাঁড় ভাঙ্গিলো, টাকা দিলো নাআআআআ”। আনন্দর লব্জ শুনেই ওরা হেসে কুটিপাটি। আনন্দর এখনো মনে আছে ‘নাআআআআ’ বলে যে সুর টেনেছিল পান্তু আর মিষ্টু। মিষ্টুর বাবা জেঠুর কারখানায় ফোরম্যান ছিল। আরেকটু বড় হয়ে টুবলুদার মুখে শুনেছে, “এঃ ম্যাঃ! এসব ভাষা ইন্ডিয়ায় বলে না। বাংলাদেশিরা বলে এসব – আইসে খাইসে ক্যান য্যান। তুই ইন্ডিয়ান না? তুই বাঙালি না?” আনন্দ কুঁকড়ে যেত। টুবলুদা তখন ফুলপ্যান্ট ধরেছে সবে, আনন্দকে ডাকত বাড়িতে। বিলিতি বই খুলে ছবি দেখাত। সিগারেট প্রথমবার। আনন্দ ভুলতে চেয়েছিল হরেন রায়ের ভাষা, জেঠুর আক্ষেপের ভাষা। আনন্দ ইন্ডিয়ান। বেগাঁউয়া পরদেশি না। কিছুতেই না। “দেশের পশ্চিমে ভাগ আর দাঙ্গা ওই একবারই হয়েছে। কিন্তু পুবে ভাগাভাগি আর দাঙ্গা মেটে না। একটা গল্প শুনবি?” বিজয় স্যার বলেছিলেন। আনন্দর অত মনে নেই। কিন্তু রক্তপাত যে থামেনি, থামবে না তা বেশ বোঝে। বিজয় স্যারের বাড়ি গেছিল দুবছর আগে। ওটাই শেষবার। তখনই বুঝেছিল স্যার কিচ্ছু জানেন না বাস্তব সম্পর্কে। স্যারের কথা শুনলে আর বাঁচতে হত না। দেসাইয়ের টাইলস কারখানার কাজটা তো হরিশদার কথাতেই হল। একটু চেপে খেলে আনন্দ, আসলে পাড়াটা তো রুলিং পার্টির দখলে। তবে, জাগরণ মঞ্চের কাজ এগোলে আরও শক্তি বাড়বে। আনন্দ নিশ্চিত হয়ে শ্বাস নেয়। আর কতবার পালাতে হবে আমাদের? এখন আমাদের দিন আসছে স্যার, চশমাটা পাল্টে নিন। আনন্দর ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ভাসে।

লাল্লা বাংলায় আসছে আবার। এবার রিষড়া। হাওড়ায় নেমে হরিজির সঙ্গে, না না, হরিশজির সঙ্গে দেখা করবে। নাম আর পেহ্চান দুবার মনে করে নিল। ফোন আনেনি লাল্লা। এই চারদিন ভিডিও না দেখে থাকবে? আগেরবার ধুলাগড় কেসের পরে পরতাপ ধরা পড়ে গেছিল সমস্তিপুর থেকে। মোবাইলের গন্ধ শুঁকে কুত্তাগুলো চলে এসেছিল ঠিক। এবার তাই মিশ্রাজি সাবধান করে দিয়েছে। মোবাইল না। কদিন একটু কষ্ট করলে জিন্দেগি সোনার মত চমকাবে। “পণ্ডিতজি কহ দিয়া তো ইয়ে দুখ কুছ নহি” বিড়বিড় করল লাল্লা। আগে একবার কলকাতায় এসেছে। ধুলাগড়ে জুলুসের কাজ সেরে কলকাতা চক্কর কেটে মৌজ-মস্তি করে তারপর হাজিপুরে ফিরেছে। মিশ্রাজি এবার একটু বেশিই দিয়েছে লাল্লাকে। হরিশজিও দেবে। লাল্লার খোয়াব জেগে উঠেছে আবার। নিজের একটা কাঠের দোকান দেবে। হাজিপুরে। সবচে বড় দোকান। শওকত আলির দোকান পুড়ে যাবার পর শওকত বাল-বাচ্চা নিয়ে পালিয়েছে। অনেকদিন ফাঁকা পড়ে আছে জমি। লাল্লা এবার ফিরে গিয়ে জমিটা নেবে। আগে একবার বিল্লু দালালের সঙ্গে কথা বলেছে। কিন্তু, অনেক টাকা চাইছে। চুতিয়া শালা। কোন এক আনসার হককে বেচার ধান্দা করছে মোটা দামে। নিজেদের লোকের দিকে খেয়াল নেই। এবার মিশ্রাজিকে বলে, ন্না ন্না, পণ্ডিতজিকে বলে কর্জ নেবে ব্যাঙ্ক থেকে। অনেকগুলো টাকা পেল, এটা জমিয়ে রাখবে। তারপর ধার নিলেই… হাজিপুরের সবচে বড় কাঠের দোকান ওর!

#

পণ্ডিতজি বুঝিয়েছিল কারা সব চাকরিবাকরি খেয়ে নিচ্ছে। ঘরশত্রু। “আনন্দ, আজ উয়ো সব রাবণোকো অগর নহি রোকা না, কাল তোদের ফির পালাতে হবে বেটা”। আর পালাবে না আনন্দ। এনআরসি একবার হোক, সত্তর বছরের বদলা নেবে। কাউকে ছাড়বে না। মঞ্চের মিটিং শুনেছে – এনআরসি কেন দরকার। যাক না মালগুলো নিজেদের দেশে। এখানে কেন? সব দেশে ওরা সন্ত্রাস করে আর রক্ত চুষে খায়। দেশ খোকলা করে দিচ্ছে গরুখোরগুলো। জেঠু নিশ্চিন্তি পাবে। রিফিউজি থাকবে না আর। হিসেব সোজা। বিজয় স্যারের কিসের যে পিরীত মালগুলোর জন্য কে জানে? যত্তসব। আনন্দও শেষ যেবার গেল, শুনিয়ে দিয়েছে কড়া করে

-আপনি পুরোটা জানেন না স্যার, কারা শুরু করেছে এসব। ওরা কেমন শুনবেন? গতমাসে পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা ছিল। পুরো রাজাবাজার আর খিদিরপুরে পাকিস্তানের পতাকা উড়েছে, আইসিসের পতাকা টাঙিয়েছে। আসানসোলে আমাদের জলের ট্যাঙ্কে আর্সেনিক মিশিয়ে দিয়েছিল। গেলবার আমাদের রামনবমীর মিছিলে পাথর ছুঁড়ে পাঁচজনের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, একজনের পিঠে ছুরি মেরেছে। রক্তবীজের ঝাড় আটকাতে না পারলে…

আনন্দর স্বরে পণ্ডিতজি ভর করছে। টের পাচ্ছিল আনন্দ। ভরসা বাড়ছিল নিজের উপরে। জিতে যাচ্ছে আনন্দ। পণ্ডিতজি বলেছে কারা ধোঁকার টাটি দিয়ে শুধু দল ভারি করেছে। কোনোদিন উদ্বাস্তুদের হক আদায় করে দেয়নি। ঠিকই তো বলে পণ্ডিতজি। ঠাকুর্দা মারা যাবার পরে জেঠু কাজে ঢুকেছিল স্মল টুলস কারখানায়। আঠারো পুরোয়নি তখনো। বাবা আরও কবছরের ছোট। কলোনির ইস্কুলে কিছুদিন পড়ত, তারপর ছুট। জেঠুর কারখানা উঠে গেল কয়েক বছরে। তারপর আবার ফ্যান কারখানায় কাজ। সেও বন্ধ। বাবা ততদিনে ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ পেয়ে গেছে। মিছিলে নিয়ে যেত পার্টির লোকেরা, জেঠুও তো যেত মজদুর ইউনিয়নে। কী হল? বাবাকে চাকরি করে দেয়নি ওরা। জেঠুর কারখানা উঠে গেল। পয়সা পেতে দৌড়াদৌড়ি, পায়ের গুলি ছিঁড়ে গেল। পয়সা পেল না। লাইন হুক করতে গিয়ে বাবা মারা গেল। মায়ের হাঁপানি। পরের বছরই। জেঠু না থাকলে কী যে হত। অত ছোট আনন্দ, চিনি তখন দুবছর। পণ্ডিতজি বুঝিয়েছে কীভাবে এককাট্টা হতে হবে সব্বাইকে। আনন্দকে মাঝেমাঝে তোলপাড় করে বিজয় স্যারের শান্ত চোখ আর বিশ্বাসী স্বর। বিজয় স্যার বলেছিলেন ভাটিয়া গ্রামের সব ছোট মাঝিমাল্লা, দোকানদার, ভাগচাষীরা নাকি স্যারের দাদুকে কিছুতেই দেশ ছাড়তে দিতে রাজি ছিল না। জান লড়িয়ে রক্ষা করবে বলেছিল। তালুকদারি ছিল। মহালক্ষ্মী কটন মিলে চাকরি করত বড়জেঠু। স্মৃতিপথে পিছলে যেত স্যারের নিভু নিভু স্বর, ভেঙে ভেঙে যেত, “জানিস, বটঠাকুর আর জেঠু মুসলমানদের দাওয়ায় উঠতে দিত না। জমিজমার মামলা করে বর্গাদারদের পথে বসাত, তাদের নিয়ে ঠাট্টা করত।” হরেন রায়ের মত কেউ নিশ্চয়ই তার ভাগচাষী ছিল? তাকে নিয়েও তামাশা করত? হরেন রায়কে দাওয়ায় উঠতে দিত স্যারের দাদু? সে যা হোক, এখানে এসে দর্মার বেড়া আর টিনের চালের নিচে তো থাকতে হত না। দখল কলোনির অন্ধকার ঘরে ছটফট করে মরতে হত না। গ্লাস ফ্যাক্টরির বোস স্যার বন্ধুর সঙ্গে বড়ম্যাচ নিয়ে কথা বলছিল। আনন্দ ঘরে চা দিতে গিয়ে শুনেছে। “ওপারে গাঁড়-মারা খেয়ে কেঁউ কেঁউ করে বাঙালবাচ্চাগুলো পালিয়ে এসেছে। লক্কাগুলো এখানে এসে নিজেদের ধর্মের লোকদের মেরে ধরে জবরদখল করল। যখন লেড়েরা মারছিল, তখন রোয়াব দেখিয়ে পাল্টা মারিসনি কেন?” আনন্দর রাগ হয়। শিরশিরে রাগ। শীত করে। অদ্ভুত কুয়াশায় পাশের লোকটাও ঝাপসা। ঠোঁট ফাটে। গলা শুকিয়ে আসে। আনন্দর মাথার মধ্যে বিজয় স্যারের স্বর ক্ষয়ে আসছে। দ্রুত। কিন্তু এতে আনন্দর বুকের মধ্যে ভারি হয়ে আসছে কেন? আনন্দ নিঃশব্দে বলেছে, স্যার, আপনি আমায় করুণা করেন, তাই না? আপনার দাদু জাতপাত মানত বলে, আমি এসসি বলে আপনি দয়া করেন আমায়, না? স্যার শুনতে পাননি। কেউ শুনতে পায়নি আনন্দর কথা। স্যার মুখ ঘুরিয়ে বলেছিলেন, “তুই পাল্টে গেছিস আনন্দ। পুরো পাল্টে গেছিস।”

#

আনন্দর কাঁধে কোপটা যখন পড়বে, তখন দুদিকের দোকানপাট জ্বলছে। আগুনের হলকা। কাপড়, টায়ার, বাইক, রাস্তা সব পুড়ছে। ওদের কুড়িজনের সাচ্চা টিম। পণ্ডিতজি বলেছিলেন, মিছিলে অনেক লোক হবে এবার, অনেক। “তোদের টিম সহি রাখওয়ালা। ডর নেহি। ঝাণ্ডা লহরানা হোগা শান সে। কুত্তা-বিল্লি কো ছোড় দে, লেকিন ওদের ছাড়া যাবে না।” গতবার ঘুসপেটিয়ারা পাথর ছুঁড়ে, পুলিশ ডেকে গান বন্ধ করেছে। জুলুসের ইজ্জত নষ্ট করেছে। এবার আর সুযোগ দেবে না ওসবের। ঘাওড়ামি করতে এলেই ঠুকে দেবে। “লাইন নাম্বার পাঁচ অওর রেলগেট মহল্লেকে সারে ঘর মে পাকিস্তানি ঝাণ্ডা”। লাল্লা, মিথিলেশ, বিট্টুরা তৈরি হচ্ছিল। দেশি কাট্টা, রড, চাপাতি, পেট্রল বোম। নাড়া উঠছে আরও জোরে। গানের ভল্যুম বাড়ছে। বাড়ছে।

-বনবাসে প্রথম আপ্যায়ন কে করেছিল জানিস? গুহক। নিষাদ গুহক। ওকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন ভগবান। খেয়েছিলেন একসাথে। সব হবে আবার। ধীরজ রাখ।

আরো পড়ুন আশু কেন গোয়েন্দা হতে পারছে না 

হরিশদা কতদিনের পুরনো সংগঠক। বিজয় স্যারের বলা কথাগুলো বুকে খচখচ করত। হা হা-দীর্ঘশ্বাস হয়ে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে দিত। অবরে শবরে। হরিশদা উত্তর দেয় – আনন্দর প্রশ্নগুলো জল হয়ে যায়। তাকত পায়। বাঁচার মানে খুঁজে পায়। না, আনন্দ আর কারোর করুণা নিয়ে বাঁচবে না। কারোর দয়া না। হরিশদা টাকা দিয়েছে। হরিশদা টাকা দিলে ব্যাঙ্কে রাখে আনন্দ। চিনির বিয়ের জন্য। দেসাই স্যার আর কতই বা দেয়? হাতখরচ চিনি নিজেই জোগাড় করে। ও-ও ব্যাঙ্কে জমায়। জেঠুর ওষুধ, চিনির বিয়ের খরচ, আনন্দর দায় বাড়ে। বিশাল দায়ের নিচে আনন্দর লিলিপুট মনে হয় নিজেকে। রুমকিকে বুঝদার মনে হয়। কদিনেরই বা আলাপ? তবু মনে হয় খুব চেনা, খুব কাছের। রুমকি শুক্রবার নিরামিষ খায়, হনুমান চালিসা পড়ে। কিন্তু দুবার জাগরণ মঞ্চের কথা তুলতেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে রাজনীতি ফালতু, ওসব না করে কম্পিউটারের কী একটা কোর্স করতে। রুমকিও করছে। রুমকি কি ওকে বুঝবে না? রোজ তো কথা হয় না। ওর বাড়ি অনেক দূর। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। রুমকি কি ভালবাসবে? আনন্দ যদি আরও টাকা জমায়? ভাবে আনন্দ। বসন্তের হাওয়ায় চৈত্রের গরম হাওয়া মেশে। হাওয়া গরম হয়। শুকনো। ধুলো ওড়ে। ঝরা পাতা উড়ে যায়। গরম বাড়ছে। এত গরম লাগছে কোত্থেকে? লাল্লাই তো প্রথম দেখাল যে ফেজ পরা দুজন ওদের নাড়া শুনে হাসছে। ভগবানের মিছিল যাচ্ছে, তাও মাংসের দোকান খুলে রেখেছে। লাল্লা বিশাল চার্জড। আনন্দ অমন জোশ পাচ্ছে না কেন? আনন্দর পা হিঁচকোচ্ছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের গরম টেনশনের বিনবিনে ঘাম লুকিয়ে রাখছে। মিছিলের মাইকের গানের ভল্যুম বাড়ল। ফেট্টি কষে বেঁধে নিল আনন্দ কপালে। “মকসুদের কাপড়ের দোকান থেকে পাথর ছুটে এসেছে”। “উয়ো মাদারচোদ গালি দিয়া আভি। মার সালেকো”। স্লোগান হঠাৎ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল।

আনন্দ যখন দৌড়তে দৌড়তে মাটিতে-পড়েও-হেঁচড়েহিঁচড়ে-পালাতে-চাওয়া নুরুলের কলার ধরল, তখন ওর চোখমুখ বীভৎস। এলাকা রণক্ষেত্র। আনন্দ দেখছিল ওর ঠাকুর্দা পালাচ্ছে। দাদুর বাঁ পা ভেঙে যাচ্ছে দৌড়তে গিয়ে। নুরুলের চোখ ঠিকরে বেরোচ্ছিল। অবিশ্বাস। আতঙ্ক। স্মৃতি। আর্তি। নুরুলের চোখ আনন্দের বিধ্বংসী চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নুরুলের পায়ে প্রথম রড মেরেছিল লাল্লা। আনন্দ যখন রডের প্রথম বাড়ি মারল, নুরুল আব্বুর মুখ মনে করছিল। আব্বুরা তেহট্টে থাকত। সেই ’৫১ সালের হ্যাঙ্গামের পরে হাওড়ায় চলে আসে। রিস্তেদাররা সবাই চলে গেছিল। কেউ পূর্ব পাকিস্তানের সরাইপুর, কেউ মামুদপুর। নুরুলের আব্বু কিছুতেই যায়নি। ওখানে জাতের লোক, বেঘত বেঘত জমিন সব আছে জেনে রিস্তেদাররা গেছিল। আব্বু যায়নি। ভিটেতে টিকতে পারেনি অবশ্য। দখল হয়ে গেছিল। ক্যাম্প বসিয়েছিল যারা ওপার থেকে এসেছিল। জুটমিলের কাছে এই মহল্লায় চলে এসেছিল আব্বু। থেকে গেছিল। কেন আব্বু? এত মহব্বত? লাল্লা চেঁচাচ্ছিল, “ঘুসপেটিয়া সালা মাদারচোদ।” আনন্দ পরের বাড়িটা মারল চোয়ালে। আনন্দর চোখের সামনে অনেকটা জমি তখন। নিজেদের বাড়ি। তিন নম্বর বাড়িটা রক্তে ভাসা নুরুলের কাঁধে আরও জোরে মারতে গিয়ে আনন্দ বুঝতে পারছিল কেউ আর ওকে হ্যাটা করছে না, জাত তুলে খোঁটা দিচ্ছে না। কেউ না।

#

আনন্দর বুকে চাপাতির কোপ পরিচ্ছন্নভাবে নেমে আসবে। যন্ত্রণায়, রক্তের ফোঁটায় চোখ খুলতে পারবে না। আগুনের হলকা আরও বাড়বে কারণ মিছিল থেকে ছুটে যাওয়া লোক মহল্লার ঘরে দোকানে আগুন দিচ্ছে। বোম আর গুলির আওয়াজে আনন্দর কান বুজে আসবে। ঠোঁট নড়বে। স্যার, ওরা আমাদের মিছিলে ইঁট মেরেছে। নোংরা নোংরা খিস্তি।

-আনন্দ, মকসুদের দোকান চল্লিশ বছরের। যে দোকানটা তোরা জ্বালালি, ওখান থেকে আগে মন্দিরের জন্য কাপড় যেত, জানিস?

-আগেরবার মিছিলে পাথর মেরে পাঁচজনের মাথা ফাটিয়েছে। তার আগেরবার মূর্তি ভেঙেছে। তার আগেরবার আমার দোকানে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়েছিল, ওরা রাস্তা জুড়ে নামাজ পড়ছিল। তার আগেরবার বসিরহাটে আগুন লাগিয়েছে। তার আগেরবার অস্ত্র দেখাতে দেখাতে তাজিয়া নিয়ে ঘুরেছে। তার আগেরবার… আনন্দর গলা হরিশের গলার মতো পিচ-টোন-মড্যুলেশনে ধারালো হয়ে গেছে। অবিকল হরিশ

লাল্লা ফিরে যাবে হাজিপুর। নাকি সমস্তিপুর? গা ঢাকা দেবে কোথাও। হয়তো। লাল্লা আনন্দকে দুবার চাপাতির কোপ মেরেছিল। এমনভাবে, যেন মনে হয় এটা ওদের কাজ। হরিশজির হুকুম সেটাই ছিল। “জাগরণ মঞ্চে এসসি বেস বাড়াতে হবে। কোনও লোয়ার কাস্ট জাগরণ মঞ্চের মিছিলে মোল্লাদের হাতে জান দিলে বিরাট ইমপ্যাক্ট হবে।” হরিশ যখন পণ্ডিতজিকে একথা বলছিল, কেউ শুনেছিল কিনা কে জানে? লাল্লা ভাগের টাকা পেয়েছিল কিন্তু আতিফের পোড়া দোকানের জমি পেল কি? আনন্দ আর কিচ্ছু জানতে পাবে না। শুনতেও পাবে না। রুমকি শুনবে টিভিতে। রিষড়ায় রামনবমীর মিছিলে সংঘর্ষ। দোকানে আগুন। পাথরবৃষ্টি। আহত প্রায় পনেরোজন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি নুরুল আলম। সংঘর্ষে মৃত এক যুবক। যুবকের পরিচয়

সমস্ত চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিল পাওয়া গেলে তা অনিচ্ছাকৃত। কিছু আসল ঘটনার উল্লেখ এসেছে গল্পের প্রয়োজনে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.