“The lamps are going out all over Europe, we shall not see them lit again in our life-time.” প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় এমনই মন্তব্য করেছিলেন ব্রিটিশ বিদেশ সচিব স্যার এডওয়ার্ড গ্রে। এই লেখা লিখতে বসে তাঁর এই ইতিহাসখ্যাত মন্তব্যই একটু পাল্টে পুনরাবৃত্তি করতে ইচ্ছে করছে – একে একে দেউটি নিভছে সমগ্র বিশ্বজুড়ে, সন্দেহ হয় আমাদের জীবদ্দশায় আশার কোনো প্রদীপ আবার জ্বলে উঠবে কিনা।
এই অবধি পড়ে পাঠক হয়ত অভিযোগ করবেন – এ অতিকথন। পরিস্থিতি প্রতিকূল, কিন্তু তত খারাপও নয়। সত্যিই কি তাই? অতিমারীর ঝাপটের আগেই নড়বড় করছিল বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ছিল অব্যাহত। অতিমারী সেই অবস্থার আরও অবনমন ঘটিয়েছে। তারপর থেকে প্রতিবছর পরিস্থিতির শুধু অবনমনই হয়েছে, উন্নতি তেমন হয়নি। বুলেটিন অফ অ্যাটমিক সাইন্টিস্টদের তরফ থেকে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের মাধ্যমে মানবসভ্যতা নিজেকে ধ্বংস করার কতটা কাছাকাছি, তার একটা হিসাব রাখা হয়। ১৯৪৭ সাল থেকে আক্ষরিক অর্থেই মানবজাতির বারোটা বাজতে কত দেরি, তার হিসাব রাখছেন তাঁরা। ঠান্ডা লড়াইয়ের চরম মুহূর্তেও এই মহাপ্রলয়ের ঘড়ির (Doomsday Clock) কাঁটা ১১টা বেজে ৫৮ মিনিটের বেশি এগোয়নি। ২০২৪ সালে কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, চিরকালের মত মানবসভ্যতার আলো নিভতে আর দেড় মিনিট বাকি, মানুষ একেবারে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেন এমন বলছেন তাঁরা? সন্ধানে আমরা এক নজরে চোখ বুলিয়ে নিতে পারি দুরন্ত ঘূর্ণির মধ্যে থাকা এই জগতের মানচিত্রে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করা যাক। নতুন বছরে দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্পর্শ করেছে তিক্ততার নতুন মাত্রা। এমনকি ২০১৮ সালেও আন্তঃকোরিয়া আলোচনা আশা জাগিয়েছিল, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি না হলেও অবনতি আপাতত হবে না। শান্তিকামীদের সেই আশা পূর্ণ হচ্ছে না, তা স্পষ্ট। অপরদিকে প্রজাতন্ত্রী চীন (তাইওয়ান) এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের মধ্যেও সম্পর্ক তিক্ত থেকে তিক্ততর হচ্ছে। নয়ের দশকে এবং একুশ শতকের শুরুর বছরগুলিতে দুই সরকারের মধ্যে যে ইতিবাচক বোঝাপড়া গড়ে উঠেছিল, তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মুখে। তবে আশার কথা, এই তিক্ততা শুধু উত্তপ্ত বাদানুবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভবনাই বেশি। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ দুই পক্ষেরই অর্থনীতির অশেষ ক্ষতি করবে, যা দুই সরকারের কারোর জন্যই কাম্য নয়। তবে দুই কোরিয়ার মধ্যে তিক্ততা, জাপানের নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, প্রজাতন্ত্রী ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের বিবাদ পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতিকে যে উত্তপ্ত করে রেখেছে, তাতে সন্দেহ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌসেনার (অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যাশিত সঙ্গতে) প্রশান্ত মহাসাগরে ও চীন উপকূলে বারংবার সামরিক মহড়া এই উত্তাপ যে আরও বাড়াবে, তাতে সন্দেহ নেই।
ইন্দোনেশিয়া থেকে মায়ানমার পর্যন্ত প্রসারিত যে অঞ্চল, সেখানে আমরা যত পশ্চিম থেকে পূর্বে যাব, ততই দেখব রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমাবনমন। এই অঞ্চলের পশ্চিমতম প্রান্তে অবস্থিত ইন্দোচীন (ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস) এবং ইন্দোনেশিয়া রাজনৈতিকভাবে সর্বাপেক্ষা স্থিতিশীল। আরেকটু পূর্বদিকে মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও খুব ইতিবাচক নয়। সবে একবছর হল মালয়েশিয়া নতুন প্রধানমন্ত্রী লাভ করেছে। অবশ্য সংস্কারক হিসাবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে ঘিরে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের যে প্রবল প্রত্যাশা ছিল, তাঁদের অনেককেই হতাশ করেছেন তিনি। ইব্রাহিমের উদাহরণ প্রমাণ করে, একটা দুটো নির্বাচনে প্রগতিশীলরা জয়ী হয়েই দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। তবুও আশার কথা যে ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী পদ অবধি পৌঁছতে পেরেছেন। মালয়েশিয়ার প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে পরিস্থিতি ততদূরও গড়ায়নি। সেদেশের ২০২৩ সালের নির্বাচনে প্রগতিশীলরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েও এখন অবধি সরকার গড়তে অক্ষম। সমগ্র নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, থাই রাজতন্ত্র এবং সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে যে প্রবল প্রভাব তা যতদিন রয়েছে, ততদিন ভোটে জিতলেও ক্ষমতার রাশ প্রগতিশীলদের নাগালের বাইরেই থাকবে।
থাইল্যান্ডে সামরিক শক্তির সঙ্গে নাগরিক সমাজের দ্বন্দ্ব উত্তপ্ত হলেও প্রত্যক্ষ সংঘাতে পরিণত হয়নি। কিন্তু ঠিক সেই ঘটনাই ঘটেছে প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে। ২০২১ সালে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা অব্যাহত রয়েছে পুরোমাত্রায়। সু চি-পন্থী বিদ্রোহী বাহিনী মায়ানমারের বিভিন্ন উপজাতীর আধাসামরিক গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে সরকারি বাহিনীকে যথেষ্ট চাপে রেখেছে, নয়ের দশকের পর আবার সক্রিয় হয়েছে মায়ানমারের কমিউনিস্ট পার্টির গণমুক্তি ফৌজ। কিন্তু এই পুরো পরিস্থিতির অন্তিম পরিণতি কী হবে তা বলা কঠিন। আমাদের প্রতিবেশী এই দেশটির ভবিষ্যৎ যা-ই হোক, তার বর্তমানের পথ রক্তে পিচ্ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে সদ্য ‘গণতান্ত্রিক’ নির্বাচন শেষে ক্ষমতায় ফিরেছে আওয়ামী লীগ। লীগের বাংলাদেশি রাজনীতিতে যে চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী একচ্ছত্র প্রভাব, তা হ্রাসের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘প্রগতিশীলতা’-র কথা বললেও, বাংলাদেশের সমাজে উগ্র ইসলামপন্থীদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধির দায়িত্ব তারা অস্বীকার করতে পারে না।
অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র নিয়ে আমাদের, ভারতীয়দেরও, বলার বিশেষ মুখ নেই। এবছরই প্রবল কোলাহল সহযোগে অযোধ্যার রামমন্দিরে বিগ্রহের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল। প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল সংখ্যাগুরুবাদেরও। এবছরের নির্বাচন নির্ধারণ করবে ভারতবর্ষ নির্বাচিত স্বৈরাচারের দিকে আরেক ধাপ এগোবে কিনা, যদিও সেখানেও ইতিবাচক কোনো ফলাফলের আশা ক্ষীণ। পাকিস্তানে সংখ্যাগুরুবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং সেনাশাসনের অভিশাপ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের থেকে প্রাচীন। সেই অভিশাপ এখনো অব্যহত। তবে এরই মধ্যে আশার কথা, পাকিস্তানের মানুষের একটি বড় অংশেরই সামরিক শাসন বিষয়ে মোহভঙ্গ হয়েছে। প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর সমালোচনা কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে রাওয়ালপিন্ডি থেকে করাচিতে।
সর্বাপেক্ষা রক্তাক্ত এবং রাজনৈতিক স্থিতিহীনতায় ভুগছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরান আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নানা সমস্যায় জর্জরিত। নাগরিক সমাজের সেই দেশের সরকারের উপর আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। ইরানের সরকারের বর্তমান গণভিত্তি যথেষ্ট নড়বড়ে। জলে রক্তের গন্ধ পেয়ে ভূরাজনৈতিক যুক্তিতে অনেকদিনের পথের কাঁটা ইরান সরকারকে সরানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সচেষ্ট। এই হস্তক্ষেপ প্রচেষ্টাকে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ অথবা ‘নারী স্বাধীনতা’-র পোশাক পরানোর প্রবল চেষ্টা চালানো হলেও, সাধারণ ইরানি নাগরিকের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কতটা দায়বদ্ধতা আছে তাতে প্রবল সন্দেহ জন্মায় গাজার দিকে তাকালে। গাজায় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান, যা কার্যত গণহত্যার রূপ নিয়েছে, তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও পূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। নিয়মরক্ষার মত কিছু আপত্তি ভেসে উঠলেও, গাজাকে কেন্দ্র করে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, সমগ্র পশ্চিমি শক্তি জোটেরই যা ভূমিকা, তাতে “আমরা স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, উদারতা, মানবাধিকারের রক্ষাকর্তা”— এই ভাষ্যের যেটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট ছিল, তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-মার্কিন শক্তিপরীক্ষা এতকাল চলছে মূলত যুযুধান দুই পক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী শক্তির মধ্যে দিয়ে, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সৌদি আরব বনাম হাউথি যুদ্ধ। সরাসরি হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে কম। কিন্তু ২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের পরিমাণ বাড়িয়েছে, একই কাজ করেছে ইরানও। এখন অবধি এই হস্তক্ষেপের মাত্রা খুব তীব্র নয়, কিন্তু এর থেকে ভবিষ্যতে আরও একটি ভয়াবহ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্টি হবে – এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ইরাক, সিরিয়া এবং লেবানন – এই তিন দেশই এখনো ভয়ংকরভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং কার্যত বিভিন্ন শক্তির (তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, রাশিয়া) ভূরাজনৈতিক দাবা খেলার ছকে পরিণত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই অবস্থার কোনো বদল আসবে – এমন মনে হচ্ছে না।
আরো পড়ুন ‘প্যালেস্তাইনের সংগ্রাম সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম’
উত্তর আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের চেয়ে স্থিতিশীল। কিন্তু লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ আপাতত স্থগিত থাকলেও এখনো কোনো সমাধান সূত্র পাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুযুধান বিভিন্ন পক্ষ দেশটিকে কার্যত দু টুকরো করে ফেলেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, লিবিয়া দেশটাই ভবিষ্যতে দুভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। মিশর, মরক্কো, আলজিরিয়া এবং তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের প্রতিবেশীদের তুলনায় ভাল হলেও আরব বসন্তের সময়ে এই দেশগুলিতে গণতান্ত্রিক কাঠামোর আদর্শ যেটুকু শিকড় বিস্তার করেছিল, তার প্রায় সবটাই সমূলে উৎপাটিত হয়েছে। এই দেশগুলির ঠিক দক্ষিণেই মধ্য আফ্রিকায় ফ্রান্সের যে অলিখিত সাম্রাজ্য, তা ভেঙে পড়েছে গতবছরই। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে মালি, চাদ, গিনি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, গাবন ইত্যাদি মধ্য আফ্রিকার দেশগুলিতে যে সরকারগুলি ক্ষমতায় এসেছে (যার পিছনে রুশ মদত রয়েছে বলেও প্রকাশ) তারা প্রবলভাবে পশ্চিমের শক্তিগুলির বিরোধী। এই রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক সংঘের (Economic Community of West African States, ECOWAS) বাকি দেশগুলির সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। নাইজেরিয়ার নেতৃত্বে অবশিষ্ট পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলি নবাগত সরকারগুলির সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ার জন্যে সামরিকভাবেও প্রস্তুত হচ্ছে। এখন অবধি প্রত্যক্ষ সংঘাত দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা থেকে ভবিষ্যতে মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় একটি স্থানীয় যুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
‘হর্ন অফ আফ্রিকা’ ইথিওপিয়াতে সদ্য গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের মেঘ সেখানেও। সোমালি সরকার সোমালিয়ার কার্যত বিচ্ছিন্ন অংশ সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে ইথিওপিয়ার আলাপ আলোচনার প্রবল বিরোধিতা করেছে। এই দুই শক্তির মধ্যে শত্রুতা বহু পুরনো এবং তা থেকে নতুন কোনো সংঘাত জন্ম নেবে না – এমনটা জোরালোভাবে বলা কঠিন। আফ্রিকার দক্ষিণতম প্রান্তে, দক্ষিণ আফ্রিকায়, আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসির অপশাসন চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। নেলসন ম্যান্ডেলার দল তাঁর আদর্শ যে প্রায় সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়েছে তা তাদের কাজকর্মেই স্পষ্ট। কয়েক বছর আগে গঠিত ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার নামক বামপন্থী দলটি বরং পুরনো এএনসির আদর্শ, অন্তত তাদের ভাষ্যে এবং কর্মসূচিতে অনেকটাই বহন করে। যদিও দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রশ্নে এই দলটির নেতাদের ভূমিকাও বিশেষ ইতিবাচক নয়, তবু আসন্ন নির্বাচনে দলটি কেমন ফল করে তার দিকে অনেকেই তাকিয়ে থাকবেন।
দক্ষিণ আমেরিকায় হাভিয়ের মিলেইয়ের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনায় অতি দক্ষিণপন্থী সরকারের প্রতিষ্ঠা পূর্বতন মধ্য-বাম সরকারের চূড়ান্ত ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে প্রায় নির্ধারিতই ছিল। কিন্তু নতুন প্রশাসনের সূচনা থেকেই সাধারণ মানুষ মিলেইয়ের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে যেভাবে রাস্তায় অবতীর্ণ হয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, তা প্রবল আশার সঞ্চার করে। বলিভিয়ায় ইভো মোরালেস বনাম আর্সে বিরোধ ক্ষমতাসীন বামপন্থী ‘সমাজতন্ত্রের আন্দোলন’ (Movimiento al Socialismo, MAS)-কে দুভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। অভ্যুত্থানকে পরাজিত করে MAS-এর ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার বামপন্থীদের মধ্যে যেরকম উৎসাহের সঞ্চার করেছিল, তার আভ্যন্তরীণ বিরোধ ও বিভাজন তেমনই হতাশার সৃষ্টি করবে। দক্ষিণ আমেরিকায় সাম্প্রতিক সময়ে বামপন্থীদের জন্য হতাশা এখানেই শেষ নয়। চিলেতে বামপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও তারা তাদের গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ – দেশের জন্য এক নতুন সংবিধান প্রবর্তন – বাস্তবায়িত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোর বাম সরকার ক্রমশ উগো শাভেজের পথ থেকে সরে এসে বিভিন্ন মার্কিনী তেল কোম্পানির সঙ্গে আপোস রফা করছে। তার প্রতিবাদ করার খেসারত দিতে হয়েছে ভেনেজুয়েলার কমিউনিস্ট পার্টিকেও। একদিকে অভ্যন্তরে একদা বন্ধু শক্তিগুলির উপর দমনপীড়ন চালিয়ে, অন্যদিকে মার্কিন ও দেশীয় পুঁজির স্বার্থের সঙ্গে নানারকম আপোস করে মাদুরো নিজের পায়ের তলার মাটি নিজেই নরম করছেন। প্রতিবেশী গায়নার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল আক্রমণ করে দখল করে নেওয়ার যুদ্ধং দেহি ভাষ্যও চূড়ান্ত নিন্দিত হয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে এমন শক্তিগুলির দ্বারাও। অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া অবস্থার পাশাপাশি এরকম নৈতিক দেউলিয়াপনা নিয়ে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলা আধুনিক মার্কিন বর্ণসংকর যুদ্ধ কৌশলের কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি শক্তি অন্ধকার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে – কলম্বিয়ার গুস্তাভো পেত্রো সরকার, ব্রাজিলের লুলা সরকার এবং কিউবার দিয়াজ-কানেল সরকার। যাঁরা দক্ষিণ আমেরিকা প্রগতিশীল পথে পরিচালিত হোক চান, তাঁদের এই তিন দেশের দিকেই আপাতত সান্ত্বনার জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে।
প্রান্তে অবস্থিত দক্ষিণের বিশ্ব (Global South) পরিক্রমা শেষে আমরা চলে যাই কেন্দ্রের উত্তরের বিশ্বে (Global North)। উত্তর আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন এবছর। সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা অনুসারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা। এর ফলাফল কী হবে, তা বলা কঠিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের বিজয় নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নেতিবাচক। কিন্তু মার্কিন রিপাবলিকান দলের ট্রাম্পপন্থী অংশটি ভূরাজনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে মূল ধারার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান পার্টির তুলনায় অনেকটাই প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপবিরোধী। সেদিক থেকে ট্রাম্পের বিজয়ে বিশ্ব পুলিশ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কিছুটা হ্রাস হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে। সুতরাং দক্ষিণের বিশ্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রাম্পের বিজয় একেবারে অনভিপ্রেত – এমন বলা চলে না। তবে এ নিছকই শীতল ভূরাজনৈতিক যুক্তি। নৈতিক দিক থেকে, যাঁরা প্রগতিশীল, তাঁরা বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, তাঁদের জন্যে ট্রাম্পের বিজয় কোনো ইতিবাচক বার্তা বহন করে না। যদিও এমন নয় যে জো বাইডেন প্রগতিশীলতার পরাকাষ্ঠা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি মূল দলেরই এবারের রাষ্ট্রপতি পদের দৌড়ে থাকা দুই ব্যক্তিত্ব এইরকম – এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। সেদেশের মানুষও এ প্রসঙ্গে একই মত পোষণ করেন। সমীক্ষায় প্রকাশ, প্রায় ৬৭% মানুষ দুই প্রার্থীকে নিয়েই চূড়ান্ত বীতশ্রদ্ধ, কিন্তু নিজ নিজ বিচারবুদ্ধি অনুসারে এঁদের মধ্যে কম ক্ষতিকারক বিকল্প বেছে নেওয়া ছাড়া তাঁদের কাছে অন্য পথ নেই।
অন্যদিকে ইউরোপে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান অব্যাহত। নেদারল্যান্ডসে অতি দক্ষিণপন্থীদের সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিজয় সেই উত্থানের সাক্ষ্যই বহন করে। ইতালিতে মেলোনি সরকার উগ্র জাতীয় রক্ষণশীলতার মোড়কে নব্য ফ্যাসিবাদকে আধুনিক রাজনীতিতে এমন গ্রহণযোগ্যতা প্রদান করেছে, যা থেকে ফেরত আসা মুশকিল। এই প্যান্ডোরার বাক্স খোলার পরে আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে জার্মানিতে AfD অথবা স্পেনে Vox-এর মত দলগুলি। আসন্ন গ্রেট ব্রিটেনের নির্বাচনে লেবার পার্টি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরবে – এমন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা প্রগতিশীলদের খুব উৎসাহিত করার মত খবর নয়। কারণ আর যাই হোক, কিয়ের স্টার্মারের লেবার পার্টি জেরেমি করবিনের লেবার পার্টি নয়। তা সত্ত্বেও সমগ্র ইউরোপ জুড়ে অতি দক্ষিণ এবং দক্ষিণপন্থীদের রমরমার যুগে টোরি সরকার অপসারিত হলে তা নেতিবাচক নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপের সর্ববৃহৎ সামরিক সংঘাত রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্বিতীয় বছরে পড়তে চলল। নিপার নদী বরাবর এবং ডনবাসে দুপক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অটল। রাশিয়া ইউক্রেনের রক্ষণ ভাঙতে অক্ষম। আবার পশ্চিম থেকে প্রাপ্ত অস্ত্র ও অর্থবলে বলীয়ান হয়ে ইউক্রেন যে প্রতিআক্রমণ শুরু করেছিল তাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। যুদ্ধ রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের হাত দুর্বল করেনি, বরং আরও শক্ত করেছে। আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যদি সম্পূর্ণ মুক্ত ও স্বাধীন হত, তাহলেও পুতিনই জিততেন – এমনই সন্দেহ হয়। লেভাদা সেন্টার, যা রুশ সরকারের প্রভাবমুক্ত, তাদের সাম্প্রতিকতম সমীক্ষাও পুতিনের জনপ্রিয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে। যা-ই হোক, এই আলোচনাই অবান্তর। কারণ আসন্ন রুশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মুক্ত এবং স্বাধীন হবে – এমন আশা কেউই করছেন না। একই কথা অবশ্য ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও বলা চলে। পশ্চিমের সংবাদমাধ্যম যতই স্তুতি করুক, ভলোদিমির জেলেনস্কি ইউক্রেনীয় শাসনব্যস্থার উপর যেভাবে নিজের কর্তৃত্ব দৃঢ় করেছেন, বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংবাদমাধ্যমকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকেও সরাসরি নিজের তাঁবে আনার প্রচেষ্টা করেছেন, তা একেবারেই পুতিনসুলভ। অথচ এইসব পদক্ষেপ অধিকাংশ ‘নামী’ ও ‘বিশ্বাসযোগ্য’ সংবাদমাধ্যম দেখেও দেখেনি। পশ্চিমের বন্ধু হলে ভাবমূর্তি নির্মাণে যে বিলক্ষণ কিছু সুবিধা মেলে – এ তার চমৎকার নিদর্শন।
আরো পড়ুন ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে: রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, একাধিপত্য, সান্ত্বনাবাক্য
২০২৪ শুরু হল নগর্নো-কারাবাখে আর্মেনিয়ান গণ-উচ্ছেদ এবং গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যার খবর দিয়ে। শুরু হচ্ছে ইউক্রেনে অব্যাহত যুদ্ধ এবং ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের খবরের মধ্যে দিয়ে। আজ পৃথিবীতে এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে মহাপ্রলয়ের তিন অশ্বারোহী – যুদ্ধ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ – তাদের নেতা চতুর্থ অশ্বারোহী মৃত্যুর নেতৃত্বে হানা দিচ্ছে না। একদিকে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে অতুল বৈভব কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে গ্রাস করছে অভাবের আঁধার। এই অবস্থা আগেও ছিল, কিন্তু তার পাশাপাশি মানুষের মনে আশার আগুনও ছিল। কিন্তু একদিন সব ভাল হবে, সুন্দর হবে – এই আশা অবধি মানুষের মন থেকে ক্রমে নির্বাপিত হচ্ছে। শুধু যুদ্ধ নয়, শিয়রে শমন হিসাবে দাঁড়িয়েছে জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনও। অথচ তার মোকাবিলা করার সদিচ্ছা অনুপস্থিত। পরিবেশের সমস্যাটাই যে আদতে প্রচলিত অর্থনৈতিক কাঠামোপ্রসূত, তা স্বীকার করতেই যেখানে আপত্তি রয়েছে, সেখানে আর সমাধান হবে কী করে?
তাও আমাদের আশা রাখতে হবে। আশা রাখতে হবে মানুষ ফিরবে এই খাদের কিনারা থেকে। আশা রাখতে হবে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ একদিন আসবে। হয়ত এই আশা বাস্তবায়িত হবে না। হয়তো প্রলয়ঘড়ির কাঁটা বারোটা স্পর্শ করবে তার আগেই। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যুষের প্রথম আলো দেখার আগেই হয়ত মানবজাতির জন্য নেমে আসবে চিররাত্রি। তবুও, তবুও – আশা আমাদের ছাড়লে চলবে না কোনোভাবেই। কারণ আশার বিকল্প হল বর্তমান জগৎ যেমন তার সঙ্গে আপোস করে নেওয়া, তাকে মেনে নেওয়া, তাকে বদলানোর ন্যূনতম প্রচেষ্টাও পরিত্যাগ করা। যদি আমরা তা করি, যদি আশার মশাল আমরা ছুড়ে ফেলে দিই, তাহলে সভ্যতার যে দেউটি আজ নিভছে, তাকে জ্বালানো যাবে না আগামীকালও।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








