সৌহার্দ্য কর

গণআন্দোলনের কর্মীদের উপর নানা কৌশলে রাষ্ট্রের ক্রমাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে এবং রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে, শ্রমজীবী মানুষের রাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করা ছাত্র সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র ফ্রন্ট (আরএসএফ) গত ২৮ জানুয়ারি (রবিবার), ৪৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রাঙ্গণে একটি মিছিলের আয়োজন করে। এই মিছিল শুরু হতে না হতেই বিধাননগর পুলিস ফ্যাসিবাদী কায়দায় মিছিলের উপর আক্রমণ করে এবং নজনকে গ্রেফতার করে।

ঠিক তার দু-আড়াই ঘন্টা পরেই শোনা যায়, যাদবপুর কমিউনের অন্তর্গত প্রীতিলতা পাঠশালা, আশু তিমিরের পাঠশালা এবং ভগৎ সিং পাঠশালা নামক বামপন্থী ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগের সংগঠকদের আটক করেছে পুলিস। অপরাধ? বস্তুত, কিছু বামপন্থী মনোভাবাপন্ন ছাত্রছাত্রী, যুবক যুবতীর উদ্যোগে বস্তির দুবেলা পেট ভরে খেতে না পাওয়া পরিবারের সন্তানদের পঠনপাঠনে সাহায্যের জন্য চালানো হয় এই পাঠশালাগুলো। সেই সন্তানরাই তাঁদের সাংস্কৃতিক পত্রিকা চরকি বিক্রি করছিল এবং প্যালেস্তাইন-গাজায় শিশুহত্যার বিরুদ্ধে ছবি এঁকে প্রদর্শনীও চালাচ্ছিল মেলার ভিতরে। সেটাই পুলিসের চোখে গুরুতর অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় তাঁদের উপর চড়াও হয় শপিজেন বাংলা, ইস্কন ও স্বয়ং গিল্ড কর্তৃপক্ষ। গিল্ডের বক্তব্য, তাদের টাকা জমা দিয়ে স্টল নিয়ে বই বিক্রি করা উচিত ছিল। এই নিয়ে বাকবিতণ্ডা চলার মধ্যেই পুলিস এসে একজন শিশু সমেত পাঠশালার প্রধানদের আটক করে। সামনের লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন থেকে গণতান্ত্রিক পরিসরের কর্মীরা এগিয়ে এসে প্রতিবাদ করলে তাঁদেরও দীর্ঘক্ষণ আটক করে রাখে পুলিস।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এইসব ঘটনার বিরুদ্ধে পরদিন (২৯ জানুয়ারি, সোমবার) বিভিন্ন গণসংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। গিল্ড কর্তৃপক্ষের কাছে ডেপুটেশন দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়। প্রতিবাদীরা জমা হতেই বিধাননগর পুলিস তাঁদের মারধর করে, মহিলা প্রতিবাদকারীদের পুরুষ পুলিসকর্মীরা টেনে হিঁচড়ে পুলিস কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যায়, তাঁদের চড় মারা হয়, অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হয়। তারপর রাত আটটা নাগাদ ১৫ জন আন্দোলনকারীকে বিধাননগর নর্থ পুলিস থানায় আটক করা হয়। এদের মধ্যে দুজন আন্দোলনকারী, শঙ্খদীপ দাস এবং অভিনব দাসকে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাদের আদালতে তোলা হলে বিচারপতি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

বিধাননগর পুলিস তাদের এই অগণতান্ত্রিক আচরণের পক্ষে একটিমাত্র কুযুক্তি খাড়া করেছে – বইমেলা প্রাঙ্গণ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির জায়গা নয়। একথা বুঝতে কারোরই সমস্যা হওয়ার কথা নয়, ‘ডিস্টার্বড এরিয়া’ হিসাবে ঘোষিত না হলে বা ১৪৪ ধারা জারি না থাকলে, ভারতের যে কোনো জায়গাতেই শান্তিপূর্ণ জমায়েত এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২২ জানুয়ারি অযোধ্যার রামমন্দির প্রতিষ্ঠা উদযাপন করতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদী শক্তির ধারক ও বাহক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এই বইমেলাতেই মিছিল করেছে। শুধু মিছিলই নয়, গাজায় চলা মার্কিন মদতপুষ্ট ইজরায়েলের গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি ছবি থাকায় মনফকিরার স্টলে আক্রমণও চালায় এবং স্টল ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়। সেইসময় পুলিস কোনো বাধা দেয়নি। মনফকিরার কর্মীরা এ নিয়ে গিল্ডের দ্বারস্থ হলেও কোনো সাহায্য পাননি। এসব থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, বিধাননগর পুলিস তথা রাজ্য সরকারের প্রশাসন ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। আসলে আজ মমতা ব্যানার্জি নিয়ন্ত্রিত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ফ্যাসিবাদবিরোধিতা শুভেন্দু অধিকারীর দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার সংকল্পের মতই হাস্যকর কথার কথা।

এই বাংলায় শাসকবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাস প্রাচীন। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক থেকে শুরু করে বামফ্রন্ট সরকারের গা জোয়ারি, পুলিসি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। সেসব ঘটনা কেবল ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে তা নয়, এ এক জীবন্ত প্রক্রিয়া, যা কালক্রমে বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। বাংলার সংসদীয় রাজনীতিও আবর্তিত হয়েছে জনগণের এই সংগ্রামকে কেন্দ্র করেই। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার তৈরি হওয়ার পিছনে বন্দি মুক্তি আন্দোলনের ভূমিকা ছিল। ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট মুক্তি দিয়েছিলও বটে। মমতা নিজেও মসনদে বসেছিলেন সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-লালগড় আন্দোলনের উপর ভর করে এবং সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েই। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে কেড়ে নেন রাজনৈতিক বন্দি তকমাটুকুও। এখনো তাঁর প্রশাসন চালিয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনবিরোধী কাজকর্ম – বীরভূমের দেউচা পাঁচামি থেকে চটকলের শ্রমিক পর্যন্ত সবার উপরে। এমনকি বাদ যাচ্ছেন না রাজ্য সরকারি কর্মচারীরাও। মহার্ঘ ভাতার জন্যে আন্দোলনরত কর্মচারীদের উপরেও তৃণমূল সরকার বারবার চড়াও হচ্ছে আন্দোলন ভেস্তে দিতে।

রামরাজ্য উত্তরপ্রদেশ বা দেশের রাজধানী দিল্লিতে বুলডোজার দিয়ে আন্দোলনকারীদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া, মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার যে মর্মান্তিক চিত্র আজ মূলধারার সংবাদমাধ্যমে হামেশাই ভেসে ওঠে, তার বদলে বাংলার জনগণ বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রী, যুবক যুবতী, বুদ্ধিজীবী, কেরানি, কর্মচারী তথা ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষদের আন্দোলন দেখতেই অভ্যস্ত। দেশজুড়ে বর্ণাশ্রমের কারণে নিপীড়িত ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা যখন মামুলি ব্যাপার হয়ে গেছে, তখন আমরাই ছাত্র আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন করেছিলাম। গ্রাম, শহর, মফস্বলের অলিগলিতে চায়ের দোকানে, ট্রেনের কামরায় যে এখনো রাজনৈতিক তর্ক বিতর্কের ঝড় ওঠে, তা দীর্ঘকাল শাসকবিরোধী সংগ্রামের ফলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক চেতনার ফল। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের অভ্যর্থনা মঞ্চ, চলচ্চিত্র উৎসব, বইমেলা – সব জায়গাতেই বিরোধী রাজনীতির চর্চা এবং অনুশীলন বাংলার স্বাভাবিক চিত্র। বলতে গেলে এটাই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আজ জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার যে কতখানি বিপন্ন তা বইমেলা যে ঘটনাবলীর সাক্ষী থাকল তাতে আরও পরিষ্কার হল।

আরো পড়ুন বইমেলা, না কলকাতার সবেধন নীলমণি কার্নিভাল?

এবারের ঘটনাবলী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তৃণমূল সরকার দেশজুড়ে চলা হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনে ধুয়ো দিচ্ছে। কলকাতা বইমেলার রাজনৈতিক চর্চা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধের ইতিহাসকে চাপা দিয়ে তারা এই পরিসরটাকে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব কর্পোরেট ধাঁচে সাজাতে চাইছে। সেখানে কেবল বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত বেসরকারি কলেজগুলোর প্রচারের জন্য স্টল থাকবে, মিও আমোরের আউটলেট থাকবে, কিছু নামকরা শাসক দলের ঘনিষ্ঠ শিল্পী এসে ‘সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান’ করবে, ধর্মীয় ভাবাবেগের নামে ব্রাহ্মণ্যবাদী, ফ্যাসিবাদী শক্তি নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করবে, প্রগতিশীল সাহিত্যচর্চার স্টলে গিয়ে ভাংচুর করবে আর গিল্ডের ভাগ্যনিয়ন্তা তৃণমূল সরকার সবটা দেখেশুনে পুলিস দিয়ে অগণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। সে খবর আবার মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলোয় জায়গাও পাবে না। অর্থাৎ উপর উপর চোখধাঁধানো জাঁকজমকে ভরিয়ে দিয়ে বইমেলাকে কেবল হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদীদের খেউড় আর মুনাফাখোর বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলোর মুক্তাঞ্চলে পরিণত করতে চাইছে তৃণমূল সরকার।

দেখে আশঙ্কা হয়, আয়োজনের দায়ভারও আগামীদিনে তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলোর হাতে। সেই কারণেই বোধহয় কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলির অরাজনীতিকরণের নীতি মেনে বইমেলা প্রাঙ্গণের ভিতরে বিরোধী স্বরের টুঁটি টিপে ধরতে মরিয়া এই সরকারের পুলিস। কিন্তু এসব করে বাংলার জনগণ এবং সংগঠনগুলোর বৈপ্লবিক চেতনাকে দমিয়ে রাখা যায় না, ইতিহাস তার সাক্ষী। আশা করি মুখ্যমন্ত্রীও তা জানেন।

লেখক বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। তথ্য লেখকের, মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.