উত্তরপ্রদেশের ভোটের ফলাফল এক দিকে যেমন কিছু মানুষকে চূড়ান্ত বিস্মিত করেছে, অনেকের আবার একেবারেই বিস্ময়কর লাগেনি। বিস্মিত তাঁরাই, যাঁরা আশা করেছিলেন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ওই রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী পার্টি বিজেপিকে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তাঁদের হিসেবে বিজেপির ভোট কমার কারণ ছিল অনেক। গত পাঁচ বছরে নোটবন্দী, জিএসটি এবং তারপর দীর্ঘ অতিমারীর সময়ে লকডাউনে মাঝারি ও ছোট শিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া, উত্তরপ্রদেশের মুসলিমদের সামাজিক সুরক্ষা কমে যাওয়া — এসব তো ছিলই, তার সাথে অতিমারীর সেই শুরুর দিনগুলোতে হাজারে হাজারে মানুষকে পায়ে হেঁটে ফিরতে হয়েছে নিজেদের গ্রামে। চাকরি নেই, খাবার নেই, রাস্তায় মানুষ মরেছে, হাসপাতালে বেড নেই, বেড আছে তো অক্সিজেন নেই, আবার সেকথা বলারও উপায় নেই, বললেই যোগী সরকারের পুলিশ সেই হাসপাতালের নামে মামলা ঠুকে দিয়েছে। অতিমারীর প্রকোপ সরকারি মন্ত্রালয়ের যুগ্ম সচিব আর রাস্তার ধারে সবজি বেচা ‘রেড়িওলা’-র মধ্যে সমস্ত পার্থক্য দূর করে দিয়েছে। অক্সিজেনের নামে নির্লজ্জ কালোবাজারী চলেছে, সম্পন্ন লোকে লাখ টাকা দিয়ে খালি সিলিন্ডার পেয়েছে, একটু চিকিৎসার অভাবে, একটা বেডের অভাবে চোখের সামনে প্রিয়জনকে তিলে তিলে মরতে দেখেছে, নদী, নদী, নদীর চর ভরে গেছে সৎকার না হওয়া লাশে। গাজিয়াবাদের শ্মশানে জায়গা নেই, লোকে ফুটপাথে করোনায় মৃত শবে আগুন দিয়েছে লাইন দিয়ে।

ফলাফলে দেখা গেল, সবকিছুই ভুলিয়ে দেওয়া গেছে। যোগী সরকারের তরফ থেকে ‘ক্ষতিপূরণ’ দিয়ে। প্রিয়জনকে হারানোর শোক সরকার কিনে নিয়েছে মাত্র কয়েক হাজার টাকায়, টাকা সরাসরি পৌঁছে গেছে জীবিত নিকটজনের কাছে। দীর্ঘ লকডাউনের দিনগুলোতে সরকার নিম্নবিত্ত মানুষজনের কাছে বিনামূল্যে রেশন পৌঁছে দিয়েছে যেভাবেই হোক। বুনিয়াদি অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনের অধিকার দিতে পারেনি, কেবল চাল ডাল আনাজ প্রতি সপ্তাহে দুবার পৌঁছে দিয়ে সরকার জানান দিয়েছে তারা কত জনদরদী।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দীর্ঘ এক বছর কৃষক আন্দোলন চলেছে। দিল্লির সীমান্তে বসে থাকা হাজার হাজার কৃষকের অনমনীয় জেদের কাছে হার মেনেই কৃষি আইনকে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে অনেকেই ভেবেছিলেন, বিজেপির আনা আইন যদি আন্দোলন করে বাতিল করা যায়, তাহলে বিজেপিকে বাতিল করা তেমন কঠিন কিছু নয়।

আশাবাদীরা উত্তর ভারতকে চেনেননি।

উত্তরপ্রদেশ হল উত্তর ভারতের আয়না। এই বিস্তীর্ণ গাঙ্গেয়-যমুনা উপত্যকার বৈশিষ্ট্যই হল, এখানকার মানুষ অতিমাত্রায় ধর্মবিশ্বাসী, দৈবে বিশ্বাসী। সামন্ততন্ত্রে বিশ্বাসী, ভেদাভেদে বিশ্বাসী। এরা যখন সরকার শব্দটা উচ্চারণ করে, তার সাথে দুটো শব্দ অনুচ্চারিত রয়ে যায় – মাই-বাপ। সংখ্যাগুরু হিন্দুর কাছে এই সরকার তাদের ধর্মের অভিভাবক, আর সংখ্যালঘুর কাছে সরকার তাদের অস্তিত্বরক্ষার একমাত্র আশা, শুধুই ক্ষতিপূরণ বা ফ্রি রেশন দেবার মাই-বাপ নয়। সরকারকে এখানকার মানুষ সত্যিই মাই-বাপ বলে মনে করে। আর হাজার অনর্থ ঘটে গেলেও এরা আঙুল তোলে ওপরের দিকে। “নসিব। মোদীজী কেয়া করতে? যোগীজি কেয়া করতে? ভগওয়ান নে বচায়া, ভগওয়ান নে হি মারা।”

যাঁরা ভেবেছিলেন লাগাতার কৃষক আন্দোলনের চাপে সরকার পিছু হঠেছে, কালা আইন বাতিল করেছে শেষমেশ, তাঁরা পুরোটা ঠিক ভাবেননি। তবে সরকার চাপে ছিল ঠিকই। উত্তরপ্রদেশের জনবিন্যাসে চোখ রাখলে দেখা যাবে দিল্লির উত্তরপ্রদেশ সীমান্ত গাজিপুরে এই কৃষক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল মূলত পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের চার-পাঁচটা জেলার লোকেরা। তার মধ্যে গাজিয়াবাদ বা গৌতম বুদ্ধ নগর (নয়ডা) ছিল না। কারণ এগুলো শহুরে জেলা, দিল্লি সংলগ্ন। কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষ এখানে কম। তাই গাজিপুর সীমান্ত ভৌগোলিকভাবে গাজিয়াবাদ জেলায় হলেও, গাজিয়াবাদে এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েনি একেবারেই। বরং সেখানে কৃষকদের লাগাতার ধর্না নিয়ে ধীরে ধীরে অসন্তোষ জন্মেছে শহুরে মানুষের মনে। তাঁরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন থেকেছেন এই আন্দোলন থেকে। শহুরে জেলাগুলো বাদ দিলে যেখানে কৃষকদের বিরোধ ছিল চরম, সেইসব এলাকাগুলোতে বিজেপি সত্যিই ভালো ফল করেনি। হেরেছে, বা খুব অল্প ব্যবধানে জিতেছে।

কৃষক আন্দোলন এবং অতিমারী সংক্রান্ত অব্যবস্থার সুবাদে যাঁরা ভাবতে বসেছিলেন উত্তরপ্রদেশে এবার সরকার বদলানোর আশা আছে, তাঁরা একদিকে উত্তরপ্রদেশের মানুষের মানসিকতা বোঝেননি, অন্যদিকে এই আন্দোলন সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গী ছিল নিতান্ত রোম্যান্টিক।

না, ভোটের ঠিক আড়াই মাস আগে কেন্দ্রীয় সরকার কারোর ভয়ে কৃষি আইন বাতিল করে দেবার ঘোষণা করেনি। ওটা ছিল হিসেব কষে নেওয়া ঝুঁকি। সিদ্ধান্তের দিক থেকে, সময়ের দিক থেকেও। পাখির চোখ ছিল উত্তরপ্রদেশ আর পাঞ্জাবের বিধানসভা ভোট। তার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ হল হিন্দুত্বের গবেষণাগার। সেই গবেষণাগারে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা ওড়ানোর জন্য এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ ছিল এই আন্দোলনকে আপাতত থামিয়ে দেওয়া। সরকারও জানত, কৃষকদের, এবং তাদের মাধ্যমে মানুষের ক্ষোভ মূলত সরকারের বিরুদ্ধেই, হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে নয়। উত্তরপ্রদেশের গাঙ্গেয় সমভূমির মানুষ হিন্দুত্ব বিক্রেতাকে খালি হাতে ফেরায় না। সেই জন্যই ভোট চাইতে এসে এখানে বিরোধী দলের নেতানেত্রীদেরও মন্দিরে গিয়ে পুজো দিতে হয়, ধর্মীয় প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়।

সে প্রসঙ্গ অন্য। কৃষক আন্দোলন এবারের ভোটে বিজেপির বিরুদ্ধে যে হাওয়া তুলতে পারেনি, তার কারণ ওটাই। সংযুক্ত কিসান মোর্চার বিরোধিতার সুর ছিল এক তারে বাঁধা — কৃষি আইনগুলোর বিলোপ। একটাই অ্যাজেন্ডা। সেই অ্যাজেন্ডা শেষ করে দিলে বিরোধিতার আর কোনো বিষয় থাকে না।

তাই হয়েছে। আইন বাতিলের সাথে সাথে সমস্ত ধর্না উঠে গেছে, রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এমনকি সরকারের জনবিরোধী আইনের জন্য বিক্ষুব্ধ কৃষক সম্প্রদায়ের এক অংশ এরপর সরকারের প্রতি আবার কৃতজ্ঞও হয়ে পড়েছে, কারণ সরকার তাদের কথা শুনেছে। বিক্ষোভ বাষ্পীভূত হয়ে গেছে। তারপর সরকারের যে মূর্তি পড়ে থাকে জনসাধারণের সামনে, তা এটুকুই – সংখ্যাগুরুর ধর্মের রাখওয়ালা। যারা অযোধ্যায় রামমন্দির বানাচ্ছে এবং দরকারমত “মোল্লাদের” টাইট দিচ্ছে।

সরকার ঠিক এই হিসেবটাই করেছিল। বিরোধিতার আর কোনো বিষয় ছিল না। রোজগারের অভাব, সামাজিক সুরক্ষার অভাব উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনী ইস্যু হয় না সাধারণত। সবার উপরে কাজ করে ধর্ম, জাত, সংস্কার, পরম্পরা, ভেদাভেদ।

‘না’-বাচক আন্দোলনের পরিণতি এরকমই হয়। নির্বাচনের ফলাফল থেকে উঠে আসা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি প্রচুর মহিলা ভোট পেয়েছে, কারণ মহিলারা মনে করেছেন যোগীর সরকারে তাঁরা সামাজিক সুরক্ষা বেশি পেয়েছেন। বিজেপি দলিতদের ভোটও পেয়েছে। এই পাঁচ বছরে দলিতদের বিরুদ্ধে একাধিক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে, তবু তাঁরা হিন্দুত্বেই আস্থা রেখেছেন। আসাদুদ্দিন ওয়েইসি বিভিন্ন বিধানসভা ক্ষেত্রে এবারেও অন্যদের ভোট কেটে বিজেপিকে জিততে সাহায্য করেছেন। দলিতদের পার্টি নিষাদ দল শুরু থেকেই বিজেপির সঙ্গে ছিল।

মোদ্দা কথা, হিন্দুত্বের গবেষণাগারে পরীক্ষা সফল। ধর্মের থেকেও বড় কোনো ইস্যু সামনে না আসা পর্যন্ত অন্যরকম ভেবে লাভ নেই।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.