সুদীপ্ত রায়

লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি পাতার মেধা। কী লিখি? কেন লিখি?

এ লেখা প্রস্তুত করতে স্নায়ু কেঁপে ওঠে। বিরতি নিই, স্নায়ু সঞ্চরণে ঢুকি, আর ছাই ওড়ে। কমলালেবুর মত করুণ মাংসের ঘ্রাণ ঢোকে নাসাগহ্বরে। মুমুর্ষূ রোগীর শয্যাপার্শ্বে অহেতুক কমলালেবু নয়, মানুষের ভিড় রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করে। তাঁকে জীবন দিতে পারে না। মৃত্যু তাঁর সহচর, আশেপাশে ঘোরে। আর ঠিক এ সময়ে কবি সুব্রত সরকার চিৎকার করে ডেকে ওঠেন হাসপাতালের ঘরে – ‘রাহুল! রাহুল! রাহুল! রাহুল!’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মৃত্যু ও জীবনের পূর্ণগ্রাস রচিত হয় যেন। নিথর মুখে রক্ত ক্লেদে বসা মাছি উড়ে যায়, নৃত্যের বিভঙ্গ যেন সেবিকার চলায় কী অমোঘ কী অমোঘ! কিছু বিমান উড়ে যায় দেখি হাসপাতালের বহুতল থেকে। তারা কি এ শোক নিতে পারে না? উড়ে যেতে পারে না মৃত্যুশোক নিয়ে ওই গোধূলি দিগন্তে? আবার ফিরে আসতে পারে না গাঢ় রাত্রিতে করপুটে জীবিতের উল্লাস নিয়ে?

ঠিক পরিচয় ছিল না আমার তাঁর সঙ্গে, যখন উঠে এলেন আমাদের বাড়ির ঠিক পাশের বাসায় – একা ও কয়েকজন। প্রথাগত পরিচয়ের বয়স তখনো আমার হয়নি। আমি তখন কেলাস তিন কি চার। অথচ কী আপন লেগেছিল তাঁকে এবং তাঁদের! প্রতি জন্মদিন ও বইমেলায় উপহার বই। আমার শৈশব ঘিরে ছিল মনীষীদের জীবনী নিয়ে লেখা প্যাপিরাসের সেইসব বই।

স্মৃতি এক বিষণ্ণতা। তিনি লিখেছিলেন, “প্রতিভা বিষণ্ণ তার শিল্প আমোদিনী…” – আর কিছু পারি না পারি, বিষণ্ণ হওয়ার প্রতিভা আমায় বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই করায়ত্ত। এক হাতে বিষণ্ণতা নিয়ে অন্য হাতের হর্ষ আমি অবলীলায় ছুঁড়ে ফেলতে পারি আকাশের প্রতি আর দেখি আকাশ ক্রমশ নীল থেকে অতি নীল… যেন আমার এক হাতের বিষাদের বিষ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে আকাশে।

এই লেখা যখন প্রস্তুত করছি, তখন সময় রাত চারটে বেজে ১৮… রাত নয়, ভোর। তবে সুপ্রভাত বলি আপনাকে পাঠক! অথচ এ রাত দীর্ঘ রাত। দীর্ঘ দিনগুলিও। কেন লিখছি এত কথা? এত শব্দ-অক্ষরের বিস্তার কেন? কেন? কেন? যার লেখা কবিতা এমন কোনো দিন নেই রাত নেই, আমার নিত্যনৈমিত্তিক অশনাক্ত এই বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় সহায় হয়নি। হয়ত আরও কারও কারও, হয়ত আরও অনেকের… অথচ তাঁর গদ্য কম আলোচিত বলেই মনে হয় কবিতার প্রতিতুলনায়। লিখেছেন যদিও স্বল্প, তবু তাঁর গদ্যে কাব্যের ইঙ্গিত স্বমহিমায় অটুট। তাঁর কাব্যের ইশারা এক ভিন্নস্বর যেন বা। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রয়োজন স্তুতির নয়, প্রয়োজন উপেক্ষার। আর তাই শরীরে শরীরে তরল আগুন ঢেলে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই কারুবাসনার প্রেত মন্থর গতিতে আসে গৃহে’। একটি বিষয় এখানে উল্লেখিত থাক যে, আমি তাঁর লেখা যা ঊদ্ধৃত করছি, তা গ্রন্থের সাহায্য না নিয়ে, এর সামান্যতর কৃতিত্বও আমার নয়, কারণ তাঁর লেখায় ছিল গাঢ় প্রবাদময়তা। যা স্মরণ-প্রত্যাশী। তিনি স্মৃতিকেই সংস্কৃতি রূপে সম্যকভাবে ভেবেছিলেন, আর তাই তিনি শঙ্কিত হতেন বিস্মৃতিতে।

আরো পড়ুন কবিতা এবং অকবিতাকে অনন্তর সঁপে যাওয়া জীবন দেবারতির

আজ শোকের বাতাস বড় ভারি হয়ে আছে আমার মনের দিগন্তে। জগৎ চলছে, কিছুই থেমে নেই, থামল শুধু তাঁর মেধার কালি ও কলম। অদ্ভুত এক মায়াবী বাঙ্ময়তা তাঁর উচ্চারণের সন্ধি। যতবার শুনেছি তাঁর উচ্চারণ, মনে হয়েছে তিনি বলে চলেছেন অক্ষরবৃত্তে দর্শন। দিগন্ত মিনারে বসা বায়স অথবা বিজ্ঞাপনের বাদামি আঁচিলের রোমাঞ্চ রমণীর সঙ্গে কথোপকথন তাঁকে নিয়ে গেছে উড়ালের পথে। যেখানে শ্রেণিহীন স্বচ্ছ সোপানের আকাঙ্ক্ষায় তিনি কলোনির ঘরে রয়েছেন অপেক্ষায় অপেক্ষায়…

মৃত্যুহীন রাহুল, রাহুল পুরকায়স্থ আমার ব্যক্তিগত প্লাবন, আমার ত্রাণশিবিরের রূপকথা

নিবন্ধকার বাংলা কবিতার অকিঞ্চিৎকর পাঠক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.