তথাকথিত সফল মানুষকে মহাপুরুষ ভেবে ফেলা এক প্রচলিত অভ্যাস। সাধারণ আই টি চাকুরে থেকে অল্প সময়ের মধ্যে দেশের অন্যতম পথিকৃৎ তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হয়ে ওঠা এবং পৃথিবীর তথ্যপ্রযুক্তি জগতে ভারতকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দেওয়া শিল্পপতি শ্রী নাগভারা রামারাও নারায়ণমূর্তি এইভাবেই নয়ের দশকে পড়াশোনার জগৎ থেকে চাকরির জগতে পা-ফেলা আমাদের কাছে মহপুরুষ হয়ে উঠেছিলেন। নারায়ণমূর্তি, সুধা মূর্তি, নন্দন নিলেকানি আর রোহিণী নিলেকানি – এই চারজনের দলকে অত বড় ইনফোসিস সাম্রাজ্য তৈরি করতে অবশ্যই অনেক কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, অনেকটা রাস্তা হাঁটতে হয়েছিল, বেশ খানিকটা জুতোর শুকতলা ক্ষয়েছিল, কিন্তু তাঁরা দেশের একাধিক প্রজন্মের সামনে একটা স্বপ্ন তৈরি করে দিতে পেরেছিলেন – যার নাম তথ্যপ্রযুক্তি। জীবনে সাফল্যের শর্টকাট। ঝাঁ চকচকে অফিস, দেশের মধ্যেই সোমবার, মঙ্গলবার টাই পরে অটোয় বসে অফিস যাওয়া, আর থেকে থেকেই অনসাইট, মানে ডলার-পাউন্ডের হাতছানি, বিদেশ থেকে ফিরে এসে একটি মনোহর অ্যাপার্টমেন্ট এবং একটি সেডান গাড়ি কিনে রাজার হালে খাতির পেতে থাকা।
কোর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বা অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে যেখানে জীবনে আর্থিকভাবে সফল হতে অন্তত এক দশক লেগে যায়, অন্তত তখনো যেত, সেই সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে চাকরি করলে দশ বছরের কম সময়ে ঈর্ষা করার মত ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বানিয়ে ফেলার সুযোগ থাকলে লোকে তার জন্য মরণপণ খাটতে রাজি থাকে। আমরাও যে খাটিনি এমন নয়। অনেক রাত অফিসেই জেগেছি কাজ ডেলিভারি দিতে গিয়ে, অনসাইট ম্যানেজার বা কোঅর্ডিনেটরের কল নিতে গিয়ে, বা অনসাইটে বসে ডিজাইন ডকুমেন্ট অফশোর আর্কিটেক্টের সাথে রিভিউ করতে গিয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যে সময়ের কথা বলছি, তখন ভারতের দু-একটা শহরে এটিএম বসছে, মোবাইল ফোনে তখনো ইনকামিং কলে পয়সা কাটত আর স্মার্টফোন বস্তুটা তখনো অচেনা ছিল। অটোমেশন শব্দটার সঙ্গে পৃথিবীর তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের প্রায় সকলেই পরিচিত ছিল, কিন্তু অটোমেশন ঠিক কোন স্তর অবধি চলে যেতে পারে, সে সম্বন্ধে সম্যক ধারণা সবার ছিল না।
কম সময়ের মধ্যে সাফল্যের আগুনে ঝাঁপ দেবার লোভে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের কেউই দিনে ১২-১৪ ঘন্টা কাজ করতে পিছপা হত না। বছরে একবার-দুবার কাজের মূল্যায়ন (অ্যাপ্রেইজাল) হত, তাতে কারোর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ত, বাকিরা বেল কার্ভের নিচের দিকেই থাকত। কদিন মনমরা হয়ে থেকে আবার দ্বিগুণ উদ্যমে দিনরাত সপ্তাহান্ত এক করে কাজ করে চলা, কারণ জীবনে সাফল্যের দ্বিতীয় কোনো শর্টকাট কারোর জানা ছিল না।
অনসাইটের ঢল যত বাড়তে থেকেছে এই শতাব্দীর গত দুই-আড়াই দশকে, তত খারাপ হয়েছে ভারতে অথ্যপ্রযুক্তি জগতের কর্মসংস্কৃতির হাল। বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের তালিকার বাইরে থাকার কারণে নিয়োগ থেকে পদোন্নতি হয়ে অনসাইটের শর্টলিস্টিং – সবকিছুতে উচ্চবর্ণের রমরমা। অস্বাস্থ্যকর কর্মসংস্কৃতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিশ্চিত সাফল্য – সব মিলিয়ে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সহায়ক ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক আসতে আসতে টাইম শীট হয়ে দাঁড়াল কেবল একটা ফর্মালিটি। বাড়তি সময় কাজ না করলে ম্যানেজারের চোখে পড়ার উপায় নেই, অ্যাপ্রেইজালে ভাল রেটিং নেই। ছুটির দিনে, সপ্তাহান্তে, এমনকি বেড়াতে গিয়েও অন-কল সাপোর্ট না দিলে মুক্তি নেই।
ইতিমধ্যেই মহাপুরুষ স্তর থেকে ভগবান স্তরে উত্তীর্ণ হয়ে শ্রী নারায়ণমূর্তি এখন একজন বাণীসর্বস্ব গুরুদেবে পরিণত হয়েছেন। নিজে শিল্পপতি হয়ে বাড়তি সময় কাজ করে একটি কোম্পানি বানিয়ে দাঁড় করিয়েছেন বলে তিনি চান ভারতের সকলেই সপ্তাহে অন্তত ৭০ ঘন্টা কাজ করুক। একা নারায়ণমূর্তিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। রতন টাটা, আজিম প্রেমজি প্রমুখ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ীদেরও বক্তব্য এর থেকে খুব আলাদা নয়। তারই প্রতিফলন এবার দেখা যাচ্ছে কর্ণাটক সরকারের প্রস্তাবিত আইটি/আইটিইএস সংক্রান্ত প্রস্তাবে। দিনে ১৪ ঘন্টা, সপ্তাহে ৭০ ঘন্টা। পারলে তারও বেশি – সপ্তাহান্তের দুটো দিনই বা নষ্ট হয় কেন?
আরো পড়ুন ৭০ ঘন্টার নিদান: কর্পোরেট দাস ব্যবসায়ীর মন কি বাত
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি যে ধরণের শিল্প, তাকে বলে পরিষেবা শিল্প। মূলত আমরা পণ্য বানাই না, আমরা বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের পরিষেবা দিই। সেখানে গতরে খাটতে হয় না। কাজ মূলত মাথার, তাও দারুণ উন্নত মস্তিষ্কের কোনো দরকার পড়ে না ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা ক্ষেত্রে। মোটামুটি লজিকাল ক্যালকুলেশন বুঝতে পারলেই প্রোগ্রামার হওয়া যায় – তারপর নিজের মেধা এবং জাত অনুযায়ী অফিসের রাজনীতি বুঝে নিতে পারলেই আস্তে আস্তে ম্যানেজারের স্তরে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। পরিষেবা কোম্পানিতে বিভিন্ন ক্রেতার বিভিন্ন প্রোজেক্ট চলে, আর প্রোজেক্টে যে ছেলেমেয়েগুলিকে নেওয়া হয় তাদের প্রোগ্রামিং দক্ষতা অনুসারে, ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে তাদের বলা হয় ‘রিসোর্স’। আইটি ম্যানেজাররা রিসোর্স বরাদ্দ করেন, রিসোর্স ব্যবস্থাপনা করেন, রিসোর্সদের মূল্যায়ন করেন, রিসোর্সদের অনসাইট বা অফশোর বরাদ্দ করেন। পদমর্যাদা অনুযায়ী সেই ম্যানেজাররা নিজেরাও রিসোর্স – কখনও বিলেবল, কখনও নন-বিলেবল।
সংজ্ঞা অনুযায়ী, রিসোর্স বা সম্পদ হচ্ছে সেই জিনিস, যাকে ইচ্ছা মত ব্যবহার করা যায়। যার কোনো অনুভূতি থাকে না, উচ্চাশা থাকে না, ছুটির দাবি থাকে না, প্রেম থাকে না, হতাশা থাকে না। ঠিক যেমন ল্যাপটপ কম্পিউটার। ঠিক যেমন টিভি, লাইট বাল্ব। সকাল হোক, মাঝরাত হোক, ঈদ হোক, সরস্বতীপুজো হোক, সুইচ টিপলেই চলে, সুইচ টিপলেই বন্ধ হয়। অনুভূতি নেই, অভিমান নেই, যতদিন কলকব্জা ঠিক থাকে, চলে। ঠিক না থাকলে দেহ রাখে। মানুষ যে রিসোর্স নয়, সে যে মানুষ, একজন কর্মী, সহকর্মী – তার শরীর খারাপ হয়, মন খারাপ হয়, সুইচ টিপলেই সে কাজ করতে শুরু করতে পারে না – এটা সাধারণভাবে ভারতের কর্পোরেট জগতে কেউ ভাবে না।
পশ্চিমের দেশগুলিতে যখন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে বেশি করে জোর দেওয়া হচ্ছে কর্মক্ষেত্রে, সাপ্তাহিক কাজের সময় কোনো কোনো দেশে ৪০ থেকে কমিয়ে ৩২ বা ৩৬ ঘন্টার করে আনা হচ্ছে, কারণ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে হইহই করে অটোমেশন এসে গেছে, ঘর থেকে কাজ করার সুবিধে এসে গেছে, সেখানে ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি জগতের ভ্যাটিকান সিটি বেঙ্গালুরু তথা কর্ণাটকে কাজের সময় বাড়াবার প্রস্তাব আনা হচ্ছে। সেই শহরের আনাচে কানাচে হয়তো মুখ কালো করে বসে থাকছেন হে মার্কেটের মৃত শ্রমিকরা – আট ঘন্টা কাজ, আট ঘন্টা বিনোদন আর আট ঘন্টা বিশ্রামের দাবিকে যাঁরা একদিন প্রাণ দিয়ে অর্জন করেছিলেন।
অবতার নারায়ণমূর্তির সেদিনের বাণীর বিরুদ্ধতা করেনি মূলধারার প্রায় কোনো সংবাদমাধ্যম। শুধুমাত্র যে ঠোঁটকাটাদের সবকিছুতেই প্রতিবাদ করা অভ্যাস, কেবল তারাই প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কেউ কেউ হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল, বাকিরা বলেছিল – বটেই তো। দেশ গড়তে গেলে খাটতে তো হবেই। তা দেশ গড়া হচ্ছে। এবারেও ওই কর্ণাটক স্টেট আইটি/আইটিইএস ইউনিয়ন (KITU) ছাড়া এই প্রস্তাবে বিরুদ্ধে বিশেষ প্রতিবাদ শোনা যায়নি এখন পর্যন্ত।
এইসব অবতার ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা এবং তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারগুলি নীরবে আরেকটা কাজ করে যাচ্ছেন এইসব বিল পাস করার মাধ্যমে। তা হল ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার আকাশটাকে সম্পূর্ণ পুরুষপ্রধান করে দেওয়া। দিনে ২-৪ ঘন্টা যাতায়ার করে, ১৪ ঘন্টা করে অফিসে শ্রম দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে সংসারের হাল ধরা, ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় আজও খুব কম মেয়ের পক্ষেই সম্ভব। তারপর তো আছেই মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত ভয়, অন্যদিকে সাফল্যের সিঁড়িতে একটু উপরে উঠে গেলেই পুরুষ সহকর্মীদের তির্যক মন্তব্য – সব মিলিয়ে ওই তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার আকাশের সামান্য ভাগই ছিল মেয়েদের দখলে। সেই ভাগ আরও, আরও কমে যাবে এই নতুন কর্মসংস্কৃতিতে সরকারি সিলমোহর পড়ে গেলে।
একুশ শতকের প্রথম দশকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যে ঠাটবাট চাকনচিকন ছিল, তা অনেকটাই অস্তমিত। এখন ছাল পলেস্তারা বেরিয়ে গেছে অনেকাংশেই। পৃথিবী বদলে গেছে, অনসাইট অফশোর মডেল বদলে গেছে, বদলাচ্ছে আরও দ্রুত। কাজের ধরণধারণ বদলে যাচ্ছে, আজকের চালু প্রযুক্তি কাল বাতিল হয়ে যাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার জগতে চ্যালেঞ্জের খামতি কোনোদিনই ছিল না। তবু কোথাও একটা ভারসাম্য বজায় ছিল। লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীর জীবনের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, নবম, দশম চাকরি আজও দিয়ে চলে এই পরিষেবা ক্ষেত্র। কেবল মানুষকে রিসোর্স বলে মনে করা আর তাকে ইচ্ছা মত সুইচ টিপে অমানুষিক খাটিয়ে নেওয়ার এই সরকারি কলে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কতদিন আর আকৃষ্ট থাকে সেটাই এখন দেখার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







