সুচিন্তন দাশ

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রাশিয়ান সেনানায়ক ও সমরতাত্ত্বিক কার্ল ফন ক্লাউসউয়িতস বলেছিলেন “যুদ্ধ আসলে ভিন্ন উপায়ে রাজনীতির সম্প্রসারণ।” আর বিংশ শতকের শেষার্ধে ফরাসি দার্শনিক, ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক মিশেল ফুকো লিখেছিলেন “রাজনীতি হল অন্য উপায়ে যুদ্ধের ধারাবাহিকীকরণ।” এই আপাতবিরোধী দুটি মন্তব্যের মূল নির্যাস আদৌ আলাদা নয়। ক্ষমতা, সে রাজনৈতিক হোক বা সামরিক, কখনোই সীমিত-একমেটে হয় না। তার ছাঁচের ব্যাপ্তি সুবিশাল, কাঠামোগতভাবেই তা বহুমাত্রিক। সামরিক, অসামরিকের বেড়া টপকে তার স্রোত ও ধাক্কা প্রতিনিয়ত অনুভূত হয় নাগরিক ও রাষ্ট্রজীবনে। আমেরিকার কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স-এর ‘গ্লোবাল কনফ্লিকট ট্র্যাকার’ বলছে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে কমপক্ষে ছাব্বিশটি সংঘর্ষ ঘটমান, কিন্তু মার্কিন স্বার্থের উপর অভিঘাতের নিরিখে মাত্র ছটি “সংকটময়” — উত্তর কোরিয়ায়, পূর্ব চীন সাগরে, দক্ষিণ-পূর্ব চীন সাগরে, আফগানিস্তানে, ইরানে, ও ইউক্রেনে। মায়ানমার ও ইয়েমেনে সংঘর্ষ নিতান্তই “সীমিত”। পাশ্চাত্য সংবাদমাধ্যমগুলিরও মোটামুটি এমনই অভিমত, তায় আবার ইউক্রেন একটি ইউরোপিয় দেশ। সেখানে কী করে আস্ত একটি যুদ্ধ লাগতে পারে তা যেন কিছুতেই তাদের বোধগম্য হচ্ছে না।

যে দুনিয়া সামরিক হস্তক্ষেপ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রতিরোধ্য শক্তি প্রদর্শনেরই সমার্থক বলে জানত, ইউক্রেনে রুশ হানার ফলস্বরূপ তার যেন এতদিনে বয়ঃসন্ধি হল। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের তিরিশ বছর পর, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, “মহাশান্তির করাল ছায়া” বোধহয় শেষমেশ কাটল। এই ছায়াতলে, যুদ্ধের উপর যে মার্কিনি একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক প্রভূত সম্ভাবনাময় ভূ-রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা আত্মপ্রকাশ করল। অথচ রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধকে শুধুমাত্র আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের আঙ্গিকে দেখলে এই সংঘাতের গভীর ও জটিল ইতিহাসকে অস্বীকার করা হয়, যা থেকে জন্ম নেয় কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও রাজনৈতিক অবস্থানগত সমস্যা। ফলত এক দলের কাছে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভোলোদিমির জেলেন্সকি হয়ে ওঠেন গোলিয়াথের সামনে প্রবল প্রতিরোধী ডেভিড, আর অপর দলের কাছে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন হয়ে ওঠেন অমিত শক্তিধর মুক্তিদাতা শত্রুঘ্ন। এই দুই অতিসরলীকৃত অপব্যাখ্যার জট ছাড়াতে গেলে অবশ্য আমাদের ফিরে যেতে হবে অতীতের অন্য এক যুদ্ধে — ১৭০৯ খ্রিস্টাব্দের পোলটাভায়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৭০৯ সালের ২৭ জুন, পোলটাভা শহরের প্রান্তরে মাস্কভি-রুশ জার প্রথম পিটার ও সুইডেনের রাজা দ্বাদশ চার্লস তাঁদের সৈন্যসামন্ত নিয়ে সম্মুখসমরে নিয়োজিত হন। চার্লসের পক্ষে ছিলেন ইউক্রেনিয় কসাকদের বিদ্রোহী হেটমান ইভান মাজেপা ,আর পিটারের হয়ে লড়ছিলেন মস্কোর অনুগত হেটমান ইভান স্কোরোপাদস্কি। ইউরোপের ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এই যুদ্ধ ছিল একইসাথে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আভ্যন্তরীণ, অনেকটা বর্তমান রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের মত। যা-ই হোক, পোলটাভার যুদ্ধে হেরে চার্লস আশ্রয় নেন অটোমান সাম্রাজ্যে, কিন্তু তাঁর আহত সঙ্গী ইভান মাজেপা মারা যান যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই। অন্যদিকে পিটার নিজেকে সমগ্র রুশ সাম্রাজ্যের জার ঘোষণা করে হেটমান কসাকদের তাঁর রাজপাটের অন্তর্ভুক্ত করেন। এই যুদ্ধের তিনশো বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৯ সালের ২৭ জুন রাশিয়া, সুইডেন ও ইউক্রেনের সম্মিলিত সরকারি প্রচেষ্টায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ উন্মোচিত হয়, যাতে লেখা আছে “সময় ক্ষত নিরাময় করে।” অথচ সেদিনের আনুষ্ঠানিক কার্যসূচি অনুযায়ী পোলটাভা যুদ্ধের এক পুনরাভিনয়ও মঞ্চস্থ হয়, যার প্রতিবাদে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভিক্টর ইউশ্চেঙ্কো নিজে অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বদলে প্রশাসনের উপপ্রধানকে পাঠান নিজের প্রতিনিধি হিসাবে।

সারা শহর জুড়ে ইউক্রেনিয় জাতীয়তাবাদীরা পোস্টার মারে “মাজেপা জিতেছেন”, “ইউক্রেন আজ এক স্বাধীন রাষ্ট্র”। রুশ জাতীয়তাবাদীরা পাল্টা মাজেপার কুশপুতুল পোড়ানোর আয়োজন করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। কোনো হিংসাত্মক সংঘর্ষ না ঘটলেও সময়ের ক্ষতে লাগে নুনের ছিটে। মজার ব্যাপার এই, যে দু তরফের জাতীয়তাবাদীদেরই রাজনৈতিক অবস্থান দাঁড়িয়ে আছে দুটি স্ববিরোধী ইতিহাসকল্পের উপর। ইভান মাজেপা বৃহৎ-রুশ আধিপত্যের বদলে সুইডেনের কর্তৃত্ব স্বীকার করতে চেয়েছিলেন — বর্তমান ইউক্রেনিয় জাতীয়তাবাদের তখন জন্মও হয়নি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বলপূর্বক ইউক্রেনের রুশিকরণ হলেও, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে জারতন্ত্রের পতনের ফলে যে ইউক্রেনিয় সোভিয়েত রিপাবলিক ভূমিষ্ঠ হয়, তা ছিল রাশিয়া, বেলারুশ, ও জর্জিয়ার মতই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অর্থাৎ সংযুক্তিকরণের আগেই তা ছিল সর্বভৌম রাষ্ট্র, তা সে যতই স্বল্প সময়ের জন্য হোক না কেন। ইউক্রেনের স্বাধীনতার দাবি প্রথম ওঠে ১৮৯৯-১৯০০ সালেই, পুতিনের ভাষ্য মতে, লেনিনের “চক্রান্তে” ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরে নয়।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ায় যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় তা প্রথমে ইউক্রেনের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ‘রাদা’, অর্থাৎ জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিদের সমষ্টির স্বায়ত্তশাসনের অধিকার মানেনি। এই দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে শেষ অবধি পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্কে উন্নীত হতে পারেনি। বলশেভিক বিপ্লবোত্তর ইউক্রেন রাশিয়ার মতোই এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যায় এবং জার্মানি ও পোল্যান্ডের সামরিক হস্তক্ষেপের অবসানে যে ইউক্রেনিয় রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রকাশ করে, তা ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক গণরাজ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় খুঁত থাকলেও তা মতাদর্শগতভাবে খাঁটি ছিল। প্রথমে লেনিনের ইচ্ছায়, পরে স্তালিনের উদ্যোগে অন্যান্য সোভিয়েত দেশের মতোই ইউক্রেনে “জাতিগত বৈশিষ্ট্য” অনুযায়ী ভাষা, সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু ও পার্টি নীতি প্রণীত হয়। বলশেভিক নেতা যোসেফ ভারেইকিসের মতে, সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে উঠেছিল একটি “শরিকি বাড়ি”, যার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় শাখাগুলি, নানা গণরাজ্য ও স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলি ছিল একেকটি কামরা। এই ব্যবস্থায় জাতীয়তা অপরিবর্তনীয় হলেও সবার ছিল সোভিয়েত নাগরিকত্ব, যার ফলে মস্কোর ‘বৃহৎ-রুশ’ জাতীয়তাবাদ ও কিয়েভের ‘ক্ষুদ্র-রুশ’ জাতীয়তাবাদের মধ্যে ১৯৩০-এর দশকে সংঘাতের উপর ছিল যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক লাগাম। আজকের মতো তীব্র শত্রুতার সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যে আদৌ ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো সর্বাত্মক সংঘর্ষ চলাকালীন ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদীদের একাংশ স্তেপান বান্দেরা ও ইয়ারোস্লাভ স্তেতসকোর নেতৃত্বে নাজি জার্মানির সাথে আপোষ করে। শুরু হয় ইহুদি, পোলিশ, হাঙ্গেরিয়ান ও রুশ বলশেভিকদের উপর অত্যাচার এবং সংগঠিত গণহত্যা। কমলা বিপ্লবের পর ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল অবধি ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি পদে থাকা ভিক্টর ইউশ্চেঙ্কো, এবং ইউরোমাইদান আন্দোলনের পর ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পেট্রো প্রোরোশেঙ্কো তাঁদের পেটোয়া ইতিহাসবিদদের সাহায্য নিয়ে এবং আইন পাশ করিয়ে এই বিতর্কিত জাতীয়তাবাদীদের সরকারি ঐতিহাসিক বয়ানে পুনর্বাসন দেন। নানা জায়গায় মূর্তি অপসারণ ও স্থান-নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে মুছে ফেলা হয় সোভিয়েত আমলের স্মৃতি, কিন্তু জাতীয়তাবাদের আড়ালে চলে নাজি সহযোগের ইতিহাস বিকৃত করে পরিবেশন করার প্রচেষ্টা। হলোকস্টের কুখ্যাত এক ছবি, যেখানে দেখা যায় একদল উন্মত্ত কিশোর মিলে এক মহিলাকে প্রায়-বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত করে ধাওয়া করছে, তোলা হয়েছিল ইউক্রেনেরই পম্পিয়েরস্কা স্ট্রিটে, যার নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভেসেলা’, অর্থাৎ ‘প্রফুল্ল’ সরণি।

বর্তমান ইউক্রেনে নব্য নাজিবাদের জন্ম জাতীয়তাবাদের জঠরে, সোভিয়েতোত্তর নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক শক থেরাপির ঔরসে। ইউক্রেন আক্রমণের পেছনে পুতিনের ঘোষিত দুটি উদ্দেশ্য হল ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ ও বেনাজিকরণ। এবার প্রশ্ন ওঠে, পুতিন এই দুই লক্ষ্যপূরণে কতটা আন্তরিক। তাঁর পূর্বসূরিদের মতই রাষ্ট্রপতি জেলেন্সকি ইউক্রেনকে ন্যাটো বা নিদেনপক্ষে ইউরোপিয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। ১৯৯১ সাল থেকে রাশিয়া ন্যাটোর সাথে নানাভাবে সহযোগিতা করা সত্ত্বেও সদস্যপদ পায়নি। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের পর সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটে, ২০২১ সালে মস্কোয় ন্যাটোর অফিস অবধি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে জর্জিয়া আক্রমণের মাধ্যমে রাশিয়া যে বার্তা দিয়েছিল, ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের মাধ্যমে যেন তার পুনরাবৃত্তি হল। বার্তাটি হল, সোভিয়েতোত্তর পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর ঘেরাটোপ অবাঞ্ছিত, কারণ তা রাশিয়ার প্রভাবক্ষেত্র। মনরো ডকট্রিন অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকাকে বাড়ির উঠোন মনে করে, তেমনি মেদভেদেভ ডকট্রিন অনুযায়ী পূর্ব ইউরোপে রাশিয়া ন্যাটোর বেড়া ডিঙানো খবরদারী সহ্য করবে না। পুতিনের কাছে তাই ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ সত্যিই রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য জামিন।

ইউক্রেনের নব্য নাজিবাদের উত্থান ২০১৪ সালের পরে আকস্মিকভাবে হয়নি। শুরুটা ২০০৪ সালেই, যে বছর আরও সাতটি দেশ, বুলগারিয়া, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়া, ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত হয়। যতদিন রাশিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধস্তন অংশীদার হিসাবে কাজ করেছে, ততদিন ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে পাশ্চাত্য দুনিয়া বিশেষ মাথা ঘামায়নি। এমনকি ১৯৯৪ সালে বুদাপেস্ট চুক্তির ফলে ইউক্রেন বাধ্য হয় সাবেক সোভিয়েত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের উপর তার সমস্ত অধিকার রাশিয়ার হাতে তুলে দিতে, তার অখণ্ডতা বা নিরাপত্তাজনিত কোনোরকম প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, শুধু রুশ-মার্কিন আশ্বাসের ভিত্তিতে। অন্যদিকে যতদিন রাশিয়া ন্যাটোর সাথে সমঝোতা করে চলেছে, ততদিন নব্য নাজিবাদ পুতিনের দৃষ্টিগোচর হয়নি। ইউক্রেনে রুশপন্থী রাষ্ট্রপতি ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতায় থাকাকালীনও নয়। মতাদর্শগতভাবে পুতিন নব উদারবাদে জারিত বৃহৎ-রুশ জাতীয়তাবাদী। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় বৈধতা নিয়ে তাঁর অভিযোগ এই, যে ইউক্রেন ভ্লাদিমির লেনিনের মস্তিষ্কপ্রসূত একটি “কৃত্রিম” রাষ্ট্র। পৃথিবীতে কোন জাতি-রাষ্ট্র কৃত্রিম নয় সেই প্রশ্ন না তুললেও এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না যে ইউক্রেনকে রাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার উপরাষ্ট্রে পর্যবসিত করাই পুতিনের অভীষ্ট, সে নব্য নাজিবাদীদের উৎখাত করেই হোক বা তাদের সাথে আপোষ করে।

তবে তুলনামূলকভাবে বিচার করলে একথা মানতেই হয়, যে ইউক্রেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাশিয়ার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়াশীল। ২০১৪ সাল থেকেই পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের আদলে নব্য নাজি অ্যাজভ ব্যাটালিয়নকে পেন্টাগন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে লাগাতার অর্থ ও অস্ত্রসাহায্য করে গেছে, প্রকাশ্যে অন্তত ২০১৮ পর্যন্ত। এই অঞ্চলেরই রুশপন্থী মিলিশিয়াকে রাশিয়া এখনো সাহায্য করে চলেছে। আট বছর ধরে চলতে থাকা এই গৃহযুদ্ধে প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ১৪,০০০। দুই পক্ষই অপর পক্ষকে অভিযুক্ত করেছে ‘মিন্সক’ ও ‘মিন্সক ২’ বোঝাপড়ার শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগে। ফ্রান্স ও জার্মানি শান্তি স্থাপনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয় নির্লিপ্ত থেকেছে, নয় তো আরও অস্ত্র পাঠানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন হুমকি দিয়েছে।

কিন্তু এই ভূ-রাজনৈতিক অচলাবস্থা তো কয়েক বছর ধরেই চলে আসছে। রাশিয়া হঠাৎ এখনই কেন ইউক্রেন আক্রমণ করল? এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত পাওয়া যাবে রাশিয়ার আভ্যন্তরীণ আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা ও কার্যকারণ অনুসন্ধান করলে। রুশ বামপন্থী অধ্যাপক বরিস কাগারলিতস্কির মতে এই যুদ্ধ অনেকাংশে রাশিয়ার অর্থনৈতিক অব্যব্যস্থা ও মন্দাজনিত সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর প্রচেষ্টা। ২০১৮ সালে পেনশন সংস্কারের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পুতিনের জনপ্রিয়তা ক্রমহ্রাসমান। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ এবং নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করা সত্ত্বেও অবস্থার তেমন উন্নতি না হওয়ায় তিনি আরও একবার বৃহৎ-রুশ জাতীয়তাবাদ নামক বাঘের পিঠে চেপে বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছেন ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া বিজয়ের পরিচিত চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে।

ইতিহাসে এরকম যুদ্ধের সবচেয়ে বড় নজির মেলে ১৮৯৮ সালে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবা ও ফিলিপিন্সে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যবিরোধী মুক্তিসংগ্রামে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, এবং যুদ্ধ শেষে দুই উপনিবেশকেই মার্কিন মুখাপেক্ষী করে তোলে। পুলিৎজার ও হার্স্টের যুগ্ম প্রচেষ্টায় যুদ্ধের পক্ষে প্রবল জনমত গড়ে তোলা হয় এই সময়। জন্ম নেয় ‘চমৎকার ছোট্ট যুদ্ধ’ ও ‘হলুদ সাংবাদিকতা’-র ধারণা। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি, যুদ্ধ শুরুর দুদিনের মাথায় রাশিয়ার সরকারি সংবাদ সংস্থা আরআইএ নভস্তি পেত্রো আকপভের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে দাবি করা হয় “ইউক্রেন রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেছে।” তাতে আরও লেখা হয় যে রাষ্ট্রপতি পুতিন বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও বেলারুশকে একত্রিত করে সোভিয়েত পতনের “ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করছেন।” প্রবন্ধটিতে অতীতকালের ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ। যেন পুতিনের ‘চমৎকার ছোট্ট যুদ্ধে’-র স্থায়িত্ব মাত্র দুদিন। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ তারপরেও চলতে থাকার ফলে নভস্তি এই পূর্বলিখিত প্রবন্ধটি প্রত্যাহার করে নেয়, যদিও তার আগেই লেখাটি আন্তর্জালে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এ থেকে এটুকু বোঝা যায় যে ইউক্রেন আক্রমণের অন্যতম কারণ হল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে পুতিনের ‘অখণ্ড রাশিয়া’-র স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার বাসনা, যদিও সেই পরিকল্পনা চালিত হচ্ছে বৃহৎ-রুশ জাতীয়তাবাদ দ্বারা, সমাজতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রীয় বিশিষ্টতাবাদের ভিত্তিতে নয়।

এই যুদ্ধের দায় রাশিয়া, ন্যাটো বা ইউক্রেন — কেউই এড়াতে পারে না। এরকম দাহ্য পরিস্থিতিতে ইউরো-মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি বা রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনকে ন্যায্যতা প্রদানের প্রচেষ্টা আসলে যুদ্ধে ইন্ধন জোগানোরই সামিল। বিংশ শতাব্দীর মত একবিংশ শতাব্দীতেও প্রায়শই যুদ্ধ সীমিত থাকে না, তার চারিত্রিক গতিশীলতার কারণে হয়ে ওঠে সর্বাত্মক। এর অসমানুপাতিক অভিঘাত এসে পড়ে সমাজের উলুখাগড়ার উপর। এই যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই কমপক্ষে বিশ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পোলিশ-ইউক্রেনিয় সীমান্তে বর্ণবিদ্বেষের স্বীকার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পুঁজির অপ্রতিরোধ্য গতির এই যুগে রাশিয়ার উপর একতরফা নিষেধাজ্ঞার যে বোঝা চাপানো হয়েছে, তার ফলস্বরূপ অত্যাবশ্যক পণ্য ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি সারা বিশ্বের বাজারে অনুরণিত হবে। যুদ্ধের দাম দেবে শ্রমজীবী মানুষ — প্রাণ ও ধন দুই দিয়েই। আর আর্থ-রাজনৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি করবে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, যা নাকি শুধুই নির্ভুল সামরিক চাঁদমারি করতে পারে শত্রুর টাকে আর বিমানঘাঁটির ছাদে। এই আখ্যানের বাইরে সবই ‘সমান্তরাল’ ও ‘বাহ্যিক’ ক্ষতি — সরকারি শ্বেতপত্রের পাদটীকা হয়ে রয়ে যাবে অসামরিক মৃত্যুহার ও সামরিক কার্বন নির্গমনের পরিসংখ্যান।

১৮৮১ সালে নিটশে লিখেছিলেন “আমরা ব্যাপক যুদ্ধের ধ্রুপদী যুগে প্রবেশ করছি, বিজ্ঞানসম্মত জনপ্রিয় যুদ্ধের যুগ, পৃথিবীর এখনো বহু অভূতপূর্ব যুদ্ধ দেখা বাকি আছে।” তার প্রায় ৪০ বছর পরে, ১৯২০-র দশকে ইতালীয় সমরনায়ক জিউলিও দুহে প্রথম যুদ্ধ জেতার স্বার্থে সামরিক-অসামরিক গণ্ডি অতিক্রম করে “কৌশলগত বোমাবর্ষণ”-এর নিদান দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই কৌশল আদপে কতটা কার্যকরী হয় তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের যুগে এই কৌশলকে মান্ধাতার আমলের উপদেশ মনে হলেও এই ধরনের যুদ্ধের ব্যাকরণ খুব একটা বদলায়নি। যুদ্ধের চরিত্র বদলালেও, যুদ্ধের হিসাবের অঙ্ক থেকেছে অপরিবর্তিত, যুদ্ধকর্তারা হয়ে উঠেছেন আরও বেশি নির্লিপ্ত। ১৯৩২ সালে বিমানে করে পারস্য যাত্রার সময়ে রবীন্দ্রনাথ প্রায়-বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে যা লিখেছিলেন তা যেন কতকটা এই অত্যাধুনিক পৃথিবীর যুদ্ধোন্মত্ততারই উদ্দেশে

বায়ুতরী যতই উপরে উঠল ততই ধরণীর সঙ্গে আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের যোগ সংকীর্ণ হয়ে একটা মাত্র ইন্দ্রিয়ে এসে ঠেকল, দর্শন-ইন্দ্রিয়ে, তাও ঘনিষ্ঠভাবে নয়। নানা সাক্ষ্য মিলিয়ে যে পৃথিবীকে বিচিত্র ও নিশ্চিত করে জেনেছিলুম সে ক্রমে এল ক্ষীণ হয়ে, যা ছিল তিন আয়তনের বাস্তব তা হয়ে এল দুই আয়তনের ছবি। সংহত দেশকালের বিশেষ বিশেষ কাঠামোর মধ্যেই সৃষ্টির বিশেষ বিশেষ রূপ। তার সীমানা যতই অনির্দিষ্ট হতে থাকে, সৃষ্টি ততই চলে বিলীনতার দিকে। সেই বিলয়ের ভূমিকার মধ্যে দেখা গেল পৃথিবীকে, তার সত্তা হল অস্পষ্ট, মনের উপর তার অস্তিত্বের দাবি এল কমে। মনে হল, এমন অবস্থায় আকাশযানের থেকে মানুষ যখন শতঘ্নী বর্ষণ করতে বেরয় তখন সে নির্মমভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে; যাদের মারে তাদের অপরাধের হিসাববোধ উদ্যত বাহুকে দ্বিধাগ্রস্ত করে না, কেননা, হিসাবের অঙ্কটা অদৃশ্য হয়ে যায়। যে বাস্তবের পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে। গীতায় প্রচারিত তত্ত্বোপদেশও এই রকমের উড়ো জাহাজ–অর্জুনের কৃপাকাতর মনকে সে এমন দূরলোকে নিয়ে গেল, সেখান থেকে দেখলে মারেই-বা কে, মরেই-বা কে, কেই-বা আপন, কেই-বা পর। বাস্তবকে আবৃত করবার এমন অনেক তত্ত্বনির্মিত উড়ো জাহাজ মানুষের অস্ত্রশালায় আছে, মানুষের সাম্রাজ্যনীতিতে, সমাজনীতিতে, ধর্মনীতিতে। সেখান থেকে যাদের উপর মার নামে তাদের সম্বন্ধে সান্ত্বনাবাক্য এই যে, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।

লেখক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

যুদ্ধ মানে কেবল জীবনহানি নয়, পরিবেশ ধ্বংসও

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.