২৮ জুন ২০২৩। হামলা হয় ভীম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদের উপর। দুষ্কৃতীরা দু রাউন্ড গুলি চালায় আজাদের কনভয় লক্ষ করে। পরবর্তীকালে এই মামলায় অভিযুক্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চারজনই রাজপুত সম্প্রদায়ভুক্ত। আজাদকে আক্রমণের কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, আজাদ দীর্ঘদিন ধরে দলিতদের অধিকার নিয়ে যে আন্দোলন করছেন তা তাঁদের উচ্চবর্গীয় মূল্যবোধে আঘাত করেছে। আজাদের আন্দোলন তাদের জাতিগত ঐতিহ্যকে অপমান করেছে। তাই তারা আজাদকে ‘জানে’ শেষ করতে চেয়েছিল।

পাঁচ বছর আগে একই কায়দায় উমর খালিদের উপর আক্রমণ হয়েছিল খোদ দিল্লিতে। বন্দুক হাতে আক্রমণ করেছিল দুষ্কৃতীরা। পরে সোশাল মিডিয়ায় একটা ভিডিও এসে পড়ে, যেখানে দুজন লোককে দেখা যায় বেশ কলার উঁচিয়ে এ কথা স্বীকার করতে, যে তারাই উমরকে আক্রমণ করেছিল। উমরের মত একজন দেশদ্রোহীকে আক্রমণ করে স্বাধীনতা দিবসের আগে দেশকে একটা ‘বিশেষ উপহার’ দিতে চেয়েছিল তারা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৯ সালে নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে এক জোরদার আন্দোলন তৈরি হয়, যা ক্রমশ গণআন্দোলনের চেহারা নেয়। সেটা ছিল ২০১৪ পরবর্তী বিজেপিবিরোধী আন্দোলনগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী আন্দোলন। তারপর ভারতে কৃষক আন্দোলন, আশা কর্মীদের আন্দোলনের মত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলন হয়েছে। সেই সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ২০২০ সালে দিল্লিতে এক ভয়াবহ দাঙ্গা হয়, যাতে পঞ্চাশের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। সেইসময় দুটো ভিডিও ক্লিপ জনসমক্ষে আসে। দেখা যায় নাগরিকত্ব আইনের সমর্থনে এক মিছিল থেকে স্লোগান তোলা হচ্ছে, “দেশকে গদ্দারোঁ কো, গোলি মারো সালোঁ কো”। অর্থাৎ “দেশের শত্রুদের গুলি করে মারো”। সেই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। এক জনসভার মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরও এই স্লোগান দিতে উদ্বুদ্ধ করেন উপস্থিত জনতাকে।

এবছর একেবারে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে, পুলিশের সামনে, উত্তরপ্রদেশে বিচারাধীন বন্দি আতিক আহমেদ এবং তার ভাইকে গুলি করে মারা হয়। তার আগে একই কায়দায় এনকাউন্টার করা হয় আতিক আহমেদের ছেলে, ১৯ বছরের আসাদ আহমেদকে। মার্চ মাসে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ জানায়, গত ছ বছরে তারা ১০,৭১৩টি এনকাউন্টার করেছে।

আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনাগুলোকে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে প্রত্যেকটা ঘটনার মধ্যে একরকম সাযুজ্য লক্ষ করা যাবে – মতাদর্শগত সাযুজ্য। এই ঘটনাগুলো ঘটিয়ে আসলে এনকাউন্টার সংস্কৃতিকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। সেই প্রচেষ্টা যে একেবারে সফল হচ্ছে না তাও নয়। উমরের উপর আক্রমণের পর তবু কিছু প্রতিবাদ হয়েছিল নাগরিক সমাজ থেকে। আজাদের উপর আক্রমণের পর কিন্তু হাতে গোনা কিছু ফেসবুক পোস্ট ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি, রাস্তার প্রতিবাদ তো দূরের কথা।

সুপরিকল্পিতভাবে দেশের মধ্যে এমন সংস্কৃতি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে নির্দ্বিধায় যে কোনো বিরোধী স্বর গুলি করে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। ‘দেশরক্ষা’, ‘ধর্মরক্ষা’, ‘জাতিগত ঐতিহ্য রক্ষা’ ইত্যাদি অজুহাতে যেখানে অবাধে বোমা, গুলি ব্যবহার করা যায়। সে কথা জনসমক্ষে কলার তুলে স্বীকার করাও যায়।

আপনি জিজ্ঞেস করতেই পারেন, এমনটা কি আগে কখনো হয়নি? আগে কখনো বিরোধী স্বর স্তব্ধ করতে বোমা, গুলি ব্যবহার করা হয়নি?

অবশ্যই তা নয়, আগেও এমন হয়েছে। রাজনৈতিক হিংসা ভারতে চিরকালই ছিল। যে কায়দায় ছত্তিসগড়ের বামপন্থী শ্রমিক নেতা শংকর গুহনিয়োগীকে হত্যা করা হয়েছিল, তারও উদ্দেশ্য একই – বিরোধী স্বরকে স্তব্ধ করা। তবু সেই ঘটনার সঙ্গে আজ যা ঘটছে তার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য। শংকর গুহনিয়োগী হত্যার পরের কলকাতা বইমেলায় একাধিক সমাজসচেতন নাগরিক জড়ো হয়েছিলেন প্রতিবাদ করতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ সোচ্চার হয়েছিলেন এই হত্যার বিরুদ্ধে। ১৯৯১ সালে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেড়িয়া গোষ্ঠীর মালিক কেপি কেড়িয়ার বক্তব্যে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, শংকর খুনের পর যে জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলন ছত্তিসগড়ে তৈরি হয়েছিল তার ভয়ে তিনি নিজের গোটা পরিবারকে ভিলাই থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। শাসকাশ্রিত দুষ্কৃতীরা সেদিন বিনা প্রতিরোধে কলার তুলে বেরিয়ে যেতে পারেনি।

কিন্তু এখন এই আক্রমণগুলো সামাজিক স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। জনসাধারণের মনে এসব ঘটনা আর কোনোরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে না। উপরন্তু ফেসবুক জুড়ে একাধিক লেখায়, পোস্টারে, ভিডিওতে উদযাপন করা হচ্ছে এই আক্রমণগুলোকে। সমাজ এখন দুটো স্পষ্ট দলে বিভক্ত। হয় তুমি এই সংস্কৃতির পক্ষে, নয় বিপক্ষে। সমস্ত হিসাবনিকাশ চলছে সাদা-কালোয়।

২০১৪ সালের আগেও রাজনৈতিক হিংসা, হত্যা হয়েছে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এনকাউন্টার সংস্কৃতিকে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। এর সপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে দিচ্ছে মানুষের মাথায়। পুলিশ, প্রশাসন, গণমাধ্যম – সবকিছুকেই ব্যবহার করা হচ্ছে এই সংস্কৃতির ভিত তৈরি করতে। তাই এই আক্রমণগুলোতে মানুষ আর শঙ্কিত হচ্ছেন না। আজ অবলীলায় মিছিল থেকে স্লোগান দেওয়া যায় – গুলি মারো। উমর, আজাদের মতো প্রতিবাদী স্বরের উপর দিনের আলোয় আক্রমণ চলে। তথাকথিত প্রগতিশীল এবং প্রতিবাদীরাও সোশাল মিডিয়ায় দু-এক লাইন ধিক্কার জানিয়ে দায় সারেন।

আরো পড়ুন আমরা মুক্ত থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে আর্ত মানুষের কাছে ছুটে যেতাম

এখানেই এসে পড়ে সেই বিতর্কিত ‘কালেক্টিভ কনশেন্স’, অর্থাৎ সমষ্টিগত বিবেকের প্রসঙ্গ। আফজল গুরুর ফাঁসির সময়ে সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে ‘কালেক্টিভ কনশেন্স’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিল। সর্বোচ্চ আদালত সেদিন যে যুক্তি দিয়েছিল, এক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ। আফজলের ফাঁসির যুক্তি হিসাবে বলা হয়েছিল, “The incident, which result in heavy casualties, had shaken the entire nation and the collective conscience of the society will only be satisfied if the capital punishment is awarded to the offender”। এখানেই প্রশ্ন, এই ‘কালেক্টিভ কনশেন্স’ বস্তুটা ঠিক কী? সেটা কি সমাজে নিজে নিজেই তৈরি হয়েছিল, নাকি তা সমাজের একাংশের নির্মাণ? সুপরিকল্পিতভাবে এগুলোর পক্ষে কি জনমত তৈরি করা হয় না বা হচ্ছে না?

আফজলের ঘটনার সঙ্গে উমর বা আজাদের ঘটনার বিস্তর ফারাক রয়েছে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই কি সেই সমষ্টিগত বিবেক কাজ করছে না? যে জিনিসটাকে সন্তুষ্ট করতে একজনকে সেদিন ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল (‘সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স’-এর ভিত্তিতে) এবং আজ এনকাউন্টার সংস্কৃতিকে উদযাপন করা হচ্ছে? আফজলের মামলা এক্ষেত্রে অনেকেরই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তবে ওই মামলার রায়ের ওই নির্দিষ্ট শব্দবন্ধ এই আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমার ধারণা। সেদিন যে সমষ্টিগত বিবেককে সাক্ষীগোপাল করে মৃত্যুদণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল, আজও সেই সমষ্টিগত বিবেককেই হাতিয়ার করা হচ্ছে বিরোধীদের উপর, বিচারাধীন বন্দিদের উপর গুলি চালানোকে ন্যায্যতা দিতে। সমষ্টিগত বিবেকের নামে আসলে অবাধে বিদ্বেষের চাষ চলছে। উত্তরপ্রদেশ পুলিসের ভুয়ো এনকাউন্টার উত্তরপ্রদেশ মডেল নামে অশ্লীলভাবে সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে। ক্রমশ এটা সামাজিক মতাদর্শে পরিণত হচ্ছে।

§ মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.