সুপ্রিম কোর্টের আদেশানুসারে গঠিত কলকাতা হাইকোর্টের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ সোমবার পশ্চিমবঙ্গের আপার প্রাইমারি (পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি), হাই ও হায়ার সেকেন্ডারি স্তরে ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার মাধ্যমে নিযুক্ত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের গোটা প্যানেলকে বেআইনিভাবে নিযুক্ত হওয়ার অপরাধে বাতিল করেছে। একজন সরকারি স্কুলের শিক্ষক এবং শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী হিসাবে নাগরিক ডট নেটের সম্পাদকমণ্ডলী এ ব্যাপারে আমায় কিছু লিখতে বলেছেন। এই সাইটে আগেও আমি শিক্ষা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে কিছু কিছু লিখেছি। কিন্তু নিজেকে আজকের মত বিভ্রান্ত কখনো মনে হয়নি।

আজ নিজের অবস্থান থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে আমি সরকারি স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস আর অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখছি না। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কী হল, কেন হল সেসব নিয়ে বহু আলোচনা, সমালোচনা হয়েছে, বিরাট বিরাট লেখা বেরিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো দিশা পাওয়া যায়নি। পাওয়ার কথাও ছিল না। রাজ্যের বুদ্ধিজীবীরা বা সমাজের অগ্রণী অংশের মানুষজন সব জেনে বুঝেও সমস্যার মূলটা সোচ্চারে বলতে বা লিখতে পারেননি। ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ একথা জিজ্ঞেস করতে গেলে শিরদাঁড়াটা শক্ত হতে হয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সচেতন পশ্চিমবঙ্গবাসী (সংখ্যাটা লজ্জাজনক রকমের কম) সবাই প্রায় সমস্যাটা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন বা আছেন। কিন্তু যাঁরা নিয়মিত এ ব্যাপারে কোর্টের কর্মকাণ্ডে চোখ রেখেছিলেন, তাঁরা ছাড়া আজকের রায় অনেকের কাছেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত মনে হচ্ছে। ফলে নানারকম ব্যাখ্যা, হাহুতাশ, রাগ, ডিভিশন বেঞ্চের সমালোচনা ইত্যাদিতে চারপাশ ভরে উঠছে। নাগরিকের সম্পাদকমণ্ডলী সেই ধোঁয়াশা বা বিভ্রান্তির মধ্যে থেকে পুরো ব্যাপারটার সার্বিক চিত্র প্রকাশ করতে চেয়েছেন পাঠকদের কাছে। আমার সীমিত ক্ষমতায় সে চেষ্টাই করছি।

শুরুতেই বলে দিই, আমি আইনের ছাত্র নই। ফলে আইনি ব্যাখ্যা খুঁজবেন না এবং আদালতের রায় আমি সাধারণভাবে যেটুকু যেভাবে বুঝেছি সেটুকুই বলার চেষ্টা করব। কেউ কোনো ব্যাখ্যার ভুল ধরিয়ে দিলে নত মস্তকে মেনে নেব।

ঘটনার শুরুটা আজ বা কাল নয়, অনেক আগে। ২০১৬ সালে রাজ্যের স্কুল সার্ভিস কমিশন কয়েক ধাপে সরকারি স্কুলের জন্য সব স্তরে — অর্থাৎ পঞ্চম থেকে অষ্টম, নবম ও দশম এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষক/শিক্ষিকা নিয়োগের জন্য আলাদা আলাদা বিজ্ঞপ্তি জারি করে। পরবর্তীকালে শিক্ষা কর্মী (গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি) নিয়োগের জন্যেও দুটো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়।

২০১১ সালের আগে শিক্ষক নিয়োগের জন্য এই এসএসসি পরীক্ষা প্রতিবছর হত। কিন্তু সেবছর থেকে প্রচণ্ড উন্নয়নের গতিতে শিক্ষক নিয়োগ ব্যাপারটা অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রাথমিক ও হাইস্কুলে যেসব নিয়োগ হয়, সেগুলো নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করে। যদিও উন্নয়নের ধাঁধায় বঙ্গবাসী এতই মুগ্ধ ছিলেন যে তাতে খুব একটা আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি, সেসব অভিযোগের সুরাহাও হয়নি। কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে স্কুলগুলোতে লক্ষ লক্ষ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ফলে রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ প্রবল উৎসাহে বিজ্ঞপ্তি বের হতেই ফর্ম পূরণের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত কোন সমস্যা নেই। সমস্যা শুরু হয় এর পর থেকে। বি এড ডিগ্রিপ্রাপ্ত এবং ওই ডিগ্রিবিহীন প্রার্থীদের সম্পর্কে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) সংস্থার নিয়ম আর এসএসসির বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য নিয়ে বেশকিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকেই চটজলদি এক সমাধান বলে দেওয়া হয়। তারপর ধাপে ধাপে প্রাথমিক পরীক্ষাগুলো (টেট) সম্পন্ন হয় এবং সমস্যা ও অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ভুল প্রশ্ন, ভুয়ো পরীক্ষার্থী, নজরদারিতে ইচ্ছাকৃত গাফিলতি, বিশেষ কিছু পরীক্ষার্থীকে সহায়তা ইত্যাদি নানাবিধ অভিযোগ ওঠে।

প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যায় টেট পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হতেই। অনেক অনুত্তীর্ণ প্রার্থী আদালতের দ্বারস্থ হন উত্তরপত্র এবং প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশের দাবি নিয়ে। অদ্ভুতভাবে সেসময় আদালত দীর্ঘসূত্রিতায় আক্রান্ত হয় এবং মামলাগুলো অমীমাংসিত থাকা অবস্থাতেই ধাপে ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এদিকে মামলার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তারপর আদালতের রায়ে টেট পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায় বিচিত্র কাণ্ডকারখানা। কম পেয়ে উত্তীর্ণ আর বেশি পেয়ে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর ছড়াছড়ি। ফলে সমস্যা জটিলতর আকার ধারণ করতে থাকে। কিন্তু তখনো আদালত চলছিল ধীর লয়ে। এর মধ্যেই চূড়ান্ত পর্বের ইন্টারভিউ সম্পন্ন হয় এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পায় ইন্টারনেটে। সেখানেও ভয়াবহ ভুলের ছড়াছড়ি। একটি খুব বিখ্যাত বা কুখ্যাত ভুল ছিল – চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর রোল নম্বরের পাশে নামের জায়গায় ‘xxx’ লেখা। না, ভুল পড়েননি। ‘xxx’-ই লেখা ছিল। দুর্জনে বলতে শুরু করে – ওটা বুক করা সিট, উপযুক্ত মূল্যের বিনিময়ে নাম বসিবেক। যদিও তৎকালীন গুরুভার শিক্ষামন্ত্রী (বর্তমানে জেলবন্দি) ওটাকে তুচ্ছ টাইপিংয়ের ভুল বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান তো হয়ইনি, বরং কেসের সংখ্যা ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে আরম্ভ করে। তারপর আদালতের আরও এক রায়ে চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত (নম্বর সহ) হলে দেখা যায় তালিকায় বহু গোলমাল। এই সময় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগের নেতৃত্বে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে।

বিচারপতি বাগ ১,১০০ পাতার তদন্ত রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লেখেন, স্কুলে নিয়োগের সব ক্ষেত্রে বিপুল দুর্নীতি হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট সেই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেন। কিন্তু সিআইডি আদৌ কোনো তদন্ত করেছিল কিনা সে খবর রাজ্যের মানুষ আজও জানেন না। ইতিমধ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এসে পড়ে। সেই নির্বাচনে শাসক দলের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ক্ষমতায় এসেই স্কুলে নিয়োগ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান। যদিও ভোটে জেতার পর ওসব ফালতু কথা শাসক দল মনে রাখেনি।

বিপুল সংখ্যক প্রার্থী, যাঁরা প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী যোগ্য হয়েও ইন্টারভিউতে ডাক পাননি বা যাঁদের নিয়োগ হয়নি, তাঁরা উপায়ান্তর না দেখে কলকাতার রাস্তায় আমরণ অবস্থানে বসে যান। এরপর কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি এবং বর্তমানে তমলুক লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অভিজিৎ গাঙ্গুলি নিয়োগ দুর্নীতির মামলাগুলোকে একত্র করে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের ফলে ভয়ঙ্কর দুর্নীতির ছবি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে আরম্ভ করে। সেই সূত্রেই তৃণমূল সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এবং এসএসসির একাধিক কর্তাব্যক্তি গ্রেফতার হন। তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতি গাঙ্গুলি একের পর এক চাকরি বাতিলের রায় দেন এবং বিচারপতি অমৃতা সিনহা বারবার তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে দুর্নীতির শিকড় খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেইসব রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে এবং স্থগিতাদেশ পায়।

ইতিমধ্যে বেশ কিছু ঘটনাক্রমে নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত সমস্ত মামলা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে গিয়ে পৌঁছয়। প্রধান বিচারপতি বাগ কমিটির রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সমস্ত মামলা কলকাতা হাইকোর্টে ফেরত পাঠান। তাঁর নির্দেশেই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এক বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ তৈরি করেন শুধুমাত্র স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতির মামলা ফের শুনে রায় দেওয়ার জন্য। বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারক মহম্মদ শব্বর রশীদির ডিভিশন বেঞ্চ সোমবার সেই রায় দিল।

সেই রায়ে কী দেখা গেল? বিচারপতির পর্যবেক্ষণ – অন্তত ১৭ রকম উপায়ে চাকরি চুরি করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হল, ২০১৬ সালে ঘোষিত শূন্য পদ যা ছিল, তার চেয়ে প্রায় হাজার দুয়েক বেশি মানুষ নিযুক্ত হয়েছে। এই অতিরিক্ত নিয়োগ কী করে হল? তাছাড়া বিচারপতি গাঙ্গুলি যখন কিছু চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন চাকরি চোরেদের বাঁচাতে রাজ্য সরকার রাতারাতি বেশকিছু ‘সুপার নিউমেরারি’ পদ তৈরি করে তাদের পুনরায় নিয়োগ করেছিল। আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রথম থেকেই এই পদগুলোর তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন। বিচারপতিরাও তাঁদের রায়ে আপত্তি জানিয়েছেন। বিচারপতির পর্যবেক্ষণে আরও ধরা পড়েছে যে বহু ব্যক্তি কোনো পরীক্ষায় না বসেই নিযুক্ত হয়েছেন।

যদি সমস্ত পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশ সংক্ষিপ্ত আকারে সাজানো হয়, তাহলে দেখা যাবে

১) ১৭ রকমভাবে বেআইনি নিয়োগ হয়েছে।
২) জাল ওএমআর দেখানো হয়েছে আদালতে।
৩) ওএমআর দেখে ফলাফল জানানোর জন্য এজেন্সি নিয়োগ করার সময়ে কোনো টেন্ডার ডাকা হয়নি। প্রসঙ্গত, ওই এজেন্সির একাধিক কর্তা গ্রেফতার হয়েছিলেন।
৪) এসএসসি আসল ওএমআর নষ্ট করেছে। মিরর ইমেজ নামে যা করেছে সেটা বেআইনি। আসল ওএমআর পাওয়া যায়নি।
৫) সুপার নিউমেরারি পদ বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়েছে।
৬) যারা বেআইনি চাকরি পেয়েছে তাদের বেতন ফেরত দিতে হবে।
৭) সিবিআই তদন্ত চালিয়ে যাবে।
৮) বেআইনিভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনে হেফাজতে নিয়ে জেরা করবে।
৯) বেআইনিভাবে সুপার নিউমেরারি পদ সৃষ্টি করায় যারা চাকরি পেয়েছে, তাদের হেফাজতে নিতে পারবে সিবিআই।
১০) চার সপ্তাহের মধ্যে জেলাশাসকরা বেআইনিভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে টাকা ফেরানোর ব্যবস্থা করবে।
১১) নতুন করে ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এসএসসিকে।
১২) সুপার নিউমেরারি পদে নিয়োগের যে সিদ্ধান্ত রাজ্য সরকারের ক্যাবিনেট নিয়েছিল, তা নিয়ে সিবিআই তদন্ত করবে। কার বা কাদের মদতে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে তা খুঁজে বের করবে। প্রয়োজনে যে কাউকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করতে পারবে সিবিআই।
১৩) এত বেআইনি নিয়োগ হয়েছে যে কার নিযুক্তি আইনি আর কারটা বেআইনি, তা বোঝা দুঃসাধ্য। এসএসসি বা রাজ্য সরকারের কাছে এ নিয়ে তথ্য চাওয়া হলেও আদালতকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

উক্ত বিষয়গুলোর প্রায় সবকটাই আগে থেকেই পূর্ববর্তী বিভিন্ন রায়ের প্রেক্ষিতে সবার কমবেশি জানাই ছিল। আমার ব্যক্তিগত ভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা ভয়ঙ্কর মনে হয়েছে শেষ ঘটনাটা। কেন তথ্য দেওয়া হয়নি?

এই বিচার চলাকালীন একাধিকবার খুব সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ২০১৬ সালে নিযুক্ত সমস্ত প্রার্থীই তো আর অযোগ্য বা বেআইনিভাবে নিযুক্ত নন। যাঁরা নিজের মেধা, যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছেন তাঁরা কারা? কেনই বা তাঁরা অন্যদের অপরাধে শাস্তি পাবেন? আজ রায় বেরোবার পর মূলত এই নিয়েই সোশাল মিডিয়া উত্তাল। একদম ঠিক কথা। এবার আবার আপনাদের উপরের তালিকার শেষ কথাটা দেখতে অনুরোধ করি। রায়দানের সময়ে আদালত জানিয়েছে, নিশ্চিতভাবেই এই প্রায় ২৫,০০০ শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর মধ্যে যথেষ্ট যোগ্য, সৎভাবে নিযুক্ত প্রার্থী আছেন। সেই কারণেই বিচার চলাকালীন বারবার এসএসসি তথা রাজ্য সরকারের কাছে সেই যোগ্য প্রার্থীদের নামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা উত্তর দেয়নি। কেন দেয়নি?

যদি যোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করা হত, তাহলে কিন্তু ঝুলি থেকে শুধু বেড়াল নয়; শেয়াল, কুকুর, গরু, গাধাও বেরিয়ে আসত। স্পষ্ট বোঝা যেত এই এদের মধ্যে কত শতাংশ বেআইনিভাবে নিযুক্ত। সাধারণ বুদ্ধি বলে, বেআইনি নিয়োগের পরিমাণটাই বেশি বলে এসএসসি যোগ্যদের তালিকা দেয়নি। তাতে কী লাভ? লাভ এই, যে এখন যে কোনো সংখ্যা বলে দেওয়া যাচ্ছে বেআইনি নিয়োগ হিসাবে। কেউ লিখছেন ২,০০০ আবার কেউ বলছেন কয়েকশো। যদিও তথ্য আসলে কারোর কাছেই নেই।

সবচেয়ে চমৎকার মন্তব্য করেছেন এসএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মজুমদার। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে গলা তুলে বলেছেন, মাত্র পাঁচ হাজার বেআইনি প্রার্থীর জন্য ১৯,০০০ বৈধ প্রার্থীর চাকরি যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাঁকে কাছে বিনীত প্রশ্ন – স্যার, ডিভিশন বেঞ্চ যখন বারবার আপনাদের কাছে যোগ্য প্রার্থীর তালিকা চাইছিল, তখন এই পাঁচ হাজারের হিসাবটা দিলেন না কেন? তাহলে তো শুধু অযোগ্যদেরই চাকরি যেত। যোগ্যরা সসম্মানে নিজ পদে নিযুক্ত থাকতেন এবং চূড়ান্ত সামাজিক অপমানের সম্মুখীন হতে হত না তাঁদের। শাক দিয়ে আর কত মাছ ঢাকবেন? দুর্গন্ধে যে টেকা যাচ্ছে না। যদি ভবিষ্যতে প্রমাণিত হয় যে এসএসসি জেনেশুনে যোগ্য ব্যক্তিদের তালিকা দেয়নি, তাহলে কিন্তু আপনার গন্তব্য প্রেসিডেন্সি হতে পারে। না, ইউনিভার্সিটি নয়।

সেসব ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, এই রায় বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলবে? সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত ভয়ানক হতে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বা তাঁর আইনজীবী নেতা কল্যাণ ব্যানার্জি যতই বলুন সুপ্রিম কোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসবেন, নিয়োগে যে অতলান্ত দুর্নীতি হয়েছে তা একাধিকবার আইনত এবং জনমনে প্রতিষ্ঠিত। ফলে আজ বাদে কাল স্থগিতাদেশ এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বা এই সমস্যার যে সমাধান হবে না তা নিশ্চিত।

কিন্তু ঘোরতর অনিশ্চিত হয়ে গেল বাংলার সরকারি স্কুলগুলোর পঠনপাঠন। হাইকোর্ট আদেশে বলেছে বটে, খুব দ্রুত ২০১৬ সালের সমস্ত ওএমআর শিট পুনর্মূল্যায়ন করে গোটা প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করতে হবে। কিন্তু আজকের অবস্থায় এসএসসি সে কাজ কতটা করতে পারবে এবং করলেও তাতে কতটা স্বচ্ছ হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

আরো পড়ুন স্কুল বেহাল, শিগগির অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন ফুরোবে

এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমার, আপনার কি করণীয়? ঠান্ডা মাথায় বুঝে নেওয়া, যে এই বিপর্যয়ের জন্যে মূল দায়ী কে বা কারা। কারা টাকার বিনিময়ে এই বিরাট দুষ্কর্ম চালিয়েছে? যাঁদের চাকরি যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে যাঁরা যোগ্য (আমরা বাইরে থেকে কোনোভাবেই বলতে পারব না) তাঁদের কাজ এবং সম্মান ফিরে পাওয়াই কাম্য। এসএসসি দ্রুত আদালতের নির্দেশ মোতাবেক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুক, অযোগ্যদের জায়গায় যেসব যোগ্য প্রার্থী দীর্ঘকাল রাস্তায় বসে আন্দোলন করছেন তাঁরা মেধা তালিকা অনুযায়ী নিযুক্ত হোন, এই কামনা করা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কী করতে পারি আমরা?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.