দেবরায়া মুখোপাধ্যায়

আগামী ১৯ ডিসেম্বর কলকাতার পুরভোট। আগামী পাঁচ বছরের জন্য কলকাতা পুরসভা গঠন করার ভোট।

আমি কলকাতার বাসিন্দা। কলকাতাতেই জন্মেছি, এখানেই চাকরি করি। তাই ভাবছিলাম একজন নাগরিক হিসাবে আমার কোন কোন পৌর পরিষেবার চাহিদা অপূর্ণ রয়েছে? কী কী ইস্যুর কথা ভেবে আমি পুরসভা নির্বাচনে ভোট দেব?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রথমেই যে কথা মাথায় আসে তা হল দূষণ। পৃথিবীর প্রথম দশটা সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় আমার শহরের নাম আসে। দার্জিলিং বা সিকিমের পাহাড়ে দিনে কুড়ি-পঁচিশটা সিগারেট খেলে আমাদের শ্বাসপ্রণালী ও ফুসফুসের যা ক্ষতি হয়, কলকাতার বাতাসে শুধুমাত্র শ্বাসপ্রশ্বাস নিলেই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। এই শহরে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দূষণের মাত্রা কমানোর জন্য নতুন পুরসভা সচেষ্ট হবে, এটা আমার প্রথম প্রত্যাশা।

পুরসভা কীভাবে সেই কাজ করবে তা নিয়ে আমার কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নেই। তার নানা পদ্ধতি আছে। শহরে যানবাহনের দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, পরিবহণ দফতরের সাথে যৌথভাবে পেট্রোল-ডিজেলে চালিত গণপরিবহণ যথাসম্ভব কমিয়ে ফেলা, এলপিজি চালিত ও বৈদ্যুতিন গণপরিবহণের সংখ্যা বাড়ানো, কলকাতা পুরসভা এলাকার অন্তর্গত পরিবেশদূষণকারী কলকারখানা, ক্ষুদ্র ও মধ্য শিল্প ইউনিটগুলোকে শহর থেকে দূরে পুনর্বাসিত করা, শহরাঞ্চলে পরিকল্পিত সবুজায়ন করা, কলকাতার বেহাল ট্রাম পরিবহণ ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করা ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত, কলকাতা শহরে গত দশ বছর ধরে লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকা বেআইনি নির্মাণশিল্পকে কঠোরভাবে দমন করা প্রয়োজন। তোলাবাজি ও কাটমানির লোভে, প্রোমোটার ও সিন্ডিকেট চক্রের উদ্যোগে এবং শাসক দলের বিভিন্ন বড়, মেজ, ছোট নেতাদের মদতে এই বেআইনি নির্মাণ সারা শহরজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন করে, আধুনিক নগর পরিকল্পনার মুখে ছাই দিয়ে, শহর ও শহরতলি জুড়ে বেআইনি নির্মাণ আজ এক মহামারী।

এটা দমন করা পুরোপুরি পুরসভার সদিচ্ছার ব্যাপার। এখানে আমার কোনো উপদেশ বা পরামর্শ নেই।

তিন নম্বর ইস্যু হল শহর ও শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিস্রুত পানীয় জলের সমস্যা। কোনো মেট্রোপলিটান শহরে পানীয় জলের এরকম সমস্যা অভাবনীয়। এই সমস্যার দ্রুত সমাধান দরকার।

এরপর আছে শহরের বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচুর জল জমে যাচ্ছে। নাজেহাল হতে হচ্ছে গৃহস্থ, অফিসযাত্রী ও বাইরে থেকে শহরে আসা বিভিন্ন ধরণের মানুষকে। পুরোনো নিকাশি ব্যবস্থার সময়মত মেরামত, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ ও সম্প্রসারণ করে গেলেই এই সমস্যা এত বড় হতে পারত না। কিন্তু শাসকদলের প্রত্যক্ষ মদতে সর্বস্তরে চলতে থাকা দুর্নীতি সেটা করতে হতে দেয় না।

অন্যান্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরসভার হাজার হাজার শূন্য পদে অবিলম্বে নিয়োগ করে শহরাঞ্চলের বেকারত্বের সমস্যার আংশিক সমাধান এবং পুরসভার পরিষেবার মান উন্নত করা, পুরসভা পরিচালিত স্কুলগুলিকে শিক্ষার উপযোগী করে তোলা, শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা শহরবাসীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া, সম্ভব হলে পুরসভা পরিচালিত স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। প্রত্যেক এলাকায় পুরসভা পরিচালিত অল্পমূল্যের বাজার ও ক্যান্টিন শুরু করাও একটা বড় এবং প্রগতিশীল উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এই সব প্রস্তাব দেখে অবধারিতভাবে যে প্রশ্ন এসে পড়ে, তা হল – এইসব কাজের জন্য পুরসভার টাকা পাবে কোথায়?

উত্তর খুব সহজ। উপরে বলা হয়েছে কীভাবে সারা শহরে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বেআইনি নির্মাণশিল্প। তা থেকে পুরসভার কাছে কোনো টাকা তো আসছেই না, উল্টে ন্যায্য আয় বন্ধ হয়ে গিয়ে বিরাট পরিমাণ অর্থ গিয়ে ঢুকছে শাসক দলের সর্বস্তরের নেতা ও আমলা আর পুর-আধিকারিকদের পকেটে। সদিচ্ছা ও উদ্যোগ নিয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলে এই ক্রমবর্ধমান নির্মাণশিল্প থেকেই পুরসভার আয় এখনকার তিন-চার গুণ হয়ে যাবে। নামমাত্র লাভে সমস্ত এলাকায় ক্যান্টিন ও বাজার চালাতে পারলেও পুরসভার পক্ষে আয়ের আরেকটা রাস্তা খোলা সম্ভব।

তাই প্রগতিশীল, ভবিষ্যৎমুখী পৌর উদ্যমের পথে অর্থনৈতিক বাধা ততটা নেই, যতটা বর্তমান পুর কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি ও বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থ।

~মতামত ব্যক্তিগত।
লেখক তথ্যপ্রযুক্তিতে কর্মরত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও বাম আন্দোলনের কর্মী।

Leave a Reply