গত ২৪ নভেম্বর মেঘালয় কংগ্রেসের বারোজন বিধায়ক — তাঁদের মধ্যে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমাও আছেন — সাড়ম্বরে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। কারণ নানাবিধ। তার একটি হচ্ছে বর্তমান মেঘালায় প্রাদেশিক কংগ্রেস প্রধান ভিন্সেন্ট পালা নাকি পার্টিবিরুদ্ধ কাজ করছেন।

বারোজন বিধায়কের পর বহু কংগ্রেস কর্মী পার্টি ছেড়েছেন নানা অছিলায়। কিন্তু সবাই তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেবেন কিনা তা নিয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়নি। তবে এইটুকু বোঝা যাচ্ছে যে রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্থান কংগ্রেস হারিয়েছে। তাদের দুরবস্থার কথা নয় পরে আলোচনা করা যাবে। আপাতত দেখা যাক তৃণমূল কংগ্রেস উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষত মেঘালয়ে, কতখানি প্রাসঙ্গিক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

তৃণমূল আদতে বাঙালি-প্রধান দল এবং এখন অবধি তার শক্তির কেন্দ্র পশ্চিমবাংলা। কিন্তু যে রাজ্যে বাঙালি বিরূপতা অবাধ, সেখানে তৃণমূল কোন কর্মসূচীর উপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লড়বে, সেটা ঠিক পরিষ্কার নয়। আর যদি বাঙালি সম্প্রদায়কে লক্ষ করেই নির্বাচনে লড়া হয়, তাহলে তৃণমূলের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অল্পই।

যে বারোজন কংগ্রেস ত্যাগী বিধায়ক এখন তৃণমূলের নৌকায়, তাঁরা সবাই খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের এঁদের মধ্যে কতজন রাজ্যের বাঙালিদের নানা সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হবেন তাতে সন্দেহ আছে। গারো পর্বতাঞ্চলের সমভূমিতে সেটা সম্ভব হলেও খাসিয়া পর্বতাঞ্চলে একেবারেই সম্ভব নয় মেঘালয়ে তৃণমূলের হাল যাঁর হাতে, সেই চার্লস পিংরপ খাসিয়া সম্প্রদায়ের হলেও বাঙালিদের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক আছে। বাংলায় যখন কথা বলেন, তখন সত্যি আশ্চর্য হতে হয়। কিন্তু শুধু তাঁর উপর ভর করে বাঙালি ভোট পাওয়াও সহজ হবে না।

মেঘালয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির মাত্র দুজন বিধায়ক থাকলেও উপজাতি বাদে অন্যদের ভোট পেতে তাদের খুব অসুবিধা হবে না। তার একটা কারণ বিজেপির দেশব্যাপী উপস্থিতি, অন্যটা মুসলমান বিদ্বেষ। তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির মুসলমানদের সাথে সুসম্পর্ক লুকোবার বিষয় নয়। কিন্তু মেঘালয়ের উপজাতি বাদে অন্য জনগোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে বাঙালিরা, এই সুসম্পর্কে কতটা পছন্দ করেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।

তাছাড়া যেসব স্থানীয় সমস্যা এই রাজ্যের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হতে পারে, তার কোনোটাই তৃণমূলের পরিধির মধ্যে পড়ে না। ইনার লাইন পারমিট (ILP) বা অবৈধ কয়লা খনি — কোনটা নিয়েই তৃণমূলের এখন পর্যন্ত কোনো অবস্থান নেই। যদি এমনও ভাবা যায় যে বর্তমান এনপিপি সরকারকে কয়লা খনি ইস্যুতে ক্রমশ কোণঠাসা করবে তৃণমূল, তাহলেও মনে রাখতে হবে, মুকুল সাংমার পত্নী দিকাঞ্চি সিরাও কয়লা খনির এক মালকিন।

রাজ্যে কংগ্রেসের গুটিকয়েক বিধায়ক অবশিষ্ট আছেন। তাঁরা দশম তফসিল অনুসারে বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে আবেদন করেছেন ১২ জন দলত্যাগীকে যেন বিধানসভা থেকে বহিষ্কার করা হয়। যদি শেষপর্যন্ত তা ঘটে, তাহলে ওই বারোটা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। কিন্তু ওই ১২ জন ভাল করেই জানেন, তৃণমূলের জোরে উপনির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা কম। অন্তত ২০২৩ সালের আগে তৃণমূলের টিকিটে জেতার মত অবস্থায় পৌঁছনো শক্ত। ত্রিপুরার পৌর নির্বাচনে ব্যাপক সন্ত্রাস হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তা বাদেও তৃণমূলের ফলাফলে কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত নেই।

তৃণমূল অদম্য উৎসাহে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের অন্যান্য রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে। বাংলা বাঁচানোর পর অন্য রাজ্যগুলোকে বাঁচানোর ইচ্ছাকে কোনো যুক্তিতেই অবৈধ বলে নাকচ করা যায় না। কিন্তু কেন এই ইচ্ছা? বাংলার দিদি কি সারা ভারতের দিদি হতে চান? তাই কি তাঁর হিল্লি-দিল্লি করার একমাত্র কারণ? অনেকে তাই বলছে। হতেই পারে যে শেষ অবধি মোদী আর দিদির মধ্যেই একজনকে বেছে নিতে হবে। কিন্তু তা বলে মেঘালয় বাঁচাবে তৃণমূল, এমন সম্ভাবনা নগণ্য। কাজ বা নীতি নয়, এই উপজাতি-প্রধান রাজ্যে তৃণমূলের প্রধান ভরসা টাকা।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply