“আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা”। কথাটা দিদাদের মুখে একেবারে যে শুনিনি ছোটবেলায় তা নয়। কথাটার মানে হল, নিজের রুচি মত খাও, পরের চোখে যা শোভন তাই পরো। তবে আরেকটা কথাও পাশাপাশি শুনে এসেছি, ‘স্থান-কাল-পাত্র জ্ঞান’। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখেছি, সরকারের বিস্তর আপত্তি আপ রুচি খানা নিয়ে, তবে পর রুচি পরনা নিয়ে ততটা নয়। যদিও মা বলেছে পরের রুচিতে পরার পরিকল্পনা মোটেই কাজের নয়, তাই পোশাক কিনে না দিয়ে হাতে দামটা দিয়ে নিজের ইচ্ছে মত কিনে নিতে বলেন।

হঠাৎ করে রুচি, পোশাক, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা ইত্যাদির প্রসঙ্গ উঠল কেন? কারণ সম্প্রতি কলকাতার নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটিতে একজন অধ্যাপিকাকে কর্তৃপক্ষ চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছে। কী কারণে? না অধ্যাপিকা তাঁর অবসর যাপনের এমন কিছু ছবি সোশাল মিডিয়ায় দিয়েছেন, যা নাকি অশ্লীল। এক ছাত্রের অভিভাবক নালিশ জানিয়েছেন, কারণ তাঁর মতে তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান দিদিমণিকে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় সোশাল মিডিয়ায় দেখছে, এই দৃশ্য অভিভাবক হিসাবে অত্যন্ত লজ্জাজনক। কারণ তিনি ছেলেকে এই ধরনের অসভ্যতা এবং নারীদেহের প্রদর্শনী থেকে দূরে রাখতে চান।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সব অভিভাবকই সন্তানের ভাল চান। বলা ভাল, তাঁরা ভাল বলতে যা বোঝেন, সেটাই চান। ভাল ব্যাপারটা যে আপেক্ষিক, তা তাঁরা মোটেই বিশ্বাস করেন না। এই ঘটনায় একজন অভিভাবক মনে করলেন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে যৌনতা সম্পর্কে অজ্ঞ করে রাখা ভাল অভিভাবকত্বের পরিচয়। উপরন্তু সন্তান তার অধ্যাপিকার ব্যক্তিগত ছবি, যে ছবি একদিনের বেশি ইনস্টাগ্রামে থাকার কথা নয়, তা দুমাস পরেও দেখতে পাওয়ার মত করে গুছিয়ে রাখাকে প্রশ্রয় দিয়ে অধ্যাপিকার নামে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করা সঠিক বলে মনে করলেন। এই ভাল চাওয়া কি আদৌ ভাল চাওয়া? আমাদের চারিদিকে রোজ ঘটতে থাকা যৌন হিংসার ঘটনা থেকে কি আমরা এটুকু বুঝতে পারি না, যে তার অধিকাংশেরই কারণ যৌনতা সম্পর্কে অশিক্ষা? যে যুগে সমাজকর্মী থেকে শুরু করে গবেষক, সকলেই বলছেন যৌন হিংসার ঘটনা কমাতে বিদ্যালয় স্তরে যৌনশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, সে যুগে একজন অভিভাবক যদি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে যৌনতা থেকে দূরে রাখতে চান, তা কতখানি ভাল চাওয়া তাতে সন্দেহ আছে।

এছাড়াও রয়েছে স্থান-কাল-পাত্রের প্রশ্ন। ছোটবেলা থেকেই আমরা সবচেয়ে চকচকে ঝকঝকে পোশাকটা তুলে রাখি বিয়েবাড়িতে পরব বলে, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাই পাটভাঙা শার্ট প্যান্ট পরে, সবথেকে ফ্যাশনেবল পোশাক তুলে রাখি বেড়াতে যাওয়ার সময় পরব বলে। হিন্দুরা বিয়েতে পরে উজ্জ্বল রংয়ের পোশাক, মৃত্যুতে সাদা। খ্রিস্টানরা বিয়েতে সাদা, মৃত্যুতে কালো। মুসলমানরা আবার মৃত্যুতে সাদা। এইভাবে স্থান, কাল এবং পাত্রের বিচারে আমাদের পোশাক পরিবর্তন হতে থাকে। সেই নিয়ম অনুযায়ী একজন অধ্যাপিকা তাঁর কাজের সময়টুকুর জন্য কাজের জায়গায় যদি কোনো পোশাক বিধি থেকে থাকে তা মেনে নিতে দায়বদ্ধ। হয়ত তা অন্যায্য হলে বাধ্য নন, প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু অবসরে তিনি কেমন পোশাক পরবেন তা ঠিক করার অধিকার তো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেই।

অধিকার নেই, তবে দায় আছে। কিসের দায়? পৃষ্ঠপোষকদের কাছে জবাবদিহির। সেন্ট জেভিয়ার্সের মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের মূল উৎস হল ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা মাস মাইনে, হাবিজাবি ফিজ, ম্যানেজমেন্ট কোটা বাবদ পাওয়া অনুদান। আর সেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি হয় কোনো ধর্মীয় সংস্থার অনুশাসনের অধীন, তাহলে তারই সঙ্গে কাজ করতে থাকে ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং গোঁড়ামি। আয়ের উৎস থেকে যদি ধর্মীয় ভাবাবেগে উস্কানি দেওয়া হয়, তাহলে তো কথাই নেই। গাঁটের কড়ি খরচ করে ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়েরা পড়তে পাঠালে তাদের এবং তাদের পরিবারের ধারণা হয় শিক্ষা একটি ভোগ্য পণ্য, যা তারা কিনে নিয়েছে। অতএব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের মোসায়েবি করবে। সেখান থেকেই জন্মায় এই অধিকারবোধ, যে শিক্ষিকার ব্যক্তিগত জীবনেও আমি হস্তক্ষেপ করতে পারি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও লগ্নিকারীদের চটাতে রাজি নয়। ফলে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে মেহনত করে কাজ পাওয়া কোনো শিক্ষিকাকে এইভাবে কাজ হারাতে হয়। এক্ষেত্রে পোশাকের জন্য কাজ হারাতে হয়েছে, কখনো ধর্মবিশ্বাসের জন্য হতে পারে, রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্যও হতে পারে। অন্যদিকে এই প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারের সুযোগ নিয়েই এই বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বদলি শিক্ষকও পেয়ে যাচ্ছে। তাঁদের কেউ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপোষ করছেন, কেউ না মানতে পেরে সরে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান নিজের মর্জিমতই চলছে।

আরো পড়ুন হিজাব না হলেও হিজাবির পক্ষ নিতেই হবে আমাদের

প্রশ্ন তোলাই যায়, সাঁতারের পোশাক পরা মানেই মুক্তমনা আর তার নিন্দা করলেই রক্ষণশীল – এ যুক্তি কি সঠিক? উত্তর হল, একেবারেই না। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্নটা রক্ষণশীলতা বনাম আধুনিকতার নয়। প্রশ্নটা পেশাগত জীবনের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি মানার। যে গণ্ডি অনুযায়ী অধ্যাপিকা কোনো অন্যায় করেননি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্যায় করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রটি এবং তার বাবা সেই অন্যায়ের অংশীদার।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.