মিমে যেন ছেয়ে গেছে নেট দুনিয়া। কোথাও জনপ্রিয় হিন্দি গানের দু-চারটি লাইন, যেখানে বিরহ বা পুনর্মিলনের কথা বলা হচ্ছে। কোথাও আবার পুরনো কথার উদ্ধৃতি, যেমন “এ আমার শেষ নির্বাচন”, অথবা “মরে যাব কিন্তু ওদের সাথে আর ফিরে যাব না” ইত্যাদি। সব আক্রমণের লক্ষ্য একজনই – নীতীশ কুমার।
গত প্রায় ২৪ বছরে নবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথগ্রহণ করেছেন তিনি। এর মধ্যে আবার পাঁচবার জোট বদল করে। অর্থাৎ কখনো বিজেপির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সে (এনডিএ) গিয়ে, আবার কখনো লালুপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) আর বাম-কংগ্রেসের হাত ধরে। বিহার বিধানসভায় জোটের অন্য বড় শরিকের চেয়ে কম আসন পেয়েও মুখ্যমন্ত্রীর আসনে কিন্তু তিনিই বসেন বারংবার। প্রতিবারই জোট বদলে প্রশ্ন ওঠে, এরপর কী হবে? আবার কি ফিরবেন নীতীশ? সরকার চলার মাঝথেই হয়ত পক্ষে বদলে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে ফেরত আসেন তিনি।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তাঁর পার্টি জনতা দল (ইউনাইটেড)-এর মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও, তাঁর মুখ ছাড়া দল যে চলবে না তা মোটামুটি সবাই স্বীকার করেন। খুব সাবধানে দল সাজিয়েছেন নীতীশ। দু নম্বরে এমন কেউ নেই যিনি তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেন। অনেক আগে কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা আমায় বলেছিলেন যে বহুদূর পর্যন্ত তাকালেও নীতীশবাবুর পিছনে আর কাউকে দেখা যাবে না। কাজেই পালাবদলের সময়ে সকলেই তাঁর পিছু পিছুই যান।
নীতীশ ভাল করেই জানেন, ভোটবাক্সে তাঁর প্রধান সমর্থক যাঁরা, অর্থাৎ কুর্মি, তাঁরা রাজ্যে তিন শতাংশেরও কম। সেক্ষেত্রে কারোর না কারোর হাত তো ধরতেই হবে। ওদিকে বিজেপিও জানে যে শুধু অগ্রসর (অসংরক্ষিত) জাতির জোরে বিহার জেতা যাবে না। কর্পুরি ঠাকুরকে মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়া আসন্ন নির্বাচনে বিহারের ৩৬% ইবিসি ভোটারকে কাছে টানার একটি কৌশল মাত্র। তাছাড়া এর মাধ্যমে একজন বিহারী ‘আইকন’ তৈরি করাও হল আর কি। কারণ কর্পুরির মতাদর্শ কোনোভাবেই বিজেপির সঙ্গে খাপ খায় না। কমণ্ডলু রাজনীতির (ধর্মভিত্তিক রাজনীতি) প্রতি বিরূপ ছিলেন তিনি। তাঁর সমর্থন দেখা গেছে মণ্ডলের (জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ) প্রতি। কাজেই নীতীশ মনে করলেন ৭২ বছর বয়সেও মুখ্যমন্ত্রী থাকতে থাকতেই আবার পদে ফিরে আসার রাস্তা প্রশস্ত করার এটাই সঠিক উপায়।
অথচ এই নীতীশই কিন্তু বিরোধীপক্ষের হয়ে রাজ্যে রাজ্যে ঘুরে কংগ্রেস ও বিভিন্ন আঞ্চলিক দলগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলে গত জুন মাসে বিহারের রাজধানী পাটনায় নতুন জোট ইন্ডিয়ার প্রথম সম্মেলন করান। কিন্তু পরে মুখ হিসাবে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের নাম আসতেই নাকি তিনি ক্ষুণ্ণ হন। হয়তো সুপ্ত ইচ্ছা ছিল জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন। সে গুড়ে বালি। ওদিকে লালুপুত্র তেজস্বী বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কদিন আর তাঁকে ঠেকিয়ে রাখবেন? কাজেই বদলাও সমীকরণ।
নীতীশ প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ২০০০ সালের ৩ মার্চ, যখন সমতা পার্টির নেতা থাকাকালীন তৎকালীন বাজপেয়ী সরকারের নির্দেশে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে বিহারে ফেরেন। সেইসময় ৩২৪ সদস্যের বিধানসভায় (ঝাড়খণ্ড তখনো আলাদা রাজ্য হয়নি) তাঁর দল পায় ১৫১ আসন এবং আরজেডি পায় ১৫৯। অর্থাৎ কোনো পক্ষই অর্ধেক পথ অতিক্রম করতে পারেনি। সাতদিন পরে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবেন না বুঝতে পেরে, পদত্যাগ করেন নীতীশ। কংগ্রেসের সমর্থনে লালুর স্ত্রী রাবড়ি দেবী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন।
২০০৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফেব্রুয়ারি মাসে নড়বড়ে ফলাফলের পর বিহারে ফের নির্বাচন হয় অক্টোবর-নভেম্বরে। এনডিএর ফুৎকারে উড়ে যায় বিরোধীরা, নীতীশ ফিরে আসেন মসনদে। ঘটনাচক্রে সেবার আসন সংখ্যায় পঞ্চম স্থানে নেমে গিয়েছিল কংগ্রেস। তাদের আর উত্থান হল না। পরের বছর বিধান পরিষদে নির্বাচিত হন নীতীশ। ২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন তিনি। তাঁর দল জেডিইউ এবং বিজেপি একসাথে বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আরজেডি-এলজেপি জোট এবং ইতিমধ্যে দুর্বল কংগ্রেস দলকে পরাজিত করে। কংগ্রেস সেবার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
তবে ২০১৪ সালের ১৭ মে লোকসভা ভোটে বিহারে নীতীশের দলের ভরাডুবি ঘটে। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী বিপুল জনাদেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নীতীশ ভাবেন, চলো পাল্টাই। তাও ওই হারের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেন। জেডিইউ সেবার বিহারে মাত্র দুটি লোকসভা আসন জিততে পেরেছিল। দীর্ঘ ১৭ বছরের জোট ভেঙে নীতীশ বেরিয়ে আসেন এনডিএ থেকে। ২০০৯ সালে কিন্তু তাঁর দল বিজেপির সঙ্গে জোট করে রাজ্যের ৪০টি আসনের অর্ধেকই জিতে নিয়েছিল। জিতন রাম মাঝি ২০১৪ সালের ২০ মে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর সঙ্গে নীতীশের মতপার্থক্য হয় এবং ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জিতন পদত্যাগ করেন। কিছু বিশ্লেষকের কথায়, নীতিশ নাকি তখনই প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তিনি পছন্দ করেননি। সে যা-ই হোক, সেবার ২২ ফেব্রুয়ারি আস্থা ভোটের ঠিক আগে জিতন পদত্যাগ করার পর নীতীশ আবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। সেদিন জেডিইউ প্রধান “দায়িত্ব ছেড়ে যাবার” (পদত্যাগ) জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। এবার ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর বিজেপির পরিবর্তে আরজেডির সমর্থনে নীতীশ আরও একবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তেজস্বী উপমুখ্যমন্ত্রী হন, তাঁকে এবং তাঁর ভাই তেজপ্রতাপকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু তেজস্বীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সম্পর্ক শীঘ্রই তিক্ত হয়ে ওঠে, ফলে ভেঙে যায় জোট সরকার। নতুন জোটে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই ফের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নীতীশ। ২০১৮ সালে তিনি তৃতীয়বার বিহার বিধান পরিষদে নির্বাচিত হন। তারপর, ২০২০ বিধানসভা নির্বাচনে ২৪৩ সদস্যের বিহার বিধানসভায় জেডিইউ পায় মাত্র ৪৫ আসন। বিজেপি এবং জিতন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা (সেকুলার) এবং এক নির্দল সদস্যের সমর্থন নিয়ে এনডিএর মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিজেপি ১১০ বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়ে জেতে ৭৪টি আসন।
বিহারে ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ ১২৫টি আসন জিতেছিল, যেখানে বিরোধী মহাজোট ১১০টি আসন পায়। এদিকে জেডিইউর আসনসংখ্যা ২০১৫ সালের নির্বাচনের ৭১ থেকে কিন্তু কমে আসে। একশো পনেরো আসনের মধ্যে মাত্র ৪৫টিতে জয়লাভ করার পর নীতীশ কিন্তু আর ‘দায়িত্ব’ নিলেন না। উলটে যখন বিহার নির্বাচনের তৃতীয় দফার প্রচার যখন শেষ হয়ে আসছে, তখন এক সভায় ওই মেয়াদ শেষে অবসর নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি।
কিন্তু মাঝপথেই নৌকা বদলে ফের শপথগ্রহণ করেন, পাশে সেই লালুপুত্র তেজস্বী। অর্থাৎ ২০২২ সালে শেষবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন নীতীশ, যখন তিনি এনডিএর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আরজেডি, কংগ্রেস ও বাম দলগুলির জোটে যোগ দেন। ইন্ডিয়া জোটের মুখ না হবার ক্ষোভ অথবা বিহারের জাতিগত আদমশুমারির প্রভাব, এমন কোনো একটা কারণে ফের এনডিএর হাত ধরলেন নীতীশ।
আরো পড়ুন বিহার সরকারের উপর নজরদারি করতে চায় লিবারেশন
সাংবাদিক সঙ্কর্ষণ ঠাকুর যথাযথভাবে নীতীশের জীবনীর নাম দিয়েছেন সিঙ্গল ম্যান, এবং তাঁর বর্ণনায় লিখেছেন “একজন সতর্ক মানুষ, প্রায়শই খুব সতর্ক, তিনি সে মাঠে পা রাখবেন না যেখানে তিনি নিশ্চিত নন”। বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে ১৯৯২ সালে নীতীশ আর লালুর মধ্যে ব্যাপক ঝগড়া হয়, কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন নীতীশ। তাও তিনি বিভিন্ন সময়ে উভয়ের সঙ্গেই জোট বেঁধেছেন, এমনকি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মাঝপথেই দিক পরিবর্তন করেছেন।
এবারও তারই পুনরাবৃত্তি হল। পালাবদলের পালায় তিনি কিন্তু সিদ্ধহস্ত। ফলে বিহারে বহুবছর হল সরকার বদলালেও মুখ্যমন্ত্রী বদলায় না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।





