গত বছরের অক্টোবর মাসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনক ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়ার পর ভারতীয় গণমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়ার উল্লাসের কথা নিশ্চয়ই আমরা কেউ ভুলে যাইনি। আড়াইশো বছরের ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের নিরিখে সেই উল্লাসকে খুব দোষ দেওয়াও হয়ত চলে না। যুক্তরাজ্যের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাগজ সেইসময় লিখেছিল “ভারতীয় গণমাধ্যম যখন ঋষির উত্থানকে (ব্রিটিশ) সাম্রাজ্যের উপর একজন ভারতীয় সন্তানের বিজয় হিসাবে উদযাপন করছে, শত শত ভারতীয় আবার নতুন করে কোহ-ই-নূর ফিরিয়ে দেবার দাবিও জানাচ্ছেন।”

গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে ঋষির আদতে পাঞ্জাবি পিতামহ সপরিবার পূর্ব আফ্রিকা থেকে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। বংশপরিচয়ে ভারতীয় শিকড়ের পাশাপাশি ঋষি ভারতের জামাইও বটে। তাঁর শ্বশুর ইনফোসিসখ্যাত সাক্ষাৎ নারায়ণমূর্তি। ভারতের মাটিতে না জন্মালেও বা বেড়ে না উঠলেও ঋষি কিন্তু নিজেকে “গর্বিত হিন্দু” বলে দাবি করেছেন। যুক্তরাজ্যের এই তরুণ প্রধানমন্ত্রীর ঝকঝকে চেহারার নানা মেজাজের ছবির মধ্যে গলায় নামাবলী জড়িয়ে গোমাতাকে আদর করার ছবিও আমরা দেখেছি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ব্রেক্সিট, অতিমারী বা বরিস জনসনের কলঙ্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের টালমাটাল অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঋষি কেবল যুক্তরাজ্যের প্রথম ভারতীয়, প্রথম হিন্দু, বা প্রথম এশিয় প্রধানমন্ত্রীই নন, প্রথম অ-শ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী এবং ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে তরুণতম প্রধানমন্ত্রী। এহেন মানুষটি গত ১৩ জুলাই যুক্তরাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে যে ঘোষণা করেন, তার বাংলা করলে দাঁড়ায় এরকম “কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ এই বেতন বৃদ্ধির খরচ পড়ছে সরকার পরিকল্পিত বাজেটের চেয়ে কয়েক লক্ষ পাউন্ড বেশি। সরকারী কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে হলে কোনো না কোনো জায়গা থেকে সেই টাকা আসতে হবে। কেন না করের বোঝা আর বাড়াতে আমি প্রস্তুত নই এবং সরকারি ঋণ আর বাড়ানোও ঠিক হবে না কারণ তাতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। তাই এই টাকা জোগাড় করার আমরা দুটো উপায় বার করেছি। অভিবাসীরা এই দেশে আসার জন্য যে ভিসার আবেদন করেন তার খরচ আমরা বাড়াতে চলেছি এবং এই দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার জন্য তাঁরা যে শুল্ক (Immigration Health Surcharge) দেন সেটাও আমরা বাড়াতে চলেছি।…আমি মনে করি এটা সঠিক। এই খাতে খরচ সাম্প্রতিককালে বাড়েনি এবং সব জিনিসের দাম বাড়ার নিরিখেও এটাই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা।”

এই বক্তব্যের মধ্যে অভিবাসীদের প্রতি স্পষ্ট অশ্রদ্ধা ছাড়া আরও কয়েকটা বিষয় আছে। প্রথমত, যুক্তরাজ্যের সাধারণ নাগরিকদের মতই যুক্তরাজ্যে কাজ করতে আসা অভিবাসীদের বেতন থেকেও আয়করের পাশাপাশি একটা অংশ মাসে মাসে কেটে নেওয়া হয় জাতীয় সুরক্ষা (National Insurance) খাতে, কিন্তু ভিসা আবেদনের সময়ে প্রদেয় শুল্ক কেবলমাত্র অভিবাসীদেরই দিতে হয়, সাধারণ নাগরিকদের নয়। অর্থাৎ এই শুল্ক বৈষম্যমূলক এবং নতুন পরিকল্পনায় সেই বৈষম্যটাই সরকার আরও বাড়াতে চায়। দ্বিতীয়ত, ভিসার আবেদনের সময়ে যুক্তরাজ্যে বসবাসের আকাঙ্ক্ষিত সময়ের পুরোটার জন্যই এই শুল্ক একবারে দিতে হয়। অর্থাৎ পাঁচ বছরের জন্য যে মানুষ ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে কাজ করতে যাচ্ছে, তাকে একবারে ধরে দিতে হয় প্রায় চার লক্ষ টাকা। সে যদি কোনো কারণে পাঁচ বছরের আগেই চাকরি ছেড়ে ফিরে আসে, তাহলেও ওই টাকার কোনো অংশ ফেরত পাওয়া যায় না। তৃতীয়ত, একথা পুরোপুরি ঠিক নয় যে সাম্প্রতিক অতীতে ভিসার জন্য আবেদনের খরচে কোনো বদল হয়নি। ২০১৯ সালেই অভিবাসীদের উপর চাপানো স্বাস্থ্য শুল্ক বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়, ২০২০ সালে তা ফের ৫৬% বাড়ানো হয়। তারপর তিন বছর আর পাল্টায়নি, এখন আবার ৬৬% বাড়ানোর কথা হচ্ছে। অবশ্য সাম্প্রতিক অতীত কথাটার সংজ্ঞা ঋষি এবং তাঁর সরকারের কাছে অন্য কিছুও হতে পারে।

স্বাস্থ্য শুল্কের পাশাপাশি বাড়ছে নানা আবেদন মূল্যও। কাজ করতে আসার ভিসার আবেদন মূল্য বাড়ছে ১৫% এবং পড়তে আসার ভিসা, বিদেশী কর্মী নিয়োগের অনুমোদন, নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদনের খরচ বাড়ছে ২০%। ভিসা আবেদনের সময়ে প্রদেয় এই বিপুল পরিমাণ অর্থ একবারে দেওয়া একটা উন্নয়নশীল দেশের মধ্য বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে সহজ কথা নয়। ভারতীয় টাকায় চার লক্ষ টাকা একসঙ্গে জোটানো অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারেই খুব কঠিন। যে দেশগুলোর মুদ্রা ভারতীয় মুদ্রার চেয়ে দুর্বল এবং যাদের গড় অর্থনৈতিক অবস্থাও আরও খারাপ, তাদের পক্ষে এই পরিমাণ অর্থসংস্থান আরও দুরূহ। অর্থাৎ এই জাতীয় নিয়মের মধ্যে দিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়ে দিচ্ছে, তারা বিদেশ থেকে শুধু দক্ষ ও মেধাবী কর্মীই চায় না, ধনী কর্মী চায়। কর্মজীবনের শুরুর দিকে থাকা তরুণ-তরুণীদের উপরই এর প্রভাব পড়বে বেশি। কারণ একদিকে তাদের সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ থাকে কম, অন্যদিকে চাকরি বদল, এমনকি পেশার কারণে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার প্রয়োজনও তাদের মধ্যে বেশি। ছাত্রছাত্রীদেরও এই শুল্ক দিতে হয়, যদিও তাঁদের জন্য কিছুটা ছাড় থাকে।

কেউ অবশ্যই বলতে পারেন, খরচ না পোষায় তো যুক্তরাজ্যে না গেলেই হল। মুশকিল হল যে তরুণ অভিবাসীরা ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যে আছেন, তাঁরাও এই নতুন নিয়মে ভুগবেন দুদিক দিয়ে। এক, তাঁদের পরিবারকে (স্বামী, স্ত্রী বা সন্তান) যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়ার খরচ বেড়ে গেল। দুই, চাকরির সময়সীমা বাড়াতে হলে যুক্তরাজ্যের মধ্যে থেকেই নতুন ভিসার আবেদন করতে হবে যা আরও বেশি খরচসাপেক্ষ।

ভারতীয় শিক্ষার্থী এবং তরুণ কর্মীদের অন্যতম গন্তব্য যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্যের নানারকম কর্মী ভিসার ৩৩% দেওয়া হয় ভারতীয়দের। দক্ষ কর্মী (Skilled Worker) এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার দক্ষ কর্মী (Skilled Worker – Health and Care) – এই দুই বিভাগে ভারতীয় আবেদনকারীর সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ২০২২ সালে প্রায় ৬০,০০০ ভারতীয় কর্মী যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হন (২০১৯ সালের তুলনায় ১০৩% বেশি)। দ্বিতীয় স্থানে ছিল নাইজেরিয়া। তাদের প্রাপ্ত ভিসার সংখ্যা প্রায় ১৩,৫০০। অভিবাসী ছাত্রছাত্রী বা কর্মীদের পরিবার হিসাবে যুক্তরাজ্যে যান ৭০,০০০-এর বেশি ভারতীয় (২০১৯ সালের তুলনায় ১৫১% বেশি)। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, ভারতীয়দের মধ্যে এই নতুন শুল্ক বৃদ্ধি নিয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। নাইজেরিয়ান এবং ইউরোপিয়ানদের তরফে যদি বা ছোটখাটো কিছু সম্মিলিত প্রতিবাদ দেখা গেছে, এই বিপুল সংখ্যক ভারতীয় বেশ চুপচাপ। এই নীরবতার কারণ খুঁজতে একটু তাকাই ভিসা আবেদন সংক্রান্ত তথ্য ও পরিসংখ্যানের দিকে। স্বাস্থ্য পরিষেবায় নিযুক্ত কর্মীদের স্বাস্থ্য শুল্ক দিতে হয় না। অর্থাৎ নতুন বাজেট পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বাড়ছে কিন্তু অভিবাসী স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর সেই ব্যয়ভার চাপছে না, চাপছে কেবল অন্যান্য ক্ষেত্রে নিযুক্ত অভিবাসীদের উপর। ২০২২ সালে প্রদত্ত মোট কর্মী ভিসার ৫৪ শতাংশই স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রের। সমস্ত অভিবাসীদের মিলিত প্রতিক্রিয়া না হওয়ার এটা অন্যতম কারণ। স্বাস্থ্য পরিষেবা বনাম অন্যান্য পরিষেবা – এই বিভাজন তৈরি করে অভিবাসীদের ক্ষোভকে দানা বাঁধতে দিচ্ছে না যুক্তরাজ্যের সরকার। ২০২১-২২ থেকে ২০২২-২৩ স্বাস্থ্য পরিষেবায় ভারতীয় নিযুক্তি বেড়েছে ১০৫%, যেখানে অন্যান্য পরিষেবায় তা বেড়েছে ৬০%। স্বাভাবিকভাবেই বিপুল সংখ্যক ভারতীয় অভিবাসী প্রতিবাদের কারণ দেখছেন না, কিন্তু স্বাস্থ্য বহির্ভূত ক্ষেত্রে নিযুক্ত অভিবাসীদের উপর এই বাজেটের কোপ পড়বে সজোরে।

আরো পড়ুন ‘সুনক প্রবল দেশপ্রেমিক ব্রিটিশ প্রমাণিত হতে চাইবেন’

তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে চলতি মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মী আন্দোলন থেকে মুক্তির জন্য ঋষির সরকার ভারত তথা অন্যান্য দেশের কর্মী ও তাঁদের অর্থের উপর নির্ভর করছে। বছর দেড়েক পরেই যুক্তরাজ্যে নির্বাচন। এমতাবস্থায় আট শতাংশের উপর মুদ্রাস্ফীতির হার এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকর্মীদের লাগাতার কর্মবিরতি আন্দোলনের চাপে হাঁপাতে থাকা অর্থনীতিকে বাগে আনতেই কনজারভেটিভ সরকারের এই ব্যবস্থা নেওয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা – নানা ক্ষেত্রে ৬-৬.৫% বেতন বৃদ্ধির খরচ প্রায় ৫০০ কোটি পাউন্ড। তাই ভিসার আবেদন মূল্য ও ভিসা আবেদনকারীদের প্রদেয় স্বাস্থ্য শুল্ক বাড়িয়ে এর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি পাউন্ড তোলাই লক্ষ্য। এই উপায়ে টাকাও আসবে আবার জনসমর্থন হারাবারও ভয় নেই। কিন্তু কনজারভেটিভ সরকারের দীর্ঘকালীন অপদার্থতার দায়ভার অভিবাসীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সহজ সমাধানের এই উপায় বড়ই লজ্জাজনক। আসলে উপনিবেশ স্বাধীন হয়ে গেলেই ঔপনিবেশিকতা উধাও হয়ে যায় না। অন্যকে শোষণ করে নিজে পুষ্ট হওয়ার মানসিকতাই ঔপনিবেশিকতার ভিত্তি। বিশ্বায়িত ব্যবস্থায় সেই ঔপনিবেশিকতাকে জিইয়ে রাখার নানা সূক্ষ্ম উপায় আছে। যুক্তরাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটে সগর্ব উচ্চারণ “মানুষ কেন যুক্তরাজ্যে আসে? কাজ করতে।” সুতরাং আবেদন মূল্য আর শুল্ক বাড়লেও বড় সংখ্যক অভিবাসীই যুক্তরাজ্যমুখী থাকবেন – এই বিশ্বাস ঋষি পরিচালিত সরকারের আছে, তা না হলে এইভাবে ১০০ কোটি পাউন্ড তোলার পরিকল্পনা তাঁরা করতেন না নিশ্চয়ই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.