বর্ণালী মুখার্জি

মমতা ব্যানার্জি ঘোষণা করলেন যে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক বঞ্চনার জবাব তিনি দেবেন রাজ্যের কোষাগার থেকেই। মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান (এমজিএনআরইজিএ বা মনরেগা) প্রকল্পের একুশ লাখ গ্রামীণ শ্রমিকের বকেয়া টাকা মিটিয়ে দেবেন। পরিমাণ কম নয় এবং কাদের দেওয়া হবে তা চিহ্নিত করা একটি বড় কাজ নিশ্চয়। তবে ঘোষণাটি যে বিজেপির গালে চড় তা বলাই বাহুল্য। কারণ নরেন্দ্র মোদীর পরিকল্পনা ছিল এই টাকা বন্ধ করে রেখে ক্রমে জনতাকে ডবল ইঞ্জিন সরকারের গুরুত্ব বোঝাবেন। কিন্তু মমতা সেই সুযোগ দিলেন না। ধন্যবাদ তাঁকে।

মোদী গত আর্থিক বছরে তেলেঙ্গানায় ১৭ লাখ, পশ্চিমবঙ্গে ৮৩ লাখ, অন্ধ্রপ্রদেশে ৭৮ লাখ, গুজরাটে সাড়ে চার লাখ জব কার্ড বাতিল করেছেন। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই সংসদে ভাষণ দেওয়ার সময়ে বলেছিলেন এই মনরেগা প্রকল্পকে তিনি অযৌক্তিক মনে করেন। বলা ভাল, তিনি মনে করেন যে এটি আসলে গর্ত খোঁড়া এবং গর্ত বোজানোর হরির লুটের প্রকল্প। অথচ ২০১৪ সালেই ১২ রাজ্যে তৃতীয় খরার মরসুম চলছিল। সেবছর সরকারের উচিত ছিল ১০০ দিনের অনেক বেশি কাজ দেওয়া। মনরেগা আইন অনুযায়ী ১০০ দিন হল ন্যূনতম দায়িত্ব, সরকার সারাবছরও কাজ দিতে পারে। ২০১৪ সালেই সেই ভাষণে আতঙ্কিত হয়ে ২৮ জন অর্থনীতিবিদ মোদীকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তাঁরা লিখেছিলেন, ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প মোটেই কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয়, এটি আসলে বাজার শক্তিশালী করার প্রকল্প। দেশের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প। ফলে স্রেফ রাস্তা খুঁড়ে ফের বোজালেও সেই উদ্দেশ্য সফল হয়। অথচ খরচ খুবই সামান্য, জিডিপির মাত্র ০.৩%। ২০২১ সালে আবার কয়েকজন অর্থনীতিবিদ চিঠি দেন। গরিব জেলা বেছে বেছে কাজ দেওয়ার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন তাঁরা। সেই সব অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ উপেক্ষা করে এবং তাঁদের আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করে মোদী ক্রমাগত এই প্রকল্পের বরাদ্দ কমাচ্ছেন। এখন ১০০ দিনের কাজ দিতে হলে বার্ষিক বরাদ্দ হওয়ার কথা প্রায় পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা। বাস্তবে যা বরাদ্দ হয় তা স্রেফ ৪২ দিন কাজ দেওয়ার টাকা। কেন্দ্রীয় সরকারি আমলারা, যাঁরা মনরেগা নিয়ে আদালতে গিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে হলফনামা পেশ করেছেন, তাঁদের বক্তব্য হল, মনরেগা প্রকল্প আসলে দুর্নীতির আখড়া, ভুয়ো কার্ড করার ছাড়পত্র। লাবণ্য তামাং একটি গবেষণায় অভিযোগ করেছেন যে মনরেগা আইন অনুযায়ী প্রকল্পের টাকা সঠিকভাবে খরচ হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। আইনের ১৭ নম্বর ধারায় গ্রামসভার দ্বারা সোশাল অডিট করার কথা বলা আছে। তা ঘটছে কিনা কেন্দ্র সে ব্যাপারে নজরদারি করেনি। কোনো অভিযোগই তারা গ্রামসভায় পেশ করেনি। ছ বছর ফাঁকি মেরে এখন হঠাৎ বিরোধী রাজ্যগুলিকে টাকা না দিয়ে শুকিয়ে মারার পথে হাঁটছে। তারা এখন হঠাৎ ২৭ নম্বর ধারা দেখাতে শুরু করেছে, যেখানে বলা আছে যে এই প্রকল্প চালানোর ক্ষেত্রে রাজ্য নিয়মভঙ্গ করলে কেন্দ্র টাকা দেওয়া বন্ধ করা দিতে পারে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কেন্দ্র মনরেগায় খরচ কমানোর জন্য অনবরত ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েই চলেছে। প্রথমে তাদের চেষ্টা ছিল, রাজ্যগুলি যেন কম জব কার্ডের দাবি করে। নিয়মানুযায়ী, বছরের শেষে রাজ্য সরকার অগ্রিম দাবি জানায় এবং তারপর কেন্দ্র শুরু করে দর কষাকষি। দেখা যায় অনেকসময়েই রাজ্যের দাবিকে ২৫% কমিয়ে এনেছে কেন্দ্র। এরপর আর চাতুরি হল জিও ট্যাগিং। তারপর দুর্নীতির অভিযোগ এনে চালু করা হল ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার। এখন আবার ভুয়ো কার্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের স্পর্ধা এতই বেড়েছে যে কাজ করার পরেও মানুষের প্রাপ্য টাকা দিচ্ছে না। আইন অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে সুদসমেত দিতে হবে। এরপর এল জব কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ড লিঙ্ক করানোর ঝক্কি। এখানেই শেষ নয়। এরপর বলা হল মনরেগার ওয়েবসাইটে নাকি দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজের জায়গা থেকে শ্রমিকদের সেলফি তুলে পাঠাতে হবে। এদিকে দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে জনস্বার্থ মামলাগুলি চলছে তার শুনানি শেষই হচ্ছে না। অবশ্য অন্যান্য মামলাতেও বিচারবিভাগের ভূমিকা আমরা রোজই দেখতে পাচ্ছি।

আরো পড়ুন একশো দিনের কাজ: কেন্দ্রের বঞ্চনা, রাজ্যের দুর্নীতির যুগলবন্দী

এখন মমতা যে মুহূর্তে ঘোষণা করলেন তিনি কেন্দ্রের দেয় টাকা দিয়ে দেবেন রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে, অমনি কানাঘুষো শুরু হয়েছে – টাকা কোথায়? আবার ঋণ? যেন সরকার ধার করা মানেই বিপদ। ধার করে সেই টাকায় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা গেলে ক্ষতি কী? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের জিডিপির ১২৫ গুণ ধার করে, জাপান ২২৫ গুণ। অমর্ত্য সেন যখন বলেন যে সরকারের উচিত গরিবের পকেটে টাকা দেওয়া, তখন কর বাবদ সেই টাকা সরকার তুলে নেবে এমন ভরসায় বলেন না। সরকার ধার করুক এবং এমনভাবে সেই টাকা কাজে লাগাক যাতে পাঁচ বছরে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।

শেষে যা বলার তা হল মোদী সরকার নিজে কি যথাযথ হিসাব দেয়? প্রধানমন্ত্রী পিএমকেয়ার্স ফান্ডের হিসাব দেননি। দেশের সব সম্পদ আদানি, আম্বানি, নীরব মোদীদের হাতে তুলে দিয়ে যে দল ইডি, সিবিআই, মিডিয়া নিয়ে চোর ধরতে বেরোয় তারা আবার হিসাব চায়!

লেখিকা বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.