২০২৪ সালকে বলা হচ্ছে নির্বাচনের বছর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরভর নির্বাচন। তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশে নির্বাচনের ফলাফল বেশ আশাব্যঞ্জক – ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। দুটি সাবেক সাম্রাজ্যবাদী দেশেই দক্ষিণপন্থী এবং অতি দক্ষিণপন্থী শক্তি পরাজিত হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্সের ফলাফল তো রীতিমত চমকপ্রদ। উগ্র দক্ষিণপন্থী শক্তি এবং মধ্যপন্থীদের পিছনে ফেলে সেখানে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে বামপন্থী জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, সংসদ ত্রিশঙ্কু। ফরাসি মুলুকের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তাও অনিশ্চিত।

ব্রিটেনে প্রত্যাশামতই অবসান ঘটেছে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ পার্টির জমানার। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে লেবার পার্টি। তবে দলের নামে ‘লেবার’ থাকলেও কেয়ার স্টার্মারের দলের কাছ থেকে ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণি এবং নিম্ন আয়ের জনগণের খুব কিছু প্রত্যাশা নেই। লেবার পার্টির মধ্যে বামপন্থী কণ্ঠস্বর জেরেমি করবিনকে আগেই দল থেকে বার করে দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে করবিনের নেতৃত্বে বামপন্থী এজেন্ডার ভিত্তিতে নির্বাচনে লড়েছিল লেবার। তখন থেকে ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর মত কাগজ, যাকে আদর করে অনেকে ‘টোরিগ্রাফ’ বলেও ডাকেন, রীতিমত চিলচিৎকার জুড়ে দিয়েছিল যে, করবিনের নেতৃত্বে অতি বামপন্থীরা লেবারকে কব্জা করে নিয়েছে। ২০১৭ সালে সামান্য ব্যবধানে হারে করবিনের লেবার, ২০১৯ সালে হারের ব্যবধান বাড়ে। তারপরেই ব্রিটেনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি করবিন ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রচারযুদ্ধ শুরু করে। ইহুদিবিদ্বিষের মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়। তাঁদের দল থেকে বার করে দেওয়া হয়। লেবার পার্টির দখল নেন স্টার্মারের নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থীরা, যাঁদের অনেকেই ‘নয়া ব্লেয়ারাইট’ বলেও চিহ্নিত করছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

করবিন এই নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন নির্দল প্রার্থী হিসাবে। গত ৪০ বছর ধরে যে ইসলিংটন নর্থ কেন্দ্রের তিনি সাংসদ, সেখানেই প্রার্থী হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে লেবার পার্টির প্রার্থীও ছিলেন। বিপুল বিরুদ্ধ প্রচার সত্ত্বেও করবিন এবারও জয়ী হয়েছেন। নিঃসন্দেহে এই জয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব বিরাট। স্টার্মারের লেবার পার্টি নিশ্চিতভাবেই দক্ষিণপন্থী কার্যকলাপ চালাবে। জাতীয় এবং আর্ন্তজাতিক – দুই ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান হবে প্রতিক্রিয়াশীল। কিন্তু ব্রিটেনের শ্রমিকশ্রেণি, অভিবাসী এবং নিম্ন আয়ের জনগণ নিশ্চিত থাকতে পারেন, সংসদের ভিতরে তাঁদের হয়ে কথা বলার জন্য করবিন আছেন।

ব্রিটেনের নির্বাচনী ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মোটামুটি পাঁচটি। প্রথমত, ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর টোরিদের বিপর্যয়। কয়েকমাস আগে ব্রিটেনে থাকাকালীন স্বচক্ষে দেখেছি, টোরিদের প্রতি সাধারণ মানুষের চরম বিরূপতা। বিশেষত অভিবাসীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন টোরি শাসনে। কুখ্যাত রোয়ান্ডা পরিকল্পনা, অর্থাৎ অভিবাসীদের ভিন দেশে পাঠানোর ছক টোরিদের প্রতি অশ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নাগরিকদের ঘৃণা আরও তীব্র করেছিল। দ্বিতীয়ত, আসনসংখ্যার বিচারে লেবারের বিপুল জয় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শতাংশের বিচারে বিরাট কিছু নয়। ২০১৭ সালে করবিনের লেবার যা ভোট পেয়েছিল, এবার লেবার তার চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় মাত্র ২% ভোট বেড়েছে, কিন্তু আসন বেড়েছে অনেক। তৃতীয়ত, অতি দক্ষিণপন্থী রিফর্ম পার্টির সাফল্য এবারের নির্বাচনের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদিও তারা প্রধানত টোরিদের ভোট কেটেছে। বিরাট সংখ্যক রক্ষণশীল, দক্ষিণপন্থী ভোটার টোরিদের বিকল্প হিসাবে এই নতুন দলকে বেছে নিয়েছেন। এই ভোট কাটাকাটিতে সুবিধা হয়েছে লেবারের। চতুর্থত, করবিন সহ বেশ কিছু প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সংগঠকের জয় ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলন এই নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রায় কোনো অর্থনৈতিক, সাংগঠনিক ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও এই প্রার্থীরা জিতেছেন কেবলমাত্র গণআন্দোলনের শক্তিতে। পঞ্চমত, ভোট শতাংশের বিচারে খুব বেশি সাফল্য না পেলেও, আসনসংখ্যার বিচারে রীতিমত ভালো ফল করেছেন লিবারাল ডেমোক্র্যাটরা।

চোদ্দ বছরের ভয়াবহ টোরি জমানার অবসান নিঃসন্দেহে ব্রিটেনের রাজনীতির জন্য শুভ লক্ষণ। এত বড় বিপর্যয় টোরিদের ইতিহাসে নজিরবিহীন। পার্টির ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে সংসদে টোরিদের আসন মাত্র ১৮%। ঋষি সুনক সরকারের ১১ জন জন মন্ত্রী হেরে গেছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, ডেভিড ক্যামেরন, বরিস জনসন এবং থেরেসা মে যে আসনগুলিতে লড়তেন, সেগুলিতে টোরি প্রার্থীরা হেরে গিয়েছেন। ১৮৩২, ১৯০৬, ১৯৯৭ সালেও বিরাট বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল কনজারভেটিভ পার্টি। কিন্তু আসনসংখ্যার বিচারে এবারের পরাজয় সেগুলিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। ১৮৩৪ সালে পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রিটেনের সংসদে কনজারভেটিভ দলের এত কম প্রতিনিধিত্ব অতীতে কখনো দেখা যায়নি। রাতারাতি সাফ হয়ে গিয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ। ২৪৪ জনকে হারিয়ে সদস্য সংখ্যা নেমে এসেছে একেবারে ১২১-এ। সবমিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচনের ফলাফল টোরিদের গালে এক বিরাশি সিক্কা চড়।

যত না লেবারের প্রতি সমর্থনের ঝড়, তার চেয়েও বেশি করে টোরিদের বিপর্যয়ের পিছনে বিরাট ভূমিকা নিয়েছে চরম দক্ষিণপন্থী, বর্ণবৈষম্যবাদী রিফর্ম পার্টির উত্থান। প্রায় চার মিলিয়ন (১৬ শতাংশের বেশি) ভোট পেয়েছে তারা। এই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন কট্টরপন্থী দল রিফর্ম ইউকের প্রধান নাইজেল ফারাজ সহ পাঁচজন প্রার্থী। মারাত্মক তথ্য হল, ৯৮টি আসনে রিফর্ম পার্টি দ্বিতীয় স্থানে। আগামীদিনে এই দলটির মোকাবিলা করতে হবে ব্রিটেনের বামপন্থীদের। এবারে হয়ত তারা টোরিদের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিল, কিন্তু আদতে মধ্যপন্থী ব্রিটিশ রাজনীতিতে এমন অতি ডানপন্থী শক্তির সাফল্য ভীষণ উদ্বেগজনক।

ভোটের শতাংশের বিচারে না হলেও টোরিদের বিপর্যয়ের ফলে আসনসংখ্যার বিচারে লাভবান হয়েছে লেবার। হাউজ অফ কমন্সে স্টার্মারের লেবার পার্টির সাংসদের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ৪১২। নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার চেয়েও ৮৬টি আসন বেশি। ১৯৯৭ সালে টনি ব্লেয়ার যেমন গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন জন মেজরের টোরি পার্টিকে, এবারও যেন প্রায় তেমনই ফলাফল হয়েছে।

লেবারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যে তথ্যটিকে আড়াল করছে তা হল, তারা মাত্র ৩৩.৮% মানুষের সমর্থন পেয়েছে। সংসদের প্রায় ৬৫% আসন তাদের দখলে, কিন্তু শতাংশের বিচারে দেখলে দুই তৃতীয়াংশ মানুষ লেবারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ২০১৭ সালে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পেয়েছিল ৪০% ভোট। ২০১৯ সালেও করবিনের নেতৃত্বে লেবারের নির্বাচনী বিপর্যয় সত্ত্বেও প্রাপ্ত ভোট ছিল এবারের দুই শতাংশেরও কম, ৩২.২ শতাংশ। অর্থাৎ গতবারের চেয়ে মাত্র ১.৬ শতাংশ ভোট বাড়িয়েছে লেবার, কিন্তু পেয়েছে অতিরিক্ত ২১১টি আসন! চ্যানেল ফোরের রাজনৈতিক বিশ্লেষক গ্যারি গিবন চমৎকার বলেছেন, ‘এটি হল লাভলেস ল্যান্ডস্লাইড’। সংখ্যার বিচারে দেখলে পাঁচ বছর বছর আগে করবিনের লেবার পেয়েছিল ১০,২৬৯,০৫১ ভোট। এবার স্টার্মারের লেবার পেয়েছে ৯,৬৫০,২৫৪ ভোট। ২০১৭ সালে করবিনের লেবার পেয়েছিল প্রায় ১৩ মিলিয়ন ভোট। এবারের চেয়ে অনেক বেশি।

বহু তথ্য সামনে আসছে না৷ যেমন লেবার লিডার তথা নতুন প্রধানমন্ত্রী স্টার্মার তাঁর নিজের আসনে বিপুল সংখ্যক ভোট হারিয়েছেন। গতবারের ৩৬,৬৪১ থেকে ভোট কমে হয়েছে ১৮,৮৮৮। লোকবল নেই, অর্থবল নেই, মিডিয়ার প্রচার নেই, তা সত্ত্বেও হবু প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অসাধারণ লড়াই করেছেন প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সংগঠক, দক্ষিণ আফ্রিকার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রাক্তন নেতা, বামপন্থী অ্যান্ড্রু ফেইনস্টেইন। উনিশ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন তিনি। যে দলের বিজয় সুনিশ্চিত ছিল, যাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল কেবল সময়ের অপেক্ষা, তাঁর বিরুদ্ধে লড়ে অ্যান্ড্রুর এমন ফলাফলই বলে দেয় প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলন ব্রিটেনকে কতখানি প্রভাবিত করেছো। লেবারের শ্যাডো ক্যাবিনেটের হেলথ সেক্রেটারি, হেভিওয়েট প্রার্থী ওয়েস স্ট্রেটিং ইলফোর্ড নর্থে হারতে হারতে জিতেছেন। প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের কর্মী লেনি মোহাম্মদ মাত্র ৫০০ ভোটে হেরেছেন এই আসনে। এছাড়া কয়েকটি আসনে ঢাল তলেয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো লড়েও জিতে গিয়েছে প্যালেস্তাইনপন্থী প্রার্থীরা। চমকে দেওয়ার মত ফলাফল হয়েছে লেস্টার সাউথ কেন্দ্রে। লেবারের শ্যাডো ক্যাবিনেট মিনিস্টার জন অ্যাশওয়ার্থকে হারিয়ে দিয়েছেন প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের কর্মী শওকত অ্যাডাম। অ্যাডামকে সমর্থন করেছিলেন ইয়র্কশায়ার ক্রিকেটে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা আজিম রফিক। করবিন তো সমর্থন করেছিলেন বটেই। ভোটে জিতে অ্যাডাম বলেছেন, ‘এই জয় গাজার জন্য। লড়াই চলবে।’

আরো পড়ুন ইজরায়েলের গাজা আক্রমণ যুদ্ধ নয়, সুপরিকল্পিত গণহত্যা

লেবার সবচেয়ে বেশি ফায়দা তুলেছে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি)-র বিপুল বিপর্যয় থেকে। স্কটল্যান্ডে লেবারের ভোট বেড়েছে ১৭%, যেখানে এসএনপি পেয়েছে ১৫%। লেবারের কাছে এসএনপি হারিয়েছে প্রায় ৪০ আসন। এসএনপির আসন সংখ্যা ৪৮ থেকে কমে হয়েছে নয়। স্কটল্যান্ডে এই বিপুল সাফল্য না পেলে লেবারের ফলাফল অন্যরকম হত। বারো শতাংশ ভোট পেয়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা ১১ থেকে ছ গুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৭১। গ্রিনদের আসন সংখ্যা এক থেকে বেড়ে হয়েছে চার। লিব ডেম এবং গ্রিনদের এই সাফল্যেরও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিরাট।

করবিন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইটায় জিতেছেন। গত দুটি নির্বাচনে তিনি ছিলেন লেবারের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। প্যালেস্তাইনের পক্ষে সোচ্চার অবস্থান নেওয়ায় তাঁকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছে। কিছুটা আপস করলেই করবিন থেকে যেতে পারতেন লেবারে, হয়ত প্রধানমন্ত্রীও হতেন এবার। না হলে কোনো জোরালো মন্ত্রকের দায়িত্ব তো পেতেনই। অন্তত জেতা নিয়ে কোনো সংশয় থাকত না। কিন্তু করবিন আপস করেননি। নিজের পুরনো দলের বিরুদ্ধে লড়ে জিতেছেন। জেতার পর করবিন বলেছেন, গাজার পক্ষে তাঁর লড়াই চলবে। হাউস অফ কমন্সের ভিতরে ও বাইরে তিনি কথা বলবেন বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই করবিনের জয়।

গ্রিন প্রার্থী কার্লা ডেনেয়ার দশ হাজারেরও বেশি ভেটে লেবারের শ্যাডো ক্যাবিনেট মিনিস্টার থাঙ্গাম ডেবোনেয়ারকে ব্রিস্টল সেন্ট্রালে হারিয়ে দিয়েছেন। কার্লাও প্যালেস্তাইনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। লেবার লিডার স্টার্মার যখন পরোক্ষে গাজায় গণহত্যার পক্ষে কথা বলেছিলেন, কার্লা তার বিরোধিতা করেছিলেন। ডেসবুরি অ্যান্ড ব্যাটলে কেন্দ্রেও প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সংগঠক ইকবাল মোহাম্মদ লেবার প্রার্থীকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জিতেছেন৷ ব্ল্যাকবার্ন থেকে জিতেছেন নির্দল প্রার্থী আদনান হুসেন। যদিও ওয়ার্কাস পার্টির নেতা জর্জ গ্যালোওয়ে কয়েকমাস আগে জেতা নিজের কেন্দ্র রচডেলে লেবার প্রার্থীর কাছে হেরে গিয়েছেন। দুর্দান্ত ফল করেছেন বার্মিংহামের পেরি বার কেন্দ্রের নির্দল প্রার্থী আয়ুব খান। তিনি খালিদ মাহমুদকে হারিয়েছেন, যিনি টনি ব্লেয়ারের আমলে ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। বেশ কিছু নির্দল প্রার্থী প্রচুর ভোট পেয়েও শেষ পর্যন্ত জিততে পারেননি। লেবারের মধ্যে থেকে যে বামপন্থীরা লড়ছেন, সেই সোস্যালিস্ট ক্যাম্পেন গ্রুপেরও অনেকে জিতেছেন। প্যালেস্তাইন আন্দোলনের অন্যতম সহায়ক জন ম্যাকডনেল জিতেছেন৷ জিতেছেন জারা সুলতানার মত দুর্দান্ত যুব সংগঠক। রিচার্ড বারগন জিতেছেন। আশা করা যায় লেবারের অন্দরে তাঁরা লড়াই জারি রাখবেন।

সবমিলিয়ে প্রত্যাশিত ফল। ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টি জানিয়েছে, তারা ক্ষমতার এই হাতবদলে খুব তাৎপর্যপূর্ণ কিছু দেখছে না। তাদের মতে, এই ‘পরিবর্তন’ হবে শুধু পুঁজিবাদ ও শাসকশ্রেণির সম্পদ রক্ষায় ‘প্রহরীর’ পরিবর্তন। সেকারণে স্টার্মারের জয় কোনো শ্রমিকশ্রেণির জন্য অর্থপূর্ণ জয় হতে পারে না। সোস্যালিস্ট ওয়ার্কাস পার্টির অভিমতও একইরকম। তাদের বক্তব্য, টোরিদের বিদায় নিঃসন্দেহে উদযাপনযোগ্য। কিন্তু স্টার্মারের দক্ষিণপন্থী লেবারের কাছে কোনও প্রত্যাশা রাখা অর্থহীন। প্রয়োজন রাজপথের লড়াইয়ের মাধ্যমে বিকল্প গড়ে তোলা। ব্যয়সঙ্কোচ, বেসরকারিকরণ, অভিবাসন, প্যালেস্তাইন, ইউক্রেন এবং ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবাজ নীতির মতো বিষয়গুলিতে টোরি সরকারের ধারাবাহিকতাই যে বজায় রাখবে স্টার্মারের দক্ষিণপন্থী লেবার সরকার, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।

নতুন লেবার সরকার দুদিক থেকে চাপের মুখে পড়বে। উগ্র দক্ষিণপন্থী চাপ এবং বামপন্থী চাপ। রিফর্ম পার্টির দুর্দান্ত ফলাফল অতি দক্ষিণপন্থীদের উৎসাহিত করেছে। অভিবাসন সহ বিভিন্ন বিষয়ে স্টার্মারের সরকার যাতে টোরিদের চেয়েও প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান নেয়, সে জন্য চাপ দেবেন তাঁরা। অন্যদিকে প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে ভোটে জিতে আসা প্যালেস্তাইন সংহতি আন্দোলনের সংগঠকরা, লেবারের মধ্যে থাকা সোশালিস্ট ক্যাম্পেন গ্রুপের সাংসদরা এবং করবিন চেষ্টা করবেন নতুন লেবার সরকারকে প্রগতিশীল অবস্থান নেওয়াতে। বিলেতের রাজনীতির আগামী দিনগুলি রীতিমত চিত্তাকর্ষক হতে চলেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.