হেলালউদ্দিন

১৯৬৩ সালে আমি যখন বাবার সঙ্গে আতপুরের জুটমিল মহল্লায় আসি, তখন আমার বয়স ছিল ১২ বছর৷ বাবা ছিলেন জুটমিলের শ্রমিক। আমাদের বাড়ি বিহারের সিয়ান জেলায়। ওখান থেকে প্রায় ২০০ মজুর এই এলাকার বিভিন্ন জুটমিলে কাজ করতেন। তাঁদের পরিবারও এখানে থাকতেন। শ্রমিক কোয়ার্টার, যাকে মজদুর বস্তি বলা হয়, সেখানেই সবাই থাকতাম। এখনও থাকি।

১৯৯২ সালের কথা বলার আগে ছোট করে আগেকার অবস্থাটা বলে নিই।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শ্রমিক বস্তিগুলোতে জনবসতির একটা নিজস্ব বিন্যাস আছে। হিন্দু, মুসলিম জনবসতি কোথাও আলাদা আলাদা, আবার কোথাও গায়ে গায়ে। একইভাবে, নিম্মবর্ণের হিন্দুরা একসঙ্গে থাকেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও তাই। ধরুন, পাসোয়ানদের একটা পাড়া, সিংদের আরেকটা পাড়া — এইরকম।

এই এলাকায় মসজিদ, মন্দির সবই আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সক্রিয়। তখন মূলত কংগ্রেস আর কমিউনিস্টরা ছিল। কিছুটা ফরওয়ার্ড ব্লক। এখন তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক আর কংগ্রেস আছে। সেই সময় জগদ্দলে সীতা শেঠের বলশেভিক পার্টি, এসইউসিআই, আরএসপি — এরাও ছিল। সংঘ পরিবারের কাজও ছিল। জনসংঘ নয় কিন্তু, সংঘ পরিবার। এখনো বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে ভারতীয় মজদুর সংঘ আছে। জগদ্দলে যেমন বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের বসবাস, এখানে ততটা নয়। কিন্তু মোটের উপর ছবিটা এক।

১৯৬৪ সালে এখানে দাঙ্গা হয়। সেই আমার প্রথম দাঙ্গা দেখা। বাংলাদেশের ঘটনার প্রেক্ষিতে এখানে গোলমাল শুরু হয়। যতদূর মনে পড়ে, মারামারিটা মূলত কংগ্রেসিরা করেছিল। হিন্দু এবং মুসলিম দুদিকেই আইএনটিইউসির লোকজন ছিল। কমিউনিস্টরা এবং ফরওয়ার্ড ব্লক উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেছিল।

এই আমার প্রথম দাঙ্গা দেখা। এরপর আমি অন্তত বার দশেক দাঙ্গা দেখেছি আমাদের এলাকায়। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়েছে, বাঙালি অবাঙালি দাঙ্গাও হয়েছে৷ কারফিউ, পুলিশ টহল সবই হয়েছে। সাতাত্তর সালে বামফ্রন্ট সরকার হওয়ার পর একটা জিনিস দেখেছি, দাঙ্গা হত ঠিকই, কিন্তু তেমন বড় আকার নিত না। তবে এটাও ঠিক যে, শুরুর সময়টা লোকাল পার্টি খুব সক্রিয় থাকত না। আমার মনে হয়েছে, বিষয়টা ঘটতে দিত। তারপর অতিসক্রিয় হয়ে নিয়ন্ত্রণ করত। এতে সিপিএমের জনপ্রিয়তাও বাড়ত। তবে একান্তই আমার পর্যবেক্ষণ। আমি ভুলও বলতে পারি।

দাঙ্গা আমাদের কাছে নতুন কোনো বিষয় নয়। খুব যে ভয়ে থাকতাম তেমনও নয়। আসল বিষয়টা তো মারামারি, লুটপাট। সেটা রাজনৈতিক গোলমালের সময়ও হত।

কিন্তু ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যা হল, আমি অন্তত তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। ওইদিনের পর থেকে আমি বুঝতে পারলাম, এই দেশটায় আমি সত্যিই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

কেন এমন বলছি? সেই দিনের সকালটায় ফিরে গেলে দেখতে পাই, খুব বেশি গোলমাল কিন্তু হয়নি। বরং একটা থমথমে আবহ ছিল। এলাকায় পুলিশ পিকেট ছিল। ছোট ছোট জমায়েত হয়েছিল। দু পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা ছিল। কিন্তু বড় কিছু হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ভূমিকা আমাদের কাছে খুবই ইতিবাচক মনে হয়েছিল। মহল্লায় সকাল থেকে রেডিও চলছিল। আমরা সেখান থেকেই সব খবর পাচ্ছিলাম। পরদিন কাগজে ওই বীভৎস ছবিটা দেখলাম।

বাবরি ধ্বংসের মাধ্যমে আমরা যেটা বুঝতে পেরেছিলাম,তা হল, এই দেশে আমাদের সঙ্গে, মুসলমানদের সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। একটা ঐতিহাসিক সৌধকে ভেঙে দেওয়া যায়। প্রশাসন, পুলিশ, সেনা কেউ আটকায় না। মসজিদের উপর উঠে দেশের বিরোধী নেতারা নাচানাচি করতে পারেন, কেউ আটকাবে না। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।

এলাকায় শান্তি কমিটি তৈরি হয়েছিল। আমিও ছিলাম। মনে আছে, এলাকার এক বয়স্ক মুসলিম ভদ্রলোক শান্তি কমিটির বৈঠকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে বলেছিলেন, “কীসের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি? আমরা তো হিন্দুদের চাকরবাকর। মালিক তো চাইলেই চাকরকে লাথি মারতে পারে।” আসলে ওই দিনের বিষয়টা অনেক বড় মানসিক ক্ষত তৈরি করেছিল। যার কোনো নিরাময় হয়নি। সরাসরি দাঙ্গা বোধহয় অনেক কম ভয়ঙ্কর। এই ধরনের ঘটনা একটা চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।

শেষে একটা কথা বলব, বাবরি ধ্বংস আমাকে অন্তত সেকুলার দলগুলোর নীচুতলাকে বুঝতে শিখিয়েছে। আমি দেখেছি বাম, কংগ্রেস কেউই নীচুতলায়, সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করেনি। বাবরির আগে এতটা স্পষ্ট করে হিন্দু সিপিএম, হিন্দু কংগ্রেস চোখে পড়েনি। সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু বিভাজনটা একদম সরাসরি সামনে এসে দাঁড়াল। আমরা মুসলিমরা ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকলাম। এখনো তো তাই। বরং আরও অবনতি হয়েছে পরিস্থিতির।

লেখক জুটমিলের শ্রমিক ছিলেন। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.