১৯৪৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি স্লোগান দিয়েছিল “ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, দেশ আভি তক ভুখা হ্যায়!” আজ প্রায় সকল ধারার কমিউনিস্টরাই স্বীকার করেন যে, স্লোগানটা খুব একটা সঠিক ছিল না। একটা উপনিবেশ থেকে ঔপনিবেশিক শক্তি বিদায় নিয়েছিল, ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছিল। দেশে দেশীয়দের দ্বারা নতুন সরকার গঠিত হয়েছিল, নতুন সংবিধান রচিত হচ্ছিল, নয়া স্বাধীনতার স্বাদ মানুষকে উদ্বেলিত করেছিল। সেই স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতার জন্যে জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে জীবন কুরবানি দিয়েছিল অসংখ্য মানুষ, অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিল সম্পত্তি, অশেষ দুঃখ কষ্ট নির্যাতন দ্বীপান্তর ভোগ করেছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অবশেষে যখন এল তখন কি তাকে ঝুটা বলাটা সমীচীন? এই নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতৃত্বও ওই স্লোগানটিকে ভালো চোখে দেখেননি, সঠিক বলে মনে করেননি।

একদিক থেকে দেখতে গেলে ঠিকই, স্লোগানটা রাজনৈতিকভাবে সঠিক ছিল না। পরিভাষা প্রয়োগ করে বললে বলা উচিত, তাতে অতিবাম বিচ্যুতি ছিল। কিন্তু আজ যখন দেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে ‘স্বতন্ত্রতা কা অমৃত মহোৎসব’ পালনের ডাক দিয়েছে তখন যে ভারতে আমরা আজ বাস করছি সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বাধীনতা কী অবস্থায় রয়েছে? দেশের সামগ্রিক স্বাধীনতারই বা কী অবস্থা? আমরা কি তার খোঁজ রাখি?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কমিউনিস্ট পার্টি সেদিন বলেছিল “দেশ আভি তক ভুখা হ্যায়।” প্রশ্ন উঠেছিল “দেশনেতাদের হাতে কি জাদুকাঠি আছে, যে স্বাধীন হওয়া মাত্র গরীবী, ভুখমারী হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে?” প্রশ্নটার মধ্যে একটা সারবত্তা তো ছিল! ব্রিটিশরা তাদের দুশো বছরের শাসনে দেশটাকে ছিবড়ে করে রেখে গিয়েছিল। তারা যখন ভারতে এসেছিল তখন ভারতের মোট জাতীয় আয় গোটা বিশ্বের জাতীয় আয়ের এক চতুর্থাংশ, অর্থাৎ ২৫% ছিল। আর যখন গেল তখন সেটা নেমে এসেছিল তিন শতাংশে। ঠিকই তো, এমন অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সময় তো লাগবেই। কিন্তু ৭৫ বছর পর যদি দেখা যায় সেই দেশে আজকাল গোটা বছরে যা আয় হয় তার ৭৩% যায় একদম উপরের ১% মানুষের হাতে, তখন তো পালটা প্রশ্ন উঠবেই, যে ঘুরে দাঁড়ানোর নাম করে এটা কি দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা হল না? অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী এ দেশের একজন অসংগঠিত শিল্পশ্রমিক যা মাইনে পায় তাতে তার ৯৪১ বছর লাগবে বস্ত্রশিল্পের একটা বড় কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ এক্সিকিউটিভের এক বছরের সমান মাইনে পেতে। তাহলে এখন ৭৫ বছর পর কী বলা যাবে এই স্বাধীনতা সম্পর্কে? দেশনেতারা কী বলেন?

এই তো গত বছরই এই সময়ে দেশে কৃষক আন্দোলন চলছিল। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর হাতে কৃষিক্ষেত্রকে তুলে দেবার যে চেষ্টা সরকার চালাচ্ছিল তিনটে আইন লাগু করে, তার বিরুদ্ধে কৃষকদের দিল্লি সীমান্তে খোলা রাস্তায় এক বছর ধরে বসে থাকতে হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, এই লড়াই গড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিত হিসাবে আমাদের সামনে আছে এমন এক কৃষিব্যবস্থা, যেখানে গড়ে প্রতি সাতাশ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করছিলেন। এর প্রধান কারণই ছিল কৃষিব্যবস্থা অলাভজনক হয়ে পড়ার সমস্যা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলি কৃষির একটা দিকে ঢুকেই পড়েছিল অনেক আগে থেকে। সার, বীজ, কীটনাশকের উপর দেশের কৃষিব্যবস্থাকে নির্ভরশীল করে দিয়ে ইচ্ছামত এই ইনপুটগুলোর দাম বাড়ানোর খেলা ‘সবুজ বিপ্লব’-এর সময় থেকেই সবুজ বিপ্লবের নাম করে বহুজাতিকরা শুরু করেছে। অন্যদিকে কৃষির আউটপুট বা উৎপাদনের উপরেও ধীরে ধীরে তাদের কব্জা বাড়ছিল। এমনিতেই ফসলের দাম স্থির করার ব্যাপারে কৃষকদের কোনো ভূমিকা নেই, সবটাই করে সংগঠিত ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষক অসংগঠিত। ফলে একদিকে বর্ধিত উৎপাদন ব্যয় এবং অন্যদিকে দাম না পাওয়ার মরণখেলা কৃষকদের কাছে যখন বিভীষিকা হয়ে উঠছে তখন ফড়েদের পরিবর্তে বহুজাতিকরা যদি সম্পূর্ণভাবে ফসলের দখল নেয় তাহলে কী অবস্থা হবে এটা কৃষকদের কাছে অনুমানের বিষয় ছিল না। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের ইতিমধ্যেই ছিল। ফলে শুরু হল জীবনমরণ লড়াই। স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও! ভাবা যায়? তাহলে এই ৭৫ বছরে হলটা কী?

একটা সময় ছিল যখন কৃষিজমির অধিকাংশটাই ছিল জোতদার জমিদারদের হাতে। হ্যাঁ, স্বাধীনতার পরের সময়টার কথাই বলছি। সেখান থেকে সরকারি উদ্যোগে খুব স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ পথে কিন্তু জমি কৃষকের হাতে আসেনি। একের পর এক কৃষক সংগ্রাম, এমনকি সশস্ত্র সংগ্রামও কৃষকদের করতে হয়েছে। সেইসব আন্দোলনকে সরকার “সন্ত্রাসবাদী” বলে চিহ্নিতও করেছে। জেল, হত্যা, খুন, গুমখুন, দমনপীড়ন সবই চলেছে। আজও সেইসব লড়াইয়ের জয়ধ্বনি দিলে সরকারি খাতায় একজন অধ্যাপকও গোপনে সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত হয়ে যান। কেন? জমি চেয়ে কি অন্যায় করা হয়েছিল? তা না পেয়ে লড়াই করে কি অন্যায় করা হয়েছিল? স্বাধীন দেশে কৃষক কি স্বাধীনতা পাবে না? তার কি তা পাওয়ার কথা ছিল না? নাকি স্বাধীনতার মানে বলে ধরে নেওয়াই হয়েছিল বছরে এক দিন জাতীয় পতাকা ওড়ানো? সেসব লড়াইয়ের ফলে কিছু কিছু জমি অবশ্য এল কৃষকের হাতে। কিন্তু কৃষিব্যবস্থা উত্তরোত্তর চলে গেল বহুজাতিকদের হাতে। এখন তো আবার শুরু হয়েছে উলটো প্রক্রিয়া। জমি কৃষকদের থেকে কেড়ে নিয়ে দেওয়া হচ্ছে বহুজাতিককে। আচ্ছা, তাহলে স্বাধীনতাটা কি শুধু বহুজাতিকরাই পেল? দেশের পাঁচ শতাংশ লোক পেল? তা এখন কী বলা যাবে এই স্বাধীনতা নিয়ে? প্রকৃত? আসল? খাঁটি? কী বলছেন আমাদের নেতারা?

১৯৪৭ সালে ইংরেজরা যখন ভারত ছাড়ল তখন দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল শূন্য। আজ ৭৫ বছরে তা শূন্য থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই হিসাব ২০২১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চারাও বুঝবে এর অর্থ কী। ব্যাপারটা শুধু এই নয় যে আপনি ধার নিয়েছেন এবং মাসে মাসে কি বছরে বছরে সুদ মেটাচ্ছেন, আসলও ফেরত দিচ্ছেন। তারপর আবারও ধার নিচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে ব্যাপারস্যাপার অত সরল নয়। গত শতকের আশির দশকের শেষে সুসান জর্জের যে বিখ্যাত বইটা সারা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার নাম ছিল A Fate Worse Than Debt সারা বিশ্বের ঋণগ্রহিতা দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক ফিনান্স চক্র এবং পুঁজির আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেমনভাবে ঋণের জালে বেঁধে তাদের হাজারো শর্ত মানতে বাধ্য করে, কেমন করে আজ যাকে “উন্নয়ন উন্নয়ন” বলে পাড়া মাথায় করা হচ্ছে, তার ফলে আমজনতা আরও প্রান্তিক, আরও বুভুক্ষু হয়ে পড়ছে, শ্রম এবং প্রকৃতির অভূতপূর্ব শোষণে ছিবড়ে হয়ে যাচ্ছে একেকটা দেশ – তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছিলেন সুসান। তিনি দেখিয়েছিলেন কেমনভাবে এই সাংঘাতিক অপ-উন্নয়ন আসলে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণের কারণ এবং ফলাফল দুটোই। আমাদের দেশকে আমরা আমাদের মত করে তৈরি করতে, গড়তে পারব না। সবকিছুই করতে হবে আন্তর্জাতিক পুঁজির অঙ্গুলিহেলনে। ফলে এটাই ঘটবে যে ভারতের মত একটা দেশ, যার কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা কম করে পাঁচ হাজার বছরের, তাদের চাষ করা শেখাবে উত্তর আমেরিকার জবরদখলকারী ঔপনিবেশিকরা, যাদের লুন্ঠনের অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নেই। তাকেই আবার সবুজ বিপ্লব নামে গৌরবান্বিত করা হবে। আমাদের দেশের পাট, চা, কার্পাস, কয়েক হাজার রকমের ধানের প্রজাতি, বনজ সম্পদ দিয়ে আমাদের উন্নয়ন হবে না। কৃষিজমি ধ্বংস করতে হবে, বনাঞ্চল ধ্বংস করতে হবে, প্রকৃতি ধ্বংস করতে হবে, মানুষকে ছিন্নমূল হতে হবে। আদিম সঞ্চয়নের যে প্রক্রিয়াকে কার্ল মার্কস চিহ্নিত করেছিলেন “রক্তের অক্ষরে লিখে রাখা ইতিহাস” বলে, আমাদেরও নাকি হাঁটতে হবে সেই পথেই। এ কি স্বাধীনতা? নাকি ঘুরিয়ে সেই পরাধীনতাই দাঁড়াল? তবে আজকের মত করে। পরোক্ষে, পুঁজির সুতোয়।

আরো পড়ুন এক রাষ্ট্র এক পুলিশবাহিনী

আমাদের দেশের প্রধান প্রধান শিল্পসংস্থাগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন। হয় তারা বিদেশি নয়তো দেশি কাঠামোর ভেতর আসলে বিদেশি পুঁজির মাতব্বরি। আমাদের শেয়ার বাজার দেখুন। বিদেশি পোর্টফোলিও পুঁজির দাপটে সে উপরে ওঠে, নীচে গড়াগড়ি খায়। তাহলে আজ এই স্বাধীনতাকে ঠিক কী বলা যাবে? সাচ্চা? প্রকৃত? খাঁটি?

এমন দেশের এমন অর্থনীতিতে আমজনতা যে ক্রমশ আরও বিচ্ছিন্ন হবেন, উদ্বাস্তু হবেন, কাজ হারাবেন, দরিদ্র হবেন সে তো খুবই স্বাভাবিক। তাই ক্ষোভ-বিক্ষোভ, বাদ-প্রতিবাদ চলবে তা-ও স্বাভাবিক। সেখানে বিক্ষোভকারীদের ঘরবাড়ির উপর বুলডোজার চলবে সেটাও কি স্বাভাবিক একটা সত্যিকারের স্বাধীন দেশে? খবর করতে গিয়ে সাংবাদিকরা রাষ্ট্রদোহিতার মামলায় ফেঁসে বছরের পর বছর জেলে থাকবেন, স্বাধীন গণমাধ্যমের উপর, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের উপর রাষ্ট্রদোহিতার মামলা রুজু হবে – স্বাধীন দেশে সেটাও স্বাভাবিক? গত সাত বছরে দেশে ১০,৫৫২ জনের উপর দেশদ্রোহিতার মামলা রুজু হয়েছে। অধ্যাপক জিএন সাইবাবার মত ৯০% শারীরিক অক্ষম ব্যক্তিদেরও মনে করা হয়েছে সন্ত্রাসবাদী, মাওবাদী। না, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো নাশকতার অভিযোগ নেই। অভিযোগ এটাই যে তিনি নিষিদ্ধ ‘মাওবাদী পার্টি’-র সমর্থক। অর্থাৎ, এখন আর শুধু কোনো একটা কাজকেই অপরাধ বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে না, বিশেষ বিশেষ চিন্তাও আজ অপরাধ। অর্থাৎ মনে মনে কিছু একটা ভাবলেই তার ভিত্তিতে আপনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত হতে পারেন। একে কি স্বাধীনতা বলা যাবে?

‘স্বতন্ত্রতা কা অমৃত মহোৎসব’-এ এই প্রশ্নগুলো দগদগে হয়ে থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.