বইমেলা কি সবার? সবাই কি বিনা বাধায় বইমেলায় সম্পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারে? একজন হুইলচেয়ারে বসা বা একজন দৃষ্টিহীন মানুষ কি বইমেলার স্বাদ চেটেপুটে নিতে পারেন? স্বাধীনতা ৭৮, প্রজাতন্ত্র ৭৫ কিংবা কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ৪৭ – এইসব সংখ্যার ক্রমিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভারতে প্রতিবন্ধকতার প্রতি মনোভঙ্গির কোনো পরিবর্তন ঘটেছে কি? এই প্রশ্নগুলি গত কয়েকদিন ধরে সোশাল মিডিয়ায় এমনকী গণমাধ্যমেও ঘুরেফিরে উঠছে।

উন্নত দেশগুলির চেয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলি অর্থনৈতিক পরিসরের পাশাপাশি মানসিকতার পরিসরেও যে এদিক থেকে বহু যোজন পিছিয়ে আছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল সম্প্রতি শেষ হওয়া বইমেলায়। প্রায় আট লক্ষাধিক বর্গফুট এলাকা জুড়ে সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠিত এই মেলায় দেশ বিদেশের একাধিক স্টলের মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেল ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ কিছু প্রথম বিশ্বের দেশের স্টল নির্মাণের ক্ষেত্রে। সেখানে প্রবেশদ্বারের পাশাপাশি প্রস্থানের জায়গাতেও সিঁড়ির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক নির্দেশনামা মেনে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ঢালু রাস্তা বা র‍্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন সমেত ভারতের বেশকিছু বড় বড় স্টলের প্রবেশদ্বারে নিছক লোকদেখানো, অবৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্মিত র‍্যাম্পের ব্যবস্থা দেখা গেছে। সেই প্রবেশদ্বার আদৌ হুইলচেয়ার ব্যবহারের উপযুক্ত কিনা তা বোধহয় গিল্ডকর্তারা কোনো বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। অন্যদিকে ছোট ছোট স্টল ও তথাকথিত প্রগতিশীলতার ধারক ও বাহক লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে যে প্রতিবন্ধী মানুষ একেবারেই প্রবেশ করতে পারবেন না, তা স্পষ্ট। কারণ সেখানে না আছে কোনো র‍্যাম্পের ব্যবস্থা, না আছে হুইলচেয়ার নিয়ে যাতায়াতের উপযুক্ত রাস্তা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এখানেই প্রশ্ন আসে, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের উদ্যোগে এবং স্থানীয় কারিগরদের দ্বারা নির্মিত বিভিন্ন দেশের স্টলের মধ্যে এই পার্থক্যের কারণ কী? তবে কি মেলার আয়োজক গিল্ড প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষকে পাঠক বা ক্রেতা হিসাবে বিবেচনা করেন না? নাকি এই চিত্র আসলে ভারতে প্রতিবন্ধকতার প্রতি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভঙ্গিকেই চিহ্নিত করে?

সল্টলেকের সেন্ট্রাল পার্ক (যেখানে গত কয়েকবছর ধরে কলকাতা বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে) মোটের উপর সুগম্য। মেলা প্রাঙ্গণের নটি মূল গেটের মধ্যে মাত্র চার-পাঁচটি গেট দিয়ে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। বাকি গেটগুলি দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা স্পষ্ট। তবে প্রবেশ করা মাত্রই বুঝতে পারা যায়, ৪৭ বছরেও প্রগতিশীল প্রকাশক ও গিল্ড কর্তারা প্রতিবন্ধকতাযুক্ত এবং বয়স্ক মানুষদের (প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের সঙ্গে বয়স্ক মানুষরাও অনেকটা একইরকম অসুবিধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন) পাঠক হিসাবে ভাবতে এখনো অক্ষম। চার, পাঁচ বা ছয় নম্বর গেট দিয়ে কিছুটা হেঁটে গিয়ে গিল্ড অফিস যতটা সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, ততটা সহজে হুইলচেয়ার বা ব্যাটারিচালিত গাড়ি খুঁজে পাওয়া যায় না। গিল্ড অফিসে জিজ্ঞাসা করলে বলা হয় ‘পুলিসের কাছে খোঁজ নিন’, আবার পুলিস দায় ঝেড়ে বলে ‘গিল্ড অফিসে যান’। এইভাবে অনেক ঘোরাঘুরির পর জানা গেল মেলা প্রাঙ্গণের প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রে দু-একটি হুইলচেয়ার রয়েছে, যা জরুরি বা আপদকালীন প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে হাঁটাচলায় প্রতিবন্ধকতাযুক্ত একজন পাঠক কীভাবে আট লক্ষ বর্গফুট মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াবেন সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা। সর্বোপরি গোটা মেলা প্রাঙ্গণে উপযুক্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচালয়ের অনুপস্থিতি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত পাঠকের মনে শুধু বৈষম্য বা বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি সৃষ্টি করে না, অমানবিক পরিস্থিতিরও সম্মুখীন করে। অনেকের ধারণা, শৌচালয়ে প্রবেশের মুখটা ঢালু করে দিলেই প্রতিবন্ধীবান্ধব শৌচালয় হয়ে যায়। আভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি তাঁরা বিবেচনার মধ্যেই রাখেন না। উপরন্তু মেলার প্রথম সাতদিন ওই শৌচালয়গুলি যে ব্যবহারের অযোগ্য ছিল গিল্ডকর্তারাও তা স্বীকার করেছেন।

আরো পড়ুন এ সমাজে মরে বাঁচলেন সুবিমল মিশ্র

ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো পাঠক হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করলেও তাঁর পক্ষে মেলাপ্রাঙ্গণে সর্বত্র সহজে যাতায়াত করা কষ্টকর। অধিকাংশ স্টলের সামনে রয়েছে দু-তিনটি অসমান উঁচু সিঁড়ি এবং সংকীর্ণ দরজা। হুইলচেয়ারে বসে থাকা বা ক্রাচ নিয়ে চলা পাঠকের পক্ষে প্রবেশ করা খুবই কঠিন। দৃষ্টিহীন পাঠকদের জন্য ট্যাকটাইল মেঝের অভাব স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে যাতায়াতের বিপুল সমস্যা তৈরি করে। অন্তত মেলা প্রাঙ্গণে ব্যবহৃত মাইকে স্টলের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ক্রমাগত অবগত করলে দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য মেলা প্রাঙ্গণ প্রতিবন্ধীবান্ধব হয়ে উঠতে পারত। অডিও বুকের অভাব তো আছেই। দেশ বিদেশের প্রায় হাজারখানেক স্টল থাকলেও অডিও বুক বিরল। ফলে দেখার প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন মানুষের বইমেলা নিয়ে সার্বিক অনাগ্রহ চোখে পড়ে। বধির মানুষের জন্যও মেলার পরিবেশ উপযুক্ত নয়। তাঁদের বিপদের কথা শোনার এবং বোঝার জন্য গিল্ড অফিসে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ জানা দোভাষীও দেখা যায় না।

অনেকেই বলে থাকেন, ভারতের মত উন্নয়নশীল দেশে প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে চিরাচরিত ধারণা এবং প্রতিবন্ধীদের দৃশ্যমানতার অভাব বা জনপরিসরে অনুপস্থিতি এরকম পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। অথচ আগের তুলনায় ইদানীং বইমেলার মত বিরাট জনপরিসরে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষের উপস্থিতি বেড়েছে। কিন্তু প্রগতিশীল প্রকাশক বা গিল্ডের কর্মকর্তারা প্রতিবন্ধকতার প্রতি তাঁদের চিরাচরিত মানসিকতার কারণে এখনো প্রতিবন্ধীদের পাঠক বা ক্রেতা হিসাবে কল্পনা করে উঠতে পারেননি। এর আরেকটি কারণ হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক বই বা পত্রপত্রিকার অভাব। হাজার হাজার লিটল ম্যাগাজিনের মধ্যে একটিরও প্রতিবন্ধকতা সংখ্যা বা কোনো বিশেষ সক্ষম ব্যক্তি সংখ্যা চোখে পড়ে না। একদা প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক বইয়ের ব্যাপারে এক প্রগতিশীল প্রকাশক সগর্বে বলেছিলেন “আমাদের এখানে প্রতিবন্ধকতার বইয়ের বাজার নেই, তাই ছাপতে পারব না।” সর্বগ্রাসী পুঁজিবাদের যুগে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ কবে বাজারের চোখে উপভোক্তায় পরিণত হবে তার অপেক্ষায় থাকলাম।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.