ভারতরত্ন পুরস্কার পেয়েছেন অমর্ত্য সেন, শচীন তেন্ডুলকর, সত্যজিৎ রায়, রবিশঙ্কর, লতা মঙ্গেশকর মৌলানা আজাদ বা জয়প্রকাশ নারায়ণ। এমন আরও বহু নাম করা যায়, যাঁদের সামনে আমরা মাথা নোয়াই। কিন্তু প্রাপক যদি পুরুষোত্তমদাস ট্যান্ডন হন, বিতর্ক হবে। ১৯৬১ সালের ভারতরত্ন ট্যান্ডন। এই কংগ্রেস নেতা ১৯৫০ সালে পাঞ্জাব থেকে আসা উদ্বাস্তুদের বলেছিলেন – বদলা নিতে হবে। ট্যান্ডনকে তাঁর সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিলেন জওহরলাল নেহরু। বা ধরা যাক মোরারজি দেশাই, যিনি মূত্রপানে উৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন দেশবাসীকে। তিনিও ভারতরত্ন পেয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। এবছর পেলেন লালকৃষ্ণ আদবানি। এমন বহু নাম করা যায় যাদের ভারতরত্ন, অর্থাৎ দেশের সর্বোচ্চ সম্মান, পাওয়া নানা প্রশ্ন জাগায় মনে। সেই বিতর্কিত নামের তালিকায় আরেকটি নাম জুড়ল, যিনি এলকে আদবানি নামেই বেশি পরিচিত।
রাজনীতির লোকজনেরা সব মানুষকে দেখেন হয় মিত্র নয় শত্রু হিসাবে। সাংবাদিকের দৃষ্টিভঙ্গী তেমন হওয়া কাম্য নয়। আমরা বরং খোলা মনে একবার দেখে নিই কেন আদবানি একটি বিতর্কিত নাম।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রথম কারণ জৈন হাওয়ালা কেলেঙ্কারির সঙ্গে জুড়ে আছে এই বিজেপি নেতার নাম। এই কেলেঙ্কারির শুরুটা দেশের নবম প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের আমলের শেষদিকে। যদিও তার আঁচ প্রবলভাবে এসে পড়েছিল নরসিমা রাও মন্ত্রিসভার উপর। সিবিআইয়ের ভূমিকাও এই ব্যাপারে খুবই ঝাপসা।
ঘটনাটি যখন ঘটেছিল, তখন চন্দ্রশেখর ৪০ জন সাংসদ নিয়ে, কংগ্রেসের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী। ব্যাপারটা এরকম – ১৯৯১ সালের মে মাসে লন্ডন থেকে হাওয়ালার মাধ্যমে আসা ১৬ লক্ষের কিছু বেশি টাকা জম্মু-কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদীদের পাঠাতে গিয়ে দিল্লিতে ধরা পড়লেন দুজন। সেই সূত্র ধরে খোঁজ করতে গিয়ে দিল্লিতে জেকে জৈন নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে হানা দিয়ে সিবিআইয়ের হাতে এল ৫৮ লক্ষ টাকা এবং দুটি ডায়েরি। এই জেকে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুরেন্দ্র জৈনের কর্মচারী। গোয়েন্দারা জানতে পারলেন যে হাওয়ালার মাধ্যমে লন্ডন থেকে ভারতে সন্ত্রাসবাদীদের অর্থ জোগাচ্ছেন ডঃ মহম্মদ আয়ুব ঠাকুর নামে কেউ একজন, আর ওই টাকা নানা কৌশলে পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। এই কাজে আরও কয়েকজনের সঙ্গে জৈনরাও যুক্ত। জৈনদের ডায়রিতে পাওয়া গেল অসংখ্য নাম, যেগুলো লেখা আদ্যক্ষর দিয়ে। তবে বোঝা যাচ্ছে কোন নামটি কার। প্রতিটি নামের পাশে লেখা টাকার অঙ্ক। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হাওয়ালা:ব্যাড মানি, ব্যাড পলিটিক্স, দ্য আনটোল্ড হাওয়ালা স্টোরি-র লেখক সাংবাদিক সঞ্জয় কাপুর তিহার জেলে আটক সুরেন্দ্র জৈনের স্বীকারোক্তি উল্লেখ করে ওই আদ্যক্ষরের পিছনের আসল নামগুলি প্রকাশ করেছিলেন তাঁর বইয়ে। তারপর বহুবছর কেটে গিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রীও তা নিয়ে মানহানির মামলা করেননি। সঞ্জয়ের বইয়ে প্রকাশিত ওই তালিকায় একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, দুজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, একজন প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী, নরসিমা মন্ত্রিসভার বেশ কয়েক জন মন্ত্রী, আমলা এবং কয়েকজন সাংসদের নাম আছে। মোট ১১৫ জনের নামের পাশে যে অর্থের পরিমাণ লেখা ছিল, তা যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৫ কোটি টাকা। ওই অঙ্কটা সেইসময় অনেক। একমাত্র বামপন্থী কোনো নেতার নাম ওই ডায়রিতে ছিল না। অন্য প্রায় সব বড় দলেরই কোনো না কোনো নেতার নাম ছিল।
আদ্যক্ষরে যেসব নাম লেখা ছিল সেগুলি এইরকম – এলকেএ, এবি, বিএস, এএন, এনএস, এমএস, কেএন ইত্যাদি। এঁরা কারা, তাও স্পষ্ট করে লেখা আছে ১৯৯৬ সালে অলকা পেপারব্যাকস প্রকাশিত সঞ্জয়ের বইয়ে। জৈন ষড়যন্ত্র করে ওই সব নাম ডায়রিতে লিখে রেখেছিলেন, নাকি ওইসব তথ্য সত্যি তা একমাত্র তদন্ত হলেই বোঝা যেত। সেই তদন্ত কিন্তু হয়নি। সুরেন্দ্র সহ ৫-৬ জনের টাডা আইনে জেল হয়েছিল। নেতাদের দিকে তদন্ত এগোয়নি।
সিবিআইয়ের প্রাক্তন জয়েন্ট ডিরেক্টর শান্তনু সেন তাঁর সিবিআই ইনসাইডার স্পিকস নামের বইয়ে লিখেছেন, ওই তালিকায় আদ্যক্ষরে যাদের নাম ছিল তাদের মধ্যে মাত্র একজন, বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি, ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেছিলেন ‘এলকেএ’ হলেন এল কে আদবানি এবং ওই নামের পাশে যে টাকার পরিমাণ লেখা আছে সেই টাকা তিনি নিয়েছিলেন। বিজেপি নেতা, আইনজীবী অরুণ জেটলি তখন বলেছিলেন, যখন ‘এলকেএ’ বা লালকৃষ্ণ আদবানি ওই টাকা নিয়েছিলেন তখন তিনি ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ ছিলেন না, কারণ তিনি তখন সাংসদ ছিলেন না। এমনকি ওই অর্থ তিনি নিজে নেননি, বিজেপির পার্টি তহবিলে দান করেছিলেন। জেটলি বলেছিলেন, দান যে করেছিলেন, বিজেপির দলীয় তহবিলে ওই টাকার নথিভুক্তি দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। ফলে আদালতও আদবানির বিরুদ্ধে এই অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি। এই প্রসঙ্গে শান্তনু তাঁর বইয়ে একটি প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি লিখেছেন, আর্থিক বিষয়ে আদবানির সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু বিদেশ থেকে ওই টাকা এসেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে নয়, বেআইনি পথে। তাছাড়া ওই টাকা পাঠানো হয়েছিল কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদীদের ভারতবিরোধী কাজে মদত দেওয়ার জন্য। সেই টাকা কী করে নেতারা গ্রহণ করলেন তার তদন্ত কিন্তু হয়নি। কারণ কোনো দলই বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি হোক চাইছিল না। সিবিআইয়ের প্রাক্তন কর্তা শান্তনুর লেখায় স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে, সত্য প্রমাণে সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগে ইচ্ছাকৃত ঘাটতি ছিল।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর, ঘরে বাইরে প্রবল চাপে পড়ে, প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী কী করে মসজিদ ধ্বংস হল, কারা দায়ী তা খুঁজে বের করতে বিচারপতি এমএস লিবেরহানের নেতৃত্বে যে এক সদস্যের বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছিলেন, সেই কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এই ঘটনা মোটেই স্বতস্ফূর্ত ছিল না, ছিল “result of great painstaking preparation and pre-planning”। সংঘ পরিবার, বিশেষ করে আরএসএস, অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে এই গোটা অভিযান – এমন মন্তব্যও বিচারপতি করেছেন তাঁর রিপোর্টে। রিপোর্টের উপসংহারে খুবই কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষায় “These leaders have violated the trust of the people and have allowed their actions to be dictated not by the voters but by a small group of individuals who have used them to implement agendas unsanctioned by the will of the common persons. There can be no greater betrayal or crime in a democracy and the commission has no hesitation in condemning these pseudo-moderates for their sins of omission.” সকলেরই জানা আছে, এই রামমন্দির আন্দোলনের শীর্ষে ছিলেন আদবানি। ঘটনার দিন অযোধ্যায় উপস্থিতও ছিলেন তিনি। যদিও একথা ঠিক, নরেন্দ্র মোদীর আমলে ২০২০ সালে স্পেশাল সিবিআই কোর্ট আদবানি সমেত বিজেপি এবং সংঘ পরিবারের সব নেতা নেত্রীকে মসজিদ ভাঙার অপরাধ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে। শীর্ষ আদালতও মন্দির ভাঙার ঘটনাকে অপরাধ বললেও, এ কাজের জন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। কিন্তু বিতর্ক থেকে গেল, বিশেষ করে আদবানির ভূমিকা নিয়ে।
আরো পড়ুন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন বুঝেছিলাম, আমি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক
পলিটিসাইজেশন অফ হিন্দু রিলিজিয়ন ইন পোস্ট মডার্ন ইন্ডিয়া বইয়ে জে কুরুভাচিরা লিখছেন, ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরে রামমন্দিরের সমর্থনে যে পথে আদবানির ‘সোমনাথ মন্দির থেকে অযোধ্যা’-র রথ গিয়েছিল, সেইসময় ওই পথে দেশের ২৬টি জায়গায় হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। ভারতরত্ন পাওয়ার পরও আদবানিকে নিয়ে এই তথ্য ইতিহাসে থেকে যাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা উপপ্রধানমন্ত্রী হিসাবে আদবানি যে বিরাট কোনো দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন – এমন দাবি বিজেপিও করে না। তবে ভয়ানক অশান্ত ত্রিপুরায় শান্তি ফেরাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন তিনি। একথা মানিক ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের কাছে একাধিকবার বলেছেন। ১৯৭৭ সালে আদবানি যখন সম্প্রচার মন্ত্রী, তখন তিনিই প্রথম রেডিও-দূরদর্শনে বিরোধী দলের নেতাদেরও নির্বাচনের আগে দলের হয়ে কথা বলার নিয়ম চালু করেছিলেন। তার আগে এই সুযোগ শুধু সরকারি দলের প্রাপ্য ছিল। ওই সময়েই সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা নিয়ে সংসদে বেশ কয়েকবার সরব হয়েছিলেন তিনি।
তবে বিজেপির দিক থেকে দেখলে তাঁর নেতৃত্বে হওয়া রামমন্দির আন্দোলনই বিজেপিকে আজ ৩০৩ আসনে পৌঁছে দিয়েছে। ২০১৪ সালে আদবানি চেয়েছিলেন দল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী করুক। দল তা করেনি। বিভিন্ন ঘটনায় প্রমাণিত, মোদীর বিজেপি চায় এই নবতিপর নেতা আড়ালেই থাকুন। এমনকি ভারতরত্ন পাওয়ার পরেও।
অবশ্য রাজনীতিতে এমন ঘটনা মোটেই বিরল নয়।
~ মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







