বিকশিত ভারতের নামে ২০৪৭ সালের স্বপ্ন বেচা আর জ্বলন্ত সমস্যা এড়াতে অন্তর্বর্তী বাজেটের দোহাই দেওয়া – কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের বাজেটকে এক ঝলকে এইভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। মাত্র ৫৭ মিনিটের বাজেট ভাষণকে কোনো দলের নির্বাচনী ভাষণ বলে ভুল করাও অস্বাভাবিক নয়। বাজেট অধিবেশনের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর সুরটাও এক। যেন ভোটে জিতে নতুন সরকার গড়ে মন্ত্রীমশাইরা সংসদে ভাষণ দিচ্ছেন। কোনটা বাজেট ভাষণ আর কোনটা জবাবী ভাষণ (অবশ্য জবাব দিতে এই কেন্দ্রীয় সরকার যে ভয় পায়, তা বারে বারে প্রমাণিত), কোনটা সংসদের বক্তব্য, কোনটা সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্য আর কোনটাই বা রাজনৈতিক সভার ভাষণ – সেসব বহুকাল আগেই গুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলার তৃণমূল সরকার অবশ্য এসব নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতেই পারে। তবুও বাজেটের একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানুষের রুটিরুজির সঙ্গে রয়েছে নাড়ির টান।
বাজেট মানেই কেবল আয়কর কাঠামোয় কী বদল হল, কীসে কতটা শুল্ক বা কর বাড়ল বা কমল তা নয়। এমন খটমট বিষয়গুলো আমজনতা এড়িয়ে চলতেই চান। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর উপস্থাপনায় মনে হবে কর কাঠামো, শেয়ার বাজার, বড় বড় কোম্পানির ফায়দা – এইসব নিয়েই যেন বাজেট। এইভাবে বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো দিব্যি আড়াল করে দেওয়া হয়। এই ধারা বহুকাল চলে আসছে। সরকার বাজেটকে জনদরদী বলবে, নতুন নতুন শব্দবন্ধ বা স্লোগান বাজারে হাজির করবে – এটাই দস্তুর। নামের চমকে কঠিন সত্যকে আড়াল করতে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের পটুতা সম্পর্কে নতুন করে বলবার কিছু নেই। বাজেটের আগে বার্ষিক আর্থিক সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়। এবারে অন্তর্বর্তী বাজেটের দোহাই দিয়ে তার বদলে বিগত দশ বছরের সাফল্য প্রকাশ করা হয়েছে। জল মেশানো সেই রিপোর্টের আসল লক্ষ্য আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের জন্যে প্রচার।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর ‘জ্ঞান পর ধ্যান’ স্লোগানের উল্লেখ করেছেন। এখানে অবশ্য জ্ঞানের সঙ্গে বিদ্যার্জনের কোনো সম্পর্ক নেই। ইংরেজি GYAN, আসলে চারটি হিন্দি শব্দের আদ্যক্ষরে তৈরি। G – গরিব, Y – যুবা, A – অন্নদাতা আর N – নারী। ইংরেজি, হিন্দি মিলেমিশে কেমন একটা গুলিয়ে দেওয়া কারবার। গরিব, যুবসমাজ, অন্নদাতা কৃষক আর নারীদের স্বার্থেই নাকি এই অন্তর্বর্তী বাজেট করা হয়েছে।
স্লোগান হিসাবে অন্নদাতা কৃষকদের কথা বলা হলেও, কৃষিতে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। চলতি বছরের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে এবারের বাজেটে কৃষি দপ্তরের বরাদ্দ ১,০০০ কোটি টাকাও বাড়েনি। চাষবাসে খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে এই বরাদ্দ প্রকৃতপক্ষে হ্রাস করারই সামিল।
আমজনতার কাছে এখন বড় সমস্যা হল মূল্যবৃদ্ধি, কাজের অনিশ্চয়তা। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থা ক্রমশ সঙ্গীন হচ্ছে। রুটিরুজির অনিশ্চয়তা নিয়ে কোনোক্রমে দিন কাটানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী বাজেটে এসবের মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? গরিব মানুষের কাছে রেশন ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রী দেশের ৮০ কোটি মানুষকে রেশনের মাধ্যমে বিনা পয়সায় খাদ্যশস্য দিচ্ছেন বলে দাবি করছেন। মানুষ কতটা খাদ্যশস্য পাচ্ছেন, কী কী খাদ্যশস্য দেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে কিন্তু সরকার বিশেষ কিছু বলে না। গরিবের জন্য করা এই কেন্দ্রীয় বাজেটে খাদ্য ও গণবন্টন দপ্তরের বরাদ্দ চলতি বছরের (২০২৩-২৪) সংশোধিত বরাদ্দের থেকে ৯,০০০ কোটি টাকা কমে গেছে। রেশনের জন্য খাদ্যশস্য কেনার পরিমাণও সরকার বছরের পর বছর কমাচ্ছে। চলতি বছরে সরকার রেশনের জন্য গত বছরের থেকে ২৭ মিলিয়ন টন কম খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছে। খাদ্যদ্রব্যের দাম আর অপুষ্ট মানুষের সংখ্যা যখন বেড়ে চলেছে, তখন খাদ্যের জন্য ব্যয় বরাদ্দ কমিয়ে যে গরিবের সর্বনাশ করা হয় তা সকলেই বুঝতে পারে। এই জ্ঞানলাভের জন্য কোনো কিছুতে ধ্যান দেওয়া বা ধর্মস্থানে ধ্যান করার দরকার পড়ে না।
গরিবের জন্য করা এই কেন্দ্রীয় বাজেটে খাদ্য ও গণবন্টন দপ্তরের বরাদ্দ চলতি বছরের (২০২৩-২৪) সংশোধিত বরাদ্দের থেকে ৯,০০০ কোটি টাকা কমে গেছে। চলতি বছরে সরকার রেশনের জন্য গত বছরের থেকে ২৭ মিলিয়ন টন কম খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছে।
গ্রামীণ অর্থনীতির হাল ফেরাতে মনরেগা প্রকল্পের (একশো দিনের কাজ) বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এই প্রকল্পে শ্রমিকদের মজুরি এবং কর্মদিবস বছরে ১০০ দিনের থেকে বাড়ানোর দরকার ছিল। কিন্তু বিজেপি সরকার প্রথম থেকেই এই প্রকল্পের বিরোধী। অতিমারীর সময়ে বাধ্য হয়ে বরাদ্দ বাড়িয়েছিল। এবারের অন্তর্বর্তী বাজেটে ২০২৩-২৪ সালের বাজেটের থেকে বরাদ্দ ২৬,০০০ কোটি টাকা বেড়েছে। কিন্তু সংশোধিত বরাদ্দের থেকে বাড়েনি। বাজেটে সরকার কোনো খাতে যে ব্যয় ধরে, পরে তার থেকে ব্যয় বাড়তে বা কমতে পারে। তার জন্য আর্থিক বছরের মাঝে সমীক্ষার মাধ্যমে সরকার সেই খাতে খরচ বাড়বে না কমবে তার হিসাব করে। বাজেট বরাদ্দের থেকে এই সংশোধিত বরাদ্দের (আর ই) পরিমাণ বাড়তে বা কমতে পারে, তবে সাধারণভাবে বাড়ে। পরের বছরের বাজেটে কোন খাতে কত খরচের হিসাব ধরা হবে তা এই সংশোধিত বরাদ্দকে ভিত্তি করেই করা উচিত। কিন্তু সরকার তা করে না, কারণ করলে আসল চিত্রটা ধরা পড়ে যাবে। চলতি বছরের বাজেট বরাদ্দ ধরলে এবারে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু সংশোধিত বরাদ্দ বিচারে বাড়েনি। কর্মদিবস বা মজুরি বৃদ্ধি তো দূরের কথা, বাস্তবে এই প্রকল্পে শ্রমদিবস কমবে, শ্রমিকের মজুরিও বকেয়া থাকবে।
স্লোগান হিসাবে অন্নদাতা কৃষকদের কথা বলা হলেও, কৃষিতে প্রকৃত বরাদ্দ কমেছে। চলতি বছরের সংশোধিত বরাদ্দের থেকে এবারের বাজেটে কৃষি দপ্তরের বরাদ্দ ১,০০০ কোটি টাকাও বাড়েনি। চাষবাসে খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে এই বরাদ্দ প্রকৃতপক্ষে হ্রাস করারই সামিল। পি এম কিষাণ প্রকল্পে কৃষকদের বছরে একাধিক কিস্তিতে অর্থ দেওয়া হয়। অনেকটা এই রাজ্যের কৃষকবন্ধু প্রকল্পের মত। এই কেন্দ্রীয় কিষাণ প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। সারে ভর্তুকি বৃদ্ধির বদলে ২৫,০০০ কোটি টাকা কমেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইন করা নিয়ে কোনো কথা বাজেটে নেই। ফসল বিক্রি, গুদামজাতকরণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের নামে কর্পোরেটদের প্রবেশের পথ আরও সুগম করা হয়েছে। কৃষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, আন্দোলনের চাপে সরকার কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য হলেও ঘুরপথে কৃষিক্ষেত্রে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আধিপত্য বাড়াতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনার বরাদ্দও এই বাজেটে কমেছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে কোনো দিশা এই বাজেট দেখাতে পারেনি। বছরে দু কোটি বেকারের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভুলিয়ে প্রযুক্তিতে দক্ষ যুবক-যুবতীদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলেছে। ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলেও বাজার সৃষ্টির কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতিমারীর সুযোগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংজ্ঞা বদলে, অপেক্ষাকৃত বড় কোম্পানিকেও এসবের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে দেওয়া বিভিন্ন সুযোগের লাভের গুড় এরাই খাবে। পরিকাঠামোর জন্য ব্যয় বরাদ্দ বাড়ালেও তাতে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নতুন করে স্থায়ী কাজের সুযোগ তো পরের কথা, কাজ করা মানুষেরই জীবিকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোটি কোটি শ্রমিকদের জন্য এই বাজেটে কিছুই করা হয়নি। প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে এত হইচইয়ের পরেও বাজেটে তাঁরা স্থান পাননি। আশা, অঙ্গনওয়াড়ির মত প্রকল্পের কর্মীদের সরকারি কর্মচারী হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টাও অবহেলিত হয়েছে। তাঁদের কেবল আয়ুষ্মান প্রকল্পের সুযোগ দিয়েই সরকার দায় সেরেছে।
এইসব কর্মীদের সিংহভাগই নারী। তাঁদের অবহেলা করে, নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মজুরির বৈষম্য, কাজের ক্ষেত্রে নানা অত্যাচারের বিষয়গুলোকে এড়িয়ে বাজেটে নারীদের জন্য দরদের বুলি আওড়ানো হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, দেশে নাকি প্রায় এক কোটি ‘লক্ষপতি দিদি’ রয়েছেন, স্বনির্ভর প্রকল্পের মাধ্যমে যাঁরা বছরে কমপক্ষে এক লক্ষ টাকা উপার্জন করেন। তাঁরা কারা, কীভাবে উপকৃত হলেন – সেই তথ্য কিন্তু সরকার দেয়নি। দিতে পারবেও না। অনেকটা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মসংস্থানের তথ্যের মত ভাঁওতাবাজি। বাজেটে এই লক্ষপতি দিদি তৈরি করার লক্ষ্যমাত্রা দু কোটি থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি করা হয়েছে। স্বনির্ভর প্রকল্প যদি এত সফলই হত, তাহলে মাইক্রোফাইন্যান্স কোম্পানিগুলির কারবার রমরমিয়ে চলত না। এই প্রকল্পে সম্পদ সৃষ্টি, উৎপাদনে মহিলাদের যুক্ত করে ক্ষমতায়নের ঘোষিত লক্ষ্য খুব একটা সফল হয়নি। ঋণের আদানপ্রদানই প্রাধান্য পেয়েছে।
শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়ের মত বিষয় নারীকল্যাণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের জন্য অর্থ বরাদ্দ। অন্তর্বর্তী বাজেটে এই মন্ত্রকের বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা (২.৫%)। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ১.৮%, শিক্ষাখাতে ২.৫%। জনস্বাস্থ্য যে নয়া উদারবাদী অর্থনীতিতে অবহেলিত তা আলাদা করে বলবার প্রয়োজন নেই। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ গত বাজেট বরাদ্দের থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা বাড়লেও একটা বড় সংশয় থেকে গেছে। গত বাজেটে এই খাতে ১,১৬,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও, আসলে খরচ হয়েছে মাত্র ১,০৯,০০০ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী বাজেটে বিদ্যালয় শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়লেও উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, গবেষণায় বরাদ্দ কমেছে। সাধারণভাবে বাজেট বরাদ্দের থেকে আসলে খরচ বাড়ে। কিন্তু এই সরকারের আমলে সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ কমেছে। অর্থাৎ বাজেটে বরাদ্দ অর্থও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক খরচ করেনি। সামাজিক উন্নয়নে ২০২৩-২৪ সালের বাজেট বরাদ্দের থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। আদিবাসী উন্নয়নে বরাদ্দের থেকে ১,০০০ কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। দলিতদের উন্নয়নে বরাদ্দের থেকে প্রকৃত খরচ কমেছে প্রায় ৭,০০০ কোটি টাকা। কৃষিতেও বরাদ্দের থেকে ৪,০০০ কোটি টাকা কম খরচ করা হয়েছে। এইসব খাতে খরচ কমানোর মানে হল গরিব, যুবা, অন্নদাতা, মহিলাদের সর্বনাশ। ‘জ্ঞান পর ধ্যান’ আসলে চূড়ান্ত জুমলাবাজি।
সরকার সামাজিক খাতে খরচ কমিয়ে বাজেট ঘাটতি কমানোর দাবি করছে। কিন্তু কর্পোরেটগুলোকে নানা বিষয়ে ছাড় দেওয়া বা কোম্পানি কর না বাড়ানোর নয়া উদারনৈতিক পথে অবিচল আছে। ঘাটতি কমাতে গেলে যেমন খরচ কমাতে হয়, তেমন আয়ও বাড়াতে হয়। এক্ষেত্রে কোনটাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে সেটাই বিবেচ্য। যদি খাওয়াদাওয়ার খরচ কমিয়ে দামি মোবাইল কেনার জন্য অর্থ খরচ করা হয়, তাহলে তা অবিবেচকের কাজ হবে। তার মোকাবিলায় ঋণ বাড়ালে তো চূড়ান্ত সর্বনাশ অবধারিত। সরকারের আর্থিক নীতি অনেকটা তেমনই।
সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস ঋণ। আয়ের ২৮% আসে ঋণ ও অন্যান্য দেনা থেকে। আয়ের আরেকটা বড় উৎস কর। পরোক্ষ কর গরিব, বড়লোক নির্বিশেষে সকলকে দিতে হয়। প্রত্যক্ষ কর দিতে হয় আয়, মুনাফা ইত্যাদির ভিত্তিতে। একটা গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য পরোক্ষ কর না বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো। ঘাটতি কমাতে কোম্পানি কর আরও বাড়ানো উচিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারের আয়ের ১৮% আসে জিএসটি থেকে, ১৭% আসে কোম্পানি কর থেকে। চলতি বছরে জিএসটি আদায়ের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে গেছে। সব মানুষকেই জিএসটি দিতে হয়। ভারতের আর্থিক বৈষম্যের চিত্রটা যখন সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন সরকার কোম্পানি করের থেকেও জিএসটি বাবদ বেশি অর্থ আয় করছে।
এবার দেখা যাক ব্যয়ের দিক। সরকারের সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয় সুদ দিতে – মোট ব্যয়ের ২০%। নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্প নিয়ে এত প্রচার। সেখানে কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাবদ খরচ হয় ১৬% আর নানা প্রকল্পে অনুদান দিতে মাত্র ৮%। ভর্তুকি বাবদ খরচ হয় মোট খরচের মাত্র ৬%। জিএসটি আর শুল্ক বাড়িয়ে সরকারের আয় বাড়ছে। আবার গরিব মানুষের স্বার্থে যেসব খাতে ব্যয় বাড়ানো দরকার, তা আসলে কমিয়ে সরকার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে।
শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়ের মত বিষয় নারীকল্যাণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তেমনই গুরুত্বপূর্ণ নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রকের জন্য অর্থ বরাদ্দ। অন্তর্বর্তী বাজেটে এই মন্ত্রকের বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা (২.৫%)।
বিকশিত ভারতের জন্য দরকার মানুষের আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষের আয়ের নিশ্চয়তা কমছে, ফলে চাহিদাও কমছে। আবার সঞ্চয়ের অনুপাতও যাচ্ছে কমে। ২০২২-২৩ সালে পারিবারিক সঞ্চয়ের পরিমাণ কমে হয়েছে জিডিপির মাত্র ৫.১%। মানুষের জিনিস কেনার ক্ষমতা না থাকলে চাহিদা বাড়বে না। আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতিও হবে না। বিনিয়োগ বাড়লে তার সুফল নিচে চুঁইয়ে পড়ে – এই তত্ত্ব যে অসার, তা সারা বিশ্বে আজ প্রমাণিত সত্য। ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার রেশ পুঁজিবাদ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারছে না। সামাজিক খাতে, সাধারণ মানুষের দরকারি ক্ষেত্রগুলোতে ভর্তুকি কমিয়ে ঘুরপথে কর্পোরেটদের ভর্তুকি দিয়ে কাজের কাজ হয়নি। ঋণনির্ভর অর্থনীতির বুদ্বুদ বহু আগেই ফেটে গেছে।
মানুষের কেনার ক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি। অথচ বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের আমলে বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ হয়েছে, কাজের ও মজুরির নিশ্চয়তা থাকছে না। সরকার এখন স্থায়ী চাকরি ব্যাপারটাকেই অতীত করে দিতে চাইছে। নির্দিষ্ট বেতনের চাকরি বা আয়ের ভিত্তিতে কাজের সুযোগ কমছে। স্বনিযুক্ত ক্ষেত্রে আয় করা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার এখন চাকরি বেশি দিতে পারবে না বলে নিজেদের ব্যবসা করে খাওয়ার জ্ঞান দিচ্ছে। তেলেভাজা বা পকোড়া বিক্রি করে বড়লোক হওয়ার গপ্পো সচেতনভাবেই গেলানো হয়।
স্বনিযুক্ত, স্বনির্ভর প্রকল্প ইত্যাদিতে ঋণের ব্যবস্থা করলেই চারতলা বাড়ি হয় না বা লক্ষপতি দিদির সংখ্যা বাড়ে না। মানুষের হাতে অর্থ না এলে ব্যবসা থেকে আয় কীভাবে হবে? পাশাপাশি কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, নানা গ্রামীণ, আঞ্চলিক শিল্প, পরিষেবায় কর্পোরেটের অনুপ্রবেশ বাড়লে প্রতিযোগিতায় অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতে নামা স্বনিযুক্ত ব্যক্তিরা টিকে থাকতে পারেন না। বাস্তবে পারছেনও না। ছোট ছোট দোকান, শিল্প প্রতিষ্ঠান, পরিষেবা ক্ষেত্রের নানা ব্যবসা, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প তাই রুগ্ন। তাই ঋণের সুযোগ করে দিয়ে মানুষের আয় কখনোই বাড়ানো যায় না। বরং মানুষের ঋণের বোঝা বাড়ে, ঋণ মেটাতে তাঁরা আরও ঋণ নেন। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন দেশের কোটি কোটি মানুষ।
স্বনিযুক্তি প্রকল্পে শ্রমের দামের দিকটাও বিবেচনায় আনা হয় না। হয়ত একজন দোকান করেছেন বা ছোট শিল্প গড়ে তুলেছেন। পরিবারের সবাই মিলে খাটছেন। কিন্তু তাঁদের সেই শ্রমের মূল্য হিসাবে আনা হয় না। কৃষিক্ষেত্রেও এটা ঘটে। পারিবারিক আয়ের হিসাব দেখিয়ে বা শ্রমের মূল্য না কষে আয় হিসাব করা হয়। বিনা পারিশ্রমিকের এই শ্রমে বঞ্চিত হন মহিলাদের বড় অংশ। বেতন বা মজুরির ভিত্তিতে কাজের সুযোগ যত কমবে তত এই বঞ্চনা বাড়বে।
নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির পণ্ডিতরা অবশ্য চাহিদাকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না। তাঁদের সবটুকু নজর যোগানের দিকে। আর্থিক বিকাশ নাকি জোগানের উপর নির্ভর করে। শ্রমিকের মজুরি বাড়লে নাকি মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। তাঁদের নিদান – সবটাই বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়া দরকার। ভর্তুকি কমানো দরকার, শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা কমানো দরকার। সোজা কথায় শ্রমজীবী মানুষকে ভাতে না মারলে আর্থিক বিকাশ হবে না। সব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর দরকার নেই। জোগান থাকলে, বাজারে পণ্য থাকলে তা বিক্রি হবেই।
আরো পড়ুন দেশের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের দায়িত্ব
সেই পথেই চলছে মোদী সরকার। শ্রমের বাজার শস্তা করতে তাই শ্রমিকদের অর্জিত অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হয়, স্থায়ী চাকরির সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়। খাদ্য, সার, কৃষিতে বরাদ্দ কমলে খাদ্যের অধিকার আইন থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। একশো দিনের কাজের প্রকল্পে বরাদ্দ ছাঁটাই করলে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন লঙ্ঘিত হয়। তেমনই শিক্ষায় প্রকৃত খরচ কমালে শিক্ষার অধিকার আইনে আঘাত পড়ে। এইভাবে সরকারই অধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের অমর্যাদা করে চলেছে।
অর্জিত অধিকার কেড়ে নিয়ে সেগুলোকে ভিক্ষায় পরিণত করা নয়া উদারনীতির আরেক বৈশিষ্ট্য। এতে মানুষের ক্ষোভকে ধামাচাপা দিয়ে রাষ্ট্রের অনুগ্রহ প্রার্থীতে পরিণত করা যায়। অধিকার আদায়ের লড়াই তখন দুর্বল হয়ে যায়। ‘বেনিফিসিয়ারি’ শব্দটা আজকের উন্নয়নের রূপকারদের বহুব্যবহৃত শব্দ। এবারের বাজেটেও এই শব্দটা একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। এটাএকটা রাজনৈতিক শব্দ। বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ, রাষ্ট্রসঙ্ঘের মত আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, পঞ্চায়েতের মাতব্বর, নানা প্রকল্পের অনুদানে পুষ্ট এনজিও কর্তা – সকলেই আজ এই শব্দ ব্যবহার করে। অধিকার এখন উপকারের নামে ভিক্ষায় পরিণত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী বাজেটে আরও দু কোটি মানুষের আবাস তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পঞ্চায়েত আইন অনুসারে আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ সমেত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কে কে সুযোগ পাবে তা নির্ধারণের অধিকার গ্রামবাসীর হাতে থাকছে না। নাগরিকদের অধিকার থাকলে তা দেওয়ার দায় রাষ্ট্রের থাকে। প্রকল্পের নামে সেইসব অধিকার কেড়ে নিতে পারলে সেই দায় আর থাকে না। নয়া উদারনীতির তৈরি করা ছকের জনমোহিনী রাজনীতি নিয়েই কেন্দ্র আর রাজ্য প্রতিযোগিতায় মেতেছে। অন্তর্বর্তী বাজেটে সেই নয়া উদারনীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী এখন স্বঘোষিত ঈশ্বর। সেই ঈশ্বরের রামরাজ্যে অর্থনীতি যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় বড় কর্পোরেটের আদেশেই চলছে, অন্তর্বর্তী বাজেট আবার তা প্রমাণ করল।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







