সুচিন্তন দাশ

বছরের শুরুর দিকে বরিস জনসন বলেছিলেন যা-ই হয়ে যাক না কেন, তিনি হাল (ক্ষমতা) ছাড়বেন না। অর্ধবর্ষ অতিক্রান্ত হওয়ার পর তিনি হাল ছেড়েও ছাড়লেন না। টোরি (কনজারভেটিভ) দলনেতার পদ থেকে ইস্তফা দিলেও আপাতত তিনিই থাকছেন যুক্তরাজ্যের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে। গত ছ মাসে অবশ্য টেমস নদী দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। বরিস দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন করোনাকালে তাঁর সরকারেরই বানানো লকডাউন আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে, তাঁর অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক অভিযুক্ত হয়েছেন প্রায় দুশো কোটি টাকা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ায়, সারা দেশের মানুষ বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ভয়ঙ্করতম মুদ্রাস্ফীতির আঘাতে জর্জরিত, একের পর এক শ্রমিক ইউনিয়ন চাকরি ও পেনশন রক্ষার দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছে, এবং মে মাসের পৌরনির্বাচনে বরিসের পার্টি খুইয়েছে চারশোর বেশি আসন এবং লন্ডনের দুটি চিরাচরিত টোরি-নিয়ন্ত্রিত পুরসভা।

বরিসের কফিনে শেষ পেরেকটি অবশ্য পোঁতে অন্য এক কেলেঙ্কারি। জুন মাসের শেষে জানা যায়, দলনেতা হিসাবে তিনি যখন সাংসদ ক্রিস পিঞ্চারকে দলীয় মুখ্যসচেতক পদে বসান, তখন তিনি বিলক্ষণ জানতেন যে পিঞ্চারের বিরুদ্ধে একাধিক যৌন নিগ্রহের প্রমাণিত অভিযোগ রয়েছে। পিঞ্চারের ইস্তফার পরই শুরু হয় দলের মধ্যে টানাপোড়েন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের বন্যা, সংসদে বিরোধীদের এবং দলীয় সাংসদদের একযোগে আক্রমণ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ ও অর্থমন্ত্রী সুনাকসহ একঝাঁক মন্ত্রী-সান্ত্রীদের একযোগে বিদ্রোহ – একের পর এক ইস্তফাপত্র পাঠ ও প্রেস নোটের মাধ্যমে। নিন্দুকের ভাষায় “একগুঁয়ে ও উদ্ধত” বরিস ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে নতুন অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন ইরাকি বংশোদ্ভূত সাংসদ নাদিম জাহাবিকে। আটচল্লিশ ঘন্টা না কাটতেই নবনিযুক্ত মন্ত্রীমশাই এবং টোরি সংসদীয় দলের প্রধান গ্রাহাম ব্র্যাডি একযোগে প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করে বসেন। উপায়ান্তর না দেখে পরের দিনই বরিস ঘোষণা করে দেন যে তিনি আর দলনেতা থাকছেন না এবং শরৎকাল শেষ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকেও ইস্তফা দেবেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বরিসকে অপসারণের প্রক্রিয়া অবশ্য শুরু হয়ে গিয়েছিল জুন মাসের প্রথম দিকেই। টোরি সাংসদদের মধ্যে ভোটাভুটির ফল তাঁর পক্ষে গেলেও প্রমাণ হয়ে যায় যে প্রধানমন্ত্রীর নিজের দলেরই প্রায় দেড়শো আইন প্রণয়নকারীর তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নেই। এর আগে বরিসের পূর্বসূরী থেরেসা মে-ও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এরকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তখনকার মত রক্ষা পেলেও অচিরেই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ভোটাভুটিতে জয়লাভের পর মে টিকেছিলেন ছ মাসের কিছু বেশি সময়। বরিস টিকলেন একমাসেরও কম। দল নাকি তাঁকে চূড়ান্ত সতর্কীকরণ দিয়েই রেখেছিল – আর একটা ভুল পা ফেললেই ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর সময় শেষ। কিন্তু এই বক্তব্য শুনতে ভাল লাগলেও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। বরিসের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে কেলেঙ্কারি এই প্রথম ঘটেনি। তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ, মিথ্যাচারের অভ্যাস, নীতিবর্জিত সুবিধাবাদ, সীমাহীন অহঙ্কার এবং বেপরোয়া চরিত্রহীনতার ভূরি ভূরি প্রমাণ যুক্তরাজ্যের জনগণ আগেও বহুবার পেয়েছেন। তাঁর পার্টি ভ্রূক্ষেপ করেনি। তাঁর রাজনৈতিক-চারিত্রিক দোষগুলোর কোনটাই বরিসের উত্থানের পথে বাধা হয়নি।

গোলমাল বেধেছে তখন, যখন লাগামহীন অসাম্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনধারণের সঙ্কটের মাঝে একের পর এক কেলেঙ্কারি জনসন সরকারের জনবিরোধী অভিমুখ ও কর্মসূচীগুলোকে সম্পূর্ণ বেআব্রু করে দিয়েছে। যতদিন বরিসের ভোটের বাজারে দাম ছিল, ততদিন তাঁর দল তাঁকে বিশেষ ঘাঁটায়নি। উল্টে মদত জুগিয়েছে, তাঁর প্রায় কোনো অপরাধই দেখেও দেখেনি। যে টোরি রাজনীতিবিদরা আজ একের পর এক ইস্তফা দিয়ে বরিসের থেকে নিজেদের বিযুক্ত করতে ব্যস্ত, এঁরাই বহুদিন ধরে তাঁকে চোখের মণির মত আগলেছেন, তাঁর অপশাসনে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন। ডুবন্ত জাহাজ থেকে পলায়নরত ইঁদুরদের মতই এঁরা ব্যক্তি বা সমষ্টিগত নৈতিকতা বা সততার দাবি করতে পারেন না। এঁদের প্রায় সবার পাখির চোখ এখন বরিসের থেকে কুর্সি কেড়ে নেওয়া।

উত্তরসূরী হওয়ার দৌড়ে যাঁরা এই মুহূর্তে এগিয়ে আছেন, একটি ব্যাপারে তাঁরা সবাই একমত। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বরিসই ছিলেন টোরিদের তুরুপের তাস, নির্বাচনে চাঁদমারি করার মোক্ষম তীরন্দাজ। তাঁর ইস্তফাপত্রে ভূতপূর্ব স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ লিখেছেন, ২০১৯ সালে জেরেমি করবিনের বিপদকে মোকাবিলা করার জন্য তাঁর দল বরিসের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী নাদিম জাহাবিও বরিস ইস্তফা দেওয়ার পর তাঁকে বাহবা জানিয়েছেন “করবিনের মত ভয়ঙ্কর ইহুদি বিদ্বেষীকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারার জন্য”। কুর্সির আরেক দাবিদার, ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রী সুনাক। তাঁকে এক সদ্য ভাইরাল হওয়া পুরনো ভিডিও ক্লিপে গর্বিত গলায় বলতে শোনা গেছে “আমার কোনো বন্ধুই শ্রমজীবী পরিবারের নয়”। তিনিও যে সাম্যবাদী ও শ্রমিক দরদী নেতা জেরেমি করবিনকে পরাস্ত করার জন্য বরিসের কাছে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকবেন তা বলাই বাহুল্য।

নীতিগতভাবে এঁরা কেউই বরিসের থেকে আলাদা নন। টোরি দলনেতা হিসেবে আগামী প্রধানমন্ত্রী যিনিই হন না কেন, ভাবনাচিন্তায়, কাজে কর্মে প্রত্যেকেই কালো চুলের বা টাক মাথার বরিস হবেন। টোরি দলের রাজনৈতিক চরিত্রে খুব একটা তারতম্য ঘটবে না। অন্যদিকে ভাবী প্রধানমন্ত্রী যদি ভুল করেও সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন ঘোষণা করেন, টোরিদের প্রতিপক্ষ হিসাবে করবিনোত্তর লেবার পার্টি আদৌ আশাব্যঞ্জক নয়। বিগত পৌরনির্বাচনে সামান্য ভাল ফল করা সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যের জনগণের মন জয় করার মত অবস্থায় তাঁরা নেই। কাইর স্টারমারের পরিচালনায় ছত্রভঙ্গ এবং দিশাহীন লেবার পার্টি বহু সুযোগ পেয়েও মানুষের পছন্দের বিকল্প হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। স্টারমার এই দশার জন্য এখনো করবিনকে দায়ী করে যাচ্ছেন, যদিও তাঁর উপর থেকে সাসপেনশন তুলে নিলেও দলীয় হুইপ ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। টোনি ব্লেয়ারের পথে হেঁটে লেবারকে টোরিদের বি টিমে পরিণত করতে চাওয়া স্যার কাইর বুঝতে চাইছেন না যে যুদ্ধের মরসুমে ন্যাটোর স্বার্থ রক্ষা করার প্রতিযোগিতায় টোরিদের চাইতেও বেশি টোরি হয়ে ওঠা তাঁর কর্ম নয়।

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক তরজা ও টোরিদের দলীয় মহাবিশৃঙ্খলা সে দেশের শাসকশ্রেণিকে বর্তমান আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় থেকে নজর ঘোরানোর এক মোক্ষম সুযোগ এনে দিয়েছে। গত ৬ জুন লন্ডনের শহরতলি ওয়ান্ডসওয়ার্থ টাউনে যেতে হয়েছিল এক জরুরি দরকারে। প্যাডিংটন স্টেশনে নেমে জানতে পারি শ্রমিক ধর্মঘটের ফলে টিউব বন্ধ।

strike at london tube
টিউবরেলে ধর্মঘট। ছবি লেখকের

অগত্যা চেপে বসলাম কালো ট্যাক্সিতে। চালাচ্ছিলেন বছর চল্লিশের এক ‘ব্ল্যাক-ব্রিটিশ’ ট্যাক্সিচালক। ঘটনাচক্রে সেদিনই টোরি সংসদীয় দলের মধ্যে ভোটাভুটির দ্বারা প্রধানমন্ত্রী বরিসের ভাগ্য নির্ধারণ হচ্ছিল। ট্যাক্সিচালকের সাথে আমার প্রায় এক ঘন্টার কথোপকথন থেকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সম্বন্ধে যা জানতে পারি তা অনেকটা এরকম – প্রধানমন্ত্রী বরিসকে একদম পছন্দ নয়, আবার লন্ডনের লেবার মেয়র সাদিক খানও বিতৃষ্ণায় উদ্রেককারী। টোরিরা ভণ্ড প্রতারক, কিন্তু লেবার পার্টি অক্ষম অপদার্থ। ধর্মঘটীরা ন্যায্য দাবি আদায় করতে চান, দেশের অবস্থা ক্রমশ আরও খারাপ হচ্ছে, নির্বাচন হলে ভোট কাকে দেবেন ঠিক করেননি।

লন্ডনের শ্রমজীবী তথা যুক্তরাজ্যের বহু মানুষের অবস্থাই ওই ট্যাক্সিচালকের মত। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের ফলে যে সার্বিক জীবনধারণের সঙ্কট দেখা দিয়েছে, তার সাথে জাতীয় রাজনীতিকদের ক্ষমতার পাশা খেলার জাঁতাকলে পড়ে তাঁরা প্রতিনিয়ত হতাশ ও বিভ্রান্ত হচ্ছেন। জনগণের দুঃখকষ্টের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন টোরিরা ব্রেক্সিটোত্তর সমস্যা নিয়ে নির্বিকার, অনুতাপহীন এবং রুশ-ন্যাটো (ইউক্রেন) ছদ্ম যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সক্রিয় ভূমিকা বজায় রাখতে অত্যুৎসাহী। অন্যদিকে স্টারমারের নেতৃত্বে লেবাররা বর্তমান সরকারের দুর্বলতম মুহূর্তেও বিকল্প তৈরি করতে বা নিদেনপক্ষে কার্যকর প্রতিবাদী ভূমিকা নিতেও অপারগ। এমতাবস্থায় এই পুঞ্জিত জনক্ষোভ ব্যাপক জনরোষের রূপ ধারণ করে আগামী নির্বাচনে যুক্তরাজ্যের দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে কিনা সেটাই এখন দেখার।

আরো পড়ুন ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে: রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ, একাধিপত্য, সান্ত্বনাবাক্য

ভাবী টোরি প্রধানমন্ত্রী ভারতীয়, ইরাকি, না পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত হবেন তার গুরুত্ব অনেকটাই সংবাদমাধ্যম ও তাদের পেটোয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দ্বারা কৃত্রিমভাবে আরোপিত। মে মাসের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে লিবারাল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিন পার্টি। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে অভূতপূর্ব ফল করেছে আইরিশ ঐক্যবাদী সিন ফিন দল। জুন মাস জুড়ে শ্রমিক ধর্মঘটের ঝড় বয়ে গেছে পরিবহন ক্ষেত্রে। টালমাটাল এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ লেবার পার্টিকে উপেক্ষা করে অন্য বামপন্থী শক্তির দিকে ঝুঁকবে কিনা সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন। এর উত্তর কারোর কাছেই নেই। তবে বরিস-বিদায়ের পরেও টোরি দল ও সরকারের নীতি এবং আচরণে যে আদৌ পরিবর্তন আসবে না তা নিয়ে বিশেষ সন্দেহের অবকাশ নেই। তাহলে বরিসের কী হবে? রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত “আপন আদিম আভিজাত্য” অনুভব করা ভূতগ্রস্ত দেশের মতই আপাতত যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী “বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না, অথচ ছাড়েও না।” ছাড়বে বলে মনেও হয় না।

লেখক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.