জীবনের কঠিন এবং দীর্ঘ সংগ্রামে হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নিরলস সাহিত্যসাধনায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন এমন প্রান্তিক মানুষদের প্রাপ্য সম্মান জানানো হল রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস বাইশে শ্রাবণে। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মঞ্চে পুরস্কৃত হলেন কবি অসীম আচার্য, কবি ও সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদক শঙ্করী দাস এবং কবি ইসমাইল দরবেশ।

আসানসোলের বাসিন্দা অসীম আচার্য একটি অটো-পত্রিকার সম্পাদক, যার নাম কবিকথা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি এই পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ করছেন। কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করে কর্মজীবনের প্রথম দিকে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেয়েছিলেন। পরে ন্যায্য বেতন ও কর্মী হিসাবে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিয়ে সমস্যা হলে চাকরি ছেড়ে ১৯৯০ সালে বেছে নেন অটোচালকের পেশা। চাকরি ছেড়ে অটো চালানো, আর্থিক সংকট ইত্যাদি কারণে যে মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন অসীম, সাহিত্যচর্চাই তাকে প্রশমিত করে। সংসারের অনটন তাঁর সাহিত্যসাধনায় বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। প্রয়াত শ্রমিক নেতা চন্দ্রশেখর মুখার্জীর প্রশ্রয়ে অসীম, ইসকো কারখানার শ্রমিক প্রয়াত কবি বিষ্ণু সিংহরায়, নাট্যকার উদয় মজুমদার এবং আরও কয়েকজন মিলে সাহিত্য আঁকড়ে থাকার পরিবেশ তৈরি করেন। কবি ও কবিকণ্ঠ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত অসীমকৃষ্ণ দত্তের স্নেহও বড় ভূমিকা পালন করেছিল। সেইসময়েই অসীম নিজের পত্রিকা কবিকথা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালের ২ মে হাতে লেখা প্রথম কবিতা প্রকাশ করেন। তিনি পত্রিকাটিকে প্রতি মাসের ২ এবং ১৭ তারিখে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ ওই দিনগুলোতেই দেশ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাণিজ্যিক পত্রিকার বাইরেও যে উল্লেখযোগ্য বাংলা কবিতা লেখা হয়, সেই বার্তা দিতেই এই সিদ্ধান্ত। অতিমারীর পর থেকে অবশ্য মাসে একবারই পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে। কবিকথা পত্রিকার পাঠক অসীমের অটোরই যাত্রীরা।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এছাড়া তাঁর নিজের তিনটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। জনমঞ্চের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন অসীম বসু।

নাট্যব্যক্তিত্ব সীমা মুখোপাধ্যায় পুরস্কার তুলে দেন কবি-সম্পাদক শঙ্করী দাসের হাতে। শঙ্করীর ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয়, ১৯ বছরে সন্তান হয়। প্রথম সন্তান সোমনাথ মায়েলোফাইব্রোসিস নামের জটিল রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা করানোর জন্য কিছুদিনের ছুটি চেয়েছিলেন সোমনাথের বাবা। কিন্তু ছুটি নামঞ্জুর হওয়ায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চাকরিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। ছেলের চিকিৎসার খরচ, সংসার খরচ, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোটাতে শঙ্করীর লড়াইয়ের সেই শুরু। কখনো লোকের বাড়িতে জামাকাপড় কাচা, বাসন মাজার কাজ করেছেন। কখনো বা লজেন্স, বাদামভাজা নিয়ে হকারি করেছেন। ব্যাটারি ভাঙার কারখানায় মজুরের কাজও করেছেন।

সোমনাথ বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্র ছিলেন। তখনই শুরু করেন সময় তোমাকে লিটল ম্যাগাজিন। ওই পত্রিকার ‘বাংলা ছোট গল্পে মিথ’ সংখ্যাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ২০১১ সালে ওই বিশেষ সংখ্যা বাংলা আকাদেমি সম্মানও পায়। কিন্তু মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে সোমনাথ অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখে প্রয়াত হন। সেখান থেকেই শুরু হয় শঙ্করীর নতুন লড়াই। ছেলের পত্রিকা চালু রাখতেই হবে – এই সংকল্প নিয়ে নিরক্ষর শঙ্করী ৫৬ বছর বয়সে পড়াশোনা শুরু করেন। তারপর থেকে একসঙ্গে চলছে সময় তোমাকে এবং কবি শঙ্করীর কাব্য রচনা। এ বছরেই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ।

কবি ইসমাইল দরবেশের আসল নাম মহম্মদ ইসমাইল। তবে সাহিত্য জগতে তিনি ইসমাইল দরবেশ নামেই পরিচিত। হাওড়া জেলার ডোমজুড়ের ডাঁশপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইলের সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সে ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েও পড়া শেষ করা হয়নি, শুরু করেন মঙ্গলা হাটে রেডিমেড পোশাকের ব্যবসা। এই হাটে বসেই চলে কবিতা লেখা। ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুকে লেখালিখির সূচনা, তারপর রচনা করেন উপন্যাস তালাশনামা। এই উপন্যাসে রয়েছে তিনি যেরকম গ্রামের মানুষ তেমন গ্রামের জীবনের ছবি। তিনি যে সম্প্রদায়ের মানুষ তার বিকাশ, টিকে থাকা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্বেষের রাজনীতির শিকার হয়ে কীভাবে গোটা সমাজ বদলে যাচ্ছে, কীভাবে অপাংক্তেয় করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে একটি সম্প্রদায়কে তাঁর সাহিত্য তারই বিবরণ। ইসমাইলের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অভিনেতা বাদশা মৈত্র।

আরো পড়ুন আকাদেমি সমাচার: পুরস্কার যার যার, তিরস্কার সবার

অনুষ্ঠানের শুরুতে এই সম্মাননা প্রদানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন নাট্যকর্মী জয়রাজ ভট্টাচার্য। রঙ্গন চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় ‘মার্জিনের বাইরে’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়েছিল। প্রথম বক্তা ছিলেন প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জাদ মাহমুদ। তিনি বলেন কেবলমাত্র জাতি কিংবা পরিচিতি সত্তার রাজনীতি দিয়েই প্রান্তিকতা বিচার করা যায় না। প্রান্তিকতার অন্যান্য নির্ণায়ক নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। কবি চৈতালী চট্টোপাধ্যায় বিশ্বভারতীতে ভেদাভেদ ঘুচিয়ে রবীন্দ্রনাথের সকলকে সুযোগ দেওয়ার কথা আলোচনা করেন। সমাজে মহিলাদের প্রান্তিকতার কথাও তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে। সেন্ট জেভিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শুভনীল চৌধুরী বলেন জনসংখ্যার যে অংশকে সংখ্যাগুরু হিসাবে ধরা হয় আদতে তারাই সংখ্যালঘু। মুসলিম, তফসিলি জাতি-উপজাতি, মহিলা বা গ্রামের চাষাভুষো কিংবা শহুরে ঠিকা শ্রমিকরা, যাঁদের আমরা প্রান্তিক বলি, তাঁরা একত্রে সংখ্যাগুরু। অথচ দেশের সম্পদের বেশিরভাগটাই জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশ, অর্থাৎ সংখ্যালঘুরা, কুক্ষিগত করে রাখছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.