উমর খালিদ

তিহার জেলে আমার কোভিড-১৯ কোয়ারান্টাইন পর্ব শেষ হওয়ার দুদিন পরে আমি ভীষণ দুঃখজনক খবরটা পেলাম। আমার মতই আরেক অভিযুক্ত নাতাশার বাবা মহাবীর নারওয়াল কোরোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

আমি মহাবীরজিকে চিনতাম না। কিন্তু নাতাশা গত গ্রীষ্মে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমি ওঁর কয়েকটা সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম। নিজের পরিবারের পক্ষে খুব কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে উনি আশ্চর্য স্থৈর্য আর সম্ভ্রম বজায় রেখে কথা বলছিলেন। নাতাশাকে ‘দাঙ্গার ষড়যন্ত্র’ করার যে হাস্যকর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তাতে বিহ্বল না হয়ে উনি নাতাশা যে নিরপরাধ তা বলেছিলেন। একইসঙ্গে ওর অ্যাক্টিভিজমকেও সমর্থন করেছিলেন এবং বলেছিলেন উনি মেয়ের জন্য গর্বিত। এই শোক এবং অপূরণীয় ক্ষতির মুহূর্তে আমি মানসিকভাবে নাতাশার পাশে আছি। ওর বেদনা কল্পনা করাও শক্ত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সাধারণ সময়েও জেলের জীবন বেশ কঠিন। আমি গত আট মাস একা একটা সেলের মধ্যে কাটিয়েছি, অনেকসময় দিনে ২০ ঘন্টারও বেশি তালাবন্ধ অবস্থায়। কিন্তু চলতি স্বাস্থ্য সংকট জেলজীবনের কাঠিন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত এক মাসে কোভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ যেভাবে ভারতকে তছনছ করেছে, তাতে আমি আমার সেলে বন্দী অবস্থায় একটা দিন বা রাতও প্রচণ্ড উদ্বেগ ছাড়া কাটাতে পারিনি — আমার পরিবার আর প্রিয়জনদের সম্বন্ধে উদ্বেগ। অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকে বেশি চিন্তা না করার চেষ্টা করতেই হয়, কিন্তু রোজ সকালের কাগজ যে মৃত্যু আর হতাশার খবর নিয়ে আসে, তা এতটাই অভিভূত করে দেওয়ার মত যে সবচেয়ে খারাপ চিন্তাগুলো দূর করা একেবারে অসম্ভব। সেই মুহূর্তগুলোতে জেলের সেলটা যেন গিলে খেতে আসছে মনে হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে, শরীর মন কাজ করে না।

বাড়ির খবর জানতে আমি সাপ্তাহিক পাঁচ মিনিটের ফোন কল বা দু সপ্তাহ অন্তর দশ মিনিটের ভিডিও কলের জন্যে মুখিয়ে থাকি। কিন্তু কথা বলা শুরু করতে না করতেই টাইমার চালু হয়ে যায়। বাড়ির সাথে কথা বলার সময় প্রত্যেকটা সেকেন্ডের মূল্য আমি যেভাবে উপলব্ধি করি সেভাবে আগে কখনো করিনি।

এপ্রিলের মাঝামাঝি আমি খবর পাই যে আমার মা এবং অন্য অনেক আত্মীয় কোভিড পজিটিভ। আমার কাকার অবস্থা বিশেষভাবে খারাপ কারণ ওঁর অক্সিজেন লেভেল ক্রমশ নেমে যাচ্ছিল এবং ওঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল, শিগগির আই সি ইউ-তে নিয়ে যেতে হয়েছিল। বাড়িতে এই অবস্থার মধ্যেই একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার শরীরটা খারাপ লাগল। জ্বর আর গায়ে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। আমি জেলের ও পি ডি-তে দৌড়ে গেলাম টেস্ট করানোর জন্যে, কিন্তু ওরা আমাকে কয়েকটা ওষুধ দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিল। ছ দিন কোভিডের অনেকগুলোর লক্ষণ নিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশে আমার টেস্ট হল এবং পজিটিভ ফল এল।

তারপর অবশ্য আমার যতটা ডাক্তারি পরিষেবা দরকার ছিল সবটাই পেলাম এবং আমাকে কোয়ারান্টাইন করা হল। কিন্তু স্বভাবতই, কোয়ারান্টাইন থাকা মানে প্রিয়জনদের কাউকে সাপ্তাহিক ফোন কল বা ভিডিও কল নয়। আমি কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠলাম আমার সেলে শুয়ে নিরুপায় হয়ে বাড়ির কী অবস্থা ভাবতে ভাবতে। 

প্রক্রিয়া নিজেই এক শাস্তি

কোয়ারান্টাইন থাকার সময় আমি দিল্লী হাইকোর্ট নিযুক্ত উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিটিটার কথা পড়লাম। এই কমিটি গত বছরের মতই কোভিড-১৯-এর জন্য এমার্জেন্সি প্যারোল/অন্তর্বর্তী জামিনে বন্দিমুক্তির কথা বিবেচনা করছিল। আমি গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলাম, এবং পরে নিশ্চিত হওয়া গেল, যে আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট, বা ইউএপিএ আইনে গ্রেপ্তার হওয়া বন্দিরা এই অন্তর্বর্তী স্বস্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

আমাদের জন্যে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার একমাত্র উপায় সাধারণ জামিন, যা ইউএপিএ-র ধারাগুলোর কারণে অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া খুব শক্ত বা প্রায় অসম্ভব।

আইন হিসাবে ইউএপিএ সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়কে প্রহসনে পরিণত করেছে, যাতে কোর্ট বলেছিল জামিন হল নিয়ম আর জেল হল ব্যতিক্রম। প্রকৃতপক্ষে ইউএপিএ এই নীতিটাকেই সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। কারণ এই আইনে জামিন পেতে হলেও অভিযুক্তকে নিজেকেই প্রমাণ করতে হয় সে নির্দোষ। অর্থাৎ ধরেই নেওয়া হয় সে দোষী। তাও বিচার ছাড়াই।

মনে হচ্ছে একমাত্র একটা দীর্ঘকালীন বিচারের পরেই আমরা মুক্তি পাওয়ার আশা করতে পারি। আমাদের মামলায় প্রথম গ্রেপ্তারের পর ১৪ মাস কেটে গেছে। এখনো বিচার শুরুই হয়নি। আমরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগই পাইনি। এই ‘ষড়যন্ত্র’ মামলায় আমাদের যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশনে আছে এবং এই অতিমারী বিচারের প্রক্রিয়ায় আরো বিলম্ব ঘটাবে কারণ অনেক জজ, উকিল এবং আদালত কর্মী অসুস্থ।

স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, প্রক্রিয়াটা নিজেই একটা শাস্তি। আর এই প্রক্রিয়া, যা সাধারণ অবস্থাতেই বেদনাদায়কভাবে মন্থর, আজকের অবস্থায় ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদি আমি মুক্ত থাকতাম

সরকার কি এখনকার অস্বাভাবিক অবস্থা বিচার করে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেবে? আমি খুব একটা সে আশা করছি না। কারণ গতবছর ঠিক এরকম ব্যতিক্রমী অতিমারী পরিস্থিতিই আমরা যারা অসাংবিধানিক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদ করছিলাম তাদের জেলে পোরার জন্য সরকারকে নিখুঁত অজুহাত জুগিয়েছিল। কারণ তখন প্রতিবাদ, আন্দোলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল আর সংবাদমাধ্যমে নজর ছিল স্বাস্থ্য সংকট আর অর্থনৈতিক সংকটের উপর।

আমি প্রায়ই ভাবি আমরা আজ মুক্ত থাকলে জীবনটা কেমন হত। যাদের সাহায্য প্রয়োজন তাদের কাছে তাদের পরিচয় নির্বিশেষে আমরা ছুটে যেতাম, সহমর্মিতা এবং সংহতি জানাতাম। অথচ আমরা আজ এমন এক অবস্থায় পড়ে আছি যেখানে পরিস্থিতি আরো খারাপ। রোগের সঙ্গে, উদ্বেগের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে; নাতাশার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সাথেও লড়তে হচ্ছে।

প্রচুর মানুষের প্রাণ হারানোর সাথে সাথে গত ১৪ মাসে কোভিড-১৯ অতিমারী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের যে বিপুল ক্ষতি করেছে বিশেষজ্ঞরা তা-ও চিহ্নিত করেছেন। মানুষ রাজনৈতিক বন্দি এবং আমাদের পরিবারগুলোর কথাও একটু ভাববেন আশা করি। মহাবীর নারওয়ালের কথা ভাববেন, যিনি শেষদিকে শুধু কোভিড-১৯-এ ভুগছিলেন না, এক বছর ধরে নিজের মেয়েকে মুক্ত দেখার বেদনাদায়ক অপেক্ষাতেও ভুগছিলেন। নাতাশার কথাও একটু ভাববেন, যে বাবার শেষ মুহূর্তগুলো তাঁর সাথে কাটাতে পারেনি এবং তাঁকে দাহ করার তিন সপ্তাহ পরে আবার জেলে ফিরে যেতে হবে।

লেখক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা, বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মী। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তাঁকে ইউএপিএ আইনে দিল্লী পুলিস গ্রেপ্তার করে। সেই থেকে তিনি তিহার জেলে বন্দি আছেন। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

(বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যের সাথে কথোপকথনের ভিত্তিতে)

*লেখক এবং ‘দ্য প্রিন্ট’ ওয়েবসাইটের অনুমতিক্রমে বাংলায় অনূদিত। মূল ইংরেজি লেখাটি প্রকাশিত হয় ওই সাইটে। নাগরিক ডট নেটের হয়ে অনুবাদ করেছেন প্রতীক।

উমর খালিদ – ছবি ফেসবুক ও উইকিপেডিয়া থেকে।

Leave a Reply