না, খেলা হয়নি। কথা ছিল তুমুল খেলা হবে, কেউ কেউ সুনীল ছেত্রীর মত গোল করবেন, কারুর বা ব্যাটের ঝলকানিতে দেখা যাবে বিরাট কোহলির প্রতিভা। শেষ অবধি যা দাঁড়াল, তাতে দেখা গেল খেলা হল একেবারেই ম্রিয়মান ভঙ্গিতে, ছেত্রী কিংবা কোহলির পড়তি ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বলা যেতে পারে। গোয়া বিধানসভার ৪০টি আসনের মধ্যে ২৬টিতে লড়াই করে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাগ্যে একটি আসনও জোটেনি। অবধারিতভাবে তৃণমূল বিরোধীদের মুখে হাসি আর ধরে না। কেমন জব্দ….হা হা, হি হি!

গোয়ার রাজনৈতিক মহলের খবর, এই “ভরাডুবি”-র জন্য তৃণমূল সমর্থকরা মূলত দায়ী করছেন আইপ্যাক প্রধান প্রশান্ত কিশোরকে। তাঁদের দাবি, মুখে প্রবল নির্লিপ্ত ভাব দেখালেও, কার্যত পিছন থেকে যাবতীয় কলকাঠি নেড়েছেন তিনিই, প্রার্থী নির্বাচনে তাঁর কথাই গুরুত্ব পেয়েছে, ভাল ভাল প্রার্থীদের সরিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের আসরে নামিয়েছেন তিনিই। নিট ফল শূন্য। অর্থাৎ, এই পরাজয়ের দায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নয়, দায়ী প্রশান্ত কিশোর। তাঁরা আঙুল তুলে বলছেন, সালিগাও কেন্দ্রে জবরদস্ত লড়াই দিতে তৈরি হচ্ছিলেন জাতিশ নায়েক। তাঁকে শেষ মুহূর্তে সরিয়ে দিয়ে ভোলানাথ ঘাটিকে কেন আনলেন প্রশান্ত? মাত্র ৩৪৪টি ভোট পেয়েছেন ভোলানাথ।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভেলিম কেন্দ্র নিয়েও তৃণমূল সমর্থকদের ক্ষোভ তুঙ্গে। প্রাথমিকভাবে কথা ছিল এই কেন্দ্রে লড়বেন অ্যান্টোনিও ক্লভিস ডা কস্টা। মনে করা হচ্ছে তিনি বেশ ভালো জায়গায় ছিলেন। তাঁকেও হঠাৎই সরিয়ে দেওয়া হল, আনা হল বেঞ্জামিন সিলভাকে, যিনি শেষ অবধি পেলেন তৃতীয় স্থান। শতকরা আশি ভাগ কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে, গণনা অনুযায়ী তাঁরা শেষ করেছেন চতুর্থ থেকে সপ্তম স্থানে। বহু কেন্দ্রে নোটা ভোটারদের সংখ্যা তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোটকে ছাপিয়ে গেছে। সারা রাজ্য জুড়ে তৃণমূল ভোট পেয়েছে পঞ্চাশ হাজারের কম, দলের রাজ্য সভাপতি কিরণ খন্দকার জামানত হারিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। আইপ্যাকের বিরুদ্ধে তিনিও সোচ্চার।

কিন্তু সত্যি কি তাই? খেলা কি তবে আদৌ হয়নি? গোয়ায় অনেকেই কিন্তু বলছেন, যে যা-ই বলুক, বেশ ভাল খেলা হয়েছে, এই খেলায় চমৎকার প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এ সেই লিগের খেলার মত, যেখানে দুই দলের পয়েন্ট ভাগাভাগিতে ট্রফি জিতে নেয় কোনো তৃতীয় দল, শেষ মুহূর্ত অবধি লড়াইয়ে থেকেও ফাঁকি পড়ে চতুর্থ দলটি। এক্ষেত্রে ট্রফি ঘরে তুলেছে বিজেপি; রানার্স আপ হয়েই তুষ্ট থাকতে হয়েছে কংগ্রেসকে।

এটা কিন্তু কথার কথা নয় — ভোটের অঙ্কের বিচারে তেমনটাই মনে করা হচ্ছে। গোয়ায় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন অন্তত তিন থেকে চারটি কেন্দ্রে কংগ্রেসের পরাজয়ের পথ প্রশস্ত করেছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। মনে রাখতে হবে, গোয়ায় আসনসংখ্যা মাত্র ৪০। সুতরাং তিন কি চারটি কেন্দ্রে ভোট পক্ষে অথবা বিপক্ষে গেলে সরকার গড়ার ক্ষেত্রে এসপার ওসপার করে ফেলতে পারে যে কোনো রাজনৈতিক দলই।

পাশাপাশি আর একটা কথাও মনে রাখা প্রয়োজন। গোয়ার নির্বাচন কেন্দ্রগুলি প্রত্যেকটিই এত ক্ষুদ্র এবং ভোটার সংখ্যা এতই কম, যে বহুক্ষেত্রে সামান্য কয়েকশো ভোটের ব্যবধানে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের ফল সবচাইতে বেশি হতাশাজনক হয়েছে গোয়ার সালসেট অঞ্চলে, কদিন আগেও যেখানে তারাই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী দল। এই অঞ্চলে ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাঁদের ভোট এতদিন সাধারণভাবে কংগ্রেসের বাক্সেই জমা পড়েছে। এবার কিন্তু দেখা গেছে সম্পূর্ণ অন্য ছবি। ধরা যাক নভেলিম কেন্দ্রের কথাই। এই কেন্দ্রে ইতিপূর্বে বিজেপি কোনোদিন জয়ের মুখ দেখেনি, কিন্তু এবার জিতেছেন তাঁদের প্রার্থী উল্লাস টুয়েনকর। এখানে কংগ্রেসের প্রার্থীর বিরাট ভোট কেটে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন তৃণমূলের ভালানকা আলেমাও। তিনি নিজে জিততে না পারলেও বিজেপি প্রার্থীর কান ঘেঁসে ৫৩০ ভোটে জয়ের রাস্তা অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

তবে একথা মোটেই বলা উচিত নয় যে শুধু বিজেপিই সুবিধা পেয়েছে। এই অঞ্চলের আরও দুটি কেন্দ্রে মোটামুটি ভাল ভোট পেয়েছে তৃণমূল, জয়মাল্য কিন্তু উঠেছে আম আদমি পার্টির গলায়। পথপার্শ্বে পড়ে থেকেছে কংগ্রেস, কমেছে তাদের আসনসংখ্যা, অবশ্যই লাভবান হয়েছে বিজেপি।

টিভিম কেন্দ্রের দিকে তাকালেও বেশ অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ছে। ২০১৭ সালে মাত্র সাড়ে সাতশো ভোটের ব্যবধানে এই কেন্দ্র বিজেপির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন নীলকান্ত হারালনকার। কদিন বাদেই তিনি জামা বদলে হয়ে যান বিজেপি। এবারেও তিনিই জিতেছেন, কিন্তু দু হাজারের বেশি ভোটে। তৃণমূল প্রার্থী প্রায় সাড়ে সাত হাজার ভোট নিয়ে পিছনে ঠেলে দিয়েছেন কংগ্রেস প্রার্থীকে।

এখানে একটা কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। যাঁরা বলছেন তৃণমূল প্রকৃত অর্থে গোয়ায় বিজেপির সুবিধার জন্য ভোটে লড়েছে, তাঁরা মোটেই সঠিক কথা বলছেন না। বিজেপির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে কংগ্রেসকে জিতিয়ে আনবার মহান দায়িত্ব তৃণমূলের নয়, অন্যের সুবিধার্থে কেউ পৃথক রাজনৈতিক দল খুলে বসে না। কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম অভিযোগ করেছেন, গোয়ায় বহু ছোট দল বিরোধী ভোট ভাগ করে দিয়েছে। তাঁকে প্রশ্ন করা উচিত, বিজেপিকে পরাজিত করতে কি কংগ্রেসকে জেতানো জরুরি?

তবে তৃণমূলকে বিন্দুমাত্র দোষারোপ না করেও একটি কথা বলা যায়। অনেক তৃণমূল সমর্থক আছেন, যাঁরা দুরকম নিয়মে বিশ্বাস করেন; তৃণমূলের পক্ষে এক ধরনের নিয়ম, বিপক্ষে অন্যরকম।

ধরুন আপনি পশ্চিমবঙ্গে আলাদা দল গড়লেন এবং বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে শুরু করলেন। এতে কিন্তু তৃণমূল সমর্থকরা গোঁসা করবেন। কারণ তখন আপনার একমাত্র কর্তব্য সম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে তৃণমূল নেত্রীর হাত শক্ত করা।

এই নিয়ম কিন্তু ত্রিপুরার ক্ষেত্রে খাটে না। সেখানে আপনি যদি বলেন তৃণমূল মূলত বিরোধী ভোট ভাগ করে দেবার খেলায় মেতেছে, তাহলে তা হবে চরম অন্যায়। কারণ পশ্চিমবঙ্গে যে সুশাসন চলছে, তার সুফল ভোগ করার অধিকার কি ত্রিপুরার মানুষের নেই?

একদম ঠিক কথা। তাই তো গোয়া নির্বাচনে হাত মেলানো হল মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক দলের সঙ্গে, যাদের বিরুদ্ধে স্পষ্টতই সাম্প্রদায়িকতার ভুরি ভুরি অভিযোগ। চোদ্দটি আসন ছেড়ে রাখা হল তাদের জন্যে, নির্বাচনের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তারা যোগ দিল এনডিএ জোটে।

সেই কবে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “মাথার ওপর খাটানো নীল বিনি পয়সার তাঁবু / নীচে সবুজ গালচে পাতা, খেলা দেখে যান বাবু!”

(এই লেখার শিরোনামের একটি অংশ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি গল্পের নাম থেকে সরাসরি চুরি। এই অপরাধের জন্য লেখক ক্ষমাপ্রার্থী)

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

ব্যক্তিতান্ত্রিক দলে উত্তরাধিকারের লড়াই ও তৃণমূল

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.